অরূপ বসু: বাবা–মা আদর করে বলতেন রামপ্রসাদ। চাটগাঁয়ের রামপ্রসাদ কলাগাছের ভেলার মতো ভাসতে ভাসতে কলকাতা, বাংলা, ভারত, লন্ডন, এডিনবরা ইংল্যান্ড। তারও পরে জার্মানি, রাশিয়া, আমেরিকা। ইউরোপ আদর করে ডাকতে শুরু করল ‘‌রবিন’।‌ বাংলার রামপ্রসাদ হয়ে গেলেন রবিন সেনগুপ্ত। প্রফেসর ডা.‌ আর পি সেনগুপ্ত বললে তো দুটো নামই বোঝায়।
সেপ্টেম্বরের গোড়ায় এক অদ্ভুত অভিযান বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। কিংবদন্তি নিউরো সার্জেন প্রফেসর ডা.‌ আর পি সেনগুপ্ত ফিরে গেছিলেন চাটগাঁয়ে। ৬ সেপ্টেম্বর চাটগাঁয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাস্তার নাম রাখা হল ‘‌প্রফেসর ডা.‌ আর পি সেনগুপ্ত সড়ক’। পুরসভার পক্ষ থেকে ঘোষণা করলেন মেয়র আজম নাসিরুদ্দিন। সড়কটি ১ নম্বর ওয়ার্ডে। হাজির ছিলেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর তৌফিক আহমেদ চৌধুরি। ভিটে ছাড়ার ৬৪ বছর পর ঘরে ফিরেছিলেন রামপ্রসাদ। কাছেই হাটহাজারী উপজেলা। সেখানেই একটি গ্রাম ফতেয়াবাদ। ১৯৩৯ সালে সেখানেই রবিনের জন্ম। ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে বন্দিরহাট শৈলবালা স্কুলে তাঁর লেখাপড়া শুরু। অভাবী ঘরের মেধাবী ছাত্র। বাবা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক। তাতে আবার সমাজসেবী। ফলে, সে আমলেও বন্ধুদের বই থেকেই পাঠ্য টুকে নিতে হত। ১৯৫৩ সালে ফতেয়াবাদ আদর্শ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকে স্কলারশিপ। দু’‌বছর বাদে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ইন্টার মিডিয়েট। কলকাতার ন্যাশনাল মেডিক্যাল‌ কলেজে ভর্তি হলেন। স্বপ্ন ডাক্তার হবেন।
১৯৬১ সালে কলকাতা যখন রাজনৈতিক কারণে তপ্ত, লন্ডন পাড়ি দিলেন। চাটগাঁও তাঁর কাছ থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে। একদা পূর্ববাংলা পূর্ব পাকিস্তান হয়েছে। রামপ্রসাদের কথায় চাটগাঁইয়া টান একদিনের জন্যও মুছে যায়নি। আজও। বিলেত যাওয়ার পর দশ বছরের চেষ্টায় রয়্যাল কলেজ অফ সার্জারির ফেলো হলেন। ফিরে এলেন ভারতে। পছন্দ মতো কাজ পাননি। ১৯৭৩ সালে দিল্লির সফদরজং হাসপাতালে কাজ জুটল। স্বদেশে পূজ্যতে রাজা, বিদ্বান সর্বত্র পূজ্যতে। গাঁয়ের ছেলে রবিন চাণক্যর কথা ভোলেননি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো সার্জেন ডা.‌ উইলিয়াম সুইটের ডাক পেলেন। ১৯৪৮ সালে ইংল্যান্ডে ন্যাশনাল হেল্প সার্ভিস শুরু হয়েছে। লন্ডনের নিউ ক্যাসেল হাসপাতালে যোগ দিলেন। আজও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। বরং তাঁর কাজে ও আন্তরিকতায় মুগ্ধ ব্রিটিশ ক্রাউন। তাঁর সম্মানে নিউ ক্যাসেল অপারেশন থিয়েটারের নাম ডা.‌ রবিন সেনগুপ্ত অপারেশন থিয়েটার। তাঁকে নিয়ে বিবিসি ফিল্ম করেছে। অডিও ক্যাসেট করেছে।
লন্ডনে স্থায়ী কাজের সুযোগ পেয়েও বসে থাকেননি। ইয়োরোপ ও আমেরিকায় নিউরো সার্জারির নব নব দিগন্তে ছুটে গেছেন। ১৯৭০ সালে জুরিখে প্রফেসর ইয়াসার গিলের সঙ্গে কাজ করেছেন। লন্ডনের স্যর অফ কেয়ার্নস মেমোরিয়াল স্কলার, ১৯৭৪ সালে ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালে এবং হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলে কাজ করেন। একদিন যাঁকে উপযুক্ত সম্মান দিতে দ্বিধা করেছিল ভারতের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান, লন্ডন, ডারহাম, এমআইটি, হার্ভার্ডকে দেখে টনক নড়ল। ২০০৯ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি এবং ২০১০ সালে ড.‌ এম জি আর মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভিজিটিং হন।
১৯৭৩ সালে ডেভিড ডিকসন পদক দিয়ে শুরু। তারপর কেয়ার্নস মেমোরিয়ালস স্কলার, নিউরো সার্জেন অফ দ্য মিলেনিয়াম, পদকের শেষ নেই।
অবিভক্ত ভারতের মাটি মানুষকে কখনও ভোলেননি। বাংলার বুকে দুনিয়ার সেরা নিউরো সায়েন্স বিষয়ক চিকিৎসা পৌঁছে দিতে চাইতেন। মন্ত্রী থেকে সাধারণ মানুষ সবার কাছে সহযোগিতা চাইতেন। কত লোকের অপমান, অবহেলা— হাল ছাড়েননি। ১৯৭৭ সালে পিয়ারলেসের সহযোগিতায় একটা নিউরো সায়েন্স সেন্টার শুরু হয়। তবু সেটা তাঁর মনের মতো হয়নি। সেটা হল আরও পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কলকাতা পুরসভার সহযোগিতায় ন্যাশনাল নিউরো সায়েন্স সেন্টার ইন কলকাতা। ভাবনায় আছে সহযোগিতা পেলে চট্টগ্রামেও এরকম একটা গড়ে তুলবেন। কাছের মানুষরা বলেন তাঁর বয়স উল্টোদিকে বাড়ে।
বছর কুড়ি আগের কথা। ক্যালকাটা হসপিটালে শব্দদূষণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে মৃতপ্রায় এক যুবকের মা ভরত মহারাজের সাহায্য নিয়ে রবিন সেনগুপ্তের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। লন্ডন থেকে উড়ে এসে যুবকটিকে বাঁচিয়ে দেন তিনি। তখনই ঠিক করেন এখানে লন্ডন, হার্ভার্ডের মানে চিকিৎসা কেন্দ্র গড়বেন। আজও থামেননি। ছুটে চলেছেন চট্টগ্রাম, ভারতীয় বৌদ্ধদের পীঠস্থান, আবার মগ, আরাকানদের যুদ্ধভূমি। রামপ্রসাদের রক্তে তাই উদারতা ও লড়াই— পাশাপাশি বহমান। 

ডা. আর পি সেনগুপ্ত

জনপ্রিয়

Back To Top