প্রচেত গুপ্ত: সিনেমা নিয়ে লেখালিখির মধ্যে আমি মোটে যাই না। সিনেমাটা আমি ঠিক বুঝি না। জ্ঞানগম্যিও নেই। ফিল্ম ক্লাব, ম্যাক্সমুলারের গঁাস্ত রঁবেজ, যাদবপুরের ফিল্ম স্টাডি, এসআরএফটিআই— কোনও কিছুই আমার ঝুলিতে নেই। এমন–কি ফিল্ম ফেস্টিভালেও যাই না। গদার, কুরোসাওয়া, তারকোভস্কি, ডি’‌সিকা, কন ইচিকাওয়া, মাজিদ মাজিদি দেখেছি বন্ধুদের তালে পড়ে। পরে শুনেছি, এইসব ছবি ওইভাবে ‘‌দেখা’‌ নাকি কোনও ‘‌দেখা’‌ই নয়। এইসব ছবি দেখতে হয় রাত জেগে (‌দিনে জাগলে হবে না)‌ হোমওয়ার্ক করবার পর। রজার এর্বাট, জেনে সিস্‌লে, পাউলিনে কায়েলদের মতো দুনিয়ার বিখ্যাত ক্রিটিকদের রেফারেন্স ঘাঁটতে হয়। তাঁরা কী বলেছেন?‌ কোন ছবি দেখতে বলছেন, কেন দেখতে বলছেন, দেখতে যাওয়ার আগে কোন বই পড়তে বলছেন— সব জেনে তারপর কপালে দইয়ের ফোঁটা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোতে হয়। আমি ওসবের মধ্যে যেতে পারি না বাবা। বেশি রাত জাগলে সকালে আমার আবার সমস্যা হয়। অনেক সময় লেগে যায়।  
 তারপরেও যেটুকু যা দেখেছি তেমন যে বুঝতে পেরেছি এমন নয়। তার থেকে বড় কথা, একটা ছবি যেভাবে বুঝলে ‘‌ঠিকঠাক বোঝা’‌ হয়, তেমনভাবে তো একেবারেই পারিনি। নিজের মতো করে বুঝেছি। সুখ, দুঃখ, হতাশা, যন্ত্রণা, সমাজ, যুদ্ধ, বিপ্লব আমার ভিতরে আমার মতোই রিঅ্যাক্ট করেছে। খুব স্বাভাবিক কারণেই সেইসব রিঅ্যাকশনে অশিক্ষা, বোকামি, আবেগ থেকে ই গেছে। 
একবার তো বিরাট কেলেঙ্কারি হল। ব্রিলান্তে মেনডোজারের অস্কার পাওয়া ছবি কিনাটে দেখতে গিয়ে একটা কাণ্ড করলাম। হয়েছিল কী..‌. থাক, পরে কোনওদিন বলব। 
যাই হোক, আমি সিনেমার কিছু জানি না বলেই, সিনেমা নিয়ে লেখালিখিতে নেই, কথা বলাতেও নেই। তারপরেও আজ একটু না বলে পারছি না। ভাললাগার কথা মাঝে মাঝে বলে ফেলতে হয়।
বেশ কিছুদিন পর একটা বাংলা সিনেমা দেখতে গিয়ে হাসলাম, কঁাদলাম, রাগ করলাম এবং শেষ পর্যন্ত খুব খুশি হয়ে হল থেকে বেরোলাম। শুনেছি, সিনেমা দেখতে গিয়ে হাসি–‌কান্না–‌রাগ হল নিম্নমানের অভিব্যক্তি। বাংলা সিনেমার বেলায় তো বটেই। ডি’‌সিকার ‘‌বাইসাইকেল থিভস্‌’ দেখে হাসলে বা মেনডোজারের ‘মনোরো’‌ দেখে চোখের জল মুছলে ক্ষতি নেই, বাংলা ছবিতে হাসি–‌কান্না বোকাদের কাজ। দুর্বল মনের প্রকাশ। ছাপোষা বাঙালিরাই এমন করে।
হ্যঁা, আমি বোকা। আমার মন দুর্বল। আমি ছাপোষা বাঙালি। তাই সেদিন ‘‌হামি’ ছবিটা দেখতে দেখতে আমি হেসেছি, চোখের জলও মুছেছি। ছবি যখন শেষ হয়েছে, মন ভরে গেছে আনন্দে। মনে হয়েছে, এমন কেন সত্যি হয় না আহা!‌ 
আমি ছোট মানুষ, অল্পস্বল্প লেখালিখি করি, কোনও বড় ভাবনার সাক্ষী হতে পারলে চট করে আপ্লুত হয়ে পড়ি। পরিচালক শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং নন্দিতা রায় একটা বড় ভাবনা সামনে এনে আমাকে আপ্লুত করেছেন। চমৎকার ছবি বানিয়েছেন। ‘‌হামি’‌ শুধু দেখায় না, ভাবায়। ‘‌হামি’‌ শুধু সমস্যা নয়, ‘‌হামি’‌ সমাধান। ‘‌হামি’‌ শুধু একটা ‘‌ফিল গুড মুভি’ নয়, ‘‌ফিল ট্রুথ মুভি’‌। যে ছবি আদর, মায়া–মমতা, মন খারাপ আর মন ভাল দিয়ে তৈরি হয়েছে। 
শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নন্দিতা রায়কে অভিনন্দন। ধন্যবাদও বটে। তাঁরা সুস্থ, সুন্দর, বসে দেখা যায় এমন একটা ছবি বানিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটা দায়িত্বও পালন করলেন। এমন একটা অবক্ষয়ের দিকে আঙুল তুলেছেন যা আমাদের রন্ধ্রে প্রবেশ করছে শয়তানের মতো। সিনেমা কি কোনও দায়িত্ব পালন করবে?‌ ব্যাকরণ কী বলে? শিল্পের কাজ কী? সে কি শুধুই ‘‌আর্ট ফর আর্ট শেক’‌‌‌ নয়?‌ যে যা খুশি বলুক। ব্যাকরণের নিকুচি। 
‘‌হামি’ ছবির দুই পরিচালক কঠিন একটা সঙ্কটকে ধরেছেন।  গুরু–শিষ্যের পারস্পরিক সম্পর্কের সঙ্কট। নাক গলিয়ে ঢুকে পড়া কিছু অভিভাবক, কিছু খারাপ লোক, কিছু কঁাচা টাকা, কিছু ক্ষমতা, কিছু ভুল প্রশাসনিক সিদ্ধাম্ত, কিছু লোভী ব্যবসাদার এই সম্পর্ককে নষ্ট করছে। এখনকার অধিকাংশ বাবা–‌মাকে দেখলে মনে হয়, আগেকার দিনে ভাল ছেলেমেয়ে বলে কিছু ছিল না। তখন কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়র, বিজ্ঞানী, মাস্টার হয়নি। এই ‘‌গাধা–চিন্তা’‌ যারা করে তার কি জানে না একটা সময়ে বাবা–‌মায়ের সঙ্গে সন্তানদের দেখাসাক্ষাৎই প্রায় হত না। তাঁরা ছেলেমেয়ের স্কুলের ধারেকাছে যাওয়ার কথা ভাবতেনও না। তাঁরা কখনও উঠতে বসতে মাস্টারমশাই, দিদিমণিদের গাল পাড়েননি। তাঁরা কখনও দুই সহপাঠীর ঝগড়ায় নিজেদের জড়িয়ে ফেলেননি। সময় বা ইচ্ছে কোনওটাই তাঁদের ছিল না। তারপরেও তো এদেশে কম ‘‌সোনার টুকরো’‌ তৈরি হয়নি। দেশে, বিদেশে তাদের সুনাম কম জোটেনি। বেত, আদর, শ্রদ্ধা, ভালবাসা, দুষ্টুমি, কঁাচা আম, হজমিগুলির যুগে কম মনীষী জোটেনি বাংলার ভাগ্যে। আর এখন?‌ বাবা–‌মায়ের অতিনজরে,‌ মাস্টারমশাই–দিদিমণিদের গালমন্দ করে, স্কুলের সামনে স্লোগানবাজি করে কী জুটছে? সবাই জানে। 
‘‌হামি’‌তে অনেক হামি আছে। তাই নিয়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড আছে। কেউ কেউ সেই হামির বদনাম করতে চেষ্টা করে। পারে না। শেষ পর্যন্ত ভালবাসার হামি, স্নেহের হামি, আদরের হামির জয় হয়। প্রথম দৃশ্য থেকে টানটান চিত্রনাট্য। চমকে দেওয়ার মতো সংলাপ। হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়তে হয়। যদি কখনও কোথাও শিথিল হয়েছে, পরের দৃশ্য তা মেরামত করেছে দ্রুত। ছাত্রছাত্রীদের জন্য শিক্ষিকাদের স্নেহ, শিক্ষিকাদের আন্তরিকতা, শিক্ষিকাদের ধৈর্য গোটা ছবিটাকে আলো করে রেখেছে রূপকথার মতো। আমাদের মতো যারা বদ পাজি অভিভাবক, তাদের মুখ লুকোতে হবে। যারা শিক্ষক পদের কলঙ্ক তারাও নিশ্চয় লজ্জা পাবেন।
ছবির দুটি বড় সম্পদ গান আর অভিনয়। কে না ভাল অভিনয় করেছে?‌ শিবপ্রসাদ, গার্গী রায়চৌধুরী মধ্যবিত্ত বাঙালি বাবা–‌মায়ের চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। দুজনের অভিনয় যেমন হাসিয়েছে, মন ভারীও করেছে। শিবপ্রসাদ মাতিয়ে রেখেছেন। একজন সাধারণ মায়ের দুশ্চিন্তা, অসহায়তা, রাগ, হিংসে ফুটিয়ে তুলতে গার্গী কোথাও ভুল করেননি। তাঁর হাঁটাচলা, কথা বলার ভঙ্গি, আচরণ আমরা রোজই চারপাশে দেখতে পাচ্ছি। কঠিন অনুশীলন এবং পর্যবেক্ষণ ছাড়া এই অভিনয় করা যায় না। ঘরে বসে কাপড় কাচা থেকে রাস্তায় মারপিট সবেতেই মাতিয়েছেন গার্গী। ব্রত, তিয়াশার ভূমিকায় যে বাচ্চা ছেলেমেয়ে দুটি অভিনয় করেছে তারা বড় কোনও প্রাইজ না পেলে খুব দুঃখ পাব। আমার ধারণা পাবে। অধিরাজ চরিত্রের ছেলেটি কিছু দৃশ্যে চমকে দিয়েছে। প্রতিভাবান একেই বলে। অপরাজিতা আঢ্য আবারও চমৎকার। খুব ভাল খরাজ, কনীনিকা। ভাল দেবলীনা।
শেষে বলব, সঙ্গীত পরিচালক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের কথা। তাঁর কাজ দারুণ হয়েছে বললে কম বলা হয়ে যাবে। মিঠে সুরের মায়া আর মন ছঁুয়ে যাওয়া কথা দিয়ে তিনি ছবির গান সাজিয়েছেন। অনিন্দ্য ছাড়া ‘‌হামি’‌ এত সুন্দর হত না।
শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং নন্দিতা রায়কে একটাই প্রশ্ন, আপনারা এতগুলো ছোট ছেলেমেয়েকে দিয়ে এত সুন্দর অভিনয় করালেন কী করে!‌ এদের প্রশিক্ষক এবং অভিভাবদের ধন্যবাদ। তাঁরা ছাড়া এ কাজ অসম্ভব হত।
যাঁরা এখনও ছবিটা দেখেননি, দেখে আসুন। নইলে অতি সুস্বাদু একটা ‘‌হামি’‌ মিস করবেন। আমি তো আবার যাব। কারণ আমি হামি ভালবাসি।‌

জনপ্রিয়

Back To Top