সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ‘‌হাওড়া ব্রিজ কতগুলো স্ক্রু দিয়ে তৈরি?‌’‌
ছয়ের বা সাতের দশকে এ ছিল এক অতি পরিচিত ‘‌জামাই–‌ঠকানো’‌ প্রশ্ন। যে প্রশ্ন করে নিয়মিতই ভড়কে দেওয়া হত চাকুরি প্রার্থী যুবকদের ইন্টারভিউ বোর্ডে।
যার সাক্ষ্য ধরা আছে জনপ্রিয় বাংলা সিনেমার ইন্টারভিউ–‌সিকোয়েন্সে। নায়ককে পর্যুদস্ত করা হচ্ছে ওই প্রশ্নবাণে। এ প্রশ্ন আক্ষরিক অর্থেই ‘‌জামাই–‌ঠকানো’‌ এই জন্য, কারণ হাওড়া ব্রিজে কোনও স্ক্রু বা নাটবল্টু নেই। না, গোটা ব্রিজেই নেই। কারণ এ ব্রিজ বানানো হয়েছে লোহার সঙ্গে লোহাকে ‘‌রিভেট’‌ করে বা ঝালাই করে জুড়ে।
হাওড়া ব্রিজের আগে গঙ্গা নদীর ওপরে ছিল পন্টুন ব্রিজ, যা এক ধরনের অস্থায়ী ছোট সেতু। ১৯৩৬ সালে তার জায়গায় শুরু হয় পাকাপোক্ত লৌহনির্মিত হাওড়া ব্রিজ তৈরির কাজ। ছয় বছর কাজ চলে ১৯৪২–‌এ শেষ হয় ব্রিজ। আর তা জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় ১৯৪৩ সালের তেসরা ফেব্রুয়ারি। ৭০৫ মিটার লম্বা আর ৩১ মিটার চওড়া এই ব্রিজ পুরোটাই স্টিলে তৈরি।  তৈরি করেছিল ব্রেথওয়েট, বার্ন অ্যান্ড জেশপ–‌এর মতো নামী কোম্পানি। কোনও কাঠ নেই। নাম হাওড়া ব্রিজ হলেও দেখভালের দায়িত্ব কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের। ৮২ মিটার উঁচু হওয়ায় এর নীচ দিয়ে বড় জলযানদের যেতে অসুবিধা হয় না। ১৯৬৫–‌র জুনে অবশ্য এ ব্রিজের একটা পোশাকি নাম দেওয়া হয়। ‘‌রবীন্দ্র সেতু’‌। তবে সে নাম কাগজে কলমে ওই ভাল নাম হয়েই রয়ে গেছে। বাঙালির মুখে মুখে আজও এ ব্রিজ হাওড়া ব্রিজ।
এই ব্রিজ নিয়ে আরও একটা ‘‌জামাই–‌ঠকানো’‌ প্রশ্ন আছে। হাওড়া ব্রিজ কে উদ্বোধন করেন?‌ আসলে এই ব্রিজের কোনও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে তখন। ভয় ছিল জাপান যদি বোমা ফেলে। ব্রিজ তৈরিতে খরচ হয়েছিল তৎকালীন আড়াই কোটি টাকা। লেগেছিল ২৬,৫০০ টন স্টিল। এটি বিশ্বের তৃতীয় দীর্ঘতম কান্টিলিভার ব্রিজ। যা দিয়ে প্রতিদিন আনুমানিক তিন লক্ষ যানবাহন আর সাড়ে চার লক্ষ পথচারী যাতায়াত করে।
দক্ষিণাও এসেছে
ব্রিজ খুলে দেওয়ার পরে প্রথম যে গাড়িটি পার করেছিল হাওড়া ব্রিজ তা একটি জনশূন্য ট্রাম। ট্রাম। কলকাতার আরেক ‘‌রেট্রো’‌ চিহ্ন।
আর এই তো ছ দিন আগে এই ব্রিজ দাপিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে গেলেন আমির খান। ‘‌লাল সিং চাড্ডা’‌র ছদ্মবেশে। শুটিংয়ের প্রয়োজনে। রবিবার। ছুটির দিনের ভোর। তবু ভিড় জমে গিয়েছিল ব্রিজের ওপর।
আমিরই প্রথম নন অবশ্য। হাওড়া  ব্রিজ হিন্দি ছবির কাছে এক ‘‌লোকেশন–‌কোহিনূর’‌ সেই পাঁচের দশক থেকেই। আর এই ‘‌ট্রেন্ড’‌–‌এর মিনার তৈরি এক প্রবাসী বাঙালি পরিচালকের হাতেই। পরিচালকের নাম শক্তি সামন্ত। ছবির নাম ‘‌হাওড়া ব্রিজ’‌। ব্যস, প্রচ্ছদপট তৈরি। সেটা ১৯৫৮ সাল। নায়কও বাঙালি। অশোককুমার। নায়িকা মধুবালা। ছবিতে গান ছিল ‘‌শুনো জি ইয়ে কলকাত্তা হ্যায়’‌। মহঃ রফির গাওয়া। হাওড়া ব্রিজের ওপর তখন ঘোড়ার গাড়ি চলত। চালক ওমপ্রকাশ এই গান গাইছে।
সেটা তো ১৯৫৮ সালের কথা। অনেকেই হয়তো খেয়াল করেননি। এ ছবির মুক্তির ৬০ বছরের মাথায় মুক্তি পেয়েছিল একই নামের আরও এক ছবি— ‘‌হাওড়া ব্রিজ’‌। এ ছবি তৈরি হয়েছিল অবশ্য তেলুগুতে। শুটিং হয়েছিল কিন্তু হাওড়া ব্রিজকে ব্যাক ড্রপে রেখেই। ছবি মুক্তি পায় ২০১৭–য়। আর ২০১৮–‌য় মুক্তি পায় একই ছবির আরেক রিমেক ‘‌হাওড়া ব্রিজ’‌ নামেই। এবার তামিল আর মালয়ালাম ভাষায় দ্বিভাষিক ছবি হয়ে। সব কটি ছবিই হিট হয়।
এই শহরের প্রতীক
হাওড়া ব্রিজের এই এক মজা। সেখানে ছবি শুট হলেই হিট। এ নিয়ে একটা মজার সংস্কার রয়েছে মুম্বইয়ের ফিল্মমেকার মহলে। শক্তি সামন্ত ১৯৫৮ সালে যেমন ‘‌হাওড়া ব্রিজ’‌ বানিয়ে হিট পান, তেমনই শক্তি সামন্তের আরেক সুপারহিট ছবি ‘‌অমরপ্রেম’‌–‌এও এক গানের দৃশ্যে আসে হাওড়া ব্রিজ। ‘‌চিঙ্গারি কোই ভড়কে’‌ গানের সেই অমর দৃশ্যে। গুরু দত্তের ‘‌পিয়াসা’‌য় আসে। বিমল রায়ের ‘‌দো বিঘা জমিন’‌–‌এও আসে।
আসলে ক্রমশ হাওড়া ব্রিজ হয়ে ওঠে এই শহরের ‘‌সিগনেচার মার্ক’‌। মনুমেন্ট নয়, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল নয়, এমনকি শিয়ালদা স্টেশনও নয়। কলকাতার পরিচিতি চিহ্ন হয়ে ওঠে হাওড়া ব্রিজের আর্চগুলো। হায়দরাবাদের যেমন চারমিনার গেট, মুম্বইয়ের সি বিচ, দিল্লির লালকেল্লা, তেমনই আমাদের গঙ্গাপারের হাওড়া ব্রিজ। ওপরে বলা প্রতিটি ছবিই ‘‌কাল্ট’‌ হয়ে গিয়ে এই চিহ্নকে চিরায়ত করে তুলেছে।
একমাত্র যতদূর মনে পড়েছে, প্রমোদ চক্রবর্তীমশাই যখন ধর্মেন্দ্র–‌মিঠুন–‌ড্যানিকে নিয়ে ‘‌তিনমূর্তি’‌ বানিয়েছিলেন, তিন নায়কের কলকাতা সফরের গানে কালীঘাট ছিল, ধর্মতলা ছিল, বৌবাজার ছিল, শিয়ালদাও ছিল। ছিল না শুধু হাওড়া!‌ দুর্জনেরা কানাকানি করে, মুম্বইয়ের দুই সমসাময়িক পরিচালক শক্তি সামন্ত আর প্রমোদ চক্রবর্তীর আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক এর জন্য দায়ী। শক্তিবাবুর ‘‌হাওড়া ব্রিজ’‌কে ছাপিয়ে‌ যেতে চেয়েছিলেন প্রমোদবাবু। ঝেড়ে ফেলতে চেয়েছিলেন সে নামের স্মৃতি।
মাঝে একটু ভাটা এসেছিল। আবার বলিউডে হাওড়া ব্রিজ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল ২০০৪–‌এ।
সেদিন অমিতাভ
২০০৪–‌এ মণি রত্নম বানান ‘‌যুবা’‌। এ ছবির নাম ঠিক করেছিলেন আগে ‘‌হাওড়া ব্রিজ’‌–‌ই রাখবেন। গঙ্গা পারের দুই শহর জুড়ে গল্প। ফলে ঠিকঠাকই নাম হত। বিশেষত ছবির‌ কেন্দ্রবিন্দু যে ঘটনা তা ঘটছে হাওড়া ব্রিজের ওপরেই। তবু মণি শেষমেশ নাম বদলান, কারণ তাঁকে কেউ কেউ বোঝান যে দর্শক ভাবতে পারে এ ছবি পুরনো ‘‌হাওড়া ব্রিজ’‌–‌এর রিমেক। বড় হিট হয় ‘‌যুবা’‌। আর এর পরের বছরই প্রদীপ সরকারের ‘‌পরিণীতা’‌য় চলে আসে হাওড়া ব্রিজ। শরৎচন্দ্রের মূল গল্পে হাওড়া ব্রিজ ছিল না। থাকা সম্ভবও ছিল না। কারণ তখন ওই ব্রিজ তৈরিই হয়নি। প্রদীপ সরকার চিত্রনাট্যে হাওড়া ব্রিজ এনে দিলেন।
প্রথম পর্বে যদি পর্দায় হাওড়া ব্রিজের মেন্টর হন শক্তি সামন্ত, এই পর্বে তবে সেই ভূমিকায় এলেন মুম্বই প্রবাসী দুই বাঙালি পরিচালক। সুজিত সরকার আর সুজয় ঘোষ। সুজিতের ‘‌পিকু’‌ আর সুজয়ের ‘‌কাহানি’‌ দুয়েরই প্রধান পাত্র–‌পাত্রীরা বাঙালি। সুজয়ের পরের ছবি ‘‌তিন’‌–‌এ তো হাওড়া ব্রিজে ভোরবেলা শুটিং করতে এলেন স্বয়ং অমিতাভ বচ্চন। সব সাবধানতা টপকে খবর ছড়িয়ে যায়। ওই ভোরেও ভিড়ে ভিড় ব্রিজের ওপর। অমিতাভ ভক্তদের দখলে তখন সব। ঠিক এবারও যেমনটা ঘটল আমির খান ‘‌লাল সিং চাড্ডা’‌ হয়ে ভোরবেলা শুটিং করতে গিয়ে।
‘‌লাভ আজকাল’‌, ‘‌বরফি’‌, ‘‌লুটেরে’‌, ‘‌গুন্ডে’‌, ‘‌ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’‌— তালিকায় চোখ বোলান, বুঝবেন কেন বক্স অফিসের বাজারে হাওড়া ব্রিজকে লাকি চার্ম ভাবা হয়।
আফশোস একটাই। গেঁয়ো যোগী ভিখ পেল না। আর বাংলা ছবিও সেভাবে হাওড়া ব্রিজকে ব্যবহার করতে পারল না।
কৌতূহল একটাই। কত রকম ডকুফিচার হচ্ছে। হাওড়া ব্রিজের ‘‌মেকিং’‌ নিয়ে পর্দায় ‘‌পিরিয়ড পিস’‌ হবে কি?‌‌‌

ভোর চারটেয় হাওড়া ব্রিজে দৌড়চ্ছেন আমির খান। ‘‌লাল সিং চাড্ডা’‌র শুটিং। ছবি:‌ সুপ্রিয় নাগ

জনপ্রিয়

Back To Top