বাহার উদ্দিন: নাগরিকপঞ্জির হুমকিকে ঘিরে বাংলায়, বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক বাড়ছে। বাড়ছে মৃত্যু। এ পর্যন্ত ১০ জনের আত্মহত্যা ও মৃত্যুর খবর মিলেছে। বিভিন্ন এলাকায় হুমকি ও গুজব উড়ছে যে, পশ্চিমবঙ্গে নতুন পঞ্জি তৈরি হবেই। আবোল তাবোলের জব্বর হুঙ্কার— বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থনে যারা কথা বলবে, তাদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যাঁরা এরকম বলছেন, তাঁদের নেতৃত্ব বিদেশি বা অনুপ্রবেশকারীদের পরিসংখ্যানগত কোনও তথ্য এখনও পেশ করেননি। অহেতুক অশান্তির বিষবীজ বুনছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, বাংলায় এনআরসি হবে না। চেষ্টা হলে রাজ্য সরকার বাধা দেবে।
তবু উড়ন্ত গুজব আর ভয় থেকে সাধারণের রেহাই নেই। প্রতিটি জেলায় ডিজিটাল রেশন কার্ড তৈরি ও আধার কার্ড সংশোধন নিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে ছিন্নমূল হয়ে আশ্রিত হাজার হাজার মানুষ ও স্থানীয় কৃষিজীবী দরিদ্র পরিবার নথির খোঁজে হন্যে হয়ে ছুটছেন। এঁদের অনেকের বার্থ সার্টিফিকেট নেই। নেই জমির দলিলপত্র। অথচ ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে। রয়েছে রেশন কার্ড বা আধার কার্ড। এ সব কার্ডে নামের বানান ভুল। বাবার সঙ্গে ছেলেমেয়ের নাম–পরিচিতিতেও ত্রুটি আছে। তা বলে তাঁরা ভারতীয় নন, এমন প্রমাণ কোথায়? 
’‌৭১ সালের আগে নানা কারণে পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্তরে স্তরে হাজার হাজার মানুষ এসেছেন। বারবার নির্বাচনে ভোট প্রয়োগ করেছেন। কখনও কোনও সরকার তাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। দ্বিতীয়ত, আর্থিক অনটনে আজকের বাংলাদেশ থেকে দারিদ্র‌্যপীড়িতরা ভারতে ঢুকে পড়ছেন, এরকম অভিযোগও ধোপে টিকবে না। বাংলাদেশের আর্থ–সামাজিক উন্নয়নের কারণে ভারতমুখী দেশত্যাগ প্রায় বন্ধ। প্রতিবেশী দেশের শিক্ষিত, অল্পশিক্ষিত যুবশক্তি এবং কৃষক পরিবারের ছেলেরা পশ্চিম এশিয়া ও ইয়োরোপ–আমেরিকায় পাড়ি দিচ্ছেন, অতিরিক্ত আয়ের মোহে। আয় যে যৎসামান্য নয়, বাংলাদেশের সার্বিক বৃদ্ধি আর রেমিটেন্সে তার পরিষ্কার ছবি উঠে আসে। মাথাপিছু আয় ও সমূহ উন্নয়নের নিরিখে বিশ্বব্যাঙ্ক ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সংস্থা বাংলাদেশকে দুনিয়ার অন্যতম ‘‌টাইগার ফোর্স’‌ বলে অভিহিত করেছে। অর্থনীতির এই গতি কতটা স্থায়ী হবে, তা বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন। আমরা শুধু এইটুকুই বুঝতে পারছি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জন্য বাংলাদেশে ইন্টারনাল মাইগ্রেশন আছে, কিন্তু এ মাইগ্রেশনের প্রভাব মূলত ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেটমুখী, সম্ভবত খুব একটা ভারতমুখী নয়।
যাঁদের ‘‌ঘুসপেটিয়া অথবা উইপোকা’‌ বলা হচ্ছে, তাঁদের ভারত–প্রবেশ নিয়ে এ পর্যন্ত কোনও সমীক্ষা হয়নি। কেউ কেউ কষ্টকল্পিত হিসেব দিয়ে অভিযোগ তুলছেন, পশ্চিমবঙ্গে এঁদের সংখ্যা অন্তত ২ কোটি। প্রশ্ন উঠছে, এই বৃহৎ সংখ্যার হদিশ ওঁরা কোথায় পেলেন?‌ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় একই উপভাষায় সাধারণ মানুষ কথা বলেন। উচ্চারণ দেখে বোঝা কঠিন, তাঁরা কোন দেশের বাসিন্দা। উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, মালদা আর বিস্তৃত সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা যাঁরা, তাঁদের কারও উঠোন বাংলাদেশে, গৃহস্থল ভারতে। এ সব মানুষের রাষ্ট্রীয় পরিচয় কী? অনুপ্রবেশকারী? বাঙালি, বাংলাদেশি, না ভারতীয়? পরিচিতি নির্ণয়ের রাস্তা কী? গুজব না পরিসংখ্যান? বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষাই একমাত্র বলতে পারে, কে অনুপ্রবেশকারী, আর কে এদেশের বৈধ নাগরিক।
মোদ্দা কথা, অনুপ্রবেশের কল্পিত অভিযোগের পেছনে বিভাজন আর মেরুকরণের রাজনীতির জোর বড্ড বেপরোয়া, যুক্তিহীন। এরকম রাজনীতির প্রবক্তারা আতঙ্ক জাগিয়ে রাজনৈতিক ভিত শক্ত করতে চাইছেন। অসমে ষাটের দশক থেকে কখনও বহিরাগত, কখনও অনুপ্রবেশকারী, কখনও উদ্বাস্তু নাম দিয়ে অনুপ্রবেশের যে ভূত জাগিয়ে তোলা হয়েছিল, তার অতি উৎসাহী রাজনীতি অজানা নয়। ষাটের দশকে অসংখ্য ভারতীয় নাগরিককে মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে পূর্ব পাকিস্তানে ঠেলে পাঠানো হয়। ভয় দেখিয়ে ভোটব্যাঙ্ক তৈরির এই কংগ্রেসি প্রক্রিয়া পরে অন্যান্য দলেও প্রবেশ করে। গত শতাব্দীর শেষের দিকে, ১৯৬৯ সালে হঠাৎ শোনা গেল, লক্ষ লক্ষ বহিরাগত এসে অসম দখল করে নিয়েছে। কিছু দিনের মধ্যে বহিরাগত–বিরোধী আন্দোলন নাটকীয়ভাবে ‘‌বিদেশি খেদাও’‌ অভিযানের চেহারা নেয়। শুরু হয় হত্যা ও অগ্নিসংযোগ। শহুরে আর গ্রামীণ কৃষিজীবী বাঙালির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে ওঠে। তাঁদের বিপন্নতার সুযোগ নিয়ে অসম ছাত্র সংস্থা সহিংস–অহিংস আন্দোলনে ঝাঁপ দেয়। ভয়ঙ্কর গণহত্যার শিকার হয় নেলি ও গোহপুর। রাজ্যে তখন কংগ্রেস সরকার। তারা প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি বা সঙ্কটাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। কংগ্রেসের সংশয় আর অকর্মণ্যতার সুযোগ নিয়ে আসু তাদের আন্দোলনের গতি বাড়িয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর নির্দেশে অসম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ক্ষমতা ছাড়তে হয় তখনকার মুখ্যমন্ত্রী হিতেশ্বর শইকিয়াকে। ভোটে ক্ষমতায় আসে অসম গণ পরিষদ। কিন্তু দুই দফার শাসনপর্বেও তাঁরা লক্ষ লক্ষ বিদেশি খুঁজে পেলেন না। ট্রাইব্যুনাল গঠিত হল। ট্রাইব্যুনালও বিদেশি শনাক্ত করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। বিজেপি–র ক্ষমতারোহণের পরে,  কংগ্রেসের ঘোষিত প্রতিশ্রুতিতে পরোক্ষ সায় দিয়ে এনআরসি–র নামে যে নৈরাজ্য, যে ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার হাত থেকে ১৯ লাখ নাগরিকের রেহাই নেই। হয়রানি চলছে। এ সব নিজদেশে পরবাসীর ভবিষ্যৎ কী? মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের মতো অনিশ্চয়তাই কি তাঁদের নিয়তি?
পশ্চিমবঙ্গেও রাজনৈতিক কারণে অনুরূপ আবহ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করেছে বিভাজনের রাজনীতি। যে রাজনীতির সঙ্গে বৃহত্তর বাঙালি নিজেকে যুক্ত করতে আগ্রহী নয়। বহিরাগতদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় বাঙালি জাতিসত্তাকে, বাঙালির সৌহার্দ্যকে, চিরায়ত ঐতিহ্যকে সঙ্কট আর ভয়ের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাঙালির ঐক্য আর অস্তিত্বের সামনে আজ নতুন বিপদ। যাঁরা বাঙালি সত্তায় ফাটল তৈরিতে ব্যস্ত, তাঁরা অচিরেই বুঝতে পারবেন, এনআরসি–র হুমকি তাঁদের দিকেই বুমেরাং হয়ে ছুটে আসবে। প্রস্তাবিত নাগরিকত্ব বিল আইনে পরিণত হলে তাঁদের অনেকের গায়েও বিদেশি তকমা ঝুলতে থাকবে।
সব দেশে নাগরিকপঞ্জি আছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে থাকা উচিত। কিন্তু পঞ্জির নির্মাণ বা নবায়নে যদি গোষ্ঠীবিদ্বেষ, জাতিবিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অপকৌশল প্রবেশ করতে থাকে, তাহলে ভাবীকালের ইতিহাস জাতিসত্তা ও রাষ্ট্রীয় পরিচয়ে এ কৌশলকেই বিভেদের অনুপ্রবেশ বলে চিহ্নিত করবে। আমরা এখানে বলতে চাইছি, বিদেশি অনুপ্রবেশ যতটা না সমস্যা, তার চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ সামাজিক অসুখ ছড়াচ্ছে তথাকথিত অনুপ্রবেশের অভিযোগ। অসমে বারবার রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা ও গণহত্যা আমাদের এই ভাবনা ও উদ্বেগের নিকটতম দৃষ্টান্ত। আজ যাঁরা নতুন এনআরসি তৈরির হুমকি দিয়ে আতঙ্ক তৈরি করছেন, বিষিয়ে তুলছেন পারিপার্শ্বিকের বায়ু, একদা দেশহারা ভিটেহারা মানুষকে আবার ছিন্নমূল করে তোলার ছক কষছেন, বৃহৎকে চেপে রেখে ক্ষুদ্রকে বড় সাজানোর চেষ্টায় অবিরত, প্রায় অপ্রতিহত, তাঁদের আমরা কোন চোখে জরিপ করব? নির্বোধ ভাবাবেগ দিয়ে, না যুক্তি ও বিবেকের নিরন্তর বিস্তার ঘটিয়ে?‌

জনপ্রিয়

Back To Top