সুচিক্কণ দাস: অর্ধকুম্ভে স্নান সেরে পাঁচ সাফাইকর্মীর পা ধোয়ালেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মুহূর্তে ভাইরাল সেই ছবি। লক্ষ্যটা স্পষ্ট। লোকসভা ভোটের আগে উত্তরপ্রদেশ–সহ গোটা দেশের অন্ত্যজদের বার্তা দেওয়া, বিজেপি আছে সমাজের নীচুতলার সঙ্গেই। অতএব, তাঁরাও যেন ভোটে বিজেপিকেই দেখেন। ঠিক যেমন পা ধুইয়ে দেওয়ার আগে প্রয়াগে ডুব দিয়ে এবং কুম্ভে পুজো দিয়ে প্রধানমন্ত্রী উচ্চবর্ণকে এই বার্তা দিতে চেয়েছেন, আমি তোমাদেরই লোক। 
বহু ধর্মের দেশে ভারতে কুম্ভমেলায় ভোটবার্তা দেওয়া এত জরুরি কেন, সে–প্রশ্ন বরং এড়িয়ে যাওয়া যাক। খতিয়ে দেখা যাক অন্য কিছু বিষয়।
সেদিন প্রয়াগরাজে পা ধোয়ানোর পর্বে প্রধানমন্ত্রীর সামনে হাজির ছিলেন মহিলা সাফাইকর্মী বীণা। এই ক’‌দিনের মধ্যে তাঁর জীবনে ঘটে গেছে আরও বড় ট্র্যাজেডি। এলাহাবাদে ময়লার চেম্বার সাফ করতে নেমে বিষাক্ত গ্যাসে মৃত্যু হয়েছে বীণার দুই ভাইয়ের। বীণা জানিয়েছেন, ওরা অন্ধকূপে নামতে চায়নি।  ঠিকাদার এসে বলে, না নামলে লাথি মেরে বের করে দেবে। আর কাজে নেবে না। তাঁর অভিযোগ, সাফাইকর্মীরা আজও কার্যত অচ্ছুৎ। এমনকি বিজেপি নেতাদের বাড়িতেও তাঁদের আলাদা কাপে চা দেওয়া হয়। তাঁর দাবি, সাফাইকর্মী হিসাবে বাল্মীকিদের সংরক্ষণ তুলে দিক সরকার।
ভোটের আগে কুম্ভমেলায় যাঁদের দিকে এত নজর প্রধানমন্ত্রীর, তাঁরা কেমন আছেন? হাতে করে মানুষের মল সাফাই বন্ধ করতে এদেশে আইন পাশ হয়েছিল বহু আগে। ১৯৯৩ সালে কার্যকর হয় এমপ্লয়মেন্ট অফ ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জার্স অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন অফ ড্রাই ল্যাট্রিনস প্রোহিবিশন অ্যাক্ট। ২০১৩ সালে চালু হয় দ্য প্রোহিবিশন অফ এমপ্লয়মেন্ট অ্যাজ ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জার্স অ্যান্ড দেয়ার রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাক্ট। অর্থাৎ হাতে করে মানুষের মল সাফাইয়ের মধ্যযুগীয় প্রথা এদেশে নিষিদ্ধ হয়েছে মোদি ক্ষমতায় আসার আগেই। তবু এখনও চালু রয়েছে এই প্রথা, যাতে সাফাইকর্মীদের মৃত্যু পর্যন্ত হচ্ছে। 
সাফাইকর্মীদের কল্যাণে সংসদে আইন পাশ করে গঠিত হয় সাফাই কর্মচারীদের জাতীয় কমিশন (NCSK)। ২০১৮–র সেপ্টেম্বরে তার রিপোর্টে জানানো হয়, ময়লা সাফ করতে গিয়ে ২০১৭ জানুয়ারি থেকে এ–পর্যন্ত ১২৩ জন সাফাইকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। সরকারি মতে, ১০ বছরে দেশে মৃত সাফাইকর্মীর সংখ্যা ৩২৩। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সাফাই কর্মচারী আন্দোলনের দাবি, গত ১০ বছরে মৃতের সংখ্যা ১,৩৪০ জন। সংগঠনের নেতা ম্যাগসেসে পুরস্কার বিজয়ী বেজওয়াদা উইলসন জানিয়েছেন, ২০১০ থেকে ২০১৭–র মধ্যে শুধুমাত্র দিল্লিতেই মৃত্যু হয়েছে ৩৫৬ সাফাইকর্মীর। বেজওয়াদাদের তথ্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ মৃত্যুই হয়েছে বিষাক্ত গ্যাসে কিংবা উপযুক্ত সরঞ্জাম না থাকার কারণে। দেখাই যাচ্ছে, ময়লা সাফ করতে গিয়ে সাফাইকর্মীদের মৃত্যুর সংখ্যা ও কারণ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি সূত্রের তথ্য মিলছে না।  
যাঁরা বাড়ি বাড়ি থেকে সকালে জমে থাকা মল হাতে বা মাথায় করে সংগ্রহ করেন এবং পিট ল্যাট্রিন পরিষ্কার করেন তাঁরাই ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জার বা হাতে মল–সাফাই কর্মী হিসাবে বিবেচিত হন। এঁদের এক–একটা বড় অংশই মহিলা। এ ছাড়াও এঁদের মধ্যে পড়েন যাঁরা সেপটিক ট্যাঙ্ক সাফাই করেন, নর্দমা বা নালি সাফ করেন ও রেললাইনের ময়লা সাফ করেন। 
সারা দেশে গ্রামীণ জেলার সংখ্যা ৬০০–র কাছাকাছি। এর মধ্যে গত বছর কেন্দ্রীয় সরকারের একটি টাস্ক ফোর্স গণনা করেছে ১২১টি জেলার হাতে–মল–সাফাইকর্মীর সংখ্যা। সেই গণনা অনুযায়ী, দেশে ম্যানুয়্যাল স্ক্যাভেঞ্জারের সংখ্যা ৫৩,২৩৬। ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে এঁদের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় চার গুণ। এটা সরকারি তথ্য। প্রথম ধরনের সাফাইকর্মীর গণনা এখনও বাকি ৪৭৯ জেলায়। এবং দ্বিতীয় ধরনের সাফাইকর্মীর গণনা বাকি ৬০০ জেলাতেই। 
২০১৩ সালের পর কেন্দ্রীয় সরকার মেনে নেয়, দেশের ১৩টি রাজ্যে ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারের সংখ্যা ১২,৭৪২ জন। অথচ ২০১১–র জনগণনা অনুয়ায়ী, সারা দেশে রয়েছে ৭ লক্ষ ৪০ হাজার ৭৮টি বাড়ি যেখান থেকে বর্জ্য ও মল হাতে এবং মাথায় করে নিয়ে যান সাফাইকর্মীরা। এ ছাড়া প্রায় ২১ লক্ষ বাড়ির লোক তাদের মল ফেলেন শুকনো ল্যাট্রিন বা ড্রেনে। সেগুলোও সাফাই করেন ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জাররা। ২০১১ সালের সোশিও ইকনমিক কাস্ট সেন্সাসের গণনায় দেখা গেছে, দেশে এমন ১ লক্ষ ৮২ হাজার পরিবার রয়েছে যাদের বাড়ির কেউ না কেউ ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিংয়ে যুক্ত। আবার স্বচ্ছ ভারত কর্মসূচির দায়িত্বে থাকা আবাসন ও শহর–বিষয়ক মন্ত্রক জানিয়েছে, তাদের কাছে শহরের ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারদের কোনও তথ্য নেই। ফলে শহরাঞ্চলে সাফাইকর্মীদের ছবিটা অস্পষ্ট। একটা সূত্রে জানা যাচ্ছে, ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারদের সংখ্যা জানতে ২৬ বছরে সাতবার সমীক্ষা চালিয়েছে কেন্দ্র। প্রতিবার উঠে এসেছে আলাদা আলাদা সংখ্যা। ফলে দেশে ঠিক কত ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জার আছেন, স্বাধীনতার সাত দশক পরেও তা জানে না কেন্দ্র কিংবা কোনও রাজ্য। ২০১৫ সালের একটি হিসাব বলছে, ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারদের সংখ্যা মহারাষ্ট্রে ৬৩ হাজার ৭১৩, উত্তরপ্রদেশে ১৭ হাজার ৬১৯, কর্ণাটকে ১৫ হাজার ৩৭৫, মধ্যপ্রদেশে ২৩ হাজার ৯৩ এবং বিহারে ৫ হাজার ২৯৬ জন। আর গত বছরের গণনায় যে ১২১টি জেলায় ৫৩ হাজার ২৩৬ জন ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারের খোঁজ মিলেছে তার ৮২ শতাংশই রয়েছেন উত্তরপ্রদেশে। 
সাফাইকর্মীদের পুনর্বাসন নিয়ে কিছু কর্মসূচি রয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারের। পুনর্বাসন তিন ধরনের। প্রথমত, কিছু পরিবারকে এককালীন দেওয়া হয় ৪০ হাজার টাকা। টাকা পেলেই ধরে নেওয়া হয় পুনর্বাসিত। দ্বিতীয়ত, অনেককে দেওয়া হয় ২ বছরের দক্ষতা উন্নয়নের ট্রেনিং। তখন মাসে ভাতা ৩ হাজার টাকা করে। তৃতীয়ত ঋণে ভর্তুকি।
কতজন ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জার পেয়েছেন পুনর্বাসনের টাকা? তথ্য জানার অধিকার বা আরটিআই সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০১৫–’‌১৬ সালে ৪০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন ৮ হাজার ৬২৭ জন। ২০১৬–’‌১৭ ও ২০১৭–’‌১৮ সালে ৪০ হাজার করে পেয়েছেন যথাক্রমে ১৫৬৭ ও ৮৯০ জন। ২০১৮–’‌১৯ সালে পেয়েছেন মাত্র ৩৬৫ জন। অর্থাৎ মোদির চার বছরে পুনর্বাসন পেয়েছেন মাত্র ১১ হাজার ৩৯৯ জন সাফাইকর্মী। এই বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় কতটা স্বল্প, তা ওপরের তথ্যগুলির কথা মাথায় রাখলে স্পষ্ট হবে।
এর চেয়েও বড় কথা  সাফাই কর্মীদের পুনর্বাসনে নতুন করে কোনও অর্থই বরাদ্দ করেনি মোদি সরকার।  তথ্যের অধিকার আইনে জানা যাচ্ছে, ২০০৬–’‌০৭ সাল থেকে সাফাইকর্মীদের পুনর্বাসনে বরাদ্দ হয়েছে মোট ২২৬ কোটি টাকা। এবং ২০১৩–’‌১৪ অর্থবর্ষের পর নতুন করে কোনও টাকা বরাদ্দ হয়নি। তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬–’‌০৭ থেকে ২০১৭–’‌১৮–র মধ্যে এই স্কিমে ৫ বার টাকা বরাদ্দ করেছে কেন্দ্র। ২০০৬–’‌০৭ অর্থবর্ষে বরাদ্দ করা হয় ৫৬ কোটি। ২০০৭–’‌০৮ অর্থবর্ষে ২৫ কোটি। ২০০৮–’‌০৯ অর্থবর্ষে বরাদ্দ ১০০ কোটি। এ–পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ। ২০০৬–’‌০৭ অর্থবর্ষে খরচ করা হয় মাত্র ১০ কোটি। বেঁচে যায় ৪৫ কোটি। ২০০৭–’‌০৮ অর্থবর্ষে খরচ করা হয়নি ৩৬ কোটি। ২০১৪–’‌১৫ অর্থবর্ষে দেখা যাচ্ছে এই তহবিলে রয়ে গেছে ৬৩ কোটি। ২০১৭–’‌১৮ অর্থবর্ষে এই তহবিলে পড়েছিল ২৪ কোটি টাকা। এবং ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭–‌এর পর এই খাতে এক পয়সাও খরচ করা হয়নি। 
দেখাই যাচ্ছে, যে সাফাইকর্মীদের পা ধুইয়ে মোদি ভোটের বার্তা দিচ্ছেন, তাঁদের জন্য সবচেয়ে বেশি টাকা বরাদ্দ করেছিল ইউপিএ সরকার। আর মোদি তাঁর সুশাসনের পাঁচ বছরে ইউপিএ আমলের বরাদ্দ টাকা ভেঙে ১১ হাজার ৩৯৯ জনকে পুনর্বাসনের টাকা দিয়ে নিজে নাম কিনেছেন। 
এখানে প্রাসঙ্গিক একটা প্রশ্ন উঠতেই পারে। সর্দার প্যাটেলের মূর্তি গড়তে কত টাকা খরচ করেছেন মোদি? প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। কে দিল এই টাকা? বিপুল পরিমাণ এই অর্থের বেশির ভাগটাই এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থার তহবিল ভেঙে। নিষ্প্রাণ পাথরের মূর্তি গড়তে এই ৩ হাজার কোটি টাকা খরচ না করে বহু যুগের একটা অভিশাপ থেকে বহু মানুষকে চিরতরে উদ্ধার করাটা কি অনেক বেশি কাম্য ছিল না? এর পরেও কোনটা মোদিজির আসল মন কি বাত, সে–প্রশ্ন ওঠাটা খুব অসঙ্গত?‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top