দীপ্তেন্দ্র রায়চৌধুরী: ঠিক দুশো বছর আগে ভিমা–কোরেগাঁওতে একটা যুদ্ধ হয়েছিল। ছত্রপতি শিবাজির সময় যে মাহার সম্প্রদায় তাঁর বাহিনীতে যুদ্ধ করতেন, পরবর্তিকালে পেশোয়ারা তাঁদের সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে দেন। তাঁরা যে ‘‌অচ্ছুত’‌, সেই কথাটা তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া হতে থাকে সব সময়ে। মাহাররা পরে ব্রিটিশ বাহিনীতে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান। সেই সময় ইংরেজদের সঙ্গে মারাঠাদের তিন–তিনটে যুদ্ধ হয়েছিল। তৃতীয়টা চলে ১৮১৬ থেকে ১৮১৯ পর্যন্ত। ওই সময় খড়কি নামক একটা জায়গায় ব্রিটিশদের কাছে হেরে গিয়ে পেশোয়ার সেনারা পুনের দিকে রওনা দেয়। পথে ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন ফ্রান্সিস স্টওনটন ১৮১৮ সালের পয়লা জানুয়ারি তাঁর ৮০০ মাহার যোদ্ধা নিয়ে ভিমা নদীর ধারে কোরেগাঁওতে পেশোয়ার বাহিনীকে আক্রমণ করেন। পেশোয়ার দু’‌হাজার সেনা পরাস্ত হন মাহার রেজিমেন্টের হাতে। এই ঘটনার দুশো বছর পূর্তিকে বড় করে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন প্রকাশ আম্বেদকরের
ভারিপ বহুজন মহাসংঘ থেকে শুরু করে অসংখ্য ছোটবড় দলিত সংগঠন। আর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জাতি–সংঘর্ষ বাধে মহারাষ্ট্রে।
সাধারণত, এই ধরনের সংকটের সময় সব দলের রাজনৈতিক নেতারা প্রথমে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করেন। দোষারোপের রাজনীতি তোলা থাকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরবর্তী পর্বের জন্য। রাজ্য বা দেশের সামগ্রিক স্বার্থে কোনও রাজনীতিকদের মধ্যে গত অন্তত তিন দশক ধরে একটা ঐকমত্য গড়ে উঠেছে। অশান্তি, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার মতো ঘটনা যখন ঘটছে, তখন তা থেকে রাজনৈতিক ফয়দা তোলার চেষ্টা কেউ এখন আর করেন না। এই বছরের প্রথম দিন পর্যন্ত সেই ধারা অব্যাহত ছিল। হঠাৎই দেখা গেল রাহুল গান্ধী সেই ঐকমত্য ভাঙলেন। তিনি টুইট করলেন, ‘‌আরএসএস–বিজেপির ফাসিস্ত দৃষ্টিভঙ্গির একটা মূল স্তম্ভ হল দলিতদের ভারতীয় সমাজের সব থেকে নীচের তলায় ফেলে রাখা। উনা, রোহিত ভেমুলা ও ভীমা–কোরেগাঁও হল প্রতিরোধের শক্তিশালী প্রতীক।’‌ প্রথম বাক্যটা তাঁর বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যটি থেকে, খুব কম করে বললেও, তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ছবিই সামনে আসে। যে সময়ে তিনি টুইট করলেন, মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন শহর তখন জ্বলছে এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে। যে ব্যক্তির মৃত্যু হয় তিনি দলিত নন, মারাঠা। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তাঁর জামায় শিবাজির ছবি থাকায় তাঁকে মারাঠা বলে শনাক্ত করে পিটিয়ে মারা হয়। এই ঘটনাকে রাহুল মনে করেন ‘‌প্রতিরোধের শক্তিশালী প্রতীক’‌?‌ 
রাহুলকে কারা ২ জানুয়ারির ওই ঘটনা নিয়ে তথ্য দিয়েছিলেন বা তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেছিলেন, জানা নেই। হয়তো এই ব্যক্তি তাঁর নব্য বন্ধু জিগনেশ মেবানি। গুজরাট পেরিয়ে মহারাষ্ট্রেও তিনি হাজির হয়েছিলেন এই প্রতিরোধের ভিত্তিভূমি তৈরি করতে। এখন প্রতিরোধ মানে যদি আগুন, খুন ইত্যাদি হয়, তা হলে সভ্য সমাজে তার কোনও স্থান নেই। দলিতদের ওপর অত্যাচার আমাদের সমাজের প্রাচীন সমস্যা। মহারাষ্ট্রেই ২০০৬ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর খইরলানজি গ্রামে একটি দলিত পরিবারের চারজনকে পিটিয়ে মারেন কুনবি জাতের মানুষেরা। পরিবারের দুই মহিলাকে নগ্ন করে গ্রামে ঘোরানো হয়। সে সময় কংগ্রেস–এনসিপি সরকার ছিল ওই রাজ্যে। কিন্তু এই ঘটনার, বা পরবর্তী সময়ে অন্যান্য অত্যাচারের দায় কোনও একটি বিশেষ দলের ওপর চাপানো একেবারেই অনর্থক। সেদিনের ‌খইরলানজির ঘটনার কারণ, ওই পরিবার তাঁদের জমি কুনবিরা দখল করে নিয়েছে বলে পুলিসে রিপোর্ট করেছিলেন। তারপরেও তাঁদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি প্রশাসন। সারাক্ষণ নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভবও নয়। যা প্রয়োজন, তা হল মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার। কারণ শিক্ষাই পারে আদিম সংস্কারগুলো থেকে মানুষকে বের করে আনতে। কংগ্রেস কিন্তু মানুষের মধ্যে চেতনার প্রসার ঘটাতে তেমনভাবে কোনও দিনই উদ্যোগী হয়নি। রাহুলের প্রতিরোধের তত্ত্ব তাই নিছক উসকানি ছাড়া অন্য কোনওভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
সেই সঙ্গেই আমাদের ভাবতে হবে, পেশোয়ার বিরুদ্ধে মাহারদের জয়ের ঘটনার স্মারক জয়ন্তী হিসেবে আজ পালন করা উচিত কি না। সহজ কথা হল, এদেশে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পেশোয়াদের অত্যাচারের শিকার শুধু মাহাররা নয়, আরও অনেকের মতো বাঙালিরাও। বর্গির আক্রমণে পূর্ব ভারতে কত মানুষের প্রাণ গিয়েছে তার কোনও হিসেব নেই। তা হলে আমরা কি মারাঠাদের বিরুদ্ধে রাগে ফুঁসব?‌ আজ যে দেশ ভারত নামে পরিচিত, তার প্রায় প্রতিটি জনগোষ্ঠী অন্য কোনও না কোনও জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছে। মুসলিম শাসকেরা অজস্র মন্দির ভেঙেছেন। তার বিরুদ্ধে রাগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কি কোনও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সমর্থন করবেন?‌ ঠিক তেমনই পেশোয়াদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর জয়কে স্মরণ করা কি শুধু বিভেদ উসকে দেওয়া নয়?‌ ইতিহাস বলছে, সে সময় পেশোয়ার বাহিনীতে অনেক আরব সৈনিক কাজ করতেন। তাঁরাও কি ব্রাহ্মণ্যবাদ রক্ষার জন্য লড়ছিলেন?‌ অথবা, যদি পেশোয়ার বাহিনীতে অনেক দলিত থাকতেন, তাহলে কি মাহাররা তাঁদের বিরুদ্ধে লড়তেন না?‌ এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর নিয়ে নিজেদের সঙ্গে তঞ্চকতা আমরা করতেই পারি। তাতে বিভাজনের আগুন উসকে দেওয়া সহজ হবে। দেশের যাবতীয় উন্নতি স্তব্ধ করে দিয়ে নেমে আসবে অরাজকতা। আমরা কি তাই চাই?‌ আমাদের সন্তানদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ডুবিয়ে দেওয়াই কি আমাদের উদ্দেশ্য?‌
জিগনেশ মেবানি যে কথা বলতে পারেন, সেকথা রাহুল গান্ধীর বলা সাজে না। রাহুল কোনও সম্প্রদায়ের নেতা নন। তাঁর লক্ষ্য তো দেশের নেতা হওয়া। গুজরাটে প্রচারের সময়েও রাহুল গান্ধী ক্রমাগত দেশের শিল্পপতিদের আক্রমণ করে গিয়েছেন। মানুষকে প্রশ্ন করেছেন, আদানিদের বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ায় আনওদলন হলে এদেশে হচ্ছে না কেন?‌ তিনি কি জানেন না, শিল্পের অগ্রগতি ছাড়া দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়?‌ কারণ, শিল্পের প্রসার সরকারকে বাড়তি রাজস্ব এনে দেয়। তা দিয়ে পরিকাঠামো ও গরিব মানুষের উন্নতি করা যায়। রাহুল কখনও শিল্পপতিদের বিরোধিতা করে, কখনও জাতিদাঙ্গাকে ‘‌প্রতিরোধ’‌ বলে উল্লেখ করে নৈরাজ্যের বীজ বুনছেন। তিনি জানেন, তাঁর দল এতটাই পরিবার–নির্ভর যে তিনি কিছু বললেই নিজস্ব বিবেক বর্জন করে দলের বড়ছোট সব নেতা তাঁকে খুশি করতে দৌড়বেন। তা সত্ত্বেও তিনি বারবার এমন সব কথা বলছেন যা আখেরে দেশকে দুর্বল করবে। কোথাও পাকিস্তান বিন্দুমাত্র সাফল্য পেলে তিনি সোল্লাসে নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করতে নেমে পড়ছেন। রাহুলের বোঝা দরকার, তিনি বা নরেন্দ্র মোদিরা আসেন, চলে যান। আজ এক রাজনৈতিক দলের উত্থান হয়, কাল সেই দল কোথায় হারিয়ে যায়!‌ আজ যিনি দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা, কাল তিনি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু দেশ থাকবে। দেশকে দুর্বল করার হাজারো সম্ভাবনা শেষ করে দিয়ে ভারত শক্তিশালী হচ্ছে। একজন দায়িত্বশীল নেতাকে সেই শক্তিশালী ভারত গড়ার সৈনিক হতে হয়। 
জওহরলাল নেহরু থেকে ‌শুরু করে বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীরা সেই সৈনিক হওয়ার চেষ্টা করেছেন এবং করছেন। তাঁদের প্রত্যেকের অনেক খামতি, কিন্তু প্রত্যেকেই যে নিজের বিশ্বাসমতো দেশকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন তাতে সংশয় নেই। নিজ নিজ রাজ্যে মমতা ব্যানার্জি থেকে মেহবুবা মুফতি, নীতীশ কুমার থেকে নবীন পট্টনায়ক, চন্দ্রবাবু নাইডু, সকলেই নিজের নিজের বিশ্বাসমতো সেই চেষ্টাটাই করছেন। সেই ভূমিকা যদি রাহুল নিতে না–পারেন, তাহলে ক্ষতি তাঁরই। দেশ কিন্তু ঠিকই এগিয়ে চলবে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top