অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: তিনি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। তিনি তর্ক পছন্দ করেন। বিশ্বের বিদগ্ধ মানুষেরা সেটা জানেন। জানেন রাষ্ট্রনেতারা। মনমোহন সিং থেকে নরেন্দ্র মোদিই শুধু নন, সেই তালিকায় আছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পও। সেই অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তৈরি সুমন ঘোষের তথ্যচিত্র ‘‌দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’‌ গত বছর সেন্সরে আটকে গিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি করার পর, সেন্সরের ছাড়পত্র নিয়ে মুক্তি পাচ্ছে আগামী ৯ মার্চ। স্বস্তির শ্বাস নিয়ে পরিচালক সুমন ঘোষ বললেন, এমন একজন বিশ্ববন্দিত মানুষের কথা আমাদের এখানকার কেউ দেখতে-‌শুনতে পাবেন না, এটা সত্যিই দুশ্চিন্তার ব্যাপার ছিল আমার কাছে।
অমর্ত্য সেনকে নিয়ে এই তথ্যচিত্রের কাজ সুমন শুরু করেন ২০০২ সালে। তারও চার বছর পরে তিনি চিত্র পরিচালনায় আসেন ‘‌পদক্ষেপ’‌ ছবি দিয়ে। সুমন বলছিলেন, ‘‌কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে যখন পিএইচডি করছি, তখন ফিল্ম কোর্স-‌এও ভর্তি হই। ইচ্ছে ছিল, পরে সিনেমা পরিচালনা করব। সেই কাজের হাতেখড়ি হল অমর্ত্য সেনকে নিয়ে তথ্যচিত্র শুরু করে।’‌ অমর্ত্য সেন তখন কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির মাস্টার অফ ট্রিনিটি কলেজে আছেন। তিনি সুমনের মাস্টারমশাই বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসুর মাস্টারমশাই। ফলে, গুরুর গুরুকে নিয়ে কাজ শুরু করতে দেরি করেননি সুমন। তখন ২০০২ সাল। তথ্যচিত্রের ভঙ্গিটা পাল্টে ফেললেন সুমন। নিছক সাক্ষাৎকার নয়, জীবনী নয়, অমর্ত্য সেনের সঙ্গে আড্ডা দেবেন কৌশিক বসু এবং সেই সূত্রে তাঁর জীবনের নানান পর্যায়কে তুলে ধরবেন সুমন। কাজ শুরু হল। প্রথম আড্ডা বসল হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে।
সেই পর্যায়ের কাজ শেষ হওয়ার ১৪ বছর পরে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ করলেন সুমন। অনেকটা অংশের শুটিং হল শান্তিনিকেতনে। ততদিনে বাংলার এক পরিচিত চিত্রপরিচালক হয়ে উঠেছেন তিনি। কিন্তু এত বছরের ব্যবধান তথ্যচিত্রের তাল কেটে দেয়নি?‌
প্রশ্ন শুনে সুমন বললেন, বরং আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এই তথ্যচিত্র। এই ১৪ বছর দেশে এবং বিশ্বজুড়ে আমূল পরিবর্তন হয়েছে। পৃথিবী পাল্টে গেছে। চোদ্দো-‌পনেরো বছরের এই ব্যবধানটা সিনেম্যাটিক্যালিও ইন্টারেস্টিং কনট্রাস্ট তৈরি করেছে এবং অমর্ত্য সেনের ভাবনাকেও বুঝতে সাহায্য করেছে।
তথ্যচিত্রে চারটি শব্দ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আটকে দিয়েছিল সেন্সর বোর্ড। ‘‌কাউ’‌, ‘‌হিন্দু’‌, ‘‌হিন্দুত্ব’‌ আর ‘‌গুজরাট’‌। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও ‘‌কাট’‌ ছাড়াই মুক্তি পাচ্ছে ‘‌দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’‌। তবে, সুমন বললেন, বিজেপির বিরুদ্ধে যে কথা বলেছেন অমর্ত্যদা, তার চেয়ে অনেক বেশি বিরুদ্ধ কথা উনি বলেছেন তাঁরই বন্ধু, দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের উদারীকরণ নীতি নিয়ে। ডোনাল্ড ট্রাম্পও বাদ পড়েননি অমর্ত্য-‌সমালোচনা থেকে। আসলে, অমর্ত্যদা সত্যিই একজন ‘‌‌আর্গুমেন্টেটিভ’‌ বিশ্ব-‌মানুষ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করে ‘‌নিউ ইয়র্ক টাইমস’‌-‌এও তাঁর লেখা বের হয়। তাহলে এখানে কেন এত অসহিষ্ণুতা?‌ প্রশ্ন তোলেন সুমন।
এত কিছুর পরে এবং এত বছরের ব্যবধান-‌সহ তৈরি হওয়া এই তথ্যচিত্র কলকাতায় মুক্তি পাচ্ছে, এতে যার-‌পর-‌নাই খুশি সুমন ঘোষ। ৯ মার্চ একই সঙ্গে ‘‌নন্দন-‌৩’‌, তিনটি আইনক্স ও একটি সিনেপোলিসের হল-‌এ মুক্তি পাচ্ছে এই এক ঘণ্টার তথ্যচিত্র। এভাবে তথ্যচিত্রের মুক্তি পাওয়াও বিরল ঘটনা। তাঁর সদ্য শেষ হওয়া ‘‌বসু পরিবার’‌-‌এর আগেই মুক্তি পাচ্ছে ‘‌‌দ্য আর্গুমেন্টেটিভ ইন্ডিয়ান’‌। আপাতত তর্কপ্রিয় বাংলার দর্শকদের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি।‌

তখন শুটিং। শান্তিনিকেতনে অমর্ত্য সেন ও কৌশিক বসুর সঙ্গে সুমন ঘোষ।

জনপ্রিয়

Back To Top