অতনু বিশ্বাস: সুকুমার রায়ের ‘‌হযবরল’‌–তে উধো–বুড়ো বলে ‘‌উনিশ’‌, আর তা শুনে কাক্কেশ্বর কুচকুচে বলে ওঠে ‘‌লাগ্‌ লাগ্‌ লাগ্‌ কুড়ি’‌। ছেলেবেলায় এই গল্প পড়েই আমরা প্রথম বুঝে ফেলি, ‘‌নিলাম’‌ কাকে বলে। এভাবে ‘‌নিলাম’‌–এর সঙ্গে যাদের পরিচয় ঘটেছিল সে প্রজন্ম আজ আধবুড়ো হয়েছে। আজকের তরুণ ভারতবাসী কিন্তু ‘‌নিলাম’‌ শিখেছে ভিন্ন উপায়ে। আইপিএল-এর হাত ধরে। আজকের ভারতবর্ষে নিলাম সর্বার্থেই এক ‘‌ললিত’‌ শিল্পকলা।
আইপিএল–এর এই নিলামটা এক গ্ল্যামারাস ইভেন্ট। সেখানে পণ্য হল ক্রিকেট জগতের মহা মহা তারকা থেকে অজানা তারারাও। তবে আসল ‘‌নক্ষত্র’‌ যে কে, তা তো ঠিক করবে এই নিলামের দাম। ঠিকঠাক দাম না পেলে কেষ্ট বিষ্টুরাও গড়াগড়ি খায় মাটিতে। কোটি কোটি টাকায় এখানে ‘‌বিক্রি হয়’‌ মহাতারকারা। কিংবা বিক্রি হয়েই পরিণত হয় ‘‌মহাতারকায়’, নিলামের হাতুড়ির এক ঘায়ে। ক্রিস্টি, সোদবিজ, কিংবা কলকাতার রাসেল এক্সচেঞ্জের মতো নিলাম হাউসগুলিতে ঠিক যেমনটা হয়। ঠিক যেভাবে নিলামের হ্যামারের নিচে পড়ে ক্রেতা ঠিক হয় একটা ঘড়ির, বা একটা পুরোনো আসবাবের।
নিলামে এক একটা টিমের বাজেট পঞ্চাশ ষাট কোটি টাকা, বা তারও বেশি। কোনও খেলোয়াড়ের দাম পঞ্চাশ লক্ষ, কারও বা আবার দশ বারো কোটি টাকা। আসলে এই নিলাম জিনিসটাই এক প্রবল উত্তেজনার খেলা। এই বছরের আইপিএল নিলাম চলার মাঝেই কংগ্রেস নেতা এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মণীশ তিওয়ারি একটি ট্যুইট করেছেন। তাতে তিনি সোচ্চার হয়েছেন এভাবে নিলামে খেলোয়াড়দের ‘‌বিক্রি’‌ করা নিয়ে। মণীশ তিওয়ারির মতে, মানুষদের এরকম নিলাম হত বর্বর যুগে। আইপিএল–এ বিভিন্ন খেলোয়াড়ের কুশলতা এবং প্রতিভার দাম কি অন্য কোনও সম্ভ্রমকর উপায়ে স্থির করা সম্ভব নয়? সম্ভ্রমের কথায় মনে পড়ে গেল যে এমনভাবে নিলামে কিনলেই বোধকরি পৃথিবীর অন্যতম সেরা খেলোয়াড় সম্বন্ধে বলা যায়, ‘‌অমুকটাকে সস্তায় পেয়ে গেলাম, তাই কিনে ফেললাম।’‌
মণীশ তিওয়ারির মতো একজন আইনজ্ঞ এবং প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এমন মতামত দিলে আইপিএল–এর নিলামের দিকে একবার ফিরে তাকাতেই হয়। বর্বর যুগে মানুষ নিয়ে নিলামের যে উল্লেখ করা হয়েছে তা সম্ভবত দাসপ্রথার প্রেক্ষিতেই। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখেছি, অষ্টাদশ আর ঊনবিংশ শতকে আফ্রিকা থেকে জাহাজে করে দাসদের এনে নিলামে বিক্রি করা হত ক্যারিবিয়ানে আর আমেরিকায়। অবশ্য এই দাস নিলামগুলির সঙ্গে আইপিএল–এর নিলামের কিছু পার্থক্য আছে। আইপিএল–এ খেলোয়াড়রা তাদের ‘‌তথাকথিত’‌ সম্ভ্রম যে হ্যামারের নিচে যাবে সেটা জেনেশুনেই রাজি হয়েছে নিলামে উঠতে। বস্তুত এটা ভাববার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে মোটের ওপর খেলোয়াড়রা নিলামে উঠতেই যথেষ্ট আগ্রহী। তার ওপরে এখানে নিলামে পাওয়া টাকাটা যাবে এই খেলোয়াড়দের পকেটেই। দাসদের নিলামে তেমনটা নিশ্চয়ই হত না।
আইপিএল–এর প্রথম নিলামটা হয় ২০০৮-এর ফেব্রুয়ারিতে। তাই এই নিলাম যে আদপে ‘‌বর্বর যুগের’ মতো, এতে সম্ভ্রমের অভাব রয়েছে, তা বুঝতে মণীশ তিওয়ারির কেন এক দশক লাগল, সেটাও আশ্চর্যের!‌ এর মাঝে প্রায় দু’‌বছর (২০১২ থেকে ১৪) তিনি আবার ছিলেন কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী। ২০১৪ পর্যন্ত কেন্দ্রে ছিল ইউপিএ সরকার। নাকি তিনি আগেও এ বিষয়ে তাঁর মতামত প্রকাশ করেছিলেন, যা আমরা জানতে পারিনি? যতদূর জানি, আইপিএল-এর চেয়ারম্যান হলেন কংগ্রেসেরই আর এক নেতা রাজীব শুক্লা। মণীশ তিওয়ারি ট্যুইটে একটু হাওয়া তুলেই এই পর্ব শেষ করেছেন, না কংগ্রেসে তাঁর সতীর্থ শুক্লাজির কাছেও তাঁর অস্বস্তির কথা ব্যক্ত করছেন, সেকথা জানবার আগ্রহ আমাদের থাকবে বইকি।
প্রায় একই সময়ে আইপিএল–এর নিলাম নিয়ে ক্ষোভের প্রকাশ দেখছি সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকেও। ওয়েলিংটন ক্রিকেটের প্রাক্তন প্রধান এক্সিকিউটিভ পিটার ক্লিন্টন তাঁর ট্যুইটে একে বলেছেন অসম্ভ্রমকর, নিষ্ঠুর এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের অনুশীলন। তাঁরও মনে পড়েছে মধ্যযুগের কথা। সে সুরে সুর মিলিয়ে নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান এক্সিকিউটিভ হিথ মিল সে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘‌নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড’‌–কে বলেছেন যে এ এক প্রাচীন পদ্ধতি এবং খেলোয়াড়দের জন্য গভীর অপমানজনক। খেলোয়াড়দের এখানে সারা বিশ্বের সামনে গবাদি পশুর মতো প্যারেড করানো হচ্ছে। প্রবল পরাক্রমশালী আইপিএল–এর বিরুদ্ধে এই প্রথম অন্য কোনও দেশের সংগঠকরা এভাবে মুখ খুলছেন। তাতে এক দশক সময় লেগে গেলেও। তবে এটা কিন্তু শেষ দৃষ্টান্ত নাও হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য বড় খেলার প্রতিযোগিতাগুলির দলগঠনের নিয়মকানুন একবার দেখার চেষ্টা করি। বস্তুত আইপিএল ছাড়া এমন বড়সড় ক্ষেত্রে নিলামের কালচার বড় একটা খুঁজে পাচ্ছি না। (আমি কি কিছু ভুল করছি? হিথ মিলও কিন্তু এমনটাই বলেছেন।) বিভিন্ন খেলায় দলগঠনের জন্যে উত্তর আমেরিকায় সবচাইতে প্রচলিত পদ্ধতির নাম ‘‌ড্রাফট’‌। এই ‘‌ড্রাফট’‌ পদ্ধতিতে দলগুলি একদল সম্ভাব্য খেলোয়াড়ের মধ্যে থেকে পালা করে বেছে নেয় তাদের খেলোয়াড়। (আমাদের ছেলেবেলায় পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলার জন্যে দুটো দল গড়া হত এভাবেই।) আর খেলোয়াড় বাছার পরে দরদাম করে তাকে চুক্তিবদ্ধ করানোর সম্পূর্ণ অধিকার সেই দলের। অন্য কোনও দল মাথা গলাবে না সেখানে। ‌ড্রাফটও আবার অনেক রকমের হয়। ‘‌এন্ট্রি ড্রাফট’‌–এ বেছে নেওয়া হয় নতুন খেলোয়াড়দের মধ্যে থেকে, ‘‌এক্সপানসন ড্রাফট’–এ নতুন দল খেলোয়াড় বাছে ইতিমধ্যে বিদ্যমান দলগুলির থেকে, আর ‘‌ডিসপারসাল ড্রাফট’–এ উঠে যাওয়া দল থেকে খেলোয়াড় বেছে নেয় টিকে থাকা দল। আমেরিকার বিভিন্ন খেলাধুলোয় হইহই করে চলছে এই ‌ড্রাফট পদ্ধতি। ‌ন্যাশনাল ফুটবল লিগে ১৯৩৫ থেকে, ‌ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশনে ১৯৪৭ থেকে, ‌ন্যাশনাল হকি লিগে‌ ১৯৬৩ থেকে, ‌মেজর লিগ বেসবলে‌ ১৯৬৫ থেকে। মেজর লিগ সকারেও রয়েছে ‌ড্রাফট। অনেক ক্ষেত্রেই আগের বছরের সবচাইতে খারাপ ফল করা দল সুযোগ পায় আগে বাছার। এনবিএ–তে আবার লটারি করে স্থির করা হয়, দুর্বল দল পায় বেশি ‘‌টিকিট’‌। অস্ট্রেলিয়াতেও ‘‌ড্রাফট’‌ পদ্ধতি চালু রয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল লিগ, ‌নিউ সাউথ ওয়েলস রাগবি লিগে। ‌ড্রাফট পদ্ধতি রয়েছে আমাদের দেশের ফুটবল লিগ ‌আইএসএল–এও। ওদিকে লা লিগার মতো প্রতিযোগিতাতে খেলোয়াড় নেওয়া হয় ‘‌ট্রান্সফার’‌–এর মাধ্যমে। অনেক ক্ষেত্রেই অবশ্য দলগুলি নিজস্ব অ্যাকাডেমিতে তৈরি করে যুবা খেলোয়াড়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগেও রয়েছে দলের সঙ্গে খেলোয়াড়ের দরদামের সংস্কৃতি, আর রয়েছে ‘‌ট্রান্সফার উইন্ডো’‌। অস্ট্রেলিয়ার টি২০ প্রতিযোগিতা ‘‌বিগ ব্যাশ’‌–এ রয়েছে দুটো নির্দিষ্ট ‘‌ট্রেড পিরিয়ড’‌, আর যাতে অন্য দলের চুক্তিবদ্ধ খেলোয়াড়দের বেচাকেনার অনুমতি রয়েছে, তাদের চুক্তির যে কোনও পর্যায়ে। তাই খেলোয়াড় আর দলগুলির দরদামই এখানে মুখ্য হওয়া স্বাভাবিক।
তাই খেলোয়াড়দের চুক্তিবদ্ধ করাবার আরও নানা ধরনের পদ্ধতি রয়েছে বিশ্বের প্রধান প্রধান ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলিতে। এটা হয়তো ঠিক যে, আইপিএল–এর নিলাম এক ব্যতিক্রমী সংস্কৃতিই। কিন্তু তা সম্ভ্রমের পরিপন্থী কি না, বা তার পরিবর্তন ঘটানোর প্রয়োজন রয়েছে কি না, সেটা সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা ভাববেন। এ বিষয়ে মহাতারকা খেলোয়াড়দের মতামতও আকর্ষণীয় হতে পারে। প্রাক্তন খেলোয়াড়দের মতামত তো বটেই। আমরা প্রতীক্ষায় রইলাম। আইপিএল নিলামের বিকল্পে অন্য কোনও ‘‌সম্ভ্রমের পথ’‌ চালু হয় কি না, তাও দেখবার জন্যে।
আপাতত আইপিএল–এর নিলামের হ্যামার যেন আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। এই হ্যামারের তলায় অনামী, অচেনা খেলোয়াড় মুহূর্তে হয়ে যায় কোটিপতি, পেয়ে যায় ভারতজোড়া পরিচিতি। মুখ্যমন্ত্রী বাবা–মায়ের সন্তান কিংবা দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতির ছেলে, এই হ্যামারের নিচে আসতে আপত্তি করেননি কেউই।
লেখক কলকাতার ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটের রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক, মতামত ব্যক্তিগত।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top