রাজীব ঘোষ: সতীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি। আমার দাদু। কাজ করতেন পার্লামেন্টে, সচিব পদে। ৩১ নং হ্যাভলক স্কোয়্যারের বাংলোটাই ছিল আমার মামার বাড়ি। লুটিয়েনস দিল্লি। এখন সেই সব বাংলো নেই, মাথা তুলেছে বহুতল আবাসন। কিন্তু গোল মার্কেটের মাটন আর মিষ্টির স্বাদ সেই ছেলেবেলা থেকেই মুখে লেগে আছে। রসিকতা করে বন্ধুদের বলি, দিল্লির সমস্ত বাগ, বিহার বা কুঞ্জে আমি থেকেছি। সত্যিই। রিগ্যাল থেকে বাস ছাড়ত। শুরু থেকে শেষ স্টপেজ পর্যন্ত যেতাম। জনপথ মার্কেট চষে ফেলতাম। নরুলার আইসক্রিম কিংবা কাঠি কাবাবের স্বাদ যেমন চেনা, পুরনো দিল্লির গলি–‌ঘুঁজিও ততটাই।
দিল্লি তখন উদার শহর। কনট প্লেস, পার্লামেন্ট স্ট্রিট, শঙ্কর রোড, তালকটোরা স্টেডিয়ামে ঘুরঘুর করছি বহু বছর ধরে। সেই দিল্লি ছিল পরিশ্রমী, উদ্যমী, দরাজদিল মানুষের শহর। বাস্তুহারা সর্দার–‌সর্দারনিদের জীবনসংগ্রাম। সেই দিল্লি দেখতে দেখতে বদলে গেল। পূর্বাঞ্চলীয়দের ঘঁাটি গাড়ার পরই ঘটেছে, এমন সরলীকরণ করব না। তবে অমিত শাহরা যেভাবে মেরুকরণের চেষ্টা এবার দিল্লির ভোটে করলেন, ততটা দুঃসাহস মদনলাল খুরানা কিংবা সাহিব সিং বর্মারাও করেননি। খুরানা ছিলেন পাঞ্জাবি, সাহিব সিং জাঠ। বিজয় গোয়েল তো এখনও আছেন। তঁারাও কিন্তু দিল্লির পরিশ্রমী বানিয়া সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বহু দূরে সরে গেছেন।
শীলা দীক্ষিতের তুঙ্গ সময়েও যে বিজেপি সমানে সমানে লড়ে যেত, তাদের এই দেউলিয়াপনা কেন?‌ কেন দিল্লিতে সভাপতির পদে বসাতে হল পূর্বাঞ্চলী মনোজ তিওয়ারিকে?‌ কেনই–‌বা দিল্লিতে ভাবী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাউকে খাড়া করতে পারল না বিজেপি?‌ ভোটে নামার আগেই তো বিজেপির কর্মী–‌সমর্থকদের পথে বসিয়ে দিলেন শাহ। এই দিল্লিতে এলেই মানুষ লালকেল্লা আর হুমায়ুনের সমাধি দেখতে যায়। যে দিল্লিতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে মুসলিম সংস্কৃতি, সেখানে হিন্দু–‌মুসলিম বিভাজনের চেষ্টা করতে গেলেন কেন শাহ?‌ এর একটাই উত্তর, আত্মসন্তুষ্টি। মোদি–‌শাহ মনে করেন ভারতের সর্বত্র তঁাদের গুজরাট মডেল কাজ করবে। মেরুকরণ করতে পারলেই কেল্লা ফতে!‌
কেজরিওয়াল শত প্ররোচনাতেও ওই ফঁাদে পা দেননি। ঘটনাচক্রে তঁার সঙ্গে কাজ করছিলেন প্রশান্ত কিশোর। আর কিছু না হোক, মানুষের নাড়ি ধরে কাজ করতে জানেন পিকে। সম্ভবত তঁার পরামর্শেই অরবিন্দ কেজরিওয়াল বা আপ নেতারা শাহিনবাগে একবারও যাননি। কেজরিওয়ালরা শুধু নিজেদের ভাল কাজের প্রচার করেছেন, সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়েছেন। আপ–‌এর সোশ্যাল মিডিয়া তুখোড়, বিজেপি–‌কে গুনে গুনে দশ গোল দিতে পারে। উল্টোদিকে বিজেপি‌র সোশ্যাল মিডিয়া শুধু বিদ্বেষ আর ভুয়ো খবর ছড়িয়ে গেছে। বিজেপি আগাগোড়াই কেজরিওয়ালকে আক্রমণ করে গেল। হনুমান মন্দিরে যাওয়া নিয়ে প্রশ্নের জবাব এল হনুমান চালিশায়?‌ প্রকাশ জাভড়েকরের মতো মৃদুভাষী মানুষও শেষ পর্যন্ত কেজরিকে সন্ত্রাসবাদী বলে ফেললেন‍!‌ ফলে ব্যাপারটা দঁাড়াল, দিল্লির সব কেন্দ্রেই যেন আপ–‌প্রার্থী কেজরিওয়াল, পুরনো বিধায়কদের দোষ–‌ত্রুটি তুলে ধরতেই পারল না বিজেপি। আত্মসন্তুষ্টির চরম, বিজেপি প্রচারে নেমেছিল অনেক দেরিতে। আর আপ?‌ পুরসভার নির্বাচনের ঠিক পরেই। লোকসভা নির্বাচনের হার ঝেড়ে ফেলতে তাদের বেশি সময় লাগেনি। লড়াইটা তাই মেরুকরণ বনাম উন্নয়নের হয়ে দঁাড়িয়েছে। দিল্লির মানসিকতা যতটা বুঝি, তাতে এখানে ভালভাবে বেঁচে থাকার থেকে জরুরি আর কিছুই নয়। যে পূর্বাঞ্চলীরা এখানে রুটি–‌রুজির টানে এসেছেন, তাঁদের কাছেও হিন্দুত্বের স্লোগান অর্থহীন। তাঁরা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চান, মাথা তুলে দাঁড়াতে চান।
বিজেপি‌র ন্যারেটিভ ইদানীং আদ্যন্ত নেগেটিভ। নিজেদের ব্যর্থতা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। দিল্লির ঝুগ্গির বাসিন্দাদের চোখের সামনে বিজেপির ‘‌পঁাচতারা’‌ অফিস। তঁাদের ভুল বোঝানো অত সহজ নয়। মোদি বারবার ডাবল ইঞ্জিনের কথা বলেন। অর্থাৎ কেন্দ্র আর রাজ্যে একই দলের সরকার হলেই নাকি মানুষের লাভ। এই ন্যারেটিভও ইদানীং রাজ্যে রাজ্যে প্রত্যাখ্যাত। দিল্লির কাছে তো বটেই। দিল্লি পুরসভা বিজেপি‌র হাতে, কাজের নামে অষ্টরম্ভা। দিল্লির পুলিশ অমিত শাহের হাতে। মানুষ সবচেয়ে বেশি আতঙ্কিত নিরাপত্তার অভাব নিয়ে। আপনি গন্ধে ম ম, কস্তুরীমৃগসম মোদি এখনও লম্ফঝম্প করে চলেছেন। দিল্লিতেও প্রচার করেছেন। যেন তিনি সামান্য অমৃতবর্ষণ করলেই সব কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু হয়, অমৃতের বদলে গরলের চর্চাতেই ডুবে মোদি। দিল্লির উন্নয়নের কথা নেই, তোপ দাগলেন শাহিনবাগে!‌ শাহ বললেন, এত জোরে বোতাম টিপতে হবে, যেন কারেন্ট লাগে শাহিনবাগে!‌ দুর্ভাগ্য, ওঁরা দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ২০০ সাংসদ, ৫ মুখ্যমন্ত্রীকে প্রচারে নামিয়েও এই হাল!‌ বস্তুত বিজেপি এতটাই মোদি–‌শাহ নির্ভর যে, কোনও রাজ্যেই স্থানীয় নেতৃত্ব বলে আর কিছু নেই।
হ্যঁা, কংগ্রেসও ছিল। সত্যি বলতে কী, দিল্লিতে কংগ্রেস লড়েইনি। ঠিক করেছে। বিজেপির সুবিধে হবে এমন কিছু কংগ্রেস করতে যাবে কেন?‌ মহারাষ্ট্রে উদ্ভব ঠাকরেকে যেমন গদি ছাড়া হয়েছে, দিল্লিতে কেজরিওয়ালকেও তেমনই ময়দান ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বস্তুত ভারতের মানচিত্র থেকে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে বিজেপি। হরিয়ানা, কর্ণাটক, গোয়া, মণিপুর— সবই পেছন দরজা দিয়ে জেতা। মহারাষ্ট্রেও সে চেষ্টা হয়েছিল, ব্যর্থ হওয়ার কারণ গয়ারামরাও এখন বিজেপি‌র ভবিষ্যৎ নিয়ে তেমন আশা দেখতে পাচ্ছেন না। ব্যবসায়ীরা জিএটি নিয়ে ক্ষুব্ধ, খেপে গেছেন দলিত–‌মুসলিমরা। অর্থনীতির হাল শোচনীয়। বিহার জেতা আর সহজ হবে না।
‌‌‌‌বিজেপি‌র বিকল্প মডেল তুলে ধরছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল, আপ যাকে বলছে ‘‌প্রকৃত জাতীয়তাবাদ’‌। সেটা কী?‌ খুব সহজ। বিজেপি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বেচে দিচ্ছে। ব্যাঙ্ক, বিমা, রেল বেসরকারীকরণের জন্য যা যা করতে হয় তা–‌ই করছে। আর আপ?‌ তাদের হাতে ছিল সরকারি স্কুল, হাসপাতাল। এই দুটি ক্ষেত্রেই অভাবনীয় উন্নতি। সমৃদ্ধ মানুষও যাচ্ছেন মহল্লা ক্লিনিকে। সরকারি স্কুলে পড়ছে ১২ লক্ষ ছাত্র‌ছাত্রী। বাড়তি ক্লাস, পেরেন্ট–‌টিচার মিটিং, ঝকঝকে শৌচাগার, সুইমিং পুল। গরিব মানুষ ধন্য ধন্য করবেন বইকি।
দেখুন দিল্লির ছবি। শিখ প্রধান এলাকায় আপ ৯, বিজেপি ১। ঝুগ্গি এলাকায় আপ ১৬, বিজেপি ১। পূর্বাঞ্চলী–‌প্রধান এলাকায় আপ ১৭, বিজেপি ৩। জাঠ এলাকায় আপ ৭, বিজেপি ২। হিসেবটা দীর্ঘ করে লাভ নেই। দিল্লির কোনও অংশের মানুষই বিজেপির গালি, গুলির রাজনীতিকে সমর্থন করেনি। দিল্লিতে জিতেছে ভারত, সেটাই স্বস্তি।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top