তরুণ চক্রবর্তী: নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বা ক্যাব আরও বেশি সর্বনাশ ডেকে আনবে উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলের বাঙালিদের। এনআরসি নিয়ে সমস্যা জিইয়ে রয়েছে অসমে। এই অবস্থায় ক্যাব পাশ হলে সেটা হবে গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো ভয়ঙ্কর। কারণ, উত্তর–‌পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় হিন্দু বাঙালিদেরও রক্ষা করার জন্য থাকছে না ক্যাব–‌এর রক্ষাকবচ। ফলে, বিপদ আরও বাড়বে। বিপদ এখানেই শেষ নয়, অসমে শুরু হয়েছে নতুন ভূমিসংস্কার নীতি প্রণয়নের চেষ্টা। নয়া ভূমি সংস্কার নীতি কার্যকর হলে বাঙালির ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কা।
বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের হিন্দু, খ্রিস্টান, শিখ, পার্সি, বৌদ্ধ ও জৈন শরণার্থীদের শর্ত সাপেক্ষে ভারতীয় নাগরিকত্ব দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বিজেপি। আর তাদের এই প্রতিশ্রুতিতেই অনেকেই আশার আলো দেখছিলেন। কিন্তু বিলটি খতিয়ে দেখলেই বোঝা যায় আলো নয়, বরং ধোঁয়াশাই বাড়ছে। লোকসভা নির্বাচনের আগে ক্যাব লোকসভায় পেশ হয়েছিল। সেখানে কিছুটা হলেও স্বস্তির সুযোগ ছিল হিন্দু বাঙালিদের। কিন্তু এখন যা খবর, পরিবর্তিত ক্যাব–‌এ সুবিধার থেকে অসুবিধাই বেশি হচ্ছে। মুসলিমরা তো বটেই, হিন্দু বাঙালিদের জন্যেও কোনও সুরক্ষাকবচ নেই ক্যাব–‌এ। তাই অনেকেই বলতে শুরু করেছেন, ক্যাব আসলে প্রবঞ্চনা বা প্রতারণার নামান্তর।
বিজেপি–‌র ঘোষিত. ‘এক দেশ, এক আইন’ নীতি মানা হচ্ছে না ক্যাব–‌এ। সূত্রের খবর, বুধবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাশ হওয়া সংশোধনী বিলটিতে বলা হয়েছে, ক্যাব কার্যকর হবে না ইনার লাইন পারমিট (আইএলপি) সুবিধাপ্রাপ্ত রাজ্যগুলিতে। অর্থাৎ, অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড ও মিজোরামের হিন্দু বাঙালিদের ক্ষেত্রে ক্যাব প্রযোজ্য নয়। আবার অন্য রাজ্যগুলিতেও ষষ্ঠ তফসিলভুক্ত বা স্বশাসিত জেলাগুলিতে, আদিবাসী এলাকায় ক্যাব কার্যকর হবে না। অর্থাৎ, উত্তর–‌পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় হিন্দু বাঙালিরাও ব্রাত্য। 
এনআরসি এমনিতেই বাঙালিদের অনেকটা কোণঠাসা করে ফেলেছে অসমে। রাজ্যে রাজ্যে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বারবার বিজেপি–‌র নেতা ও মন্ত্রীরা হুমকি দিচ্ছে, এনআরসি হবে গোটা দেশে। সঙ্গে অভয়বাণী, হিন্দুদের জন্য থাকবে ক্যাব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই বিপদ বাড়াচ্ছে ক্যাব। ক্যাব–‌বিরোধীদের বাগে আনতে পুরনো ক্যাব–‌এ বেশকিছু সংশোধনী এনেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ক্যাব–‌কে আদিবাসী এলাকার বাইরে কার্যকর করা হয়েছে। কিন্তু অসম, ত্রিপুরা–‌সহ উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় বাঙালিরা আদিবাসী শাসিত এলাকায় বসবাস করেন।
যেমন, ত্রিপুরা। ষষ্ঠ তফসিল বলে ত্রিপুরার বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছে ত্রিপুরা উপজাতি এলাকা স্বশাসিত জেলা পরিষদ (টিটিএএডিসি)। অনেকটা দার্জিলিং–‌এর গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ)–এ‌র মতোই। টিটিএএডিসি এলাকায় বহু বাঙালি বসবাস করেন। আর সেটা টিটিএএডিসি গঠনের বহু আগে থেকেই। এধরনের স্বশাসিত এলাকায় কার্যকর হবে না ক্যাব। পার্বত্য জেলাগুলিকেও ক্যাব–‌এর আওতায় রাখা হচ্ছে না। ফলে, তিন রাজ্যের পাশাপাশি মেঘালয়েও হিন্দু বাঙালিদের থাকছে না কোনও রক্ষাকবচ। 
অসমের বড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল (বিটিসি) এলাকাতে বহু হিন্দু বাঙালির নাম নেই এনআরসি তালিকায়। তাঁরা ভেবেছিলেন ক্যাব–‌এর ফলে মিলবে নাগরিকত্ব। কিন্তু সেই সুযোগ নেই ক্যাব–‌এ। দ্বিতীয় বার নাগরিকত্ব সংশোধনী শুরু হতেই তীব্র প্রতিবাদ শুরু হয় উত্তর–‌পূর্বাঞ্চলে। বিজেপি–‌র ভিতরেও ছিল হরেক সমস্যা। অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু এবং মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী বীরেন সিং প্রথম থেকেই বিরোধিতা করছিলেন ক্যাব–‌এর। মেঘালয়ের কনরাড সাংমা, নাগাল্যান্ডের নেফি রিও, মিজোরামের জোরাম থাঙ্গারাও ছিলেন ক্যাব–‌বিরোধী। কিন্তু মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে দফায় দফায় বৈঠক করে তাঁদের সুকৌশলে ক্যাব–‌এর পক্ষে নিয়ে আসেন অমিত শাহ। ক্ষোভ বুঝতে পেরেই বহু এলাকাকে ক্যাব–‌এর বাইরে রাখা হয়েছে এবার। 
তবু ক্যাব–‌বিরোধী আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু সেটা খুবই সীমিত মাত্রায়। ক্যাব–‌এর সবচেয়ে বিরোধী বলে পরিচিত শরিক অসম গণ পরিষদ বা ত্রিপুরার আইপিএফটি কার্যত নীরব। বাকি খিলঞ্জিয়া বা ভূমিপুত্রদের আন্দোলন তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না বলে নিশ্চিত বিজেপি। এই আন্দোলন অনেকটাই অ–‌বিজেপি সংগঠনগুলির নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদেই হচ্ছে। কারণ বাঙালি–‌বিরোধী বলে পরিচিত সংগঠনগুলি মোটেই পরিবর্তিত সংশোধনীর বিপক্ষে নয়। কারণ এই ক্যাব–‌এর কোনও প্রভাব তাঁদের রাজনৈতিক এলাকায় তেমন প্রভাব ফেলবে না। বরং সমস্যায় পড়বেন বাঙালিরাই।
অসমে এনআরসি–‌ছুট ১২ লাখ মানুষের মধ্যে একটা বড় অংশ পাবেন না ক্যাব–‌এর সুবিধা। গোটা দেশে এনআরসি হলে বাংলারও দার্জিলিং বা ডুয়ার্স অঞ্চলে বাঙালিদের বাড়তে পারে সমস্যা। সবচেয়ে বড়কথা ক্যাব–‌এর পাশাপাশি শুরু হয়েছে আরেক বাঙালিনাশা কর্মসূচি। মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম বা অরুণাচল প্রদেশে আগে থেকেই সেটা চলছিল। এবার অসমেও বাঙালি হারাতে বসছে ভূমির অধিকার। জমির ওপর অধিকার অসমের বিজেপি সরকার শুধুমাত্র খিলঞ্জিয়াদেরই দিতে চাইছে।
প্রাক্তন আইএএস হরিশঙ্কর ব্রহ্মকে চেয়ারম্যান করে একটি কমিটি গঠন করেছিল অসমের বিজেপি সরকার। সেই কমিটির দুটি পৃথক রিপোর্ট জমা পড়ে। এখন বিধানসভায় সেই রিপোর্টকে ভিত্তি করে নতুন আইন করার চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন মহল থেকে বিরোধিতাকে আমল দিতেই নারাজ বিজেপি নেতারা। বাঙালিদের নাগরিকত্বের পর এখন ভিটেমাটিতেও টান পড়তে চলেছে অসমে। বিরোধিতাকে আমল না দিয়ে বিজেপি–‌র মন্ত্রী পীযূষ হাজারিকার হুমকি, খিলঞ্জিয়াদের স্বার্থ রক্ষার্থেই সরকার বিলটি পাশ করাবেই। তাই এনআরসি–‌র পর বাঙালির আরও এক বিপদ আসছে অসমে। হিন্দু বাঙালিরা ভেবেছিলেন রক্ষা করবে ক্যাব। কিন্তু ক্যাব সেই আশা বা ভরসাতেও জল ঢেলে দিয়েছে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top