শুভময় মৈত্র: ভারতে উচ্চতম ন্যায়ালয়ের রায় থেকে শুরু করে লোকসভা বা রাজ্যসভায় বিল নিয়ে আলোচনা, সব মিলিয়ে তিন তালাক প্রসঙ্গে ইশরাত জাহান মহাশয়ার নাম শুনছি বারবার। ফেলে আসা বছরের শেষ রবিবার (শেষ দিনও বটে) তিনি যোগ দিয়েছেন বিজেপিতে। হাওড়া জেলার পিলখানায়। শপথ নিয়েছেন পণপ্রথা এবং মহিলাদের ওপর গার্হস্থ্য হিংসার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের। শিশুকন্যাদের শিক্ষা নিয়েও আন্দোলনে নামার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। শীর্ষ আদালতে তিন তালাকের অপব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আবেদন করেছিলেন পাঁচ মুসলিম মহিলা। ইশরাত জাহান তাঁদের মধ্যে একজন। সুপ্রিম কোর্টের রায় তাৎক্ষণিক তিন তালাকের বিরুদ্ধেই যায়। তারপর থেকেই একঘরে হয়ে পড়েছিলেন এই মহিলা। সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে তিনি নাকি বলেছেন তাঁর লড়াইটা ছিল একার, এবং এতে কোনও রাজনৈতিক দল থেকেই সাহায্য পাননি তিনি। একই সঙ্গে তিনি মন্তব্য করেছেন, মুসলিম মহিলাদের উন্নয়নে দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দৃঢ় পদক্ষেপ তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে আর তাই বিজেপিতে যোগ দিচ্ছেন। গোটা বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল। কিন্তু প্রশ্ন তো কিছু থাকবেই। ইশরাতের কঠিন লড়াইয়ের সময়টায় কোনও দল থেকেই সাহায্য না পাওয়ার কথা অবশ্যই এটাও নিশ্চিত করে যে বিজেপি থেকেও তিনি কোনও সাহায্য পাননি। তা হলে হঠাৎ করে লড়াইটা জিতে যাওয়ার পর তিনি বিজেপিতে যোগ দিলেন কেন? স্বামীর সঙ্গে ইশরাতের বিচ্ছেদ হয়েছিল ২০১৪ সালে। ২০১৫ সালে দুবাই থেকে দূরভাষে তাঁকে তিন তালাক দেন তাঁর স্বামী। গত বছরে আগস্ট মাসের বাইশ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট তিন তালাকের বিরুদ্ধে রায় দেয়। তাঁকে এবং তাঁর আইনজীবীকে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয় এই রায়ের আগে এবং পরে। অবশ্যই আধুনিক সমাজে মুসলিম মহিলাদের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এ এক প্রগতিশীল পদক্ষেপ। সেই সময় থেকেই বিষয়টা নিয়ে বিপুল হইচই শুরু হয়, এবং তারপর আজকের এই বিল। কংগ্রেস এবং বামপন্থীরা কিছু সংশোধনীর কথা বলেছিলেন। কিন্তু সেগুলো খারিজ হয়ে গেছে। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই ইশরাত জাহানের বিজেপিতে যোগদান। রাজনৈতিক দলে এই যোগদানের সময়টা ঠিকভাবে নির্বাচন করা হল কিনা সেটা নিয়ে জিজ্ঞাস্য কিছু থাকবেই। তবে সবসময় তাৎক্ষণিক তিন তালাকের মতো মুহূর্তের মধ্যে উত্তর পেতে হবে এমন দিব্যি তো কেউ দেয়নি। তাই প্রশ্নগুলো আপাতত তোলাই থাকুক। আজকের এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের দিনে উত্তরগুলো এখনই না জানলেও চলবে। তবে তার মানেই এই নয় যে উত্তরগুলো জানার দরকার নেই।
তিন তালাক সংক্রান্ত এই মামলার আর একজন আবেদনকারী ছিলেন উত্তরাখণ্ডের সায়রা বানো। চিঠিতে তিন তালাক লিখে তাঁর স্বামী আলাদা হয়ে যান পনেরো বছরের বৈবাহিক জীবনের পরে। ইশরাত জাহানের মতোই আইনের বিচারে জিতেছেন সায়রা বানো। আজ থেকে অনেক বছর আগেও কিন্তু দেশের শীর্ষ আদালত একই ধরনের রায় দিয়েছিল। সে সময়ের সঙ্গে আজকের দিনের তুলনা টানতে খুব স্বাভাবিকভাবেই যে শব্দবন্ধ অনেকের মাথায় আসছে তা হল ‘‌শাহ বানো থেকে সায়রা বানো’‌। ১৯৭৮ সালে শাহ বানোর বিচ্ছেদ হয়। স্বামী একসঙ্গে দুই স্ত্রীর সঙ্গে থাকতেন। সাংসারিক অশান্তিতে স্বামী তাঁকে সন্তান–সন্ততিদের সঙ্গে দিয়ে বাড়ি থেকে বিদায় করেন। ইন্দোরের স্থানীয় আদালতে খোরপোশের আবেদন করলে সেই সময় গুণধর স্বামী তিন তালাক দেন। এই মামলা বিভিন্ন কোর্টে চলতে থাকে বহুদিন ধরে। অবশেষে ১৯৮৫ সালের ২৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ শাহ বানোর পক্ষে রায় দেয়।

কিন্তু এরপর রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস সরকার বিল পাস করে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে বলবৎ হতে দেয়নি। বিজেপির প্রচারে সবসময় উঠে আসে এই ঘটনার কথা। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে মুসলিম তোষণের যে অভিযোগ বিজেপি প্রচার করে থাকে, তার একটা মূল অস্ত্র এই ইতিহাস। বাইশ বছর পর এবারেও একই সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্টের আর এক মাননীয় পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ। সেই রায়ের অনুসিদ্ধান্তে বিজেপি যে কংগ্রেসের থেকে ভিন্ন পথ নেবে এটাই স্বাভাবিক। তাদের অনুপ্রাসে তাই বারবার উঠে আসছে ‘‌শাহ বানো থেকে সায়রা বানো’‌। যে বিষয়টা খুব বড় করে বিজ্ঞাপনে মুখ দেখাচ্ছে, তা হল কংগ্রেসের আমলে যে অবিচারের সামনে দাঁড়িয়েছিল মুসলিমদের অর্ধেক আকাশ, আজকের 
সরকার তাঁদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। ‘‌শাহ বানো থেকে সায়রা বানো’‌ আজ তাই দেশজোড়া প্রগতিশীলতার স্লোগান, যার নাকি দিশা দেখাচ্ছে বিজেপির নেতৃত্বাধীন বর্তমানের কেন্দ্রীয় সরকার। 
মিলে যাওয়া ‘‌বানো’‌ শব্দটি যখন বারবার মাথায় হাতুড়ি মারছিল, মনে করিয়ে দিচ্ছিল দীর্ঘ সময়ব্যাপী মুসলিম মহিলাদের প্রতি অযৌক্তিক অবিচারের কথা, ঠিক তখনই ইশরাত জাহান নামটিও গুজরাটের একটি অতি আলোচিত ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিল। ইশরাত জাহান, ১৯৮৫ সালে জন্ম, বিহারে। সেই ১৯৮৫ সাল, যখন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিচ্ছে শাহ বানোর পক্ষে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, সবে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। ১১ জুন, ২০০৪ মায়ের অমতেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল ইশরাত। ১৫ জুন আমেদাবাদে আর তিনজন পুরুষের সঙ্গে পুলিসের গুলিতে মারা যায় সে। তদানীন্তন গুজরাট সরকার তাকে সন্ত্রাসবাদী আখ্যা দেয়। তবে সব বিষয়েরই তো ভিন্ন মত থাকে। ঘটনাটাকে অনেকেই সহজভাবে নেননি। আইনের হস্তক্ষেপ জরুরি হয়ে ওঠে। সেই প্রেক্ষিতে আমেদাবাদের মেট্রোপলিটন কোর্টে ম্যাজিস্ট্রেট তামাংয়ের রিপোর্ট জমা পড়ে ২০০৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। সেখানে বলা হয়েছিল যে পুলিসের হেফাজতেই ছিল এই চারজন। তাদের মারা হয় সাজানো মিথ্যে গুলির লড়াইয়ে। শুরু থেকেই অবশ্য ইশরাতের পরিবার বারবার দাবি করে এসেছে যে তাদের মেয়ে নির্দোষ। আশাকরি এটা মনে করিয়ে দিতে হবে না যে সেই সময় সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। আজকের ইশরাত জাহানের দলের সবথেকে বড় নেতা, আর গুজরাট যে দেশের অঙ্গরাজ্য, সেখানকার প্রধানমন্ত্রী। আজকের ইশরাত জাহান বলেছেন শুধু মুসলিম নয়, সমস্ত নিপীড়িত মহিলাদের জন্যে লড়াই করবেন তিনি। পশ্চিম ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে পরিবারের সম্মানরক্ষার্থে হিন্দু মহিলাদের হত্যার ঘটনা মাঝে মাঝেই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। সেই নিয়ে নিশ্চয় দলের নেতাদের সঙ্গে কথা হবে তাঁর। আজকের ইশরাত জাহান আমাদের কাছে প্রগতিশীলতার প্রতীক। শুভেচ্ছা রইল অনেক বড় নেত্রী হোন তিনি। দুঃখ ঘোচান এদেশের সব ধর্মের মেয়েদের, মায়েদের। অর্থনৈতিক এবং সামাজিকভাবে অনেকটা পিছিয়ে আছেন যাঁরা। আর দল যদি অনুমতি দেয়, অতীতের ইশরাতের খবরটা একবার পড়ে নিতে পারেন। খুঁজে দেখতে পারেন ২০০৪ সালের সমনামী মেয়েটির ছবি। পাশাপাশি চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা চারটে রক্তাক্ত লাশ, গুলি খাওয়া। ক্যামেরার সবথেকে কাছে কুড়ির আগেই ঝরে যাওয়া সেই কুঁড়ি। এক পায়ে চটি, অন্য পায়েরটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। সে চটি কি খুঁজে পাবেন আজকের ইশরাত?   

 

লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, মতামত ব্যক্তিগত

জনপ্রিয়

Back To Top