তাপস গঙ্গোপাধ্যায়: ভারতীয় জনতা পার্টি হিন্দিতে নিজের পরিচয় দেয় ভারতীয় জনসংঘের, যার প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং ড.‌ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি, গর্ভজাত একমাত্র সন্তান বলে। জনসঙ্ঘের জন্ম ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে। এর ঠিক এক বছর আট মাস বাদে ড.‌ মুখার্জির মৃত্যু হয় শ্রীনগরে। জনসঙ্ঘ এবং পরে বিজেপি গত ৬৪ বছর ধরে দাবি করে এসেছে, ড.‌ মুখার্জির ‘‌মৃত্যু অত্যন্ত অস্বাভাবিক ও রহস্যজনক’‌। এই মৃত্যুর জন্য তারা ঘুরিয়ে দায়ী করেছে দেশের তদানীন্তন দুই প্রধানমন্ত্রীকে— ভারতের পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং তখনকার জম্মু–‌কাশ্মীরের শেখ আবদুল্লাকে। এবং যখন যে দল কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসেছে, বিজেপি ওই রহস্যজনক মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি করেছে। শুধু দু’‌বার এই দাবি ওঠেনি। প্রথমবার ১৯৯৯ থেকে ২০০৪, এই পাঁচ বছর যখন অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে বিজেপি ছিল দিল্লিতে ক্ষমতায়। দ্বিতীয়বার ২০১৪–‌র মে মাস থেকে অদ্যাবধি, যখন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সাড়ে তিন বছর ক্ষমতা নিরঙ্কুশভাবে ভোগ করছে।
নিজেদের সরকার পাঁচ বছর টানা ক্ষমতায় রইল গত শতাব্দীর শেষ বছর ও চলতি শতাব্দীর প্রথম চার বছর, তবু কেন তদন্তের দাবি উঠল না?‌ এর জবাব দিয়েছেন তথাগত রায়, ত্রিপুরার বর্তমান রাজ্যপাল তাঁর বই ‘‌দ্য লাইফ অ্যান্ড টাইমস অফ ড.‌ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি:‌ আ কমপ্লিট বায়োগ্রাফি’‌ বইটিতে। বইটির প্রকাশ ২০১২ সালে। তখন তথাগতবাবু অবশ্য রাজ্যপাল হননি। উনি বইটিতে লিখেছেন, বাজপেয়ীর আমলে তদন্তের দাবি ওঠেনি কোয়ালিশন সরকারের বাধ্য‌বাধকতায়‌। বাজপেয়ীর এনডিএ সরকার তখন চলছিল ২৪টি দলের সহযোগিতায় যার অন্যতম ছিল ওই জম্মু–কাশ্মীরের ন্যাশনাল কনফারেন্স, যার প্রতিষ্ঠাতা স্বয়ং শেখ আবদুল্লা আর তাঁরই ছেলে ড.‌ ফারুক আবদুল্লা তখন বাজপেয়ীর মন্ত্রিসভার সদস্য। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা–‌সভাপতি শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন অটলবিহারী।
কিন্তু কোয়ালিশনের কাঁটা তো এবার মোদি সরকারের নেই। মোদি এনডিএ সরকারের নামাবলি গায়ে জড়ালেও ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে তাঁর উদ্বেগের কোনও কারণ নেই। ৫৪২ সদস্যের লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ২৭২ জন এমপি। বিজেপি‌র এবার নিজেরই আছে ২৮২ জন। তাছাড়া এনডিএ–‌র লোকসভার সদস্যসংখ্যা ৩৩০–এ‌র বেশি। তবু গত সাড়ে তিন বছরে শ্যামাপ্রসাদের রহস্যজনক মৃত্যুর তদন্ত চেয়ে দাবি কেন উঠল না বিজেপি‌র নিজের ঘরে?‌ কেনই বা মোদি সরকার নিজের থেকেই এ ব্যাপারে কোনও তদন্ত কমিশন গঠন করেনি?‌ অথচ যখন ক্ষমতায় ছিল না, তখন বোফর্স কামান থেকে সাম্প্রতিককালে টুজি টেলিকম কেলেঙ্কারি, কয়লাখনি কেলেঙ্কারি, কমনওয়েলথ গেমস কেলেঙ্কারি, মুম্বইয়ের আদর্শ হাউসিং কো–‌অপারেটিভ সোসাইটি কেলেঙ্কারি— প্রতিটি ক্ষেত্রে সরকারি বক্তব্য নস্যাৎ করে তদন্ত কমিশনের দাবিতে বিজেপি আকাশ ফাটিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী থেকে ক্ষমতাসীন দলের চুনোপুঁটি নেতাদের কুশপুতুল পুড়িয়েছে। দিনের পর দিন সংসদ এবং সংশ্লিষ্ট বিধানসভা অচল করে রেখেছে। অথচ এর কোনও কিছু না করে এবার যখন সেই সুযোগ জনগণই ভোটের মাধ্যমে তাদের হাতে তুলে দিল, তখন দেখছি তদন্ত কমিশন নিয়ে বিজেপি‌র অন্দরে মর্গের নীরবতা। না প্রধানমন্ত্রী, না দলের সভাপতি, মায় শ্যামাপ্রসাদকে যে বিজেপি ‘‌পশ্চিমবঙ্গের স্রষ্টা’‌ বলে দাবি করে, সেই পশ্চিমবঙ্গের দুই নেতা দিলীপ ঘোষ ও রাহুল সিনহা এ ব্যাপারে স্পিক‌টি–‌নট। সবচেয়ে বড় কথা, খোদ বিজেপি‌ই জম্মু–কাশ্মীরের ক্ষমতার অর্ধেক দখল করে আছে। আর তার জোটসঙ্গী মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মেহবুবার দল পিডিপি তো ন্যাশনাল কনফারেন্সকে ভোটে হারিয়েই বিজেপি‌র হাত ধরে ক্ষমতায় আছে। তদন্তে যদি জানা যায়, শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুর জন্য প্রত্যক্ষভাবে দায়ী শেখ আবদুল্লা এবং পরোক্ষে পণ্ডিত নেহরু, তাহলে তো শেখ–‌এর নাতি ওমর আবদুল্লা এবং নেহরুর দৌহিত্র রাজীব গান্ধীর পুত্র রাহুলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ চিরকালের মতো ব্ল্যাক হোলে ঢুকে যাবে। তাহলে গোটা দেশে এবং বিশেষ করে জম্মু–কাশ্মীরে বিজেপি‌র সত্যিকারের কোনও প্রতিপক্ষই তো থাকবে না। তবে কেন বিজেপি‌র সর্বভারতীয় নেতৃত্ব এ ব্যাপারে চোখে ঠুলি পরে বসে আছেন?‌ বাংলায় যে দিলীপ ঘোষ কথায় কথায় শব্দের তরোয়াল ঘোরান, এ ব্যাপারে কেন তিনি আজও নীরব?‌
সবচেয়ে বড় কথা, শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুতে ষড়যন্ত্রের যে তত্ত্ব তথাগতবাবু তাঁর বইতে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছেন, তিনি তো বহু ইস্যুতেই দেখি রাজ্যপাল হয়েও হিরণ্ময় নীরবতা পালন না করে বাঙ্ময় হয়ে পড়েন, তবে কেন তাঁরই লেখা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রতিষ্ঠার জন্য তদন্ত চাইছেন না?‌ তাহলে কি ধরে নিতে হবে, বিজেপি ক্ষমতায় না থাকলে, বিশেষ করে কংগ্রেস এবং তার দোসর জম্মু–কাশ্মীরে ন্যাশনাল কনফারেন্স ক্ষমতাসীন হলেই বিজেপি‌র কোমরবন্ধে গোঁজা ষড়যন্ত্রের তরোয়াল খাপমুক্ত হয়ে ঝলসাবে?‌ বিপরীতে খাপেই থাকবে সেটা?‌ এ দুটি প্রশ্নের উত্তর আজ কে দেবে?‌
নাকি ধরে নিতে হবে ছেলে শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুতে শোকাতুর মা যোগমায়াদেবী সেদিন নেহরুর শোকবার্তার জবাবে যে তদন্তের দাবি করেছিলেন, তা যতটা আবেগ‌নির্ভর, ততটা বাস্তব‌ভিত্তিক নয়?‌ বরং নেহরু মায়ের দাবির উত্তরে চিঠিতে যে কথা লিখেছিলেন তিনি নিজে কয়েকটি বিশ্বস্তসূত্র থেকে জেনেছেন, মৃত্যুর কারণ ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক এবং ওই সময় ওই পরিস্থিতিতে ওই নিশাতবাগ এলাকায় চিকিৎসার তাবৎ সুযোগ শ্যামাপ্রসাদকে বাঁচানোর জন্য কাজে লাগিয়েও কোনও ফল হয়নি। যোগমায়াদেবীর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নেহরু মেনে নেননি বলে বিজেপি তাঁকেই সেদিন কাঠগড়ায় তুলেছিল?‌ আজ যখন সব সুযোগ হাতের কাছে মজুত তখন কেন সেই সুযোগ বিজেপি কাজে লাগাচ্ছে না?‌ ‌‌‌‌

বিজেপি দপ্তরে শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি

জনপ্রিয়

Back To Top