ধ্রুবজ্যোতি বাগচী: আমাদের সবচেয়ে বড় কবি রবীন্দ্রনাথ। তিনি আর পাঁচটা রসের সঙ্গে হাস্যরসও আমাদের সামনে পরিবেশন করেছেন, অথচ কেউ কি কখনো চিন্তা করে, তাঁর জীবনটা কিরকম বিষাদবহুল ঘটনায় পরিপূর্ণ? আমার দৃঢ় বিশ্বাস অন্য যে–কোনও সাধারণজন এরকম আঘাতের পর আঘাত পেলে কিছুতেই আর সুস্থ জীবন যাপন করতে পারত না। অথচ রবীন্দ্রনাথকে দেখলে বোঝা যেত না, কতখানি শোক তিনি বুকের ভিতর বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি ভেঙে তো পড়েনই নি, এমন কি তীব্র শোকাবেগে কখনো কোনো অধর্মাচরণও করেননি— অর্থাৎ কাব্য, সাহিত্য, সৃষ্টি, যা তাঁর ‘ধর্ম’, সেটি থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তাঁর ঋষিতুল্য সর্বজ্যেষ্ঠ ভ্রাতা বলেন, আমাদের সকলেরই পা পিছলিয়েছে— রবির কিন্তু কখনো পা পিছলোয়নি।’ (‘গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন’, সৈয়দ মুজতবা আলি)
১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এমনই এক বাইশে শ্রাবণে (১৯৪১) তাঁর মহাপ্রয়াণ। আধুনিক নব্য বাঙালি কয়েকটা বাংলা তারিখ মনে রাখেন। বাংলা সাল–‌টাল মনে রাখার বালাই নেই প্রয়োজনহীনতার কারণে। কিন্তু, বাড়িতে খাওয়াদাওয়ার এলাহি আয়োজন, পুজো–‌আচ্চা, প্রাচীন মানুষেরা বেঁচেবর্তে থাকলে তাঁদের দৌলতে জ্ঞাত হওয়া— আজ দিনটি পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। আর বোকা বাক্সে বা যাদের বাড়িতে রেডিও এখনও ব্রাত্য হয়ে যায়নি, তারা চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে বা ইথার তরঙ্গে অবিরাম রবীন্দ্রনাথের গান বা আলোচনা, ইত্যাদি শুনে বা দেখে অনুভব করতে পারেন, দিনটা হয় পঁচিশে বৈশাখ বা আজ বাইশে শ্রাবণ। প্রথমটি যদিও বা পাড়া–ক্লাব, স্কুল বা সরকারি আয়োজনে এখনও সাড়ম্বরে পালিত হয়, পরেরটি মানে বাইশে শ্রাবণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নিয়ম রক্ষা।
অনেকের অভিমত, শোক নিয়ে বাড়াবাড়ি না করাই শ্রেয়। তাই বাইশে শ্রাবণ নিয়ে পাগলপারা বিষাদে বিমর্ষ হওয়ার সংখ্যা অঙ্গুলি পরিমেয়। মুষ্টিমেয়, যাদের কাছে রবীন্দ্রনাথ প্রথম এবং শেষ প্রেম, তাঁর গান যাদের দিবা–নিশি যাপনের প্রধান আশ্রয়, একটা গীতবিতান বা সঞ্চয়িতায় যারা জীবনের পরশমণির সন্ধান পান, তারা একাকী এই দিনটি নিজের মতো করে যাপন করেন। ‘প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে...’ ‘চিরবন্ধু, চিরনির্ভর’কে স্মরণ করেন আপন মনের মাধুরী মিশায়ে ‘কান্না হাসির দোলদোলানো’ জীবনের সাক্ষী হিসেবে।
বাইশে শ্রাবণের অনুষ্ঠানে মূলত এবং অবধারিতভাবে দুঃখের গান, যেগুলোতে শোক–কান্না–বিরহর প্রাধান্য, সেগুলোই বা কেন বিশেষভাবে গাইতে হবে অনুভূত হয় না। ‘জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে’, ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে’, ‘বন্ধু রহো রহো সাথে’, ‘তোমার কাছে এ বর মাগি’, ইত্যাদি গানে গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোয় নিবেদিত হয় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। মূলত ‘পূজা’ পর্যায় থেকেই নির্বাচিত হয় বাইশে শ্রাবণের গান। ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে’— অবশ্যই বাইশে শ্রাবণের থিম সং যেন। অথচ, শত দুঃখেও যিনি অবিচল, স্থিতধী, সৃষ্টিশীল, মৃত্যুই যে জীবনের শেষ কথা নয়, ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ যাঁর জীবনের মূলমন্ত্র, তাঁকে আমরা বৃথাই বাইশে শ্রাবণে দুঃখের গানে শ্রদ্ধা নিবেদন করি।
একের পর এক প্রিয়জনের মৃত্যুর মিছিল মেনে নিতে হয়েছে তাঁকে। মায়ের আদর তিনি পাননি। তাঁর সমবয়সি বৌদি কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে ছিল তাঁর প্রবল সখ্য। তাঁর আত্মহত্যা কবিকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল। তারপর... প্রথমে গেলেন স্ত্রী। দ্বিতীয় মেয়ে রেণুকা গেলেন অতঃপর। চরম আঘাত পেলেন সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে। কিছুদিন অন্তর বড় মেয়ে মাধুরীলতা চলে গেলেন। কবি অনুভব করলেন, ‘স্ত্রী–পুত্র–কন্যা, এঁরা সব মায়ার বন্ধন কেটে সময় হবার পূর্বেই পালিয়ে যাচ্ছেন— এঁরা সব পলাতকা। তাই, মাধুরীলতার মৃত্যুর কয়েক মাস পরেই বেরল ‘পলাতকা’। অবশেষে রইলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ ও কন্যা মীরা। নাতি ‘নীতু’ ছিল তাঁর পরম আদরের। সেই নীতুও ইউরোপে গিয়ে ক্ষয় রোগে মারা গেলেন ১৯/২০ বছর বয়সে। মেয়েকে লিখলেন কবি, ‘যে রাত্রে শমী গিয়েছিল, সে রাত্রে সমস্ত মন দিয়ে বলেছিলুম বিরাট বিশ্বসত্তার মধ্যে তার অবাধ গতি হোক, আমার শোক তাকে একটুও পিছনে যেন না টানে। তেমনি নীতুর চলে যাওয়ার কথা যখন শুনলুম তখন অনেক দিন ধরে বার বার বলেছি, আর তো আমার কোনো কর্তব্য নেই, কেবল কামনা করতে পারি এর পরে যে বিরাটের মধ্যে তার গতি, সেখানে তার কল্যাণ হোক। যেখানে আমাদের সেবা পৌঁছয় না, কিন্তু ভালোবাসা হয়তো বা পৌঁছয়— নইলে ভালোবাসা এখনও টিকে থাকে কেন?’
‘রবীন্দ্রনাথ দুঃখে আমাদের মতই কাতর হতেন— হয়তো বা আরো বেশি। কারণ তাঁর দিলের দরদ, হৃদয়ের স্পর্শকাতরতা ছিল আমাদের চেয়ে লক্ষগুণ বেশি। কিন্তু তিনি পরাজয় মানতেন না। আমরা পরাজয় মেনে নিই।’ (তথ্য ঋণ:‌ ‘গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন’, সৈয়দ মুজতবা আলি )
সেই অপরাজেয় রবীন্দ্রনাথই বলতে পারেন, ‘এ জগতে অবিশ্রাম জীবনের প্রবাহ মৃত্যুকে হু হু করিয়া ভাসাইয়া লইয়া যায়, মৃত কোথাও টিঁকিয়া থাকিতে পারে না। এই ভয়ে সমাধিভবন কৃপণের মতো মৃতকে চোরের হাত হইতে রক্ষা করিবার জন্য পাষাণ–‌প্রাচীরের মধ্যে লুকাইয়া রাখে, ভয় তাহার উপরে দিবারাত্রি পাহারা দিতে থাকে। মৃত্যুকেই লোকে চোর বলিয়া নিন্দা করে, কিন্তু জীবনও যে চকিতের মধ্যে মৃত্যুকে চুরি করিয়া আপনার বহুবিস্তৃত পরিবারের মধ্যে বাঁটিয়া দেয়, সে কথার কেহ উল্লেখ করে না। জীবন যেমন আসে জীবন তেমনি যায়। মৃত্যুও যেমন
আসে মৃত্যুও তেমনি যায়। তাহাকে ধরিয়া রাখিবার চেষ্টা কর কেন। হৃদয়ের দুই দ্বারই সমান খুলিয়া রাখো। প্রবেশের দ্বার দিয়া সকলে প্রবেশ করুক, প্রস্থানের দ্বার দিয়া সকলে প্রস্থান করিবে।’ (‘রুদ্ধ গৃহ’, বিচিত্র প্রবন্ধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
সেই অপরাজেয় কবির প্রয়াণ দিবসে অতএব শুধু দুঃখের গান কেন? তিনিই তো সন্ধান দিয়েছেন দুঃখ থেকে উত্তরণের পথের। ‘যেতে যদি হয় হবে / যাব, যাব, যাব তবে / গেল দিন ধরা মাঝে কত ভাবে কত কাজে, / সুখে দুখে কভু লাজে, কভু গরবে / ...জীবন হয়নি ফাঁকি, ফলে ফুলে ছিল ঢাকি / যদি কিছু রহে বাকি কে তাহা লবে! / দেওয়া নেওয়া যাবে চুকে, বোঝা–খসে যাওয়া বুকে / যাব চলে হাসিমুখে— যাব নীরবে।’
এই তো জীবনের সারাৎসার। ‘শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা,/ শুধু আলো–আঁধারে কাঁদা–হাসা।’ বা
‘যাওয়া–আসারই এই কি খেলা / খেলিলে, হে হৃদিরাজা, সারা বেলা।’
তিনি বরণীয়। স্মরণীয়। চির–আরাধ্য। জন্মদিন উদ্‌যাপনের বাড়াবাড়িতে ‘পঁচিশে বৈশাখ’ মহত্ত্ব হারায়। আবার বাইশে শ্রাবণ শোক–‌গাথায় পর্যবসিত হয়। আমাদের চলমান জীবনে প্রতি দিন তাঁর অস্তিত্ব অনস্বীকার্য। আবার তাঁকে বিন্দুমাত্র না জেনেও বিন্দাস কাটে বঙ্গজীবন। তাঁকে জানতেই হবে এমন দিব্যি তো নেই। কিন্তু, ভারি অবাক হতে হয় তখন, যখন এক দল নব্য যুবক–‌যুবতীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘বাইশে শ্রাবণ’ কেন বিখ্যাত? একটু ভেবে, কাঁধ ঝাঁকিয়ে, স্বভাবসুলভ চাপল্যে তাদের উত্তর ছিল, ওই তো, অমুক পরিচালকের ছবি। হেব্বি খিস্তি ছিল ফিল্‌মটাতে। ...কারা যেন তখন বলে উঠেছিল, ধরণী দ্বিধা হও। আর পারছি না সামলাতে...‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top