সাবির আহমেদ: লোকসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ততদিনে ঘোষণা হয়ে গেছে। অতএব সর্বত্র ভোটের আলাপ, তর্ক। সুন্দরবনের পথে মালঞ্চ বাজারে চায়ের দোকান। স্থানীয় বাসরুটে ফেরি করার ফাঁকে, একটু জিরিয়ে নিতে নিতে মাঝবয়সি ভদ্রলোক বেশ জোর গলায় বলছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন করতে সবাই একসঙ্গে লড়ল। স্বাধীনতা এল। বলা হল, দেশ সব মানুষের।’ এর পর চাপা গলায় যোগ করলেন, ‘অথচ ভোট হচ্ছে ধর্মের নামে। হিন্দু–মুসলমান ভাগ করে’। 
বাস্তবিক, পুরো নির্বাচন পর্ব জুড়ে দেশে ধর্মীয় ‘বিভাজন’–ই ভোট প্রচারের প্রধান মূলধন। আর ধর্মীয় মেরুকরণের ওপর ভর করেই ভোটের ভিন্ন ফলাফল দেখতে পাওয়া গেল। ভোটপ্রাপ্ত বয়স্কদের সাংবিধানিক অধিকার, আর এই অধিকারকে কেন্দ্র করেই বড়রা যখন বিভাজনের ভিত তৈরি করতে ব্যস্ত, মালঞ্চ থেকে তিরিশ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এক দ্বীপে, একগুচ্ছ ছেলেমেয়ে জাত–ধর্মের কারণে নিজেদের মধ্যে গড়ে ওঠা অদৃশ্য দেওয়াল ভেঙে গড়ে তুলছে বন্ধুত্বের সহজ সম্পর্ক।
বালী দ্বীপের দুটি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় বিজয়নগর আদর্শ বিদ্যামন্দির, সত্যনারায়ণপুর শশীভূষণ উচ্চ বিদ্যালয়, সুন্দরবন অসিতবরণ হাই স্কুল এবং বালি পূর্বপাড়া হাই স্কুল— এই চারটি হাই স্কুলের প্রায় ৪০০ ছাত্র–‌ছাত্রীকে নিয়ে গত চার–পাঁচ মাস ধরে কলকাতা ও সুন্দরবন অঞ্চলের স্থানীয় সংগঠন ‘দিশা’ কয়েকটি আলোচনাধর্মী কর্মশালায় ‘আলাপ–মিলাপ’–‌এর মধ্যে দিয়ে একে অপরকে ভাল করে জানার চেষ্টা করেছে, প্রশ্ন করেছে। কেন শ্রীগৌরাঙ্গ মুসলমানের ঘরে গিয়ে জল খাননি? উত্তর খুঁজে না পেয়ে লজ্জায় মাথা হেঁট করছে। আবার সামসুল কেন আদিবাসী পাড়ার বন্ধুদের এড়িয়ে চলে, তা ও জানে না। বনবিবির এই দেশে এতকাল ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে, অথচ ধর্মের কারণে বা জাতের কারণে এত দিনের ক্লাসের সহপাঠীদের আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা নেই। মনের মাঝে উঁকি মারে অনেক প্রশ্ন— ইদ মানে তো উৎসব, তাহলে ‘মহর্‌রম’ কী? ‘এই কর্মসূচির মধ্যে দিয়ে জানতে পারি মহর্‌রম শোকের পালন’, জানাল দশম শ্রেণির এক ছাত্রী। এই কর্মশালা আসলে এমন এক সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডের শৃঙ্খলা, যেগুলোর সর্বোৎকৃষ্ট ফল হল একে অপরকে জানতে ও চিনতে পারা।
এই কর্মশালার একটা অঙ্গ তাৎক্ষণিক বক্তৃতা। এই বক্তৃতা মাথার মধ্যে গেঁথে যাওয়া কিছু ধারণাকে প্রশ্ন করতে শেখায়। যেমন, অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর প্রশ্ন, ‘আমরা ধর্মের, জাতের ও বর্ণের ভিত্তিতে বিভাজনের বেড়া গড়ে তুলি। অথচ যখন প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটে, তখন কি বেছে বেছে কেবল হিন্দু বা মুসলমান পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়?‌ বরং প্রকৃতি নির্মম হয়ে ওঠে আমাদের মিলিত অবহেলায় বা অত্যাচারে। জাত–ধর্ম নির্বিশেষে এই দ্বীপের প্রায় প্রতিটি পরিবার আয়লায় ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমাধানের উদ্দেশ্যে পরিবেশ রক্ষার কাজে সবাই মিলে হাত লাগাতে গিয়ে গড়ে উঠছে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। 
এছাড়া ১২টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর প্রায় ১৫০ মহিলাও এই কর্মশালার মধ্যে দিয়ে অপরিচয়ের বেড়া ভাঙতে চেষ্টা করছেন। সে দিনের আলোচনায় আদিবাসী মহিলারা গান শোনালেন, দাবি করলেন তাঁদের শ্রমের মর্যাদার। স্থানীয় স্তরে ধর্ম ও বর্ণ বৈষম্য নিয়ে মত বিনিময় হল। সামাজিক যোগাযোগ প্রসারের প্রয়াস, এই আলাপ–মিলাপ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন স্থানীয় স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক সাকিল আহমেদ। বললেন, বয়ঃসন্ধিকালের ছাত্র–‌ছাত্রীরা, মূলত বড়দের কারণে ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংস্কারের জালে জড়িয়ে। জন্মগত কিছু সংস্কার চাপিয়ে দেওয়া বা মগজ ধোলাই করা সংস্কারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে এক দানব হয়ে সমাজের স্বাভাবিকতাকে বিকৃত করে, তাকে বিপন্ন করে। বিভিন্নতাকে স্বীকারের পরিবর্তে জাত ধর্ম ও সংখ্যার কারণে ব্রাত্য, প্রান্তিক বা ‘অপর’ করে দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে থাকে। 
গত তিন মাসের আলোচনায় গভীরে প্রোথিত ধ্যানধারণাগুলোর গোড়া খানিক আলগা হয়েছে। ছাত্র–ছাত্রীদের মধ্যে একটা তৃপ্তির আনন্দ। বন্ধুরা তো আগে থেকেই চেনা ছিল, তবে অনেক কিছুই নতুন করে শিখল। অনেক ভুল ধারণার অবসান হল। তবে তাঁর আশঙ্কা অন্য জায়গায়। তিনি মনে করেন, অন্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা ও অসম্মান ছোটরা শিখছে বাড়ির বড়দের থেকে। এমনকী শিক্ষক সমাজও এই ব্যাধি থেকে মুক্ত নয়। গতানুগতিক চিন্তা ও সংস্কারকে ধাক্কা দিতে আলাপ–মিলাপের আলোচনা শিক্ষকদের মধ্যেও জরুরি। একেবারে চেষ্টা হয়নি বলা যাবে না। সব অর্থেই সংখ্যালঘু এই দ্বীপের কয়েকশো ঘর আদিবাসী জনজাতি। এদের নিয়ে সমাজে বরাবর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য। বিজয়নগর বিদ্যালয়ের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক সুকুমার প্যয়রা সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতে আদিবাসীদের উৎসবে হাঁড়িয়া খেয়ে তাঁদের সঙ্গে নাচের তালে পা মিলিয়ে ছিলেন বলে স্কুলের আশেপাশের পাড়ায় নিন্দার ঝড় উঠেছিল। শিক্ষক মহাশয় হাল ছাড়েননি। লাগাতার আলাপ আলোচনা করে, আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে তুলে ধরে এক অপরের কাছে আসার সুযোগ তৈরি করে চলেছেন।
ক্ষমতার স্বার্থে দেশ জুড়ে বিভাজনের যে সর্বগ্রাসী রাজনীতি, তা আটকাতে এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা কতখানি কার্যকরী হবে, এই প্রশ্নের সহজ উত্তর দিলেন স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক— শুরু তো কোথাও করতে হবে। এই শিশুরা যদি তাদের মন সংস্কারমুক্ত করতে পারে, জাত ধর্মের নামে এই বিভাজনের এই কর্কট রোগ সমাজে থাবা বসাতে পারবে না। কাজেই ঘৃণা–বিদ্বেষের বিরুদ্ধে চলতে থাকুক মানুষে মানুষে আদান প্রদান।
শিক্ষক মহাশয়ের কথায় ‘বিন্দুতে সিন্ধু–কল্লোল’ । বিন্দুগুলো জরুরি। আরও জরুরি, সেগুলোকে দেখতে পাওয়া

জনপ্রিয়

Back To Top