সম্রাট মুখোপাধ্যায়: অমিতাভ বচ্চনের নায়ক হয়ে ওঠার পেছনে ‘‌ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল’‌–‌এর একটা অবদান আছে!‌ ছোট্ট হলেও।
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে ‘‌পোজ’‌ দিয়েছিলেন অমিতাভ বচ্চন। আর ছবিটা তুলেছিলেন ভাই অজিতাভ বচ্চন। সালটা ১৯৬৭। কলকাতায় তখন অমিতাভ চাকরি করেন ‘‌ব্ল্যাকার্স’‌ সংস্থায়। মাসিক ১৬০০ টাকা মাইনে। তখনকার হিসেবে বেশ ভালই মাইনে বলা চলে। আর নাটক করতেন ‘‌দ্য আমেচার্স’‌ বলে একটি ইংরেজি নাটকের দলে। ‘‌হু ইজ অ্যাফ্রেড অফ ভার্জিনিয়া উলফ’‌ নাটকটির প্রযোজনা করে যে দলটির তখন বেশ সুনাম।
ছোট ভাই অজিতাভও তখন চাকরি করতে এসে কলকাতাতেই থাকেন। ভাই পুরোপুরি ওয়াকিবহাল দাদার অভিনয় ক্ষমতা সম্পর্কে। তার ইচ্ছা দাদা এগ্‌জিকিউটিভ–‌এর চাকরি ছেড়ে পর্দার জগতে যাক। সেই মনোগত ইচ্ছেমতোই দাদার কতগুলো ‘‌গ্ল্যামারাস’‌ ছবি তোলা। যার একটি ছিল ‘‌ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল’‌ হলের সামনে। সেসময় ‘‌ফিল্মফেয়ার’‌ পত্রিকা একটি নতুন মুখ খোঁজার ‘‌কনটেস্ট’‌ করে। সেখানে দাদার ওই ছবিটি পাঠায় অজিতাভ। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে প্রতিযোগিতার ফল জানা যায়নি শেষপর্যন্ত।
ওই ছবিটা কিন্তু বিমুখ করেনি অমিতাভকে। অজিতাভ ওই ছবিটিই পৌঁছে দিয়েছিলেন বোম্বেতে পরিচালক খাজা  আহমেদ আব্বাসের কাছে। যিনি তখন ‘‌সাত হিন্দুস্থানি’‌ বানাতে চলেছেন। আমিতাভের ওই ছবি দেখেই তাকে ডেকে পাঠান আব্বাস। পছন্দসই ছবিটা বহুদিন তিনি টাঙিয়ে রেখেছিলেন নিজের অফিসে।
ষোলোশো থেকে পঞ্চাশ
অমিতাভের কেরিয়ারের শুরুতে পরোক্ষে এইভারে এই শহরের এক দর্শনীয় স্থানের যদি ভূমিকা থাকে, তবে আর এক পরোক্ষ ভূমিকা আছে এ ‌শহরের এক পরিচালকেরও। তিনি সত্যজিৎ রায়!‌
সত্যজিতের ইউনিটে তখন সহ–‌পরিচালক হতে এসেছেন টিনু আনন্দ। যাকে আব্বাস সাহেব তাঁর নির্মীয়মাণ ‘‌সাত হিন্দুস্থানি’‌র এক হিন্দুস্থানি হিসেবে ভেবে রেখেছেন। কিন্তু টিনুর মাথায় তখন অভিনেতা হবার থেকেও পরিচালক হবার পোকা। চলে এসেছেন তাই সত্যজিৎ রায়ের কাছে।
সত্যজিৎ টিনুকে বলেন, ‘‌অভিনেতা হবার ইচ্ছে থাকলে বোম্বে থাকো। কিন্তু পরিচালনা শিখতে হলে এক মুহূর্ত দেরি না করে কলকাতা চলে এসো। ‘‌সে কথাকে মান্যতা দিয়ে টিনু পত্রপাঠ চলে এলেন কলকাতায়।
আর তাঁকে না পেয়ে, তাঁর সেই ছেড়ে আসা চরিত্রে খাজা আহমেদ আব্বাস সুযোগ দিলেন কলকাতা থেকে বোম্বে আসা সেই ছেলেটাকে। যে চরিত্রে সুযোগ দিলেন, সে চরিত্রটির নাম আনোয়ার আলি। এ নামটার ব্যাপারে একটা মজার ব্যাপার আছে। এই ছবিরই অন্যতম এক প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন এক যুবক, যার সত্যি সত্যিই বাস্তবে নাম আনোয়ার আলি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিখ্যাত কমেডি–‌অভিনেতা মেহমুদের ভাই। তার নাম শুনেই এই চরিত্রটির নাম মনে আসে আব্বাস সাহেবের। এই চরিত্রটির যে ছবি তাঁর মনে এসেছিল তা রোগা, লম্বা চেহারার। অমিতাভ যেদিন দেখা করতে আসেন কে এ আব্বাসের সঙ্গে, সেদিন তাঁর পরনে ছিল চুড়িদার পাজামা আর জহর কোট। তাতে তাঁকে আরও রোগা আর লম্বা লাগছিল। আব্বাস সাহেব বুঝে যান, তিনি এই ‘‌ঘোড়া’‌টির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন।
মজার কথা, পরে এই আনোয়ারের সঙ্গে দুর্দান্ত বন্ধুত্ব হয়ে যায় অমিতাভের। দু’‌জনে হয়ে ওঠেন হরিহর আত্মা। এতটাই যে একসময় আনোয়ার আর অমিতাভ একসঙ্গে থাকতেন আনোয়ারের ফ্ল্যাটে। আর ভাইয়ের বন্ধু এই সুবাদেই অমিতাভকে প্রথম দেখেন মেহমুদ। দেখেই এতটাই পছন্দ হয়ে যায় তাঁকে যে ডেকে নিয়ে সুযোগ করে দেন নিজের পরের ছবি ‘‌বোম্বে টু গোয়া’‌য়। সেদিন যখন ঘরে ঢুকেছিলেন মেহমুদ, বড় একজনকে সম্মান দেখাতে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন অমিতাভ। এই ব্যাপারটাই চেহারার পাশাপাশি আকর্ষিত করে মেহমুদকে।
মজার কথা আরও এটাই যে, এই ‘‌বোম্বে টু গোয়া’‌য় এক অ্যাকশন দৃশ্যে অমিতাভের হাত–‌পা ছোঁড়া দেখেই তাঁকে মনে ধরে চিত্রনাট্যকার সেলিম আর জাভেদের। তাঁদের সুপারিশ অমিতাভের কাজে লাগে ‘‌জঞ্জির’‌ ছবিতে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে।
‘‌সাত হিন্দুস্থানি’‌ হিট করেনি। ঠিক বাজারে ’‌হিট’‌ করানোর ফর্মুলায় বানানোও নয় এই ছবি। কিন্তু এ ছবি অমিতাভের কেরিয়ারে ঠিকঠাক সিঁড়ির প্রথম ধাপ হয়ে উঠতে পেরেছিল। এ ‌ছবি সেবার জাতীয় পুরস্কার পায় জাতীয় সংহতি প্রচারের জন্য। সেই পুরস্কারের আসরে বিশেষভাবে বলা হয়েছিল অমিতাভের নাম। এ ‌ছাড়াও বছরের সেরা উদীয়মান মুখ হিসেবে অন্য একটি পুরস্কারও পান তিনি।
কেরিয়ারের প্রথম সাড়ে তিন বছরে ‘‌আনন্দ’‌ ছেড়ে দিলে ১১টা ছবি ফ্লপ করে অমিতাভের। কখনও তাঁর উচ্চতার অজুহাতে নায়িকা ছবি করতে চাননি, কখনও তাঁর চেহারাকে বড় বেশি ‘‌কবি–‌কবি’‌ বলে বাতিল করেছেন কোনও পরিচালক। একবার মেরিন ড্রাইভে দু’‌রাত রাস্তার বেঞ্চিতে শুয়ে কাটিয়েছেন। খাবার খেয়েছেন মধ্যরাতে, খাবারের দাম অর্ধেক হয়ে যাবার পরে। কিন্তু ওই প্রথম ছবিই বুঝিয়ে দিয়েছিল একজন অন্য চেহারার, অন্যরকম অভিনেতা এসে গেছেন। আনোয়ার আর জালাল আগা (‌‘‌সাত হিন্দুস্থানি’‌র আর এক ‘‌হিন্দুস্থানি’‌)‌ আব্বাস সাহেবের অফিসে ছবি দেখে নিজেদের মধ্যে ব্যঙ্গবিদ্রুপ করেছিল অমিতাভকে নিয়ে। প্রথমবার যখন তাঁদের সঙ্গে দেখা হয় অমিতাভের, আর ‘‌হ্যালো’‌ বলে হাত বাড়িয়ে দেন তিনি, সেই গলা শুনেই তাঁরা বোঝেন এ ছেলেকে উপেক্ষা করা যাবে না। জালাল আগা পরে বেশ কিছু রেডিও–‌র বিজ্ঞাপনের কাজ জোগাড় করে দেন অমিতাভকে। হরলিকস্‌, নিরলন প্রভৃতি কোম্পানির। পঞ্চাশ টাকা করে পেতেন অমিতাভ বিজ্ঞাপনপিছু। সেই টাকাটা বেশ কাজে আসত থাকা–‌খাওয়ায়।
বাড়ি থেকে পালিয়ে কি?‌
‘‌সাত হিন্দুস্থানি’‌র কাহিনির কেন্দ্র গোয়ার মুক্তিযুদ্ধ। তাতে শামিল ছয় যুবক ও এক যুবতীর গল্প। আব্বাস ঠিক করেছিলেন ছয় যুবক নেবেন আলাদা আলাদা ধর্মের, জাতির, ভাষার। যে বাস্তবে যে ‌রকম সে সেই চরিত্র পাবে না। এইভাবে ‘‌কাস্টিং’‌ থেকে পরিচিতি–‌মিশ্রণ ঘটাবেন তিনি। এরই ফলে বাঙালি উৎপল দত্ত ছবিতে হয়ে গিয়েছিলেন পাঞ্জাবি। দক্ষিণী অভিনেতা মধু হয়ে গিয়েছিলেন বাঙালি। বাস্তবের আনোয়ার হয়ে গেল হিন্দু রাম ভগৎ শর্মা। আর অমিতাভ হলেন মুসলমান আনোয়ার আলি।
ছবির পুরো চিত্রনাট্য শুনে অমিতাভ প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন তাঁর দু‌টো চরিত্র পছন্দ। পাঞ্জাবি আর মুসলমানের। উৎপল দত্তকে ভাবা আছে পাঞ্জাবি চরিত্রে, সেটা পেতে পারেন না অমিতাভ। অতএব পেলেন মুসলমানের চরিত্র।
এরপর আসে পারিশ্রমিকের প্রশ্ন। আব্বাস পরিষ্কার বলেন এ ছবির জন্য অমিতাভ পাবে ৫,০০০ টাকা। মাসে ১৬০০ টাকার চাকরি ছেড়ে এসেছেন। সে তুলনায় এ ‌টাকা কিছুই নয়। কিন্তু তবু এ ‌ছবি হাতছাড়া করার কথা ভাবতে পারেননি অমিতাভ। খুব দৃঢ় গলায় তিনি আব্বাস সাহেবকে জানিয়ে দেন তিনি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। এই অ্যাটিটিউডটাই পছন্দ হয় আব্বাসের। সেদিনই চুক্তিপত্র তৈরি হয়।
আর সেই সইসাবুদের কাজটা করতে গিয়ে জানতে পারেন আব্বাস যে অমিতাভ বচ্চন আদতে কবি হরবংশ রাই বচ্চনের বড় ছেলে। এটা জেনে একটু দ্বিধায় পড়ে যান আব্বাস। জানতে চান অমিতাভের কাছে, তাঁর সিনেমায় নামার ব্যাপারে তাঁর বাবার সম্মতি আছে তো?‌ আসলে তখন হরবংশ রাই বচ্চন আর খাজা আহমেদ আব্বাস দু’‌জনেই একসঙ্গে ছিলেন ‘‌সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার’‌–‌এর বিচারক। আব্বাস চাননি সিনিয়র বচ্চনের সঙ্গে দেখা হলে কোনও ভুল বোঝাবুঝি হয়।
আব্বাসের প্রশ্ন উত্তরে মজা করে একটি প্রশ্নই করেন অমিতাভ— ‘‌আপনার কি আমাকে দেখে বাড়ি থেকে পালানো ছেলে বলে মনে হচ্ছে?‌’‌ ঠান্ডা গলায় আব্বাস উত্তর দেন, ‘‌যারা বাড়ি থেকে পালায়, তাদের চেহারা দেখে কিছুই ঠাহর হয় না।’‌
‘‌সাত হিন্দুস্থানি’‌র শুটিং শুরু হয় ১৯৬৯–‌এর ফেব্রুয়ারি মাসে। আর ছবি মুক্তি পায় নভেম্বরে। শুটিং হয়েছিল বেশ কষ্ট করে। খাওয়া হত হিসেব করে। রান্নাঘরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন উৎপল–‌গৃহিণী শোভা সেন। যে যার নিজের বেডিং নিয়ে গিয়েছিল। অমিতাভও। রাতে শুতেন অনেকে মিলে এক বাংলোর বড় হলঘরে। ঐতিহাসিক ইনিংসের শুরুটা ছিল এরকমই।
এ ‌বছর ‘‌সাত হিন্দুস্থানি’‌র সুবর্ণ জয়ন্তী বছরে, গোয়ায় ‘‌ইফি’‌র অনুষ্ঠানে এসে অমিতাভ তুললেন এখানে তাঁর ওই ছবির শুটিং করে যাবার কথা। বললেন, মনে হচ্ছে ঘরে ফিরেছি।
তথ্যঋণ:‌ ‘‌অমিতাভ বচ্চন’‌ সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় আনন্দ পাবলিশার্স‌

জনপ্রিয়

Back To Top