রাজীব ঘোষ: রাফাল চুক্তি নিয়ে প্রশান্ত ভূষণ সেদিন বললেন খুব সহজ করে। ‘‌আপনার গাড়ি ৫ লাখের, আর সিট বেল্টের খরচ করছেন ২০ লাখ, চুক্তিটা এইরকমই’‌— দুঁদে আইনজীবী, বোঝালেন এইভাবেই। প্রশান্ত ভূষণ, যশোবন্ত সিংহ আর অরুণ শৌরি প্রকাশ্যে রাফাল নিয়ে মুখ খোলার পর আমরাও না হয় একটু তলিয়ে দেখি ব্যাপারটা। তার আগে একটা কথা বলে রাখা দরকার, ক’‌দিন আগে অনাস্থা বিতর্কে রাহুল গান্ধী যদি ভুল বলে থাকেন, তাহলে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলে গেছেন ডাহা মিথ্যা। হ্যাঁ, ২০০৮ সালে ফ্রান্সের ড্যাসো (‌ড্যাসল্ট উচ্চারণে এরকমই)‌ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে গোপনীয়তার ধারা ছিল। কিন্তু দাম বলা যাবে না, এমন কোনও শর্তই সেখানে নেই। গোপনীয়তা শুধু অস্ত্র–শস্ত্র, রেডার এবং অন্যান্য প্রযুক্তি নিয়েই। নির্মলা ব্যাপারটা স্রেফ চেপে গেছেন।
মনমোহনের আমলে চুক্তি হয়েছিল ফ্লাইঅ্যাওয়ে কন্ডিশন ১৮টি রাফাল কেনার জন্য। দাম মোটামুটি ৫২০ কোটি টাকার কাছাকাছি। এ ছাড়া আরও ১০৮টি রাফাল ওই কোম্পানি আমাদের দেবে, যা অ্যাসেম্বলিং হবে হিন্দুস্থান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডে। শুধু তাই নয়, ড্যাসল্ট আমাদের প্রযুক্তিও হস্তান্তর করবে। চুক্তি সব মিলিয়ে ৪২ হাজার কোটির। এখন হঠাৎ সেই চুক্তি বাতিল করে ৩৬টি রাফাল ৬০ হাজার কোটি টাকায় কেনার যুক্তি কী?‌ হ্যাল মিগ তৈরি করেছে, সুখোই তৈরি করেছে। তাদের দক্ষতা প্রশ্নাতীত। আমাদের দেশে উন্নত প্রযুক্তি আসবে, দেশের কারখানায় কাজ হলে দেশের টাকা দেশেই থাকবে— এসব শর্ত মোদি সরকারের সইল না কেন?‌ উত্তর মেলে না।
দাম বলা যাবে না, গোপনীয়তার চুক্তি আছে— গলা চড়িয়ে নির্মলা সীতারামন তো বলে গেলেন সংসদে দাঁড়িয়ে। আর ২০১৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সংসদেই প্রতিরক্ষা দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী সুভাষ ভামরে বলে গেছেন প্রতিটি রাফাল জেটের দাম প্রায় ৬৭০ কোটি। তাহলে! যে বিমানের দাম ৬৭০ কোটি, তাতে রেডার আর অস্ত্রশস্ত্র লাগালে ১৬০০ কোটি দাঁড়াবে?‌ ভাবা যায়!‌ ওই ৫ লাখি গাড়ির ২০ লাখি সিটবেল্ট। রাহুল গান্ধীর কথাই তাহলে ঠিক, তেমন কোনও গোপনীয়তার চুক্তি থাকলে মন্ত্রী বিবৃতি দিতে পারেন নাকি!‌ তাছাড়া ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট তো বলছেন, ভারত চাইলে দাম জানিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
ভারত, মানে ভারত সরকারই যে চাইছে না। তাছাড়া যে নিরাপত্তা নিয়ে দিনরাত এত বকুনি ঝাড়া হয়, সেই নিরাপত্তা নিয়েই ছেলেখেলা চলছে। ভারতীয় বায়ুসেনার আগামী ১০ বছরের চাহিদার কথা মাথায় রেখেই রাফাল কেনার কথা ঠিক হয়। অনেক চিন্তা‌ভাবনা করেই ১২৬টি জঙ্গি বিমান কেনার কথা হয়েছিল, সেই মতো দলিল–‌দস্তাবেজ আছে বইকি। জঙ্গি বিমান হিসেবে প্রথমে মাল্টি রোল কমব্যাট এয়ারক্র‌্যাফট‌ কেনার কথা হয়েছিল। পরে বায়ুসেনার চাহিদার কথা ভেবেই মিডিয়াম মাল্টি রোল কমব্যাট এয়ারক্র‌্যাফট কেনার কথা হয়। মিডিয়াম একটু বেশি শক্তিশালী, জোড়া ইঞ্জিন, দীর্ঘ উড়ানে সক্ষম, বেশি অস্ত্রশস্ত্র বহন করতে পারে। ৪০ হাজার কোটিতে ১২৬টি বিমানের বদলে ৬০ হাজার কোটিতে ৩৬টি বিমান কিনে লাভ না ক্ষতি, এই অঙ্ক দিলে ক্লাস ফোরের পড়ুয়াও হেসে ফেলবে। 
হঠাৎ হ্যাল কেন বাদ?‌ এরও উত্তর মিলছে না। ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে সবচেয়ে কঠিন কাজ বিমান তৈরি। আর অনিল আম্বানির কোম্পানির ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে কোনও অভিজ্ঞতাই নেই। আর্থিক ভিতও খুবই নড়বড়ে। সেই ভুঁইফোঁড় কোম্পানিকে এই চুক্তিতে নেওয়া আর ক্লাস ওয়ানের ছাত্রকে পিএইচডি–‌র থিসিস লিখতে দেওয়া একই ব্যাপার। মোট চুক্তির মধ্যে অর্ধেক, নিদেনপক্ষে ২৭ হাজার কোটি ওই কোম্পানি পাবে, তারা নাকি ছোট মাপের একজিকিউটিভ জেটের যন্ত্রাংশ তৈরি করবে। অথচ অফসেট গাইডলাইন বলছে, এ ধরনের যে কোনও চুক্তিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অনুমোদন লাগবে। আর মোদি সরকার এখন বলছে, ড্যাসল্ট আম্বানির সঙ্গে চুক্তি করলে আমাদের কী বলা থাকতে পারে!‌ ১২৬টি বিমান কেন কেনা হল না?‌ মনোহর পারিকর তখন বলেছিলেন, সব মিলিয়ে প্রায় ৯০ হাজার কোটি খরচ পড়ে যাবে, দামটা খুবই বেশি। কিন্তু ঘটনা এই যে, প্রতিটি বিমানে ৭১৫ কোটি খরচ হচ্ছিল, তবে দেশে কারখানা তৈরির খরচ পড়ত আলাদা। এবার ড্যাসল্ট কোম্পানির প্রেস রিলিজের ৩২ নম্বর পৃষ্ঠায় দেওয়া হিসেবে, ৩৬টি রাফালের দাম পড়ছে ৬৫ হাজার কোটি, প্রায় ১৭০০ কোটি। সস্তা হল?‌ কী পারিকর?‌
এবার শুনুন নিরাপত্তার দিকটা। ভারতীয় বায়ুসেনা ১০ বছর আগে স্পষ্ট বলেছিল, আমাদের অন্তত ৪২টি স্কোয়াড্রন চাই। বিমান হাতে না থাকলে নেমে আসবে ২০–‌তে। সেখানে ৩৬টি বিমানে কাজ চলে যাবে?‌ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার নিয়মে এখন নতুন টেন্ডার দিতে হবে। কারণ, সব কোম্পানির সমান সুযোগ প্রাপ্য। এবার ৩ বছর ধরে রাফাল বিমান সব রকমভাবে পরীক্ষা করেই বায়ুসেনা ছাড়পত্র দিয়েছিল। তিনটি বিমানও ড্যাসল্ট দিয়েছিল। এবার সেই প্রক্রিয়া কেঁচে গণ্ডুষ করতে হবে। অন্তত ৫টি বছর লেগে যাবে। ততদিনে দেশরক্ষার সরঞ্জাম থাকবে তো?‌
সব মিলিয়ে দেশের ৩৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। ভারতের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা কেলেঙ্কারি এই রাফাল। বিজেপি–‌র বোফর্স। বোফর্স জমানায় চিত্রা সুব্রহ্মণ্যমের রিপোর্ট গিলতাম, রোজ পড়তাম অরুণ শৌরির দশটি প্রশ্ন। সেই শৌরি আবার ময়দানে। এইটুকু যা স্বস্তি। ‌ ‌

জনপ্রিয়

Back To Top