বাহার উদ্দিন: মানুষ গড়ার, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় নারী শিক্ষার অদম্য, দুঃসাহসী কারিগর আমার মায়ের ছাত্রী ছিলেন মিনুফুপু। সুন্দরী। চটপটে। বেতের ফলার মতো ছিপছিপে শরীর। ধারাল নাকমুখ। গায়ে পাকা পেয়ারার রং। জনকণ্ঠে পালোয়ান বলে পরিচিত আমাদের মেজো দাদুর বড়ো মেয়ে। মেধাবী। গোটা বই মুখস্থ বলতে পারতেন। চঞ্চল, সাজগোজে পরিপাটি। পায়ে ঘুঙুর বাজিয়ে বাড়ির লাগোয়া সরকারি পুকুর থেকে স্বেচ্ছায় জল আনতে যেতেন। দেহজুড়ে যৌবন, সূর্যমুখী ফুল তখন ফুটন্ত। প্রতিবেশী, লিগপন্থী বাবুমামুর নজর পড়ল। চোখে চোখে দুজনের কথা বলার শুরুতেই আহাম্মকি রটনার শুরু— মিনু ইশারায় উড়ছে, মধু খুঁজছে মামু। দাপুটে বেহিসাবি দাদু ক্ষুদ্ধ, উদ্বিগ্ন হয়ে মামুকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, মিনুকে বিয়ে করবে? মামুর হাতে নেমে এল অধরা স্বর্গ। তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত, বাবুমামুর গিন্নি হয়ে অন্দরে প্রবেশ করলেন মিনুফুপু। ঝলমলে সংসার, বাড়তি ঝামেলা নেই। সদস্য কুল্লে দুজন। ফুপু আর মামু।
মাস দুয়েকের মধ্যেই মোহভঙ্গ, বিশ্বাসে ঘুণপোকা ঢুকে পড়ল। দরজায় তালা দিয়ে প্রায়ই মামু বেরিয়ে যান সকালে, রাতে কখনও বাড়ি ফেরেন, কখনও ফেরেন না। রহস্য কী? কৈফিয়ত তলব করতেই বাবুমামু রাগে আগুন। আগুনের কোপে, পরপর তিন তালাকে অর্ধদগ্ধ, দগ্ধ হয়ে গেল ফুপুর নসিব। বাড়ি এসে কান্নার শরীর নিয়ে বিছানায় লুটিয়ে
পড়লেন।
আমরা বোবা হয়ে দেখছি। মেজো দাদু লাফাচ্ছেন। লাঠি ঘোরাচ্ছেন শূন্যে। শূন্যতা তাঁর ‘‌ভাগ্যকে’‌ রেহাই দেয় না, সর্বক্ষণ ধাওয়া করে। ফুপু নিঃসঙ্গ। সব সময় বিষণ্ণ। চারপুরুষের শিক্ষিত, আলিম পরিবারও বেআইনি, বেশরিয়তি বিচ্ছেদনামাকে সমাজের মূর্খ চাপে মেনে নিতে বাধ্য হল। ছ’‌মাসের মোড়ে, ফুপুর রূপে মুগ্ধ এক জমিদারপুত্র ফুপুকে বিয়ে করলেন। জেদি, অহঙ্কারী পুরুষ। কাজেকর্মে মন নেই। খেলার সঙ্গে খেলা করাই তাঁর মজ্জাগত অভ্যাস। সারাদিন টোটো, বাড়ি ফিরেই তর্জনীর গর্জন। বৃহৎ পরিবার সামলাতে হয় ফুপুকে। একা দিনভর খাটুনি। রাতে, অদৃশ্য, ঝুলন্ত খড়্গ— তালাকের হম্বিতম্বি।
বাপের বাড়ি এসেছিলেন ফুপু। পরদিন ফেরার কথা। ফেরা হয়নি। দাদুর আবদার, আরেক দিন থেকে যা। এটুকুতেই ভয়ঙ্কর বিভ্রাট, মৌখিক তিন তালাকের আলটপকা সিদ্ধান্ত বার্তাবাহকের মাধ্যমে ফুপা পাঠিয়ে দিয়েই খালাস। ফুপু আবার পরিত্যক্তা। বিপন্ন। কোলের দুই শিশুর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বড় বড় মৌলবিরা ইটের মতো ভারী কেতাব নিয়ে মেতে উঠলেন তর্জায়। কেউ বললেন, এ তালাক নির্ভুল। কেউ বললেন, অশুদ্ধ। বেদায়াত। আমার নিজের দাদুও সুপরিচিত আলেম। সখেদে জানিয়ে দিলেন, এরকম তাৎক্ষণিক তালাকে কোরানের, হাদিশের, বিধিবদ্ধ শরিয়তের সায় নেই। পয়গম্বরও সম্মতি দেননি।
কে তাঁর কথা শোনে? মৌলবিরা একজোট। দাদু নির্জোট। ফুপা পরিত্যক্ত স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চাইলেন। শর্তসাপেক্ষে মঞ্জুর হল তাঁর আর্জি। হিল্লার (বাধ্যতামূলক পদ্ধতি) আশ্রয় নিলেন নিঁখুত, অনুশাসিত মৌলনারা। এক রাতের জন্য ফুপুকে বিয়ে করলেন লালা ঝরানো একজন মুনশি। পূর্ব দিগন্তে উদীয়মান সূর্য সাক্ষী রইল। সাক্ষী রইল ভোর রাতের হাওয়া। নিয়ম মেনে ফুপুকে তালাক দিলেন মুনশি। আবার ফুপুকে বিয়ে করে ঘরে ফেরালেন ভবঘুরে কাপুরুষ ফুপা। পরপর তিন তিন তালাকের কলঙ্ক নিয়ে বেঁচে রইলেন মিনুফুপু। শরিয়তের ভুল ব্যাখ্যা আর চিন্তাদূষণে বিদ্ধ হয়ে একজীবনে চারবার বিয়ের আসরে বসতে হয় তাঁকে। রক্তক্ষরণ এর পরও রেহাই দেয়নি। শেষ বয়সে নিরাশ্রিত, গুরুতর অসুস্থ, গায়ে শ্বেতী। সারা দেহে পচন। এই হল আমাদের ফুপুকাহিনী। খানাখন্দে ভরা,
রক্তাক্ত একটি বৃত্তান্ত।
আরেকটি দৃষ্টান্ত। করুণ। তিক্ত। দুঃসহ। উত্তর ২৪ পরগনার সতেজ, সপ্রতিভ একটি কিশোরী, দেহে যার ভাস্করের দুর্দান্ত কারুকার্য, যে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণহীন আবেগের বশে বিয়ে করে বসল বিহার নিবাসী একটি যুবককে। দেখতে সুপুরুষ। পোশাক–‌আশাকে কেতাদুরস্ত। বলল, সে উচ্চশিক্ষিত। ইলেকটিক্যাল প্রকৌশলী, চাকরি করে। বিয়ের পরেই রহস্য ফাঁস, বিটেক ডিগ্রি নেই। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমাই সম্বল। বেকার। আদ্যোপান্ত মদ্যপ। কীর্তিমানের আরও অনেক বদ গুণ আছে। সব ধরনের নেশায় সে পোক্ত। অলস। বন্ধুসঙ্গও নির্ভার, পরিচ্ছন্ন নয়। নার্সিহোমের সেবাকর্মী বউয়ের যৎসামান্য আয়ে ভাগ বসিয়ে মদের খরচ জোগায়। অপচয়ের রসদ না পেলেই বউ পেটায়। তিন বছরের মেয়েটিরও রেহাই নেই। শোনা কথা, দিন কয়েক আগে বউটির গলা টিপে শ্বাসরুদ্ধ করে দেয়। বয়সে ৯ বছরের বড় নেশাগ্রস্থ স্বামীর পেটে লাথি কষিয়ে প্রাণ বাঁচায় মেয়েটি। সঙ্গে সঙ্গে, তিন বছরের শিশুকন্যাকেও বালিশ চাপা দিয়ে খুন করার চেষ্টা করে।
প্রতিবেশীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে দুই নিগৃহীতাকে রক্ষা করলেন। না হলে জেলে যেত স্বামী। যায়নি। সম্প্রতি সে পগারপার। শুনেছি, দেশের বাড়িতে চলে গেছে। বউ তাকে শরিয়তের নিয়ম মেনে তালাক দিতে চেয়েছে। সায় দিয়েছেন ওর মা–‌বাবা। কিন্তু এ তালাক এক বাক্যের তিন তালাক নয়। পুরুষশাসিত সমাজ, অর্ধশিক্ষিত সমাজ, শাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যায় পরিচালিত বিভ্রান্ত সমাজ মেয়েটিকে এ সুযোগ দেয়নি। সাহায্য করেনি ভূমিহীন মা–বাবাকে। বনেদি পরিবার। ৮০ বিঘা জমি আর তিনতলা বাড়ি ছিল। দেশভাগের মুহূর্তে দাঙ্গার ভয়ে জমিজমার দলিলপত্র মেয়েটির দাদুর এক ডাক্তার বন্ধুর হাতে সঁপে দিয়ে ওঁরা বাড়ি ছাড়লেন। পরিস্থিতি শান্ত হলে ভিটেয় ফিরে দেখলেন, সব ঘর বেদখল। ভিটেবাড়ি, চাষের জমির সব দলিল হজম করে বসে আছেন পরম শুভানুধ্যায়ী (!) চিকিৎসক।
পরিবারটি আজ দুঃস্থ থেকে দুঃস্থতর। প্রান্তিকেরও নীচে তাঁদের বসবাস। রাস্তার ওপর গরিব বাড়ি, অন্যের জমিতে। জনমজুরি করে সংসার চালান মেয়েটির বাবা। মাসে আয় বড়জোর আড়াই হাজার। ভয়াবহ দারিদ্র‌্যের প্রতিনিয়ত হামলায়, মেয়ে-নাতনিকে নিয়ে বিনিদ্র উদ্বেগে, ক্ষয় আর অবক্ষয়ে, হতাশা আর স্বপ্নহীনতায় জর্জরিত পরিবারের সবাই আমার বন্ধু। কথা দিয়েছি, আমৃত্যু ওঁদের পাশে থাকব। ওঁদের হয়ে লড়ব। কিঞ্চিৎ জমি যদি ওরা ফেরত পান, আবাসন যোজনায় যদি একটি ঘর হয়, যৎসামান্য ব্যবসা গড়তে যদি সরকারি সাহায্য মেলে, তা হলে দেশের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব।
কন্যাপ্রাণ মেয়েটি লড়ছে, পরিত্যক্ত না হয়েও ঝুলছে। সমাজের একটুকু সহানুভূতি কি সে দাবি করতে পারে না? অবশ্যই তার হক আছে। আমি তাঁর সাহসের, উন্মোচিত ইচ্ছার নির্মোহ সঙ্গী।
এই যে আমার মিনুফুপুর দুঃসহ, দুর্বিষহ গল্পসত্য, এই যে চিত্রতারকা হওয়ার মতো গুণবান মেয়েটির ধূসর কাহিনী এবং লক্ষ লক্ষ পরিত্যক্ত ছিন্নমূল মহিলার করুণ বৃত্তান্তের বয়স কত? পঁচিশ, পঁয়ষট্টি, পনেরোশো! হতে পারে আরও বেশি। এঁদের বেঁচে থাকার, সন্তান-সন্ততিকে মানুষ করার দায়িত্ব আর নিরাপত্তারক্ষার দায় কার? শুধু ওঁদের? না সমাজ আর রাষ্ট্রের? প্রায় দেড়হাজার বছর জুড়ে যে অমানবিক, অপৌরুষের, ধর্মহীন, বিবেকহীন বদপ্রথা বা তিন তালাকের যে কোদাল, যে জুলুম নারীকে, তার মাতৃত্বকে ভয় দেখায়, রাস্তায় ছুঁড়ে দেয়, অবশ্যই তার আমূল অবসান দরকার।
সংসদের দুই সভায় বিল পাশ হয়েছে, তালাক নয়, তিন তালাককে নিষিদ্ধ করে, বিবেচনাহীন স্বামীদের ফৌজদারি আইনের আওতায় দোষী সাব্যস্ত করার নিদান দিয়েছে যে প্রস্তাব, সেটি আশা করি শীঘ্রই আইনে পরিণত হবে। বিলের নেপথ্যে রাজনীতি থাকতে পারে, কংগ্রেস ও অন্য বিরোধীদের সংশোধনের দাবির প্রাসঙ্গিকতাও হয়তো অসার নয়, এসব রাজনৈতিক অঙ্ক নিয়ে বিতর্ক চলছে। সংসদে, সংসদের বাইরেও। বিতর্কের যুক্তিগ্রাহ্যতা মানছি। মেনেও বলছি, মেয়েদের অপমান আর অবমাননা, স্বামীদের বেলাগাম, শরিয়ত–‌বিরোধী স্বেচ্ছাচার আর ব্যভিচার রুখতে এরকম একটি কঠিন আইন জরুরি ছিল। স্বাধীনতার সত্তর বছর পরে আইনটির সূচনায় ভারত যে পদক্ষেপ নিয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিশর–‌সহ বহু দেশে, পরিত্যক্তা, অপরিত্যক্তা মহিলাদের ন্যায় আর মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার নজির তুলে ধরছে, তা ইতিহাসে অনুকরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আইন কে তৈরি করল, কোন ঘোষিত বা অঘোষিত লক্ষ্যকে স্পর্শ করতে, এটা প্রধান বিবেচ্য নয়, বিবেচনার বিষয় নৃশংস বৈষম্য আর পুরুষের একপেশে আধিপত্যবোধের পাগলামিতে নিষেধাজ্ঞা জারির সাংবিধানিক সম্মতি। এ আরেক গৌরব।
ভারতীয়তার বিজয়ী অহংকার। এই জয়-বিজয় সাম্প্রদায়িক পরশীকাতরতা, অহেতুক অপবাদ এবং ‘‌আমরা-ওরা’‌র বিষবৃক্ষে জব্বর কোপ বসাবে। এ ব্যাপারে আমরা খানিকটা নিশ্চিত। নিঃশংসয়।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top