শুভময় মৈত্র- কলকাতা শহরে পৌষ–মাঘের প্রতীক্ষায় আকুল বাঙালি। কর্কটক্রান্তি রেখার আশপাশে গরম ভীষণ বেশি, তুলনায় শীতের প্রকোপ কম। গরমের তীব্রতা এই সব জায়গায় কষ্ট দেয়;‌ তাই শীতকালের অপেক্ষায় থাকি আমরা। তবে এবারের ঠান্ডা কিছুটা বেশি। কলকাতায় তো বারো ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের আশপাশে তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করেছে বেশ কয়েকদিন। তুলনা করার জন্যে বলতেই হয় যে গরমকালে এসি–‌র তাপমাত্রা সবথেকে কম থাকে ষোলোতে। আর ভাবুন এবারের শীতে আশপাশে মফস্‌সল শহরে, যেমন কৃষ্ণনগর কিংবা পানাগড়ে হিসেব হচ্ছে সাতের আশপাশে। দমদমে নয়–‌দশ। তাই বিশ্বজোড়া উষ্ণায়নের প্রেক্ষিতে এ এক অন্যরকম খবর। সকালবেলা অফিস যাওয়ার আগে ঠান্ডা জলে চান করা নিয়ে মজার গল্প ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার–‌আপনার হোয়াটসঅ্যাপে। শীতের সঙ্কোচনের ঠেলায় বাঙালি পালোয়ানেরা বিপর্যস্ত। সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে গায়ে চাপাতে হচ্ছে অনাবিল আলোয়ান। পৌষ সংক্রান্তির হাওয়া বনহুগলির মোড় ঘুরে হাড় কাঁপিয়ে ঢুকে পড়ছে চ্যাংড়া গলিতে। সরস্বতী পুজোর সকালবেলায় অঞ্জলির আগে স্নান করে শুদ্ধ হতে হয়;‌ এদিন আর স্নান এড়ানোর উপায় নেই। গাঁদাফুল ভুলে পলাশ ফোটার স্বপ্নে বিভোর বাঙালি এবার শীত তাড়িয়ে বসন্তের অপেক্ষায়। তবে এইটুকু শীত নিয়ে আমাদের হাবভাব অনেক সময়েই আলগা ঢঙ। গায়ে এক–‌আধটা গরম জামা, পায়ে মোজা, আর মাথায় বাঁদুরে টুপি পরলেই এই শীতকে পাঁচ গোল দেওয়া যেত। কিন্তু আড়বুঝো বাঙালি গায়ে চাপাবে হালকা টি-শার্ট, বড়জোর হাতকাটা সোয়েটার। তারপর শীতের সকালে কাঁপতে কাঁপতে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে ধোঁয়াওঠা ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে কুমেরু আস্বাদন। সময় থেমে থাকে না, তাই আলগা রোদ্দুরে গায়ের চাদর সামলাতে সামলাতেই অফিসের ডাক এসে যায়। 
ঠান্ডার কথা আলোচনা করতে গেলে সাইবেরিয়ার এক গ্রামের কথা বলতেই হবে। দূরান্তের পথ পেরিয়ে আমাদের দেশের খবরেও জায়গা করে নিয়েছে সে। নাম তার ওয়মায়াকন। এবার নাকি সেখানে তাপমাত্রা নেমেছে ঋণাত্মক বাষট্টি ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে। অতঃপর বিশেষভাবে তৈরি থার্মোমিটারও রণে ভঙ্গ দিয়েছে। তলার দিকটা ফেটে গেছে তার। শোনা যায় উনিশশো তেত্রিশ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সেখানে নাকি তাপমাত্রা নেমেছিল ঋণাত্মক সাতষট্টি ডিগ্রির তলায়। এবারেরটা সেই হিসেবে গত একশো বছরে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। বিশ্বজোড়া সবথেকে কম তাপমাত্রা এ যাবৎ মাপা হয়েছে কুমেরুতে, সে হল ঋণাত্মক পঁচানব্বই ডিগ্রি। যা–‌ই হোক, সেখানে তো সবসময় মানুষ থাকে না। তাই আবার সাইবেরিয়ার সেই গ্রামের কথায় ফিরে আসা যাক, যেখানে পঞ্চাশজন মানুষ সারা বছর বাস করেন। ওয়মায়াকন মানে ‘‌না জমা জল’‌, সম্ভবত কাছাকাছি এক উষ্ণ–প্রস্রবণের নামে। রুশ সুন্দরীর চোখের পাতায় সেখানে জমা বরফের ছবি। ইনস্টাগ্রামের আলোকবিন্দুতে নীল মণির পাশে কটা রং নাকি কালো সে দেখার সুযোগ নেই। লাস্যময়ী যুবতীর কটাক্ষের অনেকটাই রং সাদা ঝুরো বরফের আড়ালে। কোথাও বা ব্যালের বিভঙ্গে বরফঢাকা গাছের পাশে নৃত্যপটীয়সী। উরু থেকে পায়ের পাতা অবধি কাপড় নেই। সোয়ান লেকের আদলে দু’‌পায়ের মাঝে সমকোণ। হাড়কাঁপানো শীতের রাতে এ ছবি দেখতে ‘‌রাজা তোর কাপড় কোথায়’‌ বলার থেকেও সাহস লাগে অনেক বেশি। তবুও মনলোভা সব ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে আন্তর্জালে। ছবি যিনি তুলেছেন তিনি দিব্যি দিয়ে বলছেন যে এসব গণকযন্ত্রে গোলমাল করা ফটোশপে বানানো ছবি নয়, একেবারে সত্যিকারের। আমরা মোটেও অবিশ্বাস করছি না সে কথা। বরং এইসব ছবি দেখে আমাদের কাঁপুনি বেড়ে যাচ্ছে কয়েকগুণ। কলকাতায় বসে সাইবেরিয়ার অনুভূতি। আর রাত জেগে শহরের রাজপথে চারচক্রযান চেপে কম্বল বিতরণ করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলার সুযোগ। ঘরহারা মানুষের ফুটপাথ বদল হয় মাঝরাতে, আমরা লেপচাপা দিয়ে নাক ডাকি। ভোর হয় সকালে আটটা বাজার পরে, শোনা যায় না মুঠোফোনে সকাল বাজার শব্দ, মধ্যবিত্তর বাজার বসে তারপর। ধাপার বড় ফুলকপিতে সারের গন্ধ, তাই খুঁজে ফিরি যত্নে জন্মানো সত্যি গ্রামের শিশুফুল। ঢেলে সাজানো সবজির সামনে মাসিদের দেখে অবাক হই। ‘‌কী ভাবে উঠলে ভোর তিনটেয়? তারপর ক্যানিং লোকাল, নাকি লক্ষ্মীনারায়ণপুর? বনগাঁ নাকি রানাঘাট?’‌ তবুও থামে না দরাদরি। ট্যাঁকশালের অতিরিক্ত খুচরো ট্যাঁকে গুঁজে বাড়ি ফেরা।  
সপ্তাহান্তে চড়ুইভাতি বাদ দিলে তো চলবে না। দিনের দিন হলে বাস কিংবা ম্যাটাডোরে চেপে সকালে একদিকে হইচই, বিকেলে অন্যদিকে ঘরে ফেরা। অসমান পিচে বিরাট, হাওয়া কমা বলে মেসি, কিংবা হারানো পালকের ফুলে সাইনা–সিন্ধু। একদিন ছুটি বাড়িয়ে সপ্তাহান্তে শান্তিনিকেতন। বর্ণপরিচয়ের একতারা বইয়ের পাতা থেকে লাফ দিয়ে একেবারে বাউলের হাতে। ভোরে উঠে ট্রেন ধরতে হবে। সাতচল্লিশের বুড়োর সাত বছরের পুত্রকে টেনে তোলা। শিশুর অসহায় বিরক্তির বেসুরো চিৎকারের মাঝে ওলা–উবেরের সারথির সঙ্গে কথোপকথন। ‘‌বিটি রোড থেকে বাঁদিকে ঘুরে যান, তারপর সামনে পচা পুকুরের পাশ দিয়ে ডানদিকে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, এবার আপনাকে দেখতে পাচ্ছি। আর একটু এগিয়ে আসুন। সরু গলিতে ঢুকতে অসুবিধে হচ্ছে? আরে চলে আসুন না দাদা। বালি ফেলার লরি ঢুকে যাচ্ছে অনায়াসে, আর আপনি আসতে পারছেন না? কতদিন ড্রাইভারি করছেন মশায়?’‌ সাতসকালে শিয়ালদা। প্ল্যাটফর্মে বিস্বাদ কফি। এক ঘণ্টা দেরিতে কু ঝিকঝিক। তারপর দুদিন শীতে কুঁকড়ে মফস্‌সল। বাঁধনহীন পানভোজন। সপ্তাহান্ত অতিক্রম করে ঘরে ফিরে মাঝরাতে বদহজমের বমি। পরের দিন সকালে ছেলেকে স্কুলে দিতে যাওয়ার পুলকারে বস্তাবন্দি করে চাপানো গেল না। শীতকালের বিশ্বাসঘাতকতায় দিনভর অন্য অভিভাবকদের ফোন করে জানতে হল প্রাথমিক শিক্ষার একদিন প্রতিদিনের পাঠ্যসূচি। বেলা বাড়তেও শরীর সায় না দেওয়ায় বছর শুরুতেই অফিসে নষ্ট হল একটা আকস্মিক ছুটি। আসলে সবটাই শীতের দোষ। সে জন্যেই তো গায়ে দিতে হল গরম শাল, অনুসিদ্ধান্তে পেট গরম। কালকে অফিস না গেলে বড় সাহেবের কোঁতকা। তাই ‘‌হে যুগসন্ধিকালের চেতনা, আজ আমাকে শক্তি দাও। আর দাও শীতের শেষের তুষার গলানো উত্তাপ’‌। 
অন্য কলকাতা কিন্তু রোজ সকালে জাগে। শীত গ্রীষ্মের ধার ধারে না মোটে। থিকথিকে গা ঘেঁষা শহুরে চালাঘর। এক বাথরুমে কুড়ি জন ঢোকার প্রতিযোগিতায় ঘড়ি বা মুঠোফোনের কান্না ছাড়াই রাত তিনটেয় ঘুম থেকে ওঠা। শীতের একটাই সুবিধে যে জল খরচ হয় কম। চান না করলেই হল। তেষ্টাও কম পায়। বেলগাছিয়া, রাজাবাজার, উল্টোডাঙা, পাইকপাড়ার ঘিঞ্জি শহরে ভোট অনেক বেশি, বেঁচে থাকার লড়াইটাও। কখনও হঠাৎ করে মনে হয় আজকে শীত বোধহয় অনেক কম। কিছু বুঝে ওঠার আগেই লেলিহান শিখা। বস্তিতে উড়ে বেড়ায় ঘনীভূত কার্বন। সামনে মাধ্যমিক। বইগুলো পুড়ে ছাই। জোগাড় হয়েছে হ্যালোজেন, সঙ্গে গাদা গাদা সূচিছিদ্র ক্যামেরার ঝলকানি। চটজলদি ত্রিপল ঢাকা অস্থায়ী রান্নাঘরে বড় কড়াইতে একসঙ্গে খিচুড়ি রান্নার সুবাস। আজকে মাথায় ছাদ ছাড়া শোয়া। তবে আবার ছাদ হবে। বেশ তাড়াতাড়ি। এ তো আর শক্তিশালী সিমেন্ট কিংবা পেশিবহুল লোহার স্তম্ভ দিয়ে বানানো বাইশতলা নয়। পুড়তে যেমন সময় লাগে না, গড়তেও তাই। দু–একদিনের মধ্যেই বাড়ি আবার তৈরি। কিছুটা দূর থেকে টেনে আনা ঝুলন্ত তারে গোধূলি তাড়ানো চল্লিশ পাওয়ারের আলো। পড়তে বসতে হবে। পরীক্ষা এসে গেছে। সমাজসেবিকরা উপহার দিয়েছে নতুন বই। আবার ছবি ওঠে চিৎপুরের বস্তিতে। রুশ সুন্দরী নয়, কলকাতার কিশোরী। চোখের জলে বরফ নয়, পুরোটাই বাষ্প। শীত চলে গেলে সেটুকুই ভরসা।  

লেখক কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক, মতামত ব্যক্তিগত

জনপ্রিয়

Back To Top