ধ্রুবজ্যোতি নন্দী: সাংবাদিক–সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বললেন, ‘এই যে পেট্রোলের–ডিজেলের দাম লিটারে ২.৫০ টাকা করে কমানো হল, এর ফলে দেশের মানুষের বেশ কিছু টাকা সাশ্রয় হবে, তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, দেশের অর্থনীতির পালে লাগবে সুবাতাস। একেই বলে আর্থিক সুনীতি।’ দেশের অর্থনীতি মজবুত দেখালে যাদের লাভ সবচেয়ে বেশি, সেই শেয়ারবাজারের তো জেটলির বৃহস্পতিবারের ঘোষণায় নেচে ওঠার কথা। তার বদলে আমরা দেখলাম জেটলির সাংবাদিক–সম্মেলনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শেয়ারবাজার দ্রুত পড়তে শুরু করল। সেই পতন শুক্রবার যে শুধু অব্যাহতই রইল তা নয়, এক দিনে সেনসেক্সের মহাপতন হল ৭৯২ পয়েন্ট। সন্ত্রাসের সমার্থক দুটো শব্দ উঠে এল বিনিয়োগ মহলে– ব্ল্যাক ফ্রাইডে। বৃহস্পতি আর শুক্র মিলিয়ে সেনসেক্স পড়ল প্রায় ১৬০০ পয়েন্ট, সপ্তাহজুড়ে ১৮৫১ পয়েন্ট। টাকার অঙ্কে হিসেব করলে বাজারে থাকা শেয়ারের দাম এক সপ্তাহে কমে গেল প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকা! তবু জেটলি, ভারত সরকারের প্রধান সেবকের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি যখন বলছেন, দেশের অর্থনীতির পালে সুবাতাস লেগেছে, নিশ্চয়ই লেগেছে।
শেয়ারবাজারের বর্ণময় ইতিহাসে অবশ্য এমন মহাপতনকে ঠিক নজিরবিহীন বলা যাবে না। এই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি মোদি সরকারের শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেটে জেটলি তাঁর সুনীতিমালা পেশ করার পরের দিন কয়েক ঘণ্টার কেনাবেচায় সেনসেক্স পড়েছিল ৮৪০ পয়েন্ট। কিন্তু তখন না হয় শেয়ার বিক্রির লাভের ওপর ট্যাক্স বাড়িয়েছিলেন জেটলি। বাজারের রাগ দেখানোর একটা কারণ ছিল। কিন্তু এই অক্টোবরের শুরুতে এমন উন্মত্ত রাগের কারণ কী?
খোঁজখবর নিয়ে দেখা যাচ্ছে, কারণ দুটো। বাজারের প্রত্যাশা অগ্রাহ্য করে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সুদের হার ০.২৫% না বাড়িয়ে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা একটা কারণ, যার কথা অনেকেই বলছেন। কিন্তু আসল কারণ, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক প্রকাশনায় লেখালেখি শুরু হয়েছে, তা হল জ্বালানি তেলের দাম কমানোর পুরো দায়টা সরকার নিজের কাঁধে না নিয়ে অংশত দেশের তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর ওপর চাপিয়ে দিয়ে আর্থিক সংস্কারের উল্টোপথে হাঁটা। ভারতীয় অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক আস্থাটাই নড়ে গিয়েছে তার ফলে।  
ব্যাপারটা একটু বিশদে বলা যাক। মোদি সরকার ঢাক–ঢোল পিটিয়ে পেট্রোল–ডিজেলের দাম লিটার পিছু ২.৫০ টাকা করে কমানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে জানাল, এর মধ্যে শুধু ১.৫০ টাকার দায়ই নেবে সরকার। আর্থিক বছরের বাকি কটা মাসে সে বাবদ সরকারের রাজস্ব ক্ষতি ১০,০০০ কোটি টাকার মতো। আর, বাকি ১ টাকার দায় বইতে দেশের তেল বিপণন কোম্পানিগুলোকে এই ক–মাসে ৭,০০০ কোটি টাকার ক্ষতি সামলাতে হবে। টাকার অঙ্কটা, দেখাই যাচ্ছে বিরাট কিছু নয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটা সরকারি আর্থিক নীতির দর্শন এক ধাক্কায় উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। 
স্বাধীনতার পর থেকে জ্বালানি তেল আমাদের দেশে রাজনৈতিক পণ্য হয়েই ছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ওঠা–নামার সঙ্গে দেশের বাজারে তার দামের সম্পর্ক থাকত না। ভোটে সুবিধে–অসুবিধের কথা ভেবে তার দাম ঠিক করত সরকার। তাকে আর যাই বলা যাক, আর্থিক সুনীতি বলা যায় না। দীর্ঘদিনের চেষ্টায় দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের শেষপর্বে পেট্রোলের দাম সরকারি নিয়ন্ত্রণ–মুক্ত করা সম্ভব হয়।
নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ডিজেলকেও বের করে আনা হয় সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দাম তখন হু হু করে কমছে। অবস্থা দেখে মোদি নিজেকে মস্ত ‘নসিবওয়ালা’ ভাবলেন। তাঁর মনে হল, এটা রাজস্ব বাড়িয়ে নেওয়ার মস্ত সুযোগ। ভেবেই জ্বালানি তেলের ওপর কেন্দ্রীয় কর একটানা বাড়িয়ে গেলেন মোদি। কতটা বাড়ালেন? ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে পেট্রোলের ওপর এক্সাইজ ডিউটি ছিল লিটার পিছু ১০.৩৫ টাকা। বাড়াতে বাড়াতে সেই এক্সাইজ ডিউটিকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মোদি সরকার নিয়ে গেল ২২.০৪ টাকায়। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ডিজেলের ওপর এক্সাইজ ডিউটি ছিল লিটার পিছু ৪.৪৭ টাকা। বাড়াতে বাড়াতে সেই এক্সাইজ ডিউটিকে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে মোদি সরকার নিয়ে গেল ১৭.৮৯ টাকায়। তার মানে, ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে মোদি সরকার এক্সাইজ ডিউটি বাড়িয়েছিল পেট্রোলের ওপর লিটার পিছু ১১.৬৯ টাকা আর ডিজেলের ওপর লিটার পিছু ১৩.৪২ টাকা। কিন্তু চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। ইতিমধ্যেই ২০১৬–র ফেব্রুয়ারি থেকে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক দাম একটানা বেড়েই চলেছে। এক্সাইজ ডিউটির নতুন বোঝার ফলে দেশের বাজারে পেট্রোল–ডিজেলের দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। অগত্যা, ২০১৭ সালের নভেম্বরে পেট্রোল–ডিজেলের এক্সাইজ ডিউটি একবার কমানো হল লিটার পিছু ২ টাকা। তারপর ২০১৮ সালের অক্টোবরে ৫ রাজ্যের ভোট এসে গেছে দেখে আর একবার কমানো হল লিটার পিছু ১.৫০ টাকা। তার পরেও কিন্তু মোদি জমানায় চাপানো পেট্রোলের ওপর লিটার পিছু ৮.১৯ টাকা এবং ডিজেলের ওপর লিটার পিছু ৯.৯২ টাকা বাড়তি এক্সাইজ ডিউটি বহাল। সুতরাং, পেট্রোল–ডিজেলে লিটার পিছু ১০ টাকা কর কমানোর যে দাবি মমতা ব্যানার্জি তুলেছেন, তার যথেষ্টই যৌক্তিকতা আছে। মোদি–জেটলি–মমতা সবাই অবশ্য জানেন, সে দাবি মানতে গেলে ভারত সরকার লাটে উঠবে।
কিন্তু লিটার পিছু ২.৫০ টাকা দাম কমাতে গিয়ে জেটলি যে ১ টাকা চালান করে দিলেন তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর ঘাড়ে, সেইখানেই গনগনে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এ কাজ করতে গিয়ে, মানে আরও ৭০০০ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতির ঝুঁকি নিতে না–পেরে মোদি–জেটলি বস্তুত পেট্রোল–ডিজেলের দামে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে এনেছেন। এই উল্টোপথে হাঁটাকে মোটেই ভাল চোখে দেখছে না দেশি এবং বিদেশি বিনিয়োগ মহল। প্রশ্ন উঠে গেছে সরকারের সামগ্রিক আর্থিক দৃষ্টিকোণ নিয়েই। জ্বালানির দামের ধাক্কায় টাকার দাম ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক তলানিতে, একটা ডলার কিনতে লাগছে অবিশ্বাস্য ৭৪ টাকা! এরপর দেশের আর্থিক নীতির সুস্থিতির ওপর বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমা মানেই শেয়ারবাজারে বিক্রির ঢেউ, আর সেই বিক্রির টাকা ডলারে রূপান্তরিত হয়ে বিদেশে ফিরে যাওয়া। মানে, টাকার দাম আরও আরও আরও কমা। মানে, পেট্রোল–ডিজেল আরও মহার্ঘ হওয়া। অর্থনীতি মহল ইতিমধ্যেই এর নাম দিয়েছে মোদি’জ পেট্রোল ট্র্যাপ। রসিকতা চালু হয়েছে, কে আগে সেঞ্চুরি করবে, পেট্রোল না ডলার? এই মারণ ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার বিচক্ষণতা, না মোদি সরকারের কাছ থেকে আশা করার মানেই হয় না। শেয়ারবাজারের মহাপতন সেই ইঙ্গিতই দিয়ে গেল।‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top