প্রদীপকুমার দত্ত

করোনা সংক্রমণের ফলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা গভীর সঙ্কটের সামনে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি আট মাসের বেশি বন্ধ। আবার সেগুলি খুললেও সেখানে স্বাভাবিকভাবে পঠনপাঠন চালু করা যাবে কিনা, তা অনিশ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অনলাইন শিক্ষার সুপারিশ করেছে। 
এখনকার পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে অনলাইন ক্লাস চললেও তা কখনও শ্রেণিকক্ষে প্রথাগত শিক্ষার বিকল্প হতে পারে না। কিন্তু কিছুদিন ধরেই দেশে বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে ইউজিসি, প্রধানমন্ত্রী সবাই প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত ডিজিটাল শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছেন। ২৯ জুলাই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় গৃহীত জাতীয় শিক্ষানীতিতেও অনলাইন বা ডিজিটাল শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই শিক্ষানীতিতে স্বয়ম (SWAYAM), মুক (Massive Open Online Course বা সংক্ষেপে MOOC)‌ এবং দূরশিক্ষার (open and distance mode of learning বা ODL) মাধ্যমে শিক্ষাদান পদ্ধতি স্কুলস্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরেই চালু করার কথা বলা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এবং ইউজিসি করোনাজনিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সুচতুরভাবে অনলাইন শিক্ষা চালু করার পথে অতি দ্রুত এগোচ্ছে। ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে নির্দেশ দিয়েছে অনলাইন কোর্স চালু করতে। অনলাইন শিক্ষার আয়োজন করার ওপর বিশ্ববিদ্যালয়গুলির মূল্যায়ন নির্ভর করবে।
সরকার এবং ইউজিসি কি জানে না যে, এই রাজ্য–সহ গ্রামীণ ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগ অত্যন্ত দুর্বল, গ্রাম–শহরের গরিব ছাত্রছাত্রীদের ল্যাপটপ/ কম্পিউটার/ স্মার্টফোন নেই, বিপুল সংখ্যক গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের কলেজগুলিতে অনলাইন ব্যবস্থা অপ্রতুল? ডিজিটাল শিক্ষার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ও হাই স্পিড ইন্টারনেট আবশ্যিক। কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, ‘সৌভাগ্য যোজনায়’ দেশের ৯৯.৯ শতাংশ বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিদ্যুৎ পাওয়া যায় খুব কম সময়ের জন্য। তাও অনেক সময় ভোল্টেজ কম থাকে। ২০১৭–১৮ সালে গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রকের ‘মিশন অন্ত্যোদয়’ সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতের ১৬ শতাংশ বাড়িতে প্রতিদিন ১ থেকে ৮ ঘণ্টা, ৩৩ শতাংশ বাড়িতে প্রতিদিন ৯–১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে, আর ৪৭ শতাংশ বাড়িতে ১২ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে। আর অনলাইন ক্লাসের জন্য অবশ্যই চাই কম্পিউটার/ ল্যাপটপ/ স্মার্টফোন। ভারতীয়দের মাত্র ২৪ শতাংশের স্মার্টফোন আছে (দ্য হিন্দু, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯), মাত্র ১১ শতাংশের কোনও–‌না–‌কোনও ধরনের কম্পিউটার (‌ডেস্কটপ, ল্যাপটপ, ট্যাবলেট, আই প্যাড প্রভৃতি) আছে (‌কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যান ও কার্যক্রম রূপায়ণ মন্ত্রকের রিপোর্ট)। ২০১৭–১৮ সালের ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে রিপোর্ট অন এডুকেশন অনুযায়ী মাত্র ২৪ শতাংশ ভারতীয়ের বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ আছে। তাও ইন্টারনেটের স্পিড সর্বত্র সমান নয়। ভারতের জনসংখ্যার যে ৬৬ শতাংশ গ্রামে বাস করে, তাদের মাত্র ১৫ শতাংশের বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ আছে। শহরের জনসংখ্যার ক্ষেত্রে তা ৪২ শতাংশ। আর ৫ থেকে ২৪ বছর বয়সি সদস্য আছে, এমন পরিবারের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশের বাড়িতে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ দুটিই আছে। এ থেকে স্পষ্ট যে, অনলাইন শিক্ষার সুযোগ পাবে খুব স্বল্প সংখ্যক ছাত্র। আর ৯০ শতাংশেরও বেশি ছাত্রছাত্রী শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। আবার ইন্টারনেট সংযোগের ক্ষেত্রেও সব রাজ্যের পরিস্থিতি এক নয়। দিল্লি, কেরল, হিমাচল প্রদেশ, হরিয়ানা, পাঞ্জাব এবং উত্তরাখণ্ডে ৪০ শতাংশের বেশি বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও ওডিশা, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ, অসম, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে ২০ শতাংশের কম বাড়িতে ইন্টারনেট সংযোগ আছে। স্পষ্টতই অনলাইন শিক্ষার সুযোগ পাবে খুব কম সংখ্যক ছাত্রছাত্রী। আবার ছাত্র ও ছাত্রীদের মধ্যেও বৈষম্য তৈরি হবে। ২০১৯ সালে ইন্টারনেট ও মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, পুরুষদের মধ্যে ৬৭ শতাংশ এবং মহিলাদের মধ্যে ৩৩ শতাংশের ইন্টারনেট সংযোগ আছে। গ্রামে এই বৈষম্য আরও প্রকট। ইতিমধ্যেই আর্থিক কারণে অনলাইন শিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে না পেরে হতাশায় কয়েকজন ছাত্র আত্মহত্যা করেছে। তাই বলা যায়, ডিজিটাল শিক্ষা ডিজিটাল বিভাজন তৈরি করছে।
ইউনেস্কো বলেছে, ‘It is an illusion to think that online learning is the way forward for all.’ তাদের মতে, অনলাইন শিক্ষা শুধুমাত্র গরিব দেশে নয়, বিশ্বের ধনী দেশগুলিতেও বৈষম্য বাড়াবে। সম্প্রতি মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের অধীন ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ এডুকেশনাল প্ল্যানিং অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’–এর উচ্চ ও পেশাগত শিক্ষা বিভাগের প্রধান ‘কোভিড ১৯ ও ভারতে উচ্চশিক্ষা’ শীর্ষক সমীক্ষা করেছিলেন। সেখানেও বলা হয়েছে, অনলাইন শিক্ষার জন্য ‘‌যে ন্যূনতম পরিকাঠামো প্রয়োজন, তা ভারতে উচ্চশিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে তো বটেই, পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত স্তরেও নগণ্য। ফলে পড়ুয়াদের মধ্যে ‘উচ্চশিক্ষা–ছুট’ বাড়ছে। গ্রাম–শহরের বিভেদও প্রকট হয়েছে।’‌
যদি দেশে ১০০ শতাংশ বাড়িতেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, হাইস্পিড ইন্টারনেট সংযোগ এবং কম্পিউটার থাকে (যদিও বর্তমান সমাজব্যবস্থায় তা আদৌ সম্ভব নয়), তা হলেও ডিজিটাল শিক্ষা প্রথাগত শিক্ষার, যেখানে শ্রেণিকক্ষে ছাত্র ও শিক্ষকের সরাসরি সংযোগ হয়, বিকল্প হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, শিক্ষাদান মানে তো কিছু তথ্যের আদান–প্রদান নয়, মানুষ গড়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় একজন শিক্ষকের মাধ্যমেই। জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনের সময় যখন জাতীয় বিদ্যালয় গড়ে উঠছে, রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘গুরু–শিষ্যের পরিপূর্ণ আত্মীয়তার সম্বন্ধের ভিতর দিয়াই শিক্ষাকার্য সজীব দেহের শোণিত স্রোতের মতো চলাচল করিতে পারে।’‌ শিক্ষকরাই ছাত্র তৈরি করেন, কেবল ক্লাসে লেকচার দিয়েই নয়, নিজের চরিত্র, জীবনের প্রভাব দিয়ে। এটা যুগে যুগে পরীক্ষিত সত্য। তাই ডিজিটাল শিক্ষা প্রথাগত শিক্ষার বিকল্প নয়, পরিপূরক হতে পারে। তা ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্র‌্যাকটিক্যাল ক্লাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেটাও অনলাইনে সম্ভব নয়।
প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ কমিয়ে ডিজিটাল শিক্ষার ওপর এত জোর দেওয়ার পিছনে শাসক শ্রেণির সুচতুর পরিকল্পনা আছে। তা হল, শিক্ষা সঙ্কোচন করা, যা স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের শাসক শ্রেণি করে চলেছে। তার সঙ্গে শিক্ষার ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব অস্বীকার করা এবং কর্পোরেট হাউসকে শিক্ষায় ব্যবসা করে মুনাফা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া। রাজীব গান্ধীর আমলে ১৯৮৬ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে বলা হয়েছিল ‘‌education is an unique investment’‌। তখন থেকেই সরকার শিক্ষার খরচ বহন করার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে চাইছে। আর একটি উদ্দেশ্য হল, ধুঁকতে থাকা আইটি সংস্থাগুলিকে অক্সিজেন জোগানো, যাতে অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা করে তারা মুনাফা অর্জনের সুযোগ পায়। সেইসঙ্গে ল্যাপটপ, কম্পিউটার, স্মার্ট ফোন ইত্যাদির নিশ্চিত বাজার তৈরি হয়। ইতিমধ্যে বিভিন্ন আইটি কোম্পানি অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থা করে মুনাফা অর্জন করছে। ভারত অনলাইন শিক্ষার বড় বাজার হবে ধরে নিয়ে গুগল বিরাট বিনিয়োগ করছে এদেশে।
ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে সরকার নতুন নতুন কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, পরিকাঠামো তৈরি, শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে চাইছে। সরকার চাইছে, খরচ কমিয়ে বিপুল সংখ্যক কলেজ তুলে দিতে এবং অন্যদিকে, স্বল্প সংখ্যক এলিট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রেখে শিক্ষার আরও কেন্দ্রীকরণ ঘটাতে৷ অর্থাৎ, সরকারের আর্থিক দায়িত্ব কমিয়ে ছাত্রছাত্রীদের খরচ বাড়াতে। যার ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের ছাত্ররা (যারা দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ) শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। শিক্ষা আরও সঙ্কুচিত হবে। আমাদের দেশের যে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি, তাতে ডিজিটাল শিক্ষা শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাট বৈষম্যের সৃষ্টি করবে। এ বিষয়ে শিক্ষক সমাজকে সচেতন হতে হবে। সরকারের কাছে দাবি করতে হবে, শিক্ষা কীভাবে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্তের ভার শিক্ষক–শিক্ষাবিদদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হোক।

লেখক প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান

জনপ্রিয়

Back To Top