সুদীপ্ত চক্রবর্তী: নতুন বছরের দ্বিতীয় মাসেই আগামী লোকসভা নির্বাচনের উত্তাপের আঁচ গায়ে লাগতে শুরু করে দিয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই নতুন বছর আলাদা গুরুত্ব বহন করছে। এক বছরের নয়, গত পাঁচ বছরের কাজের হিসেব, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবকে যাচাই করে নেওয়ার লক্ষ্যে চলতি বছরেই অনুষ্ঠিত হবে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের লোকসভা নির্বাচন। বিগত দিনে ঘটে–যাওয়া কয়েকটি ঘটনার তাৎপর্য বিপুল;‌ আবার কিছু নেহাতই হাস্যকর। পুলওয়ামা–কাণ্ড, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ–‌যুদ্ধ ভাব ও খেলা থেকে শুরু করে গণেশের শরীরে প্লাস্টিক সার্জারি, জিএসটি বা নোটবন্দি। একটির সঙ্গে কি আরেকটির তুলনা চলে?‌ প্রাথমিকভাবে বিষয়গুলির মধ্যে আপাত কোনও মিল খুঁজে না পাওয়া গেলেও, আসলে একটা অদ্ভুত আন্তর্সম্পর্ক রয়েছে।
যেহেতু লোকসভা নির্বাচন, তাই গত পাঁচ বছরে যে রাজনৈতিক দল বা ফ্রন্ট কেন্দ্রে আসীন ছিল তাদের কাজকর্মের প্রতিই বেশি নজর থাকে;‌ এবং এটাই স্বাভাবিক। নরেন্দ্র মোদির শাসনকাল নিয়ে অ্যাকাডেমিক আলোচনায় একটি প্রসঙ্গ ইদানীং বারবার উঠে আসছে— হেজিমনি বা চিন্তা–আধিপত্য।
হেজিমনি শব্দটিকে আলোচনায় প্রথম নিয়ে এসে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রয়োগ করেন প্রখ্যাত দার্শনিক তথা চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসি। তিনি হেজিমনির তত্ত্ব দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতাকে কিছুটা অন্যভাবে ব্যাখ্যা করেন। কীভাবে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক শক্তি সমাজের ওপর ক্ষমতার হেজিমনি প্রয়োগ করে টিকে থাকে ও কীভাবে হেজিমনি হারিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হয় তা দেখিয়েছেন গ্রামসি। যদিও তারও আগে জেরমি বেন্থাম (‌১৭৪৮–‌১৮৩২)‌ বুদ্ধিবৃত্তিক সামাজিক নিয়ন্ত্রণে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (‌টাওয়ার)‌ অধীনে প্যান–‌অপটিক সোসাইটির কথা বলেছিলেন। অন্যদিকে মিশেল ফুকো ক্ষমতাকে দেখতে চেয়েছিলেন সৃষ্টিশীলতার মোড়কে। তাত্ত্বিক জটিলতায় না গিয়ে হেজিমনি ও ভারতের প্রেক্ষিত বিষয়ে ফেরা যাক। 
ফরাসি চিন্তাবিদ লুই আলথুজার তাঁর বিভিন্ন লেখায় স্পষ্ট করেই বলেছেন আধুনিক ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আমাদের দুইভাবে শাসন করে। একটি হচ্ছে নিপীড়নমূলক এবং অন্যটি হচ্ছে মতাদর্শিক শাসন প্রক্রিয়া। বর্তমান সময়ের যে উৎপাদন ব্যবস্থা এবং তার মতাদর্শ খুব সুচারুভাবে এমন এক উপরিকাঠামো বা পরিমণ্ডল সৃষ্টি করে, যাতে সেই মতাদর্শের অনুকূলে থাকতে চাওয়া কিছু কাঙ্ক্ষিত মানুষ তৈরি হয়। একদল মানুষের চেতনার স্তরে ক্রমে ক্রমে কোনও এক মতাদর্শের অনুকূলে থাকার যে ব্যবস্থা প্রোথিত হয়ে যায় সেটাকেই বলা হয় সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদ বা চিন্তার আধিপত্যবাদ বা কালচারাল হেজিমনি। গ্রামসি আরও বিশ্লেষণাত্মক বিষয় এক্ষেত্রে আলোচনাকালে টেনে এনেছেন। সেই গভীরতায় না গিয়েও বলা যায়, যদি কোনও সমাজে মানুষের চিন্তাভাবনা, রাজনৈতিক মতামত কালচারাল হেজিমনির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে সেই সমাজকে বলে হেজিমনিস্টিক সমাজ। দেখা গেছে, এই ধরনের সমাজ ব্যক্তি মানুষকে ‘‌সেলিব্রিটি’‌ করে তুলতে চায়;‌ পার্থিব জীবনে অজস্র মানুষ–‌দেবতা ও দেবীর জন্ম দেয়। আর এই দেব–‌দেবীরূপী মানুষদের পূজারি ও ভক্তের প্রয়োজন হয় বলেই তাদের বিভিন্নভাবে আরও ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠার দরকার পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এই দেবত্ব আরোপ ব্যক্তি মানুষটিকে আত্মকেন্দ্রিকতার দিকে ঠেলে দেয়। সেখান থেকেই আসে ব্যক্তির একনায়কত্ব বা স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা। পৃথিবীর ইতিহাসে তো বটেই, আমাদের দেশেও এই ঘটনার বহু উদাহরণ রয়েছে। আমরা বর্তমান সময়ে মোদিত্বের বিভিন্ন রূপ দেখতে পাচ্ছি। দীর্ঘদিন ধরে সযত্নে লালিত বিজেপি–‌র সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদের সঙ্গে মোদিত্ব একেবারে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। এই দুইয়ের মধ্যে রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের প্রচারে নরেন্দ্র দামোদর মোদি নিজেকে একজন দৃঢ়, বজ্রমুষ্টির শাসক হিসেবে দেশের জনগণের সামনে তুলে ধরেছিলেন;‌ আরও ভাল করে বললে— নিজেকে বিপণন করেছিলেন। এক বিপুল অংশের মানুষের ওপর সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদ আরোপের মধ্য দিয়ে মোদিরা লোকসভা নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যাধিক্যে ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়েছিলেন। ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে ক্রমাগত রাষ্ট্রকে নিজেদের রাজনৈতিক মত প্রচারে ব্যবহার করেছেন। জিএসটি থেকে সিনেমা হলে জাতীয় সঙ্গীত, জেএনইউ বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রবিক্ষোভ দমন থেকে শুরু করে সাইবার দুনিয়ায় নজরদারির জন্য নতুন নির্দেশিকা, ডিমনিটাইজেশন থেকে শুরু করে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক— প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেদের বক্তব্যকে রাষ্ট্রের স্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেছেন। সবথেকে বড় কথা, যাঁরা সরকারের এই কার্যকলাপে ন্যূনতম আপত্তি জানিয়ে প্রতিবাদ করেছেন, তাঁদেরকেই দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘‌রাষ্ট্রদ্রোহী’‌ বা ‘‌আরবান মাওয়িস্ট’‌ হিসেবে। এই বিষয়টিতে মোদির রাজত্বের সঙ্গে হিটলারের রাজত্বের অদ্ভুত মিল পাওয়া যায়। একটু মিলিয়ে দেখলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে। হিটলার বলেছিলেন, আমরা খুব বেশি শিক্ষিত হয়েছি বলেই আজ আমাদের বিপদ— What we suffer from today is an excess of education‌। হিটলারের আর এক সহকারী গোয়েরিং যা বলেছিলেন তার মর্মবস্তু ছিল— ন্যাশনাল সোসালিস্ট হতে গেলে ‘‌Brain'‌–‌এর প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ‌‘‌Brawn‌’‌ বা শক্তসমর্থ মাংসপেশি। হিটলার তাঁর বই ‘‌Mein Kamp‌f‌’‌ বইতে আরও পরিষ্কার করে বলেছিলেন, ‘‌We want arms one more... at the service of this great mission.‌’‌ ‌(‌আমরা অস্ত্র চাই আর একবার.‌.‌.‌ দেশের মহোত্তর স্বার্থে)‌। দেশের পরিস্থিতির দিকে তাকালে কি সেরকমই সব নজরে আসবে না?‌ আর যাঁরা এই ব্যবস্থাকে, এই দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন করবেন না তাঁরা হিটলারের ভাষায় ‘‌ডিজেনারেটস’‌‌ বা অপদার্থ পতিতের দল;‌ আমাদের দেশে ‘‌দেশদ্রোহী’‌!‌ 
এই পুরো বিষয়টির সঙ্গে একবার পুলওয়ামা–কাণ্ডটিকে মিলিয়ে দেখুন। সেখানকার ঘটনা মর্মান্তিক, কখনওই কাঙ্ক্ষিত নয়। কিন্তু জওয়ানদের মৃত্যু নিয়ে ‘‌অতি দেশভক্তি’‌ ডিজিটাল মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ার গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। একদিকে মানুষের মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে যুদ্ধ;‌ প্রতিহিংসার জিগির তুলে হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে অদৃশ্য মেশিনগান। ন্যায়বিচার বদলে যাচ্ছে প্রতিহিংসায়। বহু বহু বছর আগে স্যামুয়েল জনসন বলেছিলেন, দুর্বৃত্তের শেষ ভরসা দেশপ্রেম। বর্তমান পরিস্থিতি সেই উক্তির বাস্তবিকতাকেই প্রমাণ করছে। 
টাকার অপর পিঠের মতোই মোদিত্বের অপর একটি দিক আছে— হিন্দুত্ব, আরও সুনির্দিষ্টভাবে উগ্রসাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ব। হিন্দু মহাসভা থেকে শুরু করে আরএসএস অর্থাৎ সঙ্ঘ পরিবারের কাছে ভারত নামক দেশের, মানে এই ভৌগোলিক অস্তিত্বের একমাত্র ধর্ম— হিন্দুত্ব। অন্য ধর্ম বিশেষ করে ইসলামের জন্যই দেশের দুরবস্থা একথাও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করে সাধারণের মনে গেঁথে দেওয়ার একটা প্রচেষ্টা বিদ্যমান। নরেন্দ্র মোদির প্রধানমন্ত্রিত্বের বিশেষত্ব হল, হিন্দুত্ব ও ভারতীয়ত্বের মধ্যে সাংস্কৃতিবাদের মাধ্যমে সম্পর্ক স্থাপনে অনেকাংশেই সফলতা লাভ। ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক ঐতিহ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে এই আমলে যা রাষ্ট্র, তা–‌ই হিন্দু। আর এই কাজের জন্য ইতিহাসকে বদলে দিতেও কসুর করেন না মোদি এবং তাঁর দলবল। 
বিজ্ঞান বলছে, মানুষের মস্তিষ্কের বাম অংশ (‌যা যুক্তি নিয়ন্ত্রণ করে)‌ তাকে অকেজো করে দেওয়ার জন্যই কালচারাল হেজিমনি’‌র প্রয়োজন পড়ে। যখন এই কাজটা সম্পন্ন হয়, তখনই জেগে ওঠে মস্তিষ্কের ডান দিকের অংশ (‌যা নিয়ন্ত্রণ করে আবেগ, প্রতিহিংসা, ভয়, ঘৃণা)‌। সাধারণের কাছে যুক্তির থেকে আবেগ অনেক বেশি গ্রহণীয়। ফলে প্রতিটি মাধ্যমে (‌সোশ্যাল, ডিজিটাল, প্রিন্ট ও অডিও–‌ভিস্যুয়াল)‌ ন্যায়বিচারের তুলনায় দ্বেষ ও প্রতিহিংসা বেশি বিক্রি হয়। বিচারের জন্য দরকার চর্চা, নিজস্ব সময়, যুক্তি ও ধৈর্য। কিন্তু মানুষের এত সময় কোথায়!‌ তাই হলদিঘাটের যুদ্ধের ফলাফল যেমন বদলে দিতে হয় তেমনই ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা চলে নির্দিষ্ট কিছু পরিচ্ছেদ;‌ রাস্তা, শহর, রেল স্টেশনের নাম পরিবর্তম করতে হয়। বিজ্ঞান‌ই বাদ যাবে কেন!‌ বিজ্ঞান কংগ্রেসে শাঁখ বাজানোর উপকারিতা সংক্রান্ত গবেষণাপত্র পাঠ থেকে শুরু করে গোটা বিজ্ঞানকেই হিন্দুত্বের মোড়কে নিয়ে আসার নিরন্তর চেষ্টা চলে। পুষ্পক রথ ও বিমান আবিষ্কার, গণেশের প্লাস্টিক সার্জারি, মহাভারতের যুগে ইন্টারনেট ইত্যাদি অনেকের মনে হাসির উদ্রেক করলেও দেশের বহু মানুষ কিন্তু এটাকে বিশ্বাসও করছেন। ১৯৪৯ সালের ২২ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ চত্বরে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা না জেনেই বহু মানুষ বিশ্বাস করেন যে ওই বিতর্কিত স্থানেই রাম জন্মেছিলেন। বহু মানুষ হাসলেও কিছু যায় আসে না। কতজন হাসছেন এবং কতজন বিশ্বাস করছেন এর কোনও পরিসংখ্যান না থাকলেও হিন্দুত্বকে মানুষের মনে প্রকারান্তরে গেঁথে দেওয়ার জন্যই যে এই সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যারা হিন্দুত্বের নরম–‌গরমে মজবেন না তাদের জন্য দেশপ্রেম। আর যারা কোনওটাতেই নেই তাদের জন্য তকমা ‘‌দেশদ্রোহী’‌ বা ‘‌আরবান মাওয়িস্ট’‌ বা ‘‌পাকিস্তানপন্থী’‌। আসলে এইগুলোই নরেন্দ্র মোদির সরকার পরিচালনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।‌

জনপ্রিয়

Back To Top