সম্রাট মুখোপাধ্যায়: ●‌ আইয়ারি। পরিচালনা:‌ নীরজ পান্ডে। অভিনয়ে:‌ মনোজ বাজপেয়ী, সিদ্ধার্থ মালহোত্রা, নাসিরউদ্দিন শাহ, অনুপম খের, আদিল হুসেন, কুমুদ মিত্র, বিক্রম গোখলে, রাকুল প্রীত সিং, পূজা চোপড়া।
ভারতীয় সেনাবাহিনী। গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। গণতন্ত্রের পাহারাদার।
সেই সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকে এক তদন্ত–‌বাহিনী। ‘‌মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স’‌। আবার তারই পাল্টা এক সংগঠন, বলা উচিত পরিপূরক এক সংগঠন ‘‌কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স’‌ কাজ  করে যায় গোপনে গোপন। চলতি কথায় যার সদস্যরা ‘‌সিক্রেট এজেন্ট’‌। যারা বাস্তবে আছে। অথচ কাগজে–‌কলমে নেই।
রাষ্ট্রের অদৃশ্য পাহারাদার। বলিউডে এমন ‘‌সিক্রেট এজেন্ট’‌কে নায়ক ক‌রে ছবি অনেক হয়েছে। হালফিল সলমান খানের ‘‌টাইগার’‌ সিরিজেই যার সাক্ষ্য আছে। কিন্তু নীরজ পান্ডে মানেই অন্যরকম কিছু। ফলে এ ‌ছবিতেও ভিন্ন একটা মাত্রা এনেছেন পরিচালক নীরজ ‘‌কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স’‌ ব্যাপারটা এনে। যেখানে সেনাবাহিনীর ভেতরেই সেনা‌বাহিনীর লোকেদের পাহারা দেওয়ার জন্য একটা ‘‌সিস্টেম’‌ গড়ে তোলা হয়েছে। গোপনে। যাতে অফিসাররা বা অধস্তনরা কেউই দুর্নীতির ফাঁদে জড়িয়ে না পড়েন।
কিন্তু এটাই নীরজের হাতের সেরা তাস নয়। চূড়ান্ত প্যাঁচটা তিনি খেলেছেন এরও ওপরে!‌ যদি এই ‘‌কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স’‌–‌এর ভেতরেই কেউ অসৎ হয়ে পড়ে, তাহলে কী হবে?‌ যদি সে গোটা ব্যবস্থাটা আর তার অংশীদারদের ব্যাপারে তথ্য তুলে দেয় শত্রুপক্ষের হাতে, তবে কী ঘটবে?‌
এটাই নীরজের এবারের ছবির মূল ‘‌টেনশন’‌?‌ যে লড়াই, যে খেলাটাকে নীরজ তুলে নিয়ে গেছেন প্রায় দাবার খেলার চালের মতো বৌদ্ধিক উচ্চতায়?‌
‘‌আইয়ারি’‌–‌র চিত্রনাট্য যদি সেই দাবার বোর্ড হয়, তবে সেই রণক্ষেত্রের দু’‌পাশে মুখোমুখি বসেছে দুই ‘‌কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অফিসার’‌। কর্নেল অভয় সিং (‌মনোজ বাজপেয়ী)‌ আর মেজর জয় বক্সি (‌সিদ্ধার্থ মালহোত্রা)‌। একসময় দু‌জনেই প্রাণপণে লড়েছে শত্রুদের বিরুদ্ধে। একসঙ্গে। কিন্তু আচমকাই জয় বিগড়ে যায়। আর এই বিগড়ে যাওয়ার একটা প্রেক্ষাপট দিয়েই ছবির শুরু। সেনাবাহিনীর প্রাক্তন এক মেজর গুরিন্দার সিং (‌কুমুদ মিত্র)‌ কাজ করে লন্ডন প্রবাসী অস্ত্র ব্যবসায়ী মহেশ কাপুরের (‌আদিল হুসেন)‌ হয়ে। মহেশও প্রাক্তন সেনা। গুরিন্দার ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের ভিত্তিতে অনুরোধ করে সেনাপ্রধানকে (‌বিক্রম গোখলে)‌ মহেশের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার বরাত দিতে। সেনাপ্রধান রাজি না হলে গুরিন্দার ভয় দেখায় সে মিডিয়ায় ফাঁস করে দেবে সেনাপ্রধানের এই ‘‌কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স’‌ চালানো এবং সে বাবদ ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করার কথা। সেনাপ্রধান এমন কোনও ‘‌এজেন্সি’‌ চালানোর কথা অস্বীকার করেন।
টেলিফোন ‘‌ট্যাপ’‌ করে ‌ দু‌জনের এই কথোপকথন শোনে জয় বক্সি। সেনাপ্রধান যে তাদের কথা অস্বীকার করে, তা ব্যথিত করে তাকে। সেভাবে, তাহলে তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজের স্বীকৃতি কোথায়?‌ তার মনে হয়, ধীরে ধীরে গোটা ব্যবস্থাটাই যেখানে দুর্নীতির গহ্বরে প্রবেশ করছে, সেখানে এক–‌আধজনের সৎ থেকে কী লাভ?‌ ডিপার্টমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ যাবতীয় ফাইল এবং হার্ডডিস্ক নিয়ে সে পালায়। আর তারপর ক্রমান্বয়ে চাহিদামতো অর্থের বিনিময়ে সে সব তথ্য সে তুলে দিতে থাকে গুরিন্দারেরই হাতে। তাকে সাহায্য করতে থাকে বান্ধবী সোনিয়া (রাকুল প্রীত সিং)‌।
জয়ের এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে স্বাভাবিকভাবেই রুখে দাঁড়ায় অভয়। বুদ্ধিতে এবং আদর্শে শুরু হয় এক সঙ্ঘাত। চিত্রনাট্যে এই পর্বটিকে ভারী চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন নীরজ। প্রায় শেক্সপিয়রিয়ান’‌ নাটকের আদল নিয়ে এসেছেন ‘‌থ্রিলার’‌–‌এর ভেতরে। বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বকে কাজে লাগিয়ে। ব্যবস্থার প্রতি আস্থা–‌অনাস্থার গল্পকে টেনে এনেছেন ব্যক্তিগত সম্পর্কের চৌহদ্দিতেই। তার ভেতর ঢুকে পড়েছে বন্ধুত্ব, পেশাগত ঈর্ষা, প্রেম, প্রাক্তন–‌প্রেম, নিষ্ঠুরতা— এরকম নানা মানবিক উপাদান। ফলে ছবি জুড়ে জয় আর অভয়ের লড়াইটা শুধু বুদ্ধির চমকেই আটকে থাকেনি।
উপরন্তু চিত্রনাট্যে যাতে বিন্দুমাত্র ‘‌প্রেডিক্টেবিলিটি’‌ না আসে তাই বড় দুটো বাঁক তৈরি করেছেন নীরজ। প্রথমটি অস্ত্র ব্যবসায়ী মহেশ কাপুরের ভূমিকা নিয়ে। অন্যটি, এ ‌ছবির লুকোনো তাস বাবু রাওকে (‌নাসিরুদ্দিন শাহ)‌ ঘিরে। যে ছবির শেষ ১৫ মিনিটে আসে এবং প্রায় একক অভিনয় করে বাজি জিতে নেয়। এই অংশ নিয়ে এর চেয়ে কিছু বেশি বললে প্রযোজকের প্রতি অবিচার করা হবে। ‘‌আর্মস ডিলার’‌–‌এর চরিত্রে অনুপম খের বরং অনেকটা সাদামাটা।
বলাই বাহুল্য, এরকম ‘‌রাফ অ্যান্ড টাফ’‌ চরিত্রে মনোজ বাজপেয়ীকে তাঁর পূর্ণ চেহারায় দেখা যায়। এবারও গেল। সঙ্গে মিশেছে দ্বিধার মুহূর্তগুলোতে তাঁর চিন্তাশীল অভিনয়। ‘‌নেগেটিভ’‌ চরিত্রে সিদ্ধার্থ মালহোত্রো নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। বলিউডে সেনাবাহিনী মানেই ‘‌ওভারডোজ’‌ জাতীয়তাবাদ। তার থেকে নীরজ বেরিয়েছেন। অন্য পথ দেখিয়েছেন।

জনপ্রিয়

Back To Top