বাহারউদ্দিন: অশান্ত দিল্লির মৃত্যুমিছিল কোথায় গিয়ে থামবে, বলা মুশকিল। চেনা–‌অচেনা দুর্বৃত্তদের হুমকি, উসকানি, সশস্ত্র দাপাদাপি আর গুজব ছড়ানোর রহস্যাবৃত, সুপরিকল্পিত রাজনীতির রক্তাক্ত, অশ্রুসিক্ত পরিণতি এবার কোনদিকে ছুটবে, জানা নেই আমাদের। বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস, নির্বিশেষের সৌহার্দের বিরুদ্ধে ক্ষমতামত্ত ক্ষুদ্রের ঘৃণা ও ঔদ্ধত্যের শেষ কোথায়, কে জানে? অসহায়ের মতো দূরে থেকে, কাছে থেকে আমরা শুধু দেখে গেলাম.‌.‌.‌ রাজধানীর একাংশ যখন পুড়ছে, উন্মত্ততা নিরন্তর লাফাচ্ছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের তোয়াজ–‌উদযাপনে ব্যস্ত আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ‘‌হার্ড টাস্ক’‌, তাঁর উদ্বেগ, তাঁর প্রশাসনিক সতর্কতা একবারও স্পর্শ করল না উপদ্রুত, হিংসায় অবরুদ্ধ পূর্ব দিল্লির সমবেত আর্তনাদকে। সচেতন নীরবতার এরকম দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বারবার আসে না। আসে তখনই, যখন দুর্যোগের ঘন কালো আস্ফালন দেখেও শাসক চুপ করে বসে থাকে, শাসনের নিয়মকে আলগা কিংবা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ৪৬–‌এর কলকাতা দাঙ্গার ইতিহাস দেখুন। মুসলিম লিগের ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে–‌কে ঘিরে লুঠতরাজ, অগ্নিসংযোগ শুরু হল বন্দর এলাকায়। প্রবল আক্রোশে উন্মাদ হয়ে উঠল মধ্য, পূর্ব আর উত্তর কলকাতা। তখনকার প্রিমিয়ার মিঃ সোহরাবর্দি আর তাঁর পুলিশকর্তা শামসুদ দুহা প্রায় ২৪ ঘণ্টা চোখ বুজে রইলেন। নিরীহের রক্তের ওপর দিয়ে দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ আর দেশভাগ আসন্ন হয়ে উঠল। 
ওই দুর্যোগের ৭৫ বছর পর আরেক রকমের দেশভাগকে, বিভাজন আর ঘৃণার রাজনীতিকে দিল্লিতে সরাসরি চাপিয়ে দিল শাসকের পরিকল্পিত উদাসীনতা। যা দৃশ্যত অদৃশ্য। অন্ধ। একথা বলার কারণ, তিনদিন ধরে, অস্ত্র হাতে দাপিয়ে বেড়াল অসংখ্য কুৎসিত। আগেভাগে তাদের নেতারা শাহিনবাগকে বাগে আনতে প্রকাশ্যে পরপর হুমকি দিয়ে গেল, উসকানি ছড়াতে থাকল.‌.‌.‌এসব দেখেও কেন নিষ্ক্রিয়, নিশ্চুপ হয়ে রইলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী? কেন আগুনের অনর্গল বর্ষণ রোখার তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিলেন না স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী? আক্রান্ত কোনও এলাকায় কার্ফু জারি হল না, সেনা–‌পুলিশকে বসিয়ে রেখে আধাসেনার হাতে দায়সারা দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হল। এরকম নির্লজ্জ, নগ্ন নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে ২০০২ সালের কুখ্যাত গুজরাট দাঙ্গার দিনগুলিতেও। দুই ঘটনার কী অদ্ভুত সাদৃশ্য! নরেন্দ্র মোদি তখন শাইনিং গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। হঠাৎ করসেবকদের ট্রেনে গোধরায় আগুন জ্বলে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের উন্মাদনা ঝাঁপিয়ে পড়ল আমেদাবাদ, গুজরাট ও অন্যান্য শহরে। দৃষ্টির আড়ালে সক্রিয় অমিত শাহ। মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিশ্চুপ হয়েও পুরোপুরি নির্বাক নন.‌.‌.‌এভরি অ্যাকশন হ্যাজ অ্যা রিঅ্যাকশন বলেই উসকে দিলেন আগুনকে। ঘটনাচক্রে তাঁদের শাসন পর্বে, তাঁদেরই চোখের সামনে স্বাধীন ভারতের রাজধানীতে জঘন্য, করুণ, মারাত্মক ও সংক্রামক, একপেশে আরেক দাঙ্গা সঙ্ঘটিত হতে থাকল। তাহলে কি গুজরাটের অভিজ্ঞতাকে দিল্লিতে চাপিয়ে দিল একই শাসকের সম্প্রসারিত কূটকৌশল? বুকের ওপর ছোরা.‌.‌.‌প্রশ্ন তুলবে কে? জবাব দেবে কে.‌.‌.‌রাজধর্মের মুখে কুলুপ! 
দাঙ্গার রাজনীতি ও অর্থনীতি এখন আর অস্পষ্ট নয়। গুজরাটে বাণিজ্যিক অর্থনীতির প্রয়োজন ছিল দাঙ্গার। রাজনীতির দরকার ছিল সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের। দু’‌পক্ষ নিভৃতে হাত মিলিয়ে নিশানা করেছে মিশ্র–‌অমিশ্র বসবাসকে। দাঙ্গা ঘটিয়ে, সরাসরি হুমকি দিয়ে কেল্লাহ ফতেহ। ভয়ে থমকে গেল সীমিত সংখ্যকের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা। মেরুকৃত রাজনীতিও উৎসাহিত বোধ করল। ভাবতে শিখল, দিল্লি দূরঅস্ত নয়। কাছে আসছে। আরও কাছে। ২০১৪ সালে তাঁদের ওই ইচ্ছাপূরণ আর বর্ধিত উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনেও একপেশে অর্থনীতির আধিপত্য বিস্তারের অভিপ্রায় নজরে আসছে। ১৯৮৪–‌র শিখ দাঙ্গা এবং ৯২ সালের বাবরি ধ্বংসের পর থেকে অন্য এক নিঃশব্দ, প্রতিক্রিয়ায় দিল্লিতে মিশ্র বসবাস, মিশ্র অর্থনীতি মাথা তুলতে শুরু করে। পূর্ব দিল্লিতে আমরা দেখেছি, ভয়, জড়তা আর অবিশ্বাসকে হারিয়ে দিয়ে বাণিজ্যের ক্ষুদ্রতাহীন বসতি বাড়ছে। এই বুদ্ধিকেই টার্গেট করেছে ঘৃণা আর বিভাজনের সন্ত্রাস। এখানে দাউদ কিংবা ইয়াকুব মেমন থেকে কপিল মিশ্রদের অবস্থান আর নিশানার তফাত নেই। দু’‌পক্ষেরই লক্ষ্য অভিন্ন অর্থনীতি। অভিন্নের 
সংস্কৃতি। যে শাসক তাদের একাংশের গতি আটকে জেলে পুরে রাখে, সে শাসকই তার প্রয়োজনে সাম্প্রদায়িক ক্ষমতামত্তকে প্রশ্রয় দেয়। পুষ্ট করে তোলে। ভাগলপুর, মিরাট, আমেদাবাদ, ভদোদরা, হায়দরাবাদের একমুখী দাঙ্গার পর দাঙ্গার পেছনে ও সামনে ভেদাভেদের রাজনীতি ও অর্থনীতির 
সহাবস্থান ও সহযাত্রার কলঙ্কিত কৌশল কি প্রমাণ করে না, মুখ বদলেছে, বাড়ছে মুখোশ? ওই নিষ্ঠুর ও নৃশংসদের কবলে পড়ল আধুনিক দিল্লিও।  

জনপ্রিয়

Back To Top