৩ ফেব্রুয়ারি, রবিবার। অন্ধকার নেমে আসার পর, কলকাতার নগরপাল রাজীব কুমারের বাড়িতে হানা দিতে হাজির সিবিআই–‌এর লোকেরা। আগের দিন, ২ ফেব্রুয়ারি, শনিবার বাংলায় দুটি জায়গায় মমতা ব্যানার্জি ও তাঁর সরকারকে কুৎসিত আক্রমণ করে গেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হুমকি। পরদিনই, রবিবার, হামলা। একেবারে ‘‌খাস লোক’‌ নাগেশ্বর রাওকে সিবিআই–‌এর অস্থায়ী ডিরেক্টর পদে বসানো হয়েছিল। রবিবারই ছিল তাঁর মেয়াদের শেষ দিন। কর্তার ইচ্ছায় তিনি অতি–‌সক্রিয় হলেন। ঘটনাক্রম বুঝিয়ে দিচ্ছে, সবটাই পরিকল্পিত। মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্য সরকারকে হেয় করার চক্রান্ত।
সিবিআই–‌কে রাজীব কুমার জানিয়েছিলেন, ‘‌নিরপেক্ষ’‌ স্থানে কথা বলতে, বয়ান দিতে প্রস্তুত। জবাব দেয়নি সিবিআই। যদি পুলিশ কমিশনার ইচ্ছাকৃতভাবে কথা বলা এড়িয়েই গিয়ে থাকেন, সিবিআই সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারত। গিয়ে বলতে পারত, অনুমতি দিন। যে–‌নির্দেশ এল সর্বোচ্চ আদালতের কাছ থেকে, তা আগেই আসতে পারত এবং কোনও আপত্তি থাকত না রাজীব কুমারের। ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টে সিবিআই–‌এর পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল দাবি করেন, মামলার নথি নষ্ট করেছেন রাজীব, আরও লোপাট করার চেষ্টা করছেন। প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ বলেন, যদি প্রমাণ করতে পারেন যে, পুলিশ কমিশনার প্রমাণ নষ্ট করেছেন বা নথি লোপাট করছেন, এমন শাস্তি দেব ওঁকে, অনুতাপ করতে হবে। অবশ্যই কড়া বার্তা। পরদিন কিন্তু সিবিআই কোনও প্রমাণই পেশ করতে পারেনি। সুপ্রিম কোর্ট ন্যূনতম ভর্ৎসনা করেনি। ‘‌অনুতাপ’‌ করতে হয়নি রাজীব কুমারকে। উল্টে পরিষ্কার হয়ে গেল, কলকাতার পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ভিত্তিহীন। এজন্য লজ্জিত হলেন কি সিবিআই কর্তাদের ‘‌মনিব’‌ নরেন্দ্র মোদি?‌ না। লজ্জা ওঁর ধাতে নেই।
মিথ্যাচার কতটা, ভেবে দেখুন। রবিবার সন্ধের পর নগরপালের বাসভবনে নাকি সিবিআই গিয়েছিল ‘‌কথা বলতে’‌। রবিবার কথা?‌ সন্ধের পর কথা?‌ এবং প্রশ্ন, ‌‘‌কথা বলার’‌ জন্য ৪০ জনকে যেতে হয়। হ্যাঁ, সংখ্যাটা ৪০, ছাপার ভুল নয়। উদ্দেশ্য স্পষ্ট, তুলে আনা। গ্রেপ্তার করা। ৪ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট ‘‌নিরপেক্ষ স্থান’‌ শিলংয়ে কথা বলার নির্দেশ দিয়েছে। এবং বলে দিয়েছে, গ্রেপ্তার করা যাবে না। লজ্জা.‌.‌.‌ না, থাক।
যখন পুলিশ কমিশনারের বাসভবনে হামলা করতে গিয়েছে সিবিআই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বসে থাকলেন না। তাঁর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির পাশে এসে দাঁড়ালেন। গোটা ব্যাপারটাই রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের চক্রান্ত বুঝে, ধর্নায় বসার সিদ্ধান্ত নিলেন। কেউ কেউ ফিসফিস করলেন, ঠিক হল কি?‌ কোনটা ঠিক, জানেন তিনি। দেড় ঘণ্টার মধ্যে তাঁর প্রতিবাদকে সমর্থন জানালেন দেশের প্রায় সব বিরোধী দলের নেতারা। তাঁরা বুঝলেন, লোকসভা ভোটের আগে সর্বভারতীয় চক্রান্তের অংশ এই সিবিআই হামলা। বিশেষ করে তিন জনের সমর্থনের কথা আলাদা করে বলতে হবে। এক, রাহুল গান্ধী। টুইট করার আগেই ফোন করলেন। বুঝেছেন, এই ইস্যুতে নীরবতা তাঁর ও কংগ্রেসের বিজেপি–‌বিরোধিতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে। দুই, নবীন পট্টনায়ক। তাঁর দল বিরোধী শিবিরে নেই, ‘‌নিরপেক্ষ’, কিন্তু রাজ্যের বিরুদ্ধে কেন্দ্রের শয়তানি ইস্যুতে নীরব থাকলেন না। থাকা সম্ভব নয়। তিন, দীপঙ্কর ভট্টাচার্য। সেই দুপুরেই বামফ্রন্টের ব্রিগেডে প্রশংসিত বক্তা। অন্য বামপন্থীরা উল্টো পথে, সিপিআই(‌এমএল)‌ লিবারেশন নেতা সরাসরি কেন্দ্রের হামলার বিরুদ্ধে বিবৃতি দিলেন। 
সিবিআই তথা কেন্দ্রের লিখিত অভিযোগ, মমতার ধর্নামঞ্চে উপস্থিত ছিলেন রাজীব কুমার। প্রথমত, তাঁর এলাকার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী রাস্তায় বসেছেন, নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতেই হয়। ধর্নায় বসলেও মমতা ব্যানার্জি মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর পরামর্শ বা নির্দেশ যে–‌কোনও বিষয়ে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, মিথ্যা, মিথ্যা, মিথ্যা। ধর্নামঞ্চে ওঠেননি রাজীব কুমার। তখনও মঞ্চ তৈরি হচ্ছে, রাস্তায় বসে মমতা, সেখানে থাকা শুধু উচিত কেন, কর্তব্য নয় নগরপালের?‌ ৪৬ ঘণ্টায় একবারও ধর্নামঞ্চে ওঠেননি রাজীব কুমার। ছবি প্রকাশিত, দেখে নিন।
প্রায় সব বিরোধী দল একজোট। ‘‌প্রায়’‌ শব্দটা ব্যবহার করতে হচ্ছে, কারণ সিপিএম তথা বামফ্রন্ট প্রতিবাদ করেনি। উল্টে, পরদিনই মমতার বিরুদ্ধে পথে নেমে পড়ল সিপিএম। সরকার–‌বিরোধিতা নিশ্চয় করবেন, ইস্যু ঝাপসা হলেও। সারদা ইস্যুতে নামতেই পারেন পথে, কিন্তু একটা দিনও তর সইল না?‌ যখন রাজ্য মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিবাদে উত্তাল, দেশের সব বিরোধী নেতারা মুখর, তখন, তখনই, যখন ধর্না চলছে, পথে নেমে কটু কথা বলতে হল?‌ গোটা বিরোধী শিবির থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য এত চেষ্টা করতে হবে‌!‌
দেশে বিরোধী জোট আরও মজবুত হল। দিল্লিতে নেতারা বৈঠক করলেন, বিবৃতি দিলেন। মোদি বুঝলেন, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে চরম আক্রমণের বিরুদ্ধে জোট আরও সঙ্ঘবদ্ধ হল। এবং, প্রতিবাদের সামনে সেই মমতা। যাঁরা গালি দিতে চান দিন, মনে মনে মেনেও তো নিন!‌ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নজিরও গড়লেন মমতা। তৃণমূল কর্মীরা বিক্ষোভে নেমে পড়েছিলেন। শুরু হয়েছিল পথ অবরোধও। মমতা নির্দেশ দিলেন, বিক্ষোভ নয়, অবরোধ নয়। কর্মী–‌সমর্থকের ওপর এতটা নিয়ন্ত্রণ ক’‌জন নেতার থাকে?‌
পুলিশ কমিশনারের বাসভবনে হামলা করে রাজ্য প্রশাসনকেই সঙ্কটে ফেলে দিতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু, তিনি, মমতা ব্যানার্জি সঙ্কটে আরও শক্তিশালী। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, সাহস ও আত্মবিশ্বাস তাঁকে এই জায়গায় এনে দিয়েছে। কেন্দ্রের হামলা প্রতিহত। চক্রান্ত ব্যর্থ। 
আবার তিনি নিশ্চিত জয়ী। সঙ্কট তাঁকে শঙ্কিত করে না, শক্তি দেয়। নরেন্দ্র মোদি বুঝলেন, বাংলার মাটি দুর্জয় ঘাঁটি, 
বাংলার নেত্রী অপরাজেয়। সঙ্কট তাঁকে থমকে দেয় না, এগিয়ে দেয়।‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top