আজি হতে সিকি-শতবর্ষ আগে

দেবাশিস দত্ত: না, বঙ্গসমাজ ভাবেনি বেহালা থেকে লর্ডস পৌঁছে এরকম ভাবে এক কোটার ক্রিকেটার এতটা দাপট দেখাতে পারবে। একে লর্ডস, তায় অভিষেক এবং শুরুতেই জবরদস্ত ১৩১ রানের একটি মনভোলানো ইনিংস। মঞ্চে হাজির সৌরভ গাঙ্গুলি। অ্যালান মুলালিকে কভার ড্রাইভে বাউন্ডারিতে পাঠাতেই মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে। ব্যাট ঘোরালেন ৩৬০ ডিগ্রি। লর্ডস তখন উত্তাল। বারবার ব্যাট তুলছেন… এই দিনটির অপেক্ষাতেই তো ছিলেন তিনি। বারবার বলতেন, শচীন তেন্ডুলকার ছাড়া আমি কারও চেয়ে কোনও অংশে কম নই। তবু, সুযোগ আসছিল না। বিরানব্বই-এ অস্ট্রেলিয়া সফরে ত্রিদেশীয় সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে ততটা সুবিধে করতে পারেননি। করেছিলেন মাত্র ২ রান। এলবিডব্লু অ্যান্ডারসন কামিন্স। দীর্ঘ চার বছর পর, অবশেষে, লর্ডসে ঝলমলে প্রত্যাবর্তন।
বলা হয়েছিল, কোটার ক্রিকেটার হিসাবে তাঁকে বিরানব্বইতে অস্ট্রেলিয়া সফরে পাঠানো হয়েছিল। চার বছর পর গুণ্ডাপ্পা বিশ্বনাথের নির্বাচক সমিতি যখন প্রবল অনিচ্ছায় দলে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন বলা হয়েছিল যে, তিনি বিলেত যাচ্ছেন অলরাউন্ডারের কোটায়। এবং কী আশ্চর্য, লর্ডস টেস্টের প্রথম ইনিংসে ১৩১ রান করারও আগে বল হাতে ভেল্কি দেখিয়ে তুলে নিতে পেরেছিলেন নাসের হোসেন এবং গ্রেম হিকের মতো দুটি উইকেট। কোটার ক্রিকেটার, অলরাউন্ডারের তকমা লাগানো ক্রিকেটারকে, এরপর আটকে রাখা যায়নি। এমনকি ওই সফরেই লর্ডসের পরে নটিংহ্যাম টেস্টে ১৩৬ রান করার পর দুনিয়া জেনে গিয়েছিল আরও একজন বাঁহাতি ক্রিকেট দুনিয়ায় ঝড় তুলতে পৌঁছে গেছে। জিওফ বয়কট বিবিসি টিভিতে বলেই ফেললেন, গত তিরিশ বছরে তো রাজপুত্রের অভিষেক হল এমন ঝলমলে ভঙ্গিতেই। পরপর দুটি টেস্টে সেঞ্চুরি করার পর বাংলা জেনে গেল পঙ্কজ রায়ের পর আরও একজন ক্রিকেটার কলকাতার পতাকা নিয়ে ঘুরবে গোটা ক্রিকেট দুনিয়ায়। আজি হতে সিকি-শতবর্ষ আগে লর্ডসে যে ঝলকানি দেখেছিল দুনিয়া তা শুরু হয়েছিল ছিয়ানব্বই-এর ২২ জুন। কিন্তু টেস্ট ম্যাচ শুরু হয়েছিল ২০ জুন। ওই টেস্টের তৃতীয় দিনে সৌরভ পেয়েছিলেন ওই স্মরণীয় ১৩১। প্রথম প্রেমের মতোই অভিষেক টেস্টের সেঞ্চুরি ভোলা কঠিন। গাঙ্গুলি নামের একটি পদবি গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল তার পর থেকেই।
অভিষেকের পর পঁচিশ বছর কেটে গিয়েছে। যেন মনে হচ্ছে এই তো সে দিনের কথা। উত্তাল হয়ে যাওয়া কলকাতা ২৫ বছর পর আবার যেন সেই বিকেলে ফিরতে চাইছে যখন বাংলার মহারাজ সেঞ্চুরিতে পৌঁছনোর পর ব্যাট তুলে যেন বোঝানোর চেষ্টা করছেন, দ্যাখো, আমিও পেরেছি। হ্যাঁ পেরেছেন। আমরা গর্বিত। লর্ডসের বাঁদিকের ড্রেসিং রুমের ব্যালকনিতে কপিলদেবরা তিরাশির পঁচিশে জুন বিশ্বকাপ জিতেছিলেন, সেখানেই শচীন তেন্ডুলকার, মহম্মদ আজহারউদ্দিনরা দাঁড়িয়ে উঠে হাততালি দিচ্ছেন সৌরভের জন্য। ওই ব্যালকনিটা একান্তই আমাদের। ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জয়ের পর জামা খুলে সৌরভ উড়িয়েছিলেন না? আরও একটা গর্বের মুহূর্ত উপহার দিয়েছিল লর্ডসের সেই ব্যালকনি।
এরপর থেকে সৌরভের অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটেছে ক্রিকেট দুনিয়ায়। সিকি-শতাব্দী আগে যে দৌড়ের সূচনা হয়েছিল, তা যেন আজও অব্যাহত। হরেক পরিসংখ্যান, নানা রেকর্ড, উজ্জ্বল মুহূর্ত, গনগনে বিতর্ক নিয়েই ছুটে চলেছেন। সৌরভিত সেই মুহূর্তের ছবি নথিবদ্ধ করা আছে যে জাবদা খাতায়, তা খুলে দেখার জন্য চাই লম্বা সময়। সেই মঞ্চে আমরা অবশ্যই আসব, আজ অথবা কাল। আজ না হয় পঁচিশ বছর আগের সেই সোনালি বিকেলের নানা স্মৃতি নিয়ে জাবর কাটতে বসি।