অলোকপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়: মনোময় ভট্টাচার্য, রাঘব চট্টোপাধ্যায় আর রূপঙ্কর বাগচী। তিন গায়কই জনপ্রিয়। তিন জনেরই গান-‌জীবন দু’‌দশক অতিক্রম করেছে। এই প্রথম বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে একই আসরে আসছেন তিন শিল্পী, আজ, বিড়লা সভাঘরে। একই সঙ্গে মঞ্চে বসবেন তিন শিল্পী। ভাগ করে নেবেন গান এবং গান-‌জীবনের কথা। পুজোর গান যখন বাংলা থেকে  বিলীয়মান, তখন পুজোর আবহে তিন জনপ্রিয় শিল্পীকে এক আসরে নিয়ে আসার জন্যে ধন্যবাদ প্রাপ্য ‘‌ইউটোপিয়া’‌ সংস্থার। আমরা কথা বললাম তিন গায়কের সঙ্গে।

ইউটিউবে গান শুনিয়ে
পুজোর গান হয় না

বললেন মনোময় ভট্টাচার্য

• তিন গায়ক একসঙ্গে এক মঞ্চে। এমনটা তো খুব একটা হয় না। আমাদের শুভেচ্ছা।
•• ধন্যবাদ। সত্যিই এমনটা হয় না। আমরা কল-‌শো করতে গিয়ে কখনও আমার পর রূপঙ্কর, বা রাঘবের পরে আমি গান গেয়েছি। কিন্তু এভাবে তিন জনে একসঙ্গে একই মঞ্চে উপস্থিত থেকে গান গাওয়ার, আড্ডা দেওয়ার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। শনিবার (‌আজ)‌ বিড়লা সভাঘরে সত্যিই এক অন্য আবহে চলে যাব আমরা। শ্রোতাদের মধ্যে এনিয়ে যথেষ্ট আগ্রহও তৈরি হয়েছে। এটাও আমাদের বিরাট প্রাপ্তি।
• তিন গায়ক, প্রায় একই সময়ে গানের যাত্রা শুরু করেছেন। পরস্পরের একটা প্রতিযোগিতা তো শুরুতে নিশ্চয়ই ছিল?‌ এখনও কি প্রতিযোগিতা আছে?‌ বা ঈর্ষা?‌
•• আমি এভাবে ব্যাপারটা দেখিনি। কে ভাল গায়, খারাপ গায় এটা নিয়ে ভাবিনি কখনও। আমার গানের কেরিয়ার ২৩ বছরের, রূপঙ্করের ২৪ বছর আর রাঘবের ২০ বছর। সমসাময়িক আমরা। আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব একটা ঘরানা আছে। তাই আমি কখনও প্রতিযোগিতা অনুভব করিনি। ঈর্ষাও নয়। আমি রূপঙ্কর আর রাঘবকে শ্রদ্ধা করি তাদের গানের জন্যে। তারা ভাল গান করে বলেই তো এত বছর ধরে শ্রোতারা তাদের গান শুনছেন। প্রত্যেকের আলাদা ঘরানা।
• আপনার ঘরানাটা কী বলে মনে করেন?‌
•• আমি সফ্ট, মেলোডিয়াস গান গাই। আমার নিজস্ব বেসিক গান আছে। রবীন্দ্রসঙ্গীতও করি। সিনেমার গানও আমি নিয়মিত গাই। সম্প্রতি ‘‌বসু পরিবার’‌-‌এ ‘‌ভ্রমর কইও’‌, ‘‌দুর্গেশগড়ের গুপ্তধন’‌ ছবিতে ‘‌মাগো তুই আসবি বলে’‌ খুবই জনপ্রিয় হয়েছে।
• এই অনুষ্ঠানে কি জনপ্রিয় গানই শুধু গাইবেন?‌ নাকি, ততটা জনপ্রিয় নয়, অথচ নিজের খুব প্রিয়, তেমন গান শোনাবেন?‌
•• দেখুন শ্রোতাদের প্রিয় গান তো গাইতেই হবে। আমার ‘‌চেয়ে দেখো মেঘেরা’‌, ‘‌মনের মানুষ’‌ বা ‘‌ওরে মন, ও উদাস পাগল মন’‌ শ্রোতাদের খুব পছন্দের। এগুলো গাইতে হবে।
• কিন্তু যেসব দুঃখী গান  শ্রোতারা খুব একটা শুনতে চান না, তেমন কী গান গাইবেন?‌
•• এটা ভাল বলেছেন। দুঃখী গান। যেমন গৌতম ঘোষালের কথায়, সুরে ‘‌কোন ছায়ার পথে’‌ তেমন জনপ্রিয় হয়নি, কিন্তু আমার খুব প্রিয়। এই গানটা শ্রোতাদের শোনানোর খুব ইচ্ছে।
• আপনারা পরস্পরের গানও নিশ্চয়ই গাইবেন।
•• হ্যাঁ, অবশ্যই। আমি হয়ত রূপঙ্করের একটা গান গাইব, রূপঙ্কর হয়ত গাইবে রাঘবের গান।
• আপনি তো রূপঙ্করের কথায় সুরে গান গেয়েছেন।
•• হ্যাঁ, ‘‌ওরে মন ও উদাস পাগল মন’‌ তো রূপঙ্করের তৈরি করা গান।
• পুজোর ঠিক আগে মঞ্চে আসছেন আপনারা। অথচ, পুজোর বাংলা গান প্রায় উঠে গেল। দুঃখ হয় না?
•• খুব কষ্ট হয়। খুব খারাপ লাগে। গতবার আমি পুজোর অ্যালবাম করেছিলাম। কিন্তু অ্যালবাম তো কেউ কেনে না। তাই এবার অভিমান করেই আর পুজোর গান করলাম না। লোকে এখন ইউটিউবে গান শোনে। আর যাই হোক, ইউটিউবে পুজোর গান হয় না। আমরাও ইউটিউবে গান দিতে বাধ্য হচ্ছি। এটাই এখন সিস্টেম। কিন্তু ইউটিউবে ‘‌লাইক’‌ দিয়ে গানের মূল্যায়ন হয় না। কেউ যে আদৌ সেই গান শুনছে, তার কোনও প্রমাণ নেই। আমার যে গান ইউটিউবে দশ মিলিয়ন ভিউ দেখাচ্ছে, সেই গানের কোনও অনুরোধ পাই না মঞ্চে। তাহলে কারা ‘‌লাইক’‌ করল?‌ ইউটিউবে লোকে গান দেখে, শোনে না। এই সিস্টেমে গান হিট করানো মুস্কিল। আর, যে পদ্ধতিতে ‘‌হিট’‌-‌এর রাস্তায় হাঁটতে হয়, সেটাতে আত্মসম্মানে লাগে। কিন্তু সিস্টেমটাই পাল্টে গেল আমাদের চোখের সামনে। এই অনুষ্ঠানে অবশ্য একটা পুজোর গান উদ্বোধন হবে, ইন্টারনেটেই। গানটা লিখেছে, সুর করেছে আমার ছেলে আকাশ, অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছে শ্রীকান্ত আচার্যর ছেলে পূরব। অনেকেই গেয়েছে। পুজোর গান। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম একটা সান্ত্বনা পুরস্কার দিল আমাদের এই পুজোয়।‌‌‌

ইউটিউবে গান এখন গ্লোবাল, তাতে 
উপকারই হয়েছে

বললেন রাঘব চট্টোপাধ্যায়

• একসঙ্গে তিন বন্ধু, তিন গায়ক এই প্রথম এক আসরে। শুভেচ্ছা। কী অনুভূতি হচ্ছে?‌
•• শুভেচ্ছার জন্যে ধন্যবাদ। সত্যি একটা দারুণ অনুভূতি হচ্ছে। এটা একটা ইউনিক ভাবনা। আমরা তিনজনেই নতুন বাংলা গান করি। ফলে, শ্রোতারা যে এই অনুষ্ঠান নিয়ে আগ্রহী, তাতে আমরাও উদ্দীপ্ত।
• কী কী গান গাইবেন ভেবেছেন?‌
•• নিজের জনপ্রিয় গানগুলো তো গাইতেই হবে। তার মধ্যে থাকবে ‘‌তোমার কথা ভেবে’‌, ‘‌চাঁদ কেন আসে না’‌, ‘‌ঝিরি ঝিরি’‌। তবে, মিলেমিশে অনুষ্ঠান তো, আমি হয়ত রূপঙ্করের গান গাইব, রূপঙ্কর মনোময়ের, মনোময় আমার। আড্ডার আবহে অনুষ্ঠান। নিজেদের জার্নির কথা বলব আমরা।
• নতুন গান গাইবেন?‌
•• হ্যাঁ, নতুন গান শোনানোর সুযোগ তো সবসময় পাওয়া যায় না। শ্রোতারা বেশির ভাগ সময় জনপ্রিয় গান শোনার অনুরোধ করেন। তবে, এখানে মনে হয় সেই সুযোগ পাব।
• নিজের তো এমন কিছু গান থাকে, যেগুলো তেমন গাওয়া হয় না, অথচ খুব প্রিয়।  তেমন কোনও গান গাইবেন?‌
•• হ্যাঁ, ইচ্ছে তো আছে। ‘‌আনমনে তোমাকে ভেবেছি’‌ বলে আমার একটা গান আছে। নিজের কম্পোজিশন। আমার খুব প্রিয়। ইচ্ছে আছে, এদিন শোনাব শ্রোতাদের।
• মনোময় বা রূপঙ্কর তো একই সঙ্গে গান শুরু করেছিলেন। আপনার সমসাময়িক। কোনও প্রতিযোগিতা আছে?‌ কোনও ঈর্ষা?‌
•• না, না, কোনও কম্পিটিশন নেই, ঈর্ষা নেই। আমার গায়কী, আমার ‘‌ভয়েস’‌ আমার মতো। ‘‌ক্লাসিক্যাল-‌বেসড’‌ গান গাইতে ভাল লাগে আমার। ফলে, যারা আমার গান ভালবাসেন, তাঁরাই আমাকে ডাকেন।
• এখন তো পুজোর গান বলে কিছু নেই। শ্রোতারা আফসোস করেন। আপনার কোনও কষ্ট হয়?‌
•• না, না, কোনও আফসোস বা কষ্ট নেই। আগে যখন ক্যাসেট বা সিডিতে গান গাইতাম, তখন কে কিনে নিয়ে গিয়ে শুনবেন, তার ওপর নির্ভর করতে হত। এখন তো গান ইন্টারনেটে আপলোড করা হয়। পৃথিবীর সমস্ত প্রান্তের মানুষ সেই গান শুনতে পান। ইউটিউবের গান এখন গ্লোবাল, এতে তো আমাদের উপকারই হয়েছে। আর, পুজোর গানের বাস্তব পরিস্থিতিটাই আর নেই। ফলে, কষ্ট পেয়ে লাভ নেই। ইউটিউবকে ভরসা করতেই হবে।

পুরোদস্তুর হিংসে করি
মনোময়, রাঘবকে

বললেন রূপঙ্কর বাগচী 

• এই প্রথম তিন গায়ক এক মঞ্চে। আমাদের অভিনন্দন।
•• ধন্যবাদ। সত্যিই বেশ অভিনব ব্যাপার। এমনটাই হওয়া উচিত। তিন বন্ধু গান গাইব। কথা আছে আড্ডা দেব, নিজেদের গানের জার্নির কথা বলব। কিন্তু লোকজন এখন বড় অধৈর্য্য হয়ে গেছেন। শুনবেন কি আমাদের কথা?‌ আমাদের এক একজনের এক একরকম লড়াই। কীভাবে শুরু করেছি, কীভাবে এগিয়েছি তিনজনেরই বলতে ইচ্ছে করবে। পরস্পরের লড়াইটাও আমরা দেখেছি। যদি শ্রোতারা শোনার ধৈর্য্য দেখান, বলব। না হলে, শুধুই গান।
• প্রায় একই সময়ে গান শুরু করেছিলেন আপনারা। দু’‌দশক হয়ে গেল। কোনও প্রতিযোগিতা টের পান পরস্পরের মধ্যে?‌ কোনও ঈর্ষা?‌
•• আমি পুরোদস্তুর হিংসে করি মনোময়কে, রাঘবকে। কেউ একটু ভাল গাইলেই আমি তাকে হিংসে করি। এটাকে ঈর্ষা বলতে পারেন কেউ, কম্পিটিশনও বলতে পারেন। কিন্তু আমি নাচার। কেউ ভাল গাইলেই আমার হিংসে হয়। মনোময়, রাঘবও নিশ্চয়ই আমাকে হিংসে করে। তবে, ওরা সেটা আমার মতো বলবে কী না, জানি না।
• এই আসরে কি নিজের প্রিয় গান, যা তেমন জনপ্রিয় হয়নি হয়ত, গাইবেন?‌ কিছু কিছু দুঃখী গান তো থাকেই।
•• আমি তো ভেবেছিলাম সেই সব দুঃখী গান, আমার ভাল লাগা একটু নির্জন গানগুলোই গাইব। একটাও জনপ্রিয় গান গাইব না। কিন্তু উদ্যোক্তারা বলেছেন, টিকিট কেটে শ্রোতা, দর্শকরা আসবেন, জনপ্রিয় গানগুলো গাইবেন কিন্তু।
• নানান অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় গান গেয়ে গেয়ে ক্লান্ত?‌
•• কী আর বলব?‌ ঘুরে ফিরে সাত-‌আটটা জনপ্রিয় গান গাওয়ার অনুরোধ শুধু। সেই ‘‌ভোকাট্টা’‌, সেই ‘‌প্রিয়তমা’‌ নয়তো ‘‌এ তুমি কেমন তুমি’‌। নতুন গান তৈরি করে যদি শ্রোতাদের শোনাতে না পারি হতাশা তো লাগেই।
• পুজোর গান এখন নেই। হতাশ লাগে?‌
•• হতাশ হয়ে লাভ নেই। এখন তো গায়ক-‌গায়িকাদের জন্যে মার্কেটটা ‘‌ওপেন’‌ হয়ে গেছে। কোনও ক্যাসেট বা রেকর্ড কোম্পানির পেছনে ঘুরতে হয় না শিল্পীদের। নিজেদের গান নিজেরা ইউটিউবে দিয়ে দিতে পারছেন। এটা তো নতুনদের পক্ষেও ভাল।
• ইউটিউবে নতুনদের গান কি শ্রোতারা সেভাবে শুনছেন?‌
•• আসলে সংখ্যাটা প্রচুর বেড়ে গেছে। আর, মানুষ অধৈর্য্য। স্থিতিশীলতা নেই। আগে যেমন আমরা সুমনদার গানই শুনবো বলে তাঁর সব ক্যাসেট কিনতাম। এখন তেমন হয় না। সহজেই অন্যের প্রতি মানুষ অনুরক্ত হয়ে পড়ছে। আবার সেই অনুরাগ চলেও যাচ্ছে তাড়াতাড়ি। বড্ড পলকা হয়ে গেছে সব কিছু।
• এখন তো বাংলা নতুন আধুনিক গান সেভাবে লোকে শুনছেন না। সিনেমায় গান গাইলে তবেই শ্রোতার কাছে পৌঁছনো যাচ্ছে।
•• এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। বাংলা আধুনিক গানের জায়গাটা নষ্ট হয়ে গেছে। আর, সিনেমায় এখন কত যে গান হচ্ছে, ভাবা যায় না। আর কোনও দেশের সিনেমায় এত গান থাকে না, যদি না সেটা মিউজিক্যাল হয়। কোনও স্প্যানিশ ছবিতে, কি, আর্জেন্টিনার ছবিতে আপনি ১৫টা গান পাবেন?‌ অদ্ভুত ব্যাপার। তবে, সিনেমায় গান হচ্ছে, আমরাও কাজ পাচ্ছি।
• সিনেমার গান ইউটিউবে ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে বলেই কি বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে?‌
•• একেবারেই তাই। ধরুন সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ছবিতে প্রসেনজিৎ আছেন, কিংবা পাওলি আছেন, বড় প্রযোজকের ছবি, প্রচুর খরচ করে গান শ্যুট করা হয়েছে, লোকে দেখছে। আমরা কি আমাদের গানের ভিডিওতে প্রসেনজিৎ বা পাওলিকে নিতে পারব?‌ ফলে, আমাদের গান লোকে দেখছে না।
• দেখার কথা বললেন। গান কি দেখার?‌
•• হায়!‌ সেটাই হয়ে গেছে। একটা গান কল্পনাকে উস্কে দেয়। কিন্তু ভিডিও করে সেই ইমাজিনেশনকে বামন করে দেওয়া হচ্ছে। নিম্নমেধায় ভরে গেছে চারদিক। আমরা তার শিকার। ফলে, লোকে গান শুনছে না, দেখছে। এটাই নিয়তি।

জনপ্রিয়

Back To Top