সৌগত চক্রবর্তী: ‌• বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় প্রযোজক ও পরিচালকের সঙ্গে পরপর দুটো সিনেমা করে ফেললেন। কেমন লাগছে?‌
•• ভীষণ, ভীষণ ভাল লাগছে। আমি অনেকদিন ধরেই চেয়েছিলাম শিবু (‌শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়)‌ ও নন্দিতার (‌নন্দিতা রায়)‌ সঙ্গে কাজ করতে। শিবু যখন যোগাযোগ করল আমার সঙ্গে ‘‌মুখার্জিদার বউ’‌ করার সময় তখন খুব খুশি হয়েছিলাম। কী অসাধারণ চরিত্র। একটা সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার!‌ সবাই তো ভাবে না আমাকে নিয়ে। নন্দিতা আর শিবু যে আমাকে এরকম একটা চরিত্রে ভেবেছেন তাতে আমি ভীষন খুশি। সেটা শেষ হল, ছবি হিট হল। দর্শক ভীষনভাবে গ্রহণ করল ছবিটা। আমি ওঁদেরই কৃতিত্ব দেব যে ওঁরা কীকরে বুঝতে পারলেন, ওরকম একটা গল্প, শাশুড়ি আর বৌমাকে নিয়ে, কীভাবে শাশুড়ি আর বৌমা একসঙ্গে সাইকোলজিস্টের কাছে যাচ্ছে, আসাধারণ। যেমন গল্প, চিত্রনাট্য, যেমন পৃথার ডিরেকশন, তেমনই শিবু-‌নন্দিতার পরামর্শ। সব মিলিয়ে ওয়ান্ডারফুল এক্সপেরিয়েন্স। সেই সময়েই শিবু বলে দিয়েছিল অমুক সময় আমার জন্য কয়েকটা ডেট রাখবেন। আমি আপ্লুত। বুঝলাম, আমার ওপর ওঁদের ভরসা আছে। ওঁরা চান আমার সঙ্গে কাজ করতে। তাঁরা এটা বিশ্বাস করেন না, মেন ক্যারেক্টার করতে গেলে সুন্দরী হতে হবে বা কমবয়সি হতে হবে। শুটিং করতে গিয়ে বারবার মনে হয়েছে, ইস কী খারাপ দেখতে আমি (‌হাসি)‌। কিন্তু নন্দিতা বারবার বলেছে, ওসব একদম মনে আনবেনা।
• এই ছবিতে আপনার অভিনীত চরিত্রটা কেমন?‌
•• ‘‌গোত্র’ ছবিতে আমি অভিনয় করেছি মুক্তিদেবীর চরিত্রে। এই চরিত্রটা শিবুর মায়ের ওপর বেস করে। সম্পূর্ণ কপি নয়, বলা যায় ওর মায়ের আদলে। তখন আমি একদিন গেলাম মাসিমার সঙ্গে আলাপ করতে। ওঁকে দেখে আমার ভীষন ভাল লেগেছে। ওঁকে দেখতেও যেমন সুন্দর, ব্যবহারও তেমন আর কী শিক্ষিত!‌ দারুণ ইন্সপিরেশনাল মানুষ। আমার অত শিক্ষাও নেই, আর ভীষন অজ্ঞ। আমি ওঁর চরিত্রটা নিজের মধ্যে নেব কী করে, এটাই ছিল আমার সমস্যা। শিবু আমায় ভরসা দিল। চরিত্রটা এতটাই জমজমাট যে যতদিন গেছে ততই চরিত্রটার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছি। চরিত্রটা শিক্ষিত, সে মানুষ ভালবাসে, সে জাতপাতে বিশ্বাস করে না।
• এই ছবির একটা পোস্টারে আপনার ছবি দিয়ে লেখা ছিল ‘‌হিটলার মাসি’‌। এটা কেন?‌
•• (‌হেসে)‌ আসলে ভদ্রমহিলা অত বড় বাড়িতে একা থাকেন তো!‌‌ সেখানে ছেলে থাকে না। ছেলেকে, বউমাকে নাতিকে খুব মিস করেন। এইসব নানা কারণে একটু রাগী। কেউ হুট করে বাড়িতে ঢুকে পড়ুক, সেটা পছন্দ করেন না। ছেলে মা-‌কে দেখার জন্যে কেয়ারটেকার রাখে। সেই কেয়ারটেকারকে মহিলার একদমই পছন্দ নয়। একটু খিটখিটে। কেউ বিড়ি ধরালে সেটা পছন্দ নয়, কেউ হিন্দি গান শুনলে সেটাও পছন্দ নয়, এই কারণেই ‘‌হিটলার মাসি’‌।
• এই ছবিতে নাইজেল আকারার সঙ্গে কাজ করলেন। ওঁকে একজন সহশিল্পী হিসেবে বা মানুষ হিসেবে কেমন লাগল?‌
•• সহশিল্পী হিসেবে আমি নাইজেলকে এক্সেলেন্ট বলব।  এবং সবসময়ে নিজেকে ইমপ্রুভ করার একটা ইচ্ছে ওকে তাড়া করে বেড়ায়। একটা শট ঠিকমতো হল কী না, নন্দিতা-‌শিবুকে বারবার জিজ্ঞেস করত। আমার কাছে এসেও বলত, দিদি প্লিজ আপনি বলুন। এই শটটা ঠিক না হলে আবার দেব। আমি যে এক্সপ্রেশন দিচ্ছি আপনি ঠিকঠাক রিঅ্যাক্ট করতে পারছেন তো?‌ এটাই তো আমরা চাই। সবাই চাই। এই অল্পে সন্তুষ্ট না হওয়ার ব্যাপারটা ওর মধ্যে আছে। এছাড়াও ও খুব ডিসিপ্লিনড। ওকে এই ছবিতে খুব খাটতে হয়েছে। কিন্তু মুখ বুজে সেই খাটনিটা ও করেছে। ও এখন আমার খুব বন্ধু হয়ে গেছে। খুব ভাল ছেলে।
• কয়েকদিন আগেই জোম্যাটোর এক ডেলিভারি বয়ের হাতে খাবার নিতে অস্বীকার করেছিল ভিন্ন ধর্মের এক মানুষ। সেরকম একটা ঘটনা এই ছবির ট্রেলারেও কিন্তু আছে। যেখানে প্রোমোটার বাপি তারেক আলির হাতে প্রসাদ নিতে অস্বীকার করছে।
•• আমাদের ‘‌গোত্র’‌র বিশেষত্ব তো ওটাই। শিবু-‌নন্দিতারও বিশেষত্ব ওখানে। একদম সমসাময়িক কিছু সমস্যাকে ওরা তুলে ধরে। তার সঙ্গে বিনোদনের দিকটাতেও ওরা নজরে রাখে। তার ওপর এই যে একা থাকা বৃদ্ধ-‌বৃদ্ধারা খুন হয়ে যাচ্ছেন ইদানীং, সেটাও এই ছবির বিষয়ের সঙ্গে এসেছে। তাই সবদিক থেকেই ‘‌গোত্র’‌ একেবারে সমসাময়িক একটা ছবি।
• এখন টেলিভিশনে কাজ করছেন?‌
•• এই তো দুটো ধারাবাহিক ‘‌অন্দরমহল’‌ আর ‘‌কুসুমদোলা’‌ শেষ করলাম। এই মূহূর্তে আর টেলিভিশনে করছি না। ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই করব। আসলে ওই দুটো সিরিয়াল শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই ছবির কাজ এল। পরপর চারটে ছবির কাজ। ‘‌তারিখ’, ‘‌মুখার্জিদার বউ’, ‘‌গোত্র’‌ আর ‘‌দেবতার গ্রাস’‌।
• এখন আপনি তাহলে সিনেমায় আরও বেশি কাজ করতে চাইছেন?‌
•• না, সেরকম কোনও ব্যাপার নেই। কখন যে কী কাজ আসে সেটা তো আমি বলতে পারি না। এই মূহূর্তে আর কোনও কাজ নেই। অথচ কাজ আমাদের করতেই হবে। মনের খিদে মেটাবার জন্যেও কাজ করতে হবে আবার পেটের খিদে মেটাবার জন্যেও কাজ করতে হবে (‌হাসি)‌। আর কাজ পেলে মনটাও বেশ ভাল থাকে। একসময়‌‌ তো টেলিভিশনে প্রচুর কাজ করেছি। আর সৌমিত্রদার (‌সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়)‌ মতো সিনিয়রদেরও দেখছি এই বয়সেও কতটা কাজ করছেন। মাধবীদি (‌মাধবী মুখোপাধ্যায়)‌, সাবুদি (‌সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়)‌ এঁরা আমার ইন্সপিরেশন। কাজেই ছবি আমার প্রায়োরিটি হবে কী না বলতে পারছি না, তবে ডেফিনিটলি আমাকে কাজ করতে হবে। তবে শিবু-‌নন্দিতার সঙ্গে আরও বেশি কাজ করতে চাই।
• শৈবাল মিত্রর ‘‌দেবতার গ্রাস’‌-‌এর শুটিং কি শেষ?‌
•• হ্যাঁ, শুটিং শেষ। এবার ডাবিং শুরু হবে।
• এর আগে ‘‌তাহাদের কথা’‌, ‘‌ভাল থেকো’‌, ‘‌চিত্রাঙ্গদা’‌—অনেক ছবিতে কাজ করেছেন। মাঝখানে বেশ কিছু সময় ছবিতে আপনাকে দেখা যায়নি কেন? ধারাবাহিকে ব্যস্ত ছিলেন বলে?‌
•• ব্যস্ত ছিলাম ঠিকই। তবে সিনেমা না করার সেটাই কারণ নয়। আসলে এর উত্তরটা প্রযোজক, পরিচালকরাই বলতে পারবেন।
• নতুন করে থিয়েটার‌ করছেন?‌
•• না, আসলে থিয়েটার করার জন্যে যে সময়টা দরকার সেটা এখন দিতে পারব না। বিভিন্ন কাজে এখন জড়িয়ে গেছি। একসময় তো থিয়েটার করতাম। সঙ্গে একটা কর্পোরেট হাউসে চাকরিও করতাম। প্রায় ৩২ বছর। সেই সময়টা চুটিয়ে থিয়েটার করেছি। থিয়েটারই আমার প্রথম পছন্দ। তারপর ছেলে বিদেশে পড়তে গেল আর আমিও চাকরি ছেড়ে ধারাবাহিকে মন দিলাম। এখন শো থাকলে ‘‌সোনাটা’‌ আর ‘‌সিনেমার মতো’‌ নাটকের শো করছি। তবে ইচ্ছে থাকলেও সেভাবে থিয়েটার করতে পারছি না বলে মনটা একটু খারাপ। ধারাবাহিক আর সিনেমা নিয়েই এখন কাটছে। দেখা যাক জীবন কোনদিকে নিয়ে যায়!‌ ‌‌

ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top