দীপাঞ্জন চক্রবর্তী: ‘‌মৃতদেহ কথা বলে’‌। প্রায় ১৪০০ বছর পুরনো এই প্রাচীন চৈনিক প্রবাদটি আজকের ভারতবর্ষেও কতটা প্রযোজ্য, তা ভাবলে অবাক লাগে। ১৯৮৪। ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীর হাতে মৃত। সহানুভূতির ঝড়ে পরবর্তী নির্বাচনে ধূলিসাৎ বিরোধীরা। ১৯৯১। শ্রীপেরামবুদুরে মানববোমায় ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায় রাজীব গান্ধী। আবার সেই একই প্রতিক্রিয়া, সহানুভূতি। ভেসে যায় বিরোধীরা সহানুভূতির ভোটে। অপ্রত্যাশিত ভাবে ফিরে আসে ক্ষমতায় কংগ্রেস।
২০১৯। দেশের অর্থনীতি এবং বাকি অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি দমবন্ধ করা চাপের সৃষ্টি করতে শুরু করেছে শাসকদলের ওপর। আম্বানি, আদানি, চোসকি ইত্যাদি মহাপুরুষদের কালো ছায়া ক্রমশ ঢেকে দিতে চলেছে স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষের সবথেকে বড় বিপণন বিশেষজ্ঞ স্বপ্নের কারবারি নরেন্দ্র মোদির ওপর। নির্বাচন আসন্ন। ভারতের মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে কোথায় গেল পনেরো লাখ, কোথায় গেল দু’‌কোটি চাকরি, ‘‌আচ্ছে দিন’‌ তো দূরের কথা, মানুষের জীবনযাপন হয়ে উঠেছে বিভীষিকাময়।
এসে গেল ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯। কেঁপে উঠল ভূস্বর্গ কাশ্মীর। কেঁপে উঠল গোটা ভারতবর্ষ। সন্ত্রাসবাদীর আঙুল ঠিক করে দিল কখন রিমোট কন্ট্রোলের বোতামটা টেপা হবে এবং মুহূর্তে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে ৪০–এর বেশি সিআরপিএফ জওয়ান। বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিল পুলওয়ামা। কিছু লোক তুলতে শুরু করল সেই প্রশ্ন। তারা মুহূর্তের মধ্যে দেশদ্রোহী উপাধিও পেয়ে গেল। একশো দিনের মধ্যে সেই বিপণন বিশেষজ্ঞ উগ্র জাতীয়তাবাদের ঝোড়ো হাওয়ায় উড়িয়ে দিলেন সম্মিলিত বিরোধীদের। মহারাজা এবার হলেন সম্রাট। একার কৃতিত্বে ৩০৩। সত্যিই কি একার কৃতিত্বে, নাকি ওই ৪০– এরও বেশি শহিদের রক্তমাংস দিয়ে তৈরি হল নতুন মসনদ। সম্রাটের জন্য।
৪০–এরও বেশি জওয়ান অসহায় মৃত্যুবরণ করল, তাতে কি ‘‌কারওর’‌ ভাল হল, নাকি ‘‌কারওর’‌ ভাল করার জন্যই তাদের এই অসহায় আত্মসমর্পণ এবং বীভৎস মৃত্যুকে মেনে নেওয়া।
ভারত সরকারের সর্বোচ্চ কমান্ডোবাহিনী এনএসজি এবং ‘‌র’‌–‌এর দীর্ঘ দু’‌দশকের অভিজ্ঞতা আমাকে বলতে আজ বাধ্য করছে কোথাও একটা পচনের গন্ধ কিন্তু রয়েই গেল। অনেক প্রশ্ন ভিড় করে আসছে। আজ থেকে এক বছর আগেও প্রশ্নগুলো করেছিলাম বিভিন্ন সংবাদপত্রে, বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে। দেশদ্রোহী উপাধি পাওয়া ছাড়া কোনও প্রশ্নেরই উত্তর পাওয়া যায়নি। আজ এক বছর পরেও সে প্রশ্নগুলো আবার তুলছি।
পুলওয়ামা বিস্ফোরণের ঠিক ৬ দিন আগে জম্মু–‌কাশ্মীর পুলিশের এক সিনিয়র অফিসারের স্বাক্ষর করা একটি সরকারি নির্দেশনামা সিআরপিএফ, জম্মু–‌কাশ্মীর পুলিশ, আইবি এবং সামরিকবাহিনী–‌পুলিশ যৌথ কমান্ডোর সর্বোচ্চ অধিকারীদের কাছে পৌঁছে যায় (‌আমার কাছে এই দলিলের প্রতিলিপি রয়েছে)‌। তৎকালীন জম্মু–‌কাশ্মীরের রাজ্যপাল টিভি চ্যানেলের সামনে ঘটনার দিনই স্বীকার করেছিলেন এই নির্দেশনামার ব্যাপারে। যেখানে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, খুব শীঘ্রই সামরিক বা আধাসামরিকবাহিনীর ওপর অত্যন্ত বড় মাপের আইইডি হামলা হতে চলেছে। তার পরেও সিআরপিএফ এত বড় কনভয় নিয়ে কী করে বাধ্যতামূলক আকাশপথে নজরদারি ছাড়াই এতটা রাস্তা প্রায় ৭৮টি গাড়ি এবং ২৫০০–এর বেশি লোক নিয়ে যাত্রা করেছিল। কেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সিআরপিএফ–‌এর আবেদন এই এত বড় বাহিনীকে আকাশপথে নিয়ে যাওয়াকে অস্বীকার করে, না মঞ্জুর করে।
একজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই প্রশ্ন আমি করতেই পারি— এত বড় ইন্টেলিজেন্সের ব্যর্থতা কী করে হল?‌ নিজে কাশ্মীর উপত্যকায় বেশ কিছু বছর কাজ করার অভিজ্ঞতা দিয়ে জানি বিশেষ করে কাশ্মীর উপত্যকায় প্রতিটি জেলা বা শহর শুধু নয়, প্রতিটি গ্রামেও আইবি, কাশ্মীর পুলিশের হাজার হাজার ‘‌চোখ এবং কান’‌ ছড়ানো আছে। প্রতিটি গাড়ির গ্যারাজ, প্রতিটি মোবাইলের দোকান এই ‘‌চোখ–‌কান’‌–‌এর নজর এড়িয়ে কিছু করতে পারে না। এমনকী প্রতিটি মুদির দোকানের ওপরেও শ্যেনদৃষ্টি থাকে গোয়েন্দাদের। কোনও বাড়িতে স্বাভাবিকের থেকে যদি দশ কিলো চালও বেশি যায়, সেই খবর পৌঁছে যায় গোয়েন্দাদের কাছে। গ্রামের কথা তো ছেড়েই দেওয়া যাক, কোনও বাড়িতে কোনও অতিথি এলে সেই খবর সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় পৌঁছে যায়। এই পরিস্থিতিতে কী করে পাচার হল তিনশো কিলো আরডিএক্স। গোয়েন্দা দপ্তর কি ঘুমিয়েছিল?‌ নাকি তাদের ঘুমোতে বলা হয়েছিল?‌
ঘটনার চার মাস পরে রাজ্যসভার সদস্য সৈয়দ নাসের হোসেনের তোলা 'Unstarred question No. 513, dared 26 June, 2019'‌ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের রাজ্যমন্ত্রী জি কিষান রেড্ডি সংসদে দঁাড়িয়ে লিখিত জবাবে সরাসরি জানিয়ে দেন পুলওয়ামায় কোনও ইন্টেলিজেন্স ব্যর্থতা হয়নি। যেহেতু Unstarred question‌, সংসদের বিধি অনুযায়ী এই উত্তরের ওপর অন্য আর কোনও প্রশ্ন করা যায় না। সাংসদ নাসের হোসেনের লিখিত প্রশ্ন ৩০০ কিলো আরডিএক্স নিয়ে সেই ঘাতক গাড়িটি কীভাবে সিআরপিএফের কনভয়ে আক্রমণ করতে পারল, তার কোনও উত্তর মন্ত্রী মহাশয়ের লিখিত উত্তরে পাওয়া গেল না। অতঃপর পুলওয়ামার ব্যর্থতা (‌!‌)‌ নিয়ে সম্রাটের মাথাব্যথা আপাতত ধামাচাপা পড়ল। দু’‌মাসের মধ্যেই ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নিল, কাশ্মীর উপত্যকায় অত্যন্ত জরুরি এবং গোপনীয় যোগাযোগের জন্য সরকারের সর্বোচ্চ মহলে ৯৯টি স্যাটেলাইট ফোন দেওয়া হবে। দু’‌দিনের মধ্যে ‘‌সর্বোচ্চ গোপনীয়তা’‌ সত্ত্বেও পাকিস্তানের ডন পত্রিকা এবং কুপওয়ারা নিউজে ছেপে দিল সেই ৯৯টি স্যাটেলাইট ফোন নম্বর এবং তার ব্যবহারকারীদের নাম (‌এর বিস্তারিত দলিলও আমার কাছে আছে)‌।
এই দুটো ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমরা কতটা নিরাপদ রয়েছি, আমাদের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বন্দোবস্ত কতটা পেশাদার। আমি নিশ্চিত আজ পর্যন্ত গত এক বছরে কাশ্মীর পুলিশ, সিআরপিএফ, আইবি অথবা ‘‌র’‌ কোনও তদন্ত কমিটি গঠন করে পুলওয়ামা ষড়যন্ত্রের সত্য নির্ধারণ করতে পারেনি অথবা করতে চায়নি। না হলে অবশ্যম্ভাবীভাবেই এই সব কমিটির রিপোর্টগুলো বাইরে বেরিয়ে আসত। এর থেকে একটি মাত্র সিদ্ধান্তেই আসা যায়। ক্ষমতার সর্বোচ্চ জায়গায় বসে থাকা কেউ বা কারা কি চাইছে না পুলওয়ামা ষড়যন্ত্রের সত্য বেরিয়ে আসুক?‌ তা হলে কি অনেক অপ্রিয় সত্যও বেরিয়ে আসতে পারে?‌ পুলওয়ামা ষড়যন্ত্র এবং তার পরে সরকারের অদ্ভুত
‌‌‌নীরবতা মনে করিয়ে দেয়, বহু বছর আগের এক অসাধারণ সংবাদপত্র শিরোনাম ‘‌নো ওয়ান কিল্ড জেসিকা লাল’‌।
যে দেশে দীর্ঘ দশ বছর আইনি লড়াই লড়তে হয় আধাসামরিকবাহিনীর নিহত জওয়ানদের ‘‌শহিদ’‌–‌এর মর্যাদা দেওয়ার জন্য, যেখানে দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদের একচ্ছত্র অধিপতি মহামহিম সম্রাট এবং তার মহাশক্তিধর অনুচর, ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে বিন্দুমাত্র সহযোগিতা, সহমর্মিতা পাওয়া যায় না। যে দেশে মারগাঁওয়ে বিস্ফোরণ কাণ্ডে অভিযুক্তা প্রতিরক্ষা দপ্তরের স্ট্যান্ডিং কমিটির মেম্বার হতে পারে, যে দেশে চিফ অফ আর্মি স্টাফ সামরিক পোশাক পরেই ভিন্ন রাজনৈতিক মন্তব্য করতে পারে সে দেশে সরকারের কাছ থেকে ফৌজ–‌ফৌজিদের কোনওরকম প্রত্যাশা না থাকাই ভাল।
এই লেখা শেষ করছি একটি আশা এবং আশঙ্কা দিয়েই। ভারতের অর্থনীতি এই মুহূর্তে সর্ব নিম্নস্থলে, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন ভয়াবহ বাজারের জন্য হাঁসফাঁস করছে, গত চার দশকের সর্বনিম্ন অবস্থা কর্মসংস্থানে, দেশজুড়ে আগুন জ্বলছে সিএএ এবং এনআরসি নিয়ে। সেই বিখ্যাত বিপণন বিশেষজ্ঞ সম্রাটের আবার প্রয়োজন পড়বে না তো আর একটি পুলওয়ামার। যাতে দেশপ্রেমের সুনামি আছড়ে পড়তে পারে ভারতবর্ষজুড়ে এবং একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে দাগিয়ে দেওয়া যায় এক বিশেষ রঙে।
আমি বিশ্বাস করি না সব কিছুই অন্ধকার এবং ঘোর অমানিশায় ঢাকা। নো ওয়ান কিল্ড জেসিকার পরেও কিন্তু জনতার দাবিতে তৎকালীন সরকার বাধ্য হয় নতুন করে তদন্ত শুরু করার। পরিণাম আজ ইতিহাস। বিকাশ যাদব এবং মনু শর্মা আজও জেলের অন্ধকার ঘরে বসে দিন গুনছে। শুরুতেই লিখেছিলাম মৃতদেহ কথা বলে। জেসিকালাল বলেছে চল্লিশেরও বেশি আমার সহকর্মীর মৃতদেহরাও কথা বলবে আজ না হয় কাল। কিন্তু বলবেই। কেউ পার পাবে না। অপেক্ষা শুধু সেই সময়ের।জয় হিন্দ।
(‌লেখক প্রাক্তন এনএসজি এবং ‘‌র’‌–‌এর কর্তা‌‌)‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top