দেবাশিস পাঠক: ভয় হয়। লজ্জাও। ইতিহাস পড়লে। তার পাশাপাশি আজকের ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ করলে।১৭৮৯। ফরাসি বিপ্লব। ফ্রেঞ্চ অভিধানে অনন্য মর্যাদায় অভিষিক্ত হল একটা শব্দ। ‘সিটইয়াঁ’। চেনা ইংরেজিতে যা কিনা ‘সিটিজেন’। অর্থাৎ নাগরিক। রাজতন্ত্র–শাসিত ফ্রান্সের সাধারণ মানুষ প্রজার অভিধা ছেড়ে নাগরিকের মুকুট নিজেদের নামে জুড়ে নিয়েছিল। ফ্রান্সের আম আদমি নিজেদের চিনিয়ে ছিল ‘নাগরিক’ নামে। সাম্য- ভ্রাতৃত্ব-স্বাধীনতা-র স্বপ্ন চোখে লেপে নেওয়ার সেই শুরু। বিশ্বজুড়ে। প্রজা থেকে নাগরিকের গরিমা লাভের স্বপ্ন।
এসবের ১২৮ বছর পরের পৃথিবী। সাল ১৯১৭। রুশ বিপ্লব। সংগ্রামী স্বপ্ন দেখে যে সব মানুষ, তাঁরা এবার নামের আগে জুড়ে দেওয়ার জন্য পেয়ে গেলেন আর একটা জুতসই শব্দ। ‘কমরেড’। সে শব্দও ভলগা গঙ্গা মিসিসিপি ছাড়িয়ে বিশ্বময় হয়ে উঠেছিল। স্তালিনের লাল ফৌজ যে সব দেশে পা রাখেনি, সেখানেও মানুষের স্বপ্ন দেখার সাথী হয়ে গেল ওই শব্দ। লেনিনগ্রাদ থেকে বেগুসরাই, বার্লিন থেকে বাস্তার— সর্বত্র বিপ্লবস্পন্দিত প্রতিটি বুক পেয়ে গেল অভিন্ন আত্মপরিচয়ের উচ্চারণ, ‘কমরেড’।
আর এসবেরও ১০২ বছর পর এই ২০১৯–এর ঘটনা। নামের আগে জোড়ার জন্য বাজারে এসেছে একটা শব্দ। ‘চৌকিদার’। সে শব্দ এখনও আমাদের দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বজনীন তকমা পায়নি। তবে দেশজুড়ে শব্দটা একটা সাড়া ফেলেছে, সন্দেহ নেই। কেউ ‘চৌকিদার’ বললেই ‘রক্ষকই ভক্ষক’-এর প্রায় সমার্থক একটা স্লোগান তুলছেন, এটা যেমন সত্যি, তেমনই এটাও সত্যি যে দেশের রাজনীতিকদের একাংশ নামের আগে ‘চৌকিদার’ জুড়ে নিচ্ছেন। গর্বের সঙ্গে কথাটা ব্যবহার করছেন। আর সেই জুড়ে গড়া নামটা আন্তর্জাতিক মিডিয়া বেশ খাচ্ছে। এই তো ক’‌দিন আগে, সুষমা স্বরাজকে চৌকিদার সুষমা স্বরাজ বলে উল্লেখ করল সিএনএন। বলল, ভারতের বিদেশমন্ত্রী হলেন চৌকিদার সুষমা স্বরাজ। আমরা বুঝলাম, আন্তর্জাতিক স্তরে এ জিনিস পৌঁছোল বলে।
তখনই ওই ভয় আর লজ্জার আমদানি। গর্বের বদলে। কেন? তাহলে সোজা কথাটা এবার সোজাভাবেই বলা যাক।
চৌকিদার শব্দটার শুরুতেই ‘চৌকি’। অর্থাৎ, থানা। চৌকিদার– শাসিত দেশে থাকা মানে তো তাহলে থানায় থাকা। কয়েদ থাকা। চৌকিদারের শাসন স্বীকার করা মানে তো তাহলে ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’–র দেশে ‘উচ্চ যেথা শির’–এর ভাবনা নাকচ করে থাকা।
তাই তো থাকছি আমরা। গোরক্ষকদের শাসনে। গোমাংস খাওয়া মুসলমানদের বাঁচা–মরার ভার তাদের হাতে তুলে দিয়ে বাঁচছি। তাই তো আছি আমরা। অ্যান্টি–রোমিও স্কোয়াডের অভিভাবকত্বে। মুসলমান ছেলের হিন্দু গার্লফ্রেন্ড হলেই তাদের তাড়া খাচ্ছি। তাই তো থাকতে হবে আমাদের। এবিভিপি-র শাসনে। হিন্দু মেয়ের সিভিল ম্যারেজ নোটিস দেখলেই সেটা ছিঁড়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করবে ওরা, আমাদের তা মেনে নিতে হবে। চৌকিদাররা বাড়ির ফ্রিজে কীসের মাংস আছে, তা খুঁজে বেড়াবে। নবরাত্রির সময় মাংসের দোকান বন্ধ রাখার জন্য ব্যস্ত হবে। ধর্মের নামে আমরাও সে সব মেনে নিতে কোনওরকম অসুবিধা বোধ করব না। সত্যি সত্যি মরার আগে দু’‌বেলা মরতে এতটুকু অসুবিধা হবে না আমাদের। কারণ আমরা চৌকিদারের শাসন মেনেছি। যাঁদের পূর্বজরা ইংরেজদের কাছে মুচলেকা দিয়ে পিঠ বাঁচিয়েছিলেন, ইংল্যান্ডের রানির প্রজা থেকে আমাদের সাধারণতন্ত্র্রী স্বাধীন ভারতের নাগরিক করে তোলার কোনও দায় যাঁরা নেননি, ভারতীয় জাতি গড়ার সেইসব  অ–কারিগরদের আধুনিক উত্তরাধিকার আজ আমাদের জাতীয়তাবাদী চেতনার পাহারাদার। চৌকিদারের শাসন বরণ করা মানে সেই প্রহরাটাকে নতমস্তকে মেনে নেওয়া। একটা পুলিশ স্টেটের সদস্য হওয়া।
কেন ভোট দেব এই চৌকিদারদের?
এই চৌকিদারের দল তো ব্যক্তিগত বলয়ে রাষ্ট্রের নিষিদ্ধ অনুপ্রবেশ রুখতে প্রহরা দেয় না। এই চৌকিদারের দল তো উল্টোটাই করে। রাষ্ট্রকে, রাষ্ট্রীয় রাজনীতিকে টেনে ঢুকিয়ে দেয় মশারির ভেতর। এই চৌকিদাররা তো বেড়া পাহারা দিতে চায় না। বেড়া টপকে ব্যক্তিগত পরিসরে উঁকিঝুঁকি নয়, একেবারে মাতব্বরিতেই এই চৌকিদারদের বড্ড আনন্দ। এই চৌকিদারদের নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই, সেটাকে সুরক্ষিত করার কোনও দায় নেই। বরং অধিকারের বন্দোবস্তটিকে দুর্বল করাতেই তাদের যাবতীয় আগ্রহ। তাই এই চৌকিদারিতে গণতন্ত্র মানে ‘খাপ পঞ্চায়েত’। দেশপ্রেম মানে সাধ্বী প্রজ্ঞার ভাষায় কথা বলা, তাঁর চিন্তায় উদ্দীপ্ত হওয়া। বৌদ্ধিকতার মাপকাঠি ফেসবুকের টাইমলাইনে ইতিহাস–ভূগোল ভুলে নানা মন্তব্যের সংযোজনা। স্বাধীনতা মানে হিন্দুত্ববাদী লুম্পেনদের যা কিছু বলা, যা কিছু করার স্বাধীনতা। সাম্য মানে বহুস্বরকে দমিয়ে হিন্দি বলয়ের হিন্দুত্ববাদী চিন্তাভাবনাকে তন্মাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে সব্বাই এক রা কাড়ে, কোনও ব্যাগড়বাঁই না করে, তা সুনিশ্চিত করা। ভ্রাতৃত্ব মানে সংখ্যাগুরুর মধ্যে যাঁরা ধর্মান্ধ, তাঁদের এক ছাতার তলায় এনে যে কোনও মূল্যে ওই গোষ্ঠীস্বার্থের সংরক্ষণ। সমাজসেবা মানে কেউ যদি হিন্দি বলয়ের হিন্দুত্ববাদী সংস্কার না মানে তাকে, দরকার হলে হিংসার পথে সহবত শেখানো।
উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, রাজস্থানে যে চিত্র হামেশাই দেখতে মানুষ অভ্যস্ত, সেই ছবিটাকে সারা ভারতে লেপ্টে দেওয়ার তাগিদেই চৌকিদারের চ্যালারা এবার ভোট কুড়োতে বেরিয়েছে। ইতিহাস বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধপূর্ব পৃথিবীতে এদের মতো চৌকিদারেরাই নাৎসি জার্মানিতে খয়েরি জামা, ফ্যাসিস্ত ইতালিতে কালো জামা, ফ্রাঙ্কো–ফালাঙ্গে জমানার স্পেনে গাঢ় নীল জামা পরে জনসমর্থন কুড়োতে বেরিয়েছিল। সময় বলছে, কপালে গেরুয়া ফেট্টি বেঁধে তারাই আজকের ভারতে চৌকিদারের হয়ে চিল্লাচ্ছে।
তাই, সরাসরি একটা জিজ্ঞাসা। আমরা যদি কয়েদখানার জিম্মায় নিজেদের তুলে না দিতে চাই, তবে কেন চৌকিদারকে ভোট দেব আমরা? কেন আমাদের অতীত ঐতিহ্য আর আগামীর আশা বন্ধক রাখব খয়েরি–কালো–গাঢ় নীল জামাদের গেরুয়া উত্তরাধিকারীদের কাছে?
উত্তরটা খুঁজে নিয়ে ভোট দিতে যাবেন প্লিজ।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top