তপোময় ঘোষ: পশুপ্রেমের যে তিনটি গল্প বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছে, সেগুলি হল শরৎচন্দ্রের ‘‌মহেশ’‌, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘‌আদরিণী’‌ আর তারাশঙ্করের ‘‌কালাপাহাড়’‌। তিনটি গল্পই করুণ রসে আর্দ্র। পড়ামাত্রই পাঠকহৃদয় সিক্ত হয়ে যায়। এই ত্রয়ী গল্পের তৃতীয়টি অর্থাৎ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘‌কালাপাহাড়’‌ গল্পটি প্রকাশের আশি বছর পূর্তি হল সম্প্রতি। গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৭ সালের ২০ নভেম্বর দেশ পত্রিকায়। এই আশি বছরে গল্পের পটভূমি, কেন্দ্রীয় চরিত্র, পার্শ্বচরিত্রের অর্থাৎ গল্পের সেই এলাকা, ‘‌কালাপাহাড়’‌ এবং তার মালিক রংলালের কেমন পরিবর্তন ঘটেছে?‌ দেখা যাক গল্পের ভিতর বাহির। 
বড় চাষি রংলাল পছন্দসই গরু কিনতে চায়। বাড়ির গরু জোড়া বিক্রির টাকা নিয়ে পঁাচুন্দীর হাট থেকে ঘটনাচক্রে কিনে ফেলে দুটো অতিকায় মহিষ। বাড়ি নিয়ে গেলে স্ত্রী ও পুত্রের কথা ধরে তাদের নাম হয় কালাপাহাড় আর কুম্ভকর্ণ। রোজ তাদের নদীর ধারে চরাতে নিয়ে যায়। দূরে চলে গেলে অবিকল মহিষের ডাক ডেকে ফিরিয়ে আনে। দু’‌জনার ঝগড়া হলে, তাদের আলাদাভাবে স্নান করিয়ে পেট ভরিয়ে খাইয়ে তবে একসঙ্গে মিলতে দেয়। উপদেশ দেয়, ছিঃ ঝগড়া করতে নেই। একসঙ্গে মিলেমিশে থাকবি তবে তো!‌ একদিন বাঘ পড়ল তাদের ওপর। কুম্ভকর্ণ বাঘটাকে শিঙে গেঁথে ফেলেও মারা গেল। রংলাল বালকের মতো কঁাদতে লাগল। এখন কালাপাহাড়কে সামলানো বিপদ। সে রংলালের কোলে মুখ তুলে দেয়, রংলাল পরম স্নেহে তার মাথা চুলকে দেয়। একসময় তার দুরন্তপনায় অস্থির হয়ে রংলাল এক পাইকারের কাছে তাকে বিক্রি করলেও সে ফিরে আসে। শেষে এক পাইকার কোন জমিদারকে দিতে তাকে কিনল। কিন্তু পাইকারের হাত থেকে গলার দড়ি ছিনিয়ে নিয়ে কালাপাহাড় শহরের রাস্তায় ছুটতে থাকে আর রংলালকে ডাকে আঁ–‌আঁ–‌আঁ। শান্তিভঙ্গের কারণে পুলিস সাহেব তাকে গুলি করে মারলেন। ‘‌সাহেব রিভলবারটা খাপে ভরিয়া সঙ্গের কনস্টেবলকে নামাইয়া দিলেন, বলিলেন, ‘‌ডোম লোগকো বোলাও’‌।
অনভ্যস্ত পরিবেশে এই অতিকায় অথচ অসহায় প্রাণীর মৃত্যু আমাদের বেদনার্ত করে। মহিষ কালাপাহাড় এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও তার মালিক কৃষক রংলালই আমাদের আলোচ্য। গল্পটি পাঠ করে রংলাল সম্বন্ধে যা ধারণা করা যায় তাতে, সে নানুর লাভপুর কেতুগ্রাম কাটোয়া কান্দী থানা এলাকার কোনও এক গ্রামের মাঝারি কৃষক। তার স্ত্রী এই এলাকার দেশাচার লোকাচার মানে। পুত্র প্রথম প্রজন্মের শিক্ষিত আধুনিক যুবক। সে ম্যাট্রিক পাস করে কাজের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। তার পারিবারিক আয় কৃষিনির্ভর। কোনও বছরে ধান ভাল ফললে শখ আহ্লাদ মেটাতে পারে। ধান চাষই তার মুখ্য পেশা। চাষের কাজে যত্নবান। গল্পকারের ভাষায় বলশালী দেহ। খুব খাটতে পারে। একবিন্দু শক্তিও অবশিষ্ট রাখে না। বোধ হয় এই কারণেই গরুর ওপরেও তার প্রচণ্ড শখ। লেখক ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিচ্ছেন, রংলাল গরুর মতোই খাটে এবং তার বুদ্ধিও.‌.‌.‌।
সে যাই হোক, রংলাল এই মধ্যবঙ্গের একজন কৃষক যে বিগত শতকের তিরিশের দশকে নিজহাতে হাল ডাকিয়ে, জমিতে চাঙড় চাঙড় মাটি তুলে ভাল ধান/‌ফসল ফলাত। তার দাম পেয়ে সংসারে শ্রীবৃদ্ধি ঘটাত। খড় বঁাচাতে মাঠে–‌ঘাটে নদীর ধারের ঘাস খাইয়ে মহিষ পুষত। একেবারে হিসেবি কৃষক। সমাজবিজ্ঞানের ভাষ্যে রংলাল সামন্ত যুগের একজন আদর্শ উৎপাদক, যার উৎপাদনক্ষেত্র নিজস্ব কিছু জমি। আর উৎপাদনের উপকরণ সেই কেঠো লাঙল আর হাল বলদ অথবা মহিষ। গ্রামীণ পরিবেশের আদর্শ কৃষক দম্পতিও তারা। কৃষিকেন্দ্রিক আচার অনুষ্ঠান মেনে চলে। তাই তো নতুন মহিষের আগমনের সঙ্গে তেল–‌সিঁদুর পরিয়ে উলিয়ে বরণ করে নেয়। ছেলের সঙ্গে প্রজন্ম–ফারাক মানসিক ফারাকে পরিণত হয়। নিম্নমধ্যবিত্ত কৃষকের জীবনযাপন, কিন্তু তারা সুখী। 
এবার আমরা দেখব স্থান–কাল–পাত্রের মধ্যে শুধুমাত্র ‘‌কাল’‌টিকে আশি বছর পরে এনে কী দেখতে পাই।
আজকের রংলাল অবশ্যই শুনতে পাবে না ঘ্যঁাস ঘ্যাঁস শব্দ, আর চোখ খুলে দেখতে পাবে না হিংস্র চিতাবাঘকে। না, লাভপুরের কুয়েনদী বা কেতুগ্রামের কান্দর বা ভরতপুর–কান্দীর ময়ূরাক্ষীর ধারের কোনও ঝোপজঙ্গলেই আর কুম্ভকর্ণকে মেরে ফেলার মতো চিতাবাঘ নেই। অর্থাৎ জৈববৈচিত্র্য নষ্ট হয়েছে। ১৯৩৭–‌এর রংলালের ছেলে যশোদানন্দন ম্যাট্রিক পাস করলেই একটা কাজের জোগাড় হত। এখনকার রংলালের পুত্ররা বেকার। ম্যাট্রিক কেন এমএ পাস করেও চাকরি নেই। কর্মসংস্থানের জন্য যশোদানন্দনদের খুব ঘুরতে হচ্ছে, তাই তাদের মেজাজ সেদিনের চেয়েও তিরিক্ষে। টেট ফেট কেউ কিচ্ছু পাচ্ছে না। হতাশায় কেউ কেউ আত্মহত্যাও করে ফেলছে। সেদিনের রংলাল পুরনো গরু বিক্রির টাকা তার স্ত্রীর কাছ থেকে নিয়ে মোট ১০০ (‌একশো)‌ টাকায় কালাপাহাড় আর কুম্ভকর্ণকে কিনতে পেরেছিল। কিন্তু আজ তার সেই টাকায় একটা হঁাসও হবে না পাঁচুন্দীর হাটে। কালাপাহাড় বা কুম্ভকর্ণকে কিনতে লাগবে ‌এক লক্ষ টাকা। মুদ্রাস্ফীতি এতখানিই ঘটেছে!‌‌
সেরা গরু পোষার, যত্ন করার শখ ছিল রংলালের। এখনকার রংলালদের গরু–মহিষ পোষার শখ একেবারে লোপ পেয়ে পেয়ে বিনষ্ট হয়েছে। এই এলাকার কোনও গ্রামে আর হাল বলদ রাখার রেওয়াজ নেই। পূর্বে উল্লেখিত চার–পঁাচখানা থানা এলাকার কোন গঁায়ের চাষি ছিল রংলাল, তা জানা না থাকলেও, এটা জানা আছে যে, সেই গঁায়ে আর দশ–বিশ জোড়া গরু– মহিষও নেই। আট দশক তো খুব দূরের, মাত্র তিন দশক আগেও প্রতিবেদকের গ্রামে (‌কেতুগ্রাম থানার)‌ অন্তত ৪০০ জোড়া গরু–মোষের হাল সে দেখেছে। কিন্তু আজ সেই শিবলুন‌ গ্রামে মাত্রই বিশ‌ জোড়া হাল বলদ। এসব পোষার খরচ বেশি। পোষায় না। ধানজমির হঁাটুভর কাদা এখন বড় লাঙলে নয়, ট্র‌্যাক্টরেই করে দিচ্ছে। হ্যাঁ আমার গ্রামে এখন ঠিক বিশখানাই ট্র‌্যাক্টর। তাদের একদিনের চালনায় তাবৎ মাঠ কর্দমাক্ত। 
তাহলে কি শাশ্বত বাংলার সব কিছুই বদলে গেছে?‌ না, পাঁচুন্দীর হাটের অবস্থা একটুও বদলায়নি। সেরকমই পশুর কেনাবেচা হয়। সেদিনের শাকাশী মহিষ কুম্ভকর্ণের সঙ্গে মাংসাশী চিতাবাঘের লড়াইও একই আছে। বাঘ এখনও ঘাস খায় না। নিরীহ শাকাশী প্রাণীদের মেরে খেতে চায়। আগের মতোই বজায় আছে গরিব চাষির দুর্দশা। তারা যেন সেই রামা কৈবর্ত আর রহিম সেখের সময় থেকেই বড় বড় মহাজনদের খাদ্য!‌ আজও তেমনই আছে। রংলাল আগের বছরের ধানের ফলন এবং দাম পেয়ে পুরনো খারাপ গরু বিক্রি করে ভাল মহিষ কিনতে পেরেছিল। আজকের রংলালের ধান বিক্রি হয় না। হলেও ন্যূনতম দামে। না, উৎপাদন ব্যয়ের দ্বিগুণ লাভ দিয়ে কোনও সরকার কেনে না। 
তারাশঙ্কর লিখেছিলেন, ‘‌মহিষের মেজাজ একবার খারাপ হইলে সে আর শান্ত হয় না, বরং উত্তরোত্তর সে অশান্ত হইয়া ওঠে।’‌ আজকের রংলাল হয়তো তার শিক্ষিত, কাজের ছেলে যশোদানন্দনের পরামর্শে লাখ টাকার কালাপাহাড়কে পশু হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানকার ডাক্তারবাবু বলে, এ আমাদের কম্মো নয়। আপনি বরং ‌অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ার স্পেশালিস্ট অথবা ‌ইথোলজিস্টদের কাছে নিয়ে যান। হ্যাঁ, বিহেভিয়াল সায়েন্স বা ইথোলজির যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে। আজকের দিনে হলে হয়তো কালাপাহাড়ের মনখারাপ সেরে যেত। ভুলে যেত তার সাথী কুম্ভকর্ণ আর মালিক রংলালকে। ‘‌.‌.‌.‌প্রাণভয়ে কালাপাহাড় ছুটিতেছিল’‌, লিখেছেন তারাশঙ্কর। করুণ দৃশ্য। আজও মানুষ দেখতে বাধ্য হয়, দীর্ঘদিনের হাল বলদকে যখন তার রংলালের মতো মনিবরা পাইকারকে বিক্রি করে দেয়, তখন সেই গৃহস্থের চোখে জল আসে, আর সেই পশুও গোয়াল ছেড়ে পাইকারের সঙ্গে যেতে চায় না। তারও চোখ ছলছল করে ওঠে। হায় রে কালাপাহাড়!‌ তুমি সাথীহারা হয়ে পাগল হয়েছিলে বলে রংলাল তোমাকে বেচে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তুমি অচেনা পথে মালিককে খুঁজতে গিয়ে সভ্যতার ক্ষতি করে ফেলেছিলে। তাই নির্মম গুলিতে তোমার মৃত্যু।
তোমার পরিবর্ত হিসেবে গ্রামে বড় গৃহস্থের বাড়িতে এসেছে যন্ত্রের লাঙল, ট্র‌্যাক্টর। সে পাগল হলে?‌ কী হাল হয়?‌ গ্রামের অজিত বিশ্বাসের ট্র‌্যাক্টরও পাগল হয়ে পর পর অ্যাকসিডেন্ট ঘটাচ্ছিল। অজিতদারা তাই তাকে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিক্রি করে দিব্যি তারা ফিরেও আসে। কিন্তু পশু কালাপাহাড়ের মতো সেই যন্ত্রদানব তাণ্ডব করে নতুন মালিকের বাড়িতেও অ্যাকসিডেন্ট করে যাচ্ছে শোনা যায়!‌

জনপ্রিয়

Back To Top