কৈলাসপতি মণ্ডল: ১৮৪২ সালে কাশিমবাজারের মানবপ্রেমী ও উদার জমিদার রাজা কৃষ্ণনাথ রায় উনিশ শতকের প্রথমার্ধে মুর্শিদাবাদ জেলায় একটি বিশ্বমানের আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার প্রায় ১৭৫ বছর পর মুর্শিদাবাদ জেলায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হতে চলেছে। এ বিষয়ে রাজ‍্যে মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১৮ প্রণীত হয়েছে। আইন অনুযায়ী, কৃষ্ণনাথ কলেজের বহরমপুরস্থিত কলেজ সংলগ্ন বা অন্যত্র সমস্ত সম্পত্তি অধিগ্ৰহণ করে কৃষ্ণনাথ কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে উন্নীত হবে।
সম্ভবত কৃষ্ণনাথই প্রথম ভারতীয় যিনি ওই সময়কালে একটি উন্নত ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। বস্তুত, আধুনিক ভারতে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয় ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে ১৮৫৪ সালে ইংল্যান্ডে অবস্থিত বোর্ড অব কন্ট্রোল–‌এর সভাপতি Sir Charles Wood–‌এর পরিকল্পনা অনুসারে। ১৮৫৭ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে কলকাতা, বম্বে ও মাদ্রাজ, এই তিন প্রেসিডেন্সি শহরে একটি করে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়। 
তারও অনেক আগে মাত্র ২২ বছরের রাজা কৃষ্ণনাথ ৩০ অক্টোবর, ১৮৪৪, তাঁর মৃত্যুর আগের দিন মুর্শিদাবাদ জেলায় ‘‌কৃষ্ণনাথ ইউনিভার্সিটি অফ বানজেটিয়া’‌ নামে একটি আধুনিক ও বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার উদ্দেশ্যে তাঁর বিশাল সম্পত্তি উইল করে গেছিলেন। তাতে স্ত্রী স্বর্ণময়ীর জন্য মাসিক ১৫০০ টাকা, ৩ লক্ষ টাকা অন্ধ ও অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের প্রতিদিনের খাবারের জোগান ছাড়া সমস্ত সম্পত্তি ওই ‘‌কৃষ্ণনাথ ইউনিভার্সিটি’‌ তৈরির জন্য বরাদ্দ করে গিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির জন্য সরকার যেন তাঁর সম্পত্তি অধিগ্ৰহণ করে, উইলে সেকথাও বলে যান রাজা কৃষ্ণনাথ। 
সুপ্রিম কোর্টের রায়ে কৃষ্ণনাথের ওই উইল খারিজ হয়ে যায় এবং তাঁর বিধবা স্ত্রী স্বর্ণময়ী রাজ এস্টেট ফিরে পান। মহারানি স্বর্ণময়ী তাঁর স্বামীর স্বপ্নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করতে ১৮৫১ সালে প্রয়োজনীয় জমি ও বিপুল অর্থ দান করেন এবং ১৮৫৩ সালে ‘‌বহরমপুর কলেজ’‌ স্থাপন করেন, যা একেবারে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে তৈরি। স্থাপত‍্য নকলের কারণে ব্রিটিশ সরকার কলেজ কর্তৃপক্ষকে এক টাকা জরিমানা পর্যন্ত করেছিল। কলেজের ব্যয়ের জন্য স্বর্ণময়ী বছরে ২০ হাজার টাকা দিতেন। ১৯০২ সালে এই কলেজেরই নাম হয় কৃষ্ণনাথ কলেজ। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার কৃষ্ণনাথ কলেজের পরিচালনা দলিলের মাধ্যমে কৃষ্ণনাথের ভাগ্নে কাশিমবাজারের মহারাজা স্যর মণীন্দ্র চন্দ্র নন্দীর হাতে দেয়। কলেজ পরিচালনার জন্য তিনি বছরে ৪৫০০০ টাকা খরচ করতেন। 
কিন্তু ১ অক্টোবর, ২০১৮ থেকে মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১৮ কার্যকর হওয়ার ফলে কৃষ্ণনাথের সাধের কলেজটি আর রবে না নীরবে। তাঁর নামটিও আর থাকবে না। অথচ শুধু রাজ‍্যে নয়, গোটা দেশে কৃষ্ণনাথ কলেজ একটি ঐতিহ্যশালী নাম, দীর্ঘ ১৬৬ বছরের ইতিহাস তার। স্বাধীনতা সংগ্ৰামেও এই কলেজের ছাত্রদের ভূমিকা ছিল। মাস্টারদা সূর্য সেন, নলিনী বাগচীরা পড়তেন এখানে। পড়াতেন আচার্য ব্রজেন্দ্র নাথ শীল, জ‍্যোতিষ মিত্র, হীরালাল হালদার, এন কে নাগ, ই এম হুইলার প্রমুখ যশস্বী পণ্ডিতেরা। এই কলেজের খ্যাতি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এখানকার ছাত্র–‌ছাত্রীরা দেশে এবং বিদেশে এখনও দেশের গরিমা বৃদ্ধি করে চলেছেন। অংশ নিচ্ছেন রাষ্ট্রনির্মাণে, মানবকল্যাণে। তাদের কাছে কৃষ্ণনাথ কলেজ একটি আবেগ। সেখানে এক লহমায় কৃষ্ণনাথ কলেজের গৌরবময়, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাবে— এটা মেনে নেওয়া কঠিন।
ইতিপূর্বে প্রেসিডেন্সি কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসাকে উন্নীত করে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজও সেন্ট জেভিয়ার্স ইউনিভার্সিটি হয়েছে। সেভাবেই গঠিত হোক ‘‌কৃষ্ণনাথ বিশ্ববিদ্যালয়’‌, যেখানে স্থায়ীভাবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়ানোর ব্যবস্থা থাকুক। মুর্শিদাবাদ জেলার বাকি কলেজ নিয়ে গঠিত হোক উন্নত পরিকাঠামোযুক্ত ‘‌মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়’‌। অথবা রাজা কৃষ্ণনাথের দেওয়া পুরনো নামের আদলে হোক ‘‌কৃষ্ণনাথ ইউনিভার্সিটি অফ মুর্শিদাবাদ’‌। এই নামটি বেশ মানানসই হত।
(‌লেখক প্রাক্তনী, কৃষ্ণনাথ কলেজ)‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top