পৃথ্বীন্দ্র চক্রবর্তী: রবীন্দ্রনাথের নামটি উল্লেখ করতে হলে আমার বাল্যকালে আমি এবং আমাদের বাড়ির সকলেই গুরুদেব শব্দটি ব্যবহার করতাম। বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষকদের আদেশে গুরুদেবকে রবীন্দ্রনাথ বলতে শিখলাম। 
১৯৪১ সালের জুন মাস থেকে গুরুদেব শয্যাশায়ী। ওঁর প্রস্টেট গ্ল্যান্ডের সমস্যা ও স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের অবস্থা গুরুতর হলে ২৫ জুলাই শান্তিনিকেতন আশ্রম থেকে কলকাতায় গেলেন চিকিৎসার জন্যে। বোলপুর রেল স্টেশন যাওয়ার পথে সেদিন শহরের বহু লোক ওঁর মোটরগাড়ির দু’‌পাশে দঁাড়িয়ে ওঁকে দেখতে এলেন। তঁার রোগমুক্তি কামনা করে বিদায়–‌নমস্কার জানালেন।
কলকাতার জোড়াসঁাকোর বাড়িতে উঠলেন। ওই বাড়িতেই ওঁর জন্ম বাংলা ১২৬৮ সালের ২৫ বৈশাখ। ওখানে চিকিৎসা হল বটে, তবে শরীরের অবস্থার অবনতিই হতে থাকল। ওঁর শেষ রচনা ‘‌তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি’‌ এই কবিতাটি মুখে–‌মুখে বলে গেলেন। এর অনুলিখিত রূপটি ‘‌শেষ লেখা’‌ বইটিতে অন্তর্ভুক্ত আছে। ৩ আগস্ট থেকে স্বাস্থ্য খুবই খারাপ হতে থাকল। অবশেষে ৭ আগস্ট দুপুর সাড়ে বারোটার সময় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, রাখিপূর্ণিমা তিথির অবসান কালে।
শান্তিনিকেতন আশ্রমে শোকের ঘন ছায়া নেমে এল। শান্তিনিকেতনের আশপাশের শহর ও গ্রামের লোকজনও দুঃসংবাদটি জানল। আমাদের গ্রাম আশ্রমের অদূরে, পুব দিকের বর্ধমান–‌সাহেবগঞ্জ লুপ রেলপথের ওপারে সুরুল–‌গনুটিয়া সড়কের ওপর, ছাতিমতলা থেকে চার কিলোমিটারের মতো হঁাটা পথ। আমাদের গ্রামের অনেক লোক তখন আশ্রমের নানা বিভাগে কাজ করত। তাদেরই একজন বাবাকে এসে খবরটি দিলে দুপুরের একটু পরেই।
বাবা বাড়িতেই ছিলেন। বাবা আমাদের বাড়ির দক্ষিণ বারান্দাতে এসে একটি মোড়া টেনে নিয়ে তাতে চুপচাপ বসলেন। এই প্রথম ওঁর চোখ ছলছল হতে দেখলাম।
বিশ শতকের প্রথম দশকের দিকে আমার পিতৃদেব দিল্লিতে থাকতেন। সে–‌সময়, মনে হয় ১৯০৯ সালের দিকে, গুরুদেব কন্যা মীরাকে নিয়ে উত্তর–‌পশ্চিম ভারতের কালকায় কিছু দিন ছিলেন। কলকাতা ফেরার পথে দিল্লিতে কয়েক দিন থাকার সময় আমার পিতৃদেব কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ওঁর কাছে গিয়েছিলেন। সে–‌সময় ওই যুবকদের শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মবিদ্যালয় দেখে আসতে আহ্বান জানান গুরুদেব। আমার পিতৃদেব উৎসাহ দেখিয়েছিলেন। এবং পরে নন্দবাবু নামে আর–‌একজন শান্তিনিকেতনে আসার অভিপ্রায় জানিয়েছিলেন। বাবা নন্দবাবুর পরিচয় পেলেন শান্তিনিকেতনে আসার পর। বাবার থেকে বয়সে একটু বড়। নিজেকে বলতেন গৃহী সন্ন্যাসী। শান্তিনিকেতন আশ্রমে আসার আগে বারো বৎসর উনি স্নান করেননি। অস্থিরমতি নন্দবাবু আশ্রমে বেশি দিন থাকলেন না। বাবাকে গুরুদেবের পছন্দ হল, আশ্রমের চিকিৎসা কেন্দ্রের কাজ দিলেন। সঙ্গে বিদ্যালয়ে পড়ানোর কিছু কাজও। আশ্রমের রীতি অনুসারে ওখানকার কর্মী ও শিক্ষকদেরকে ডাকনামে, মানে সম্বোধনে, তঁাদের প্রথম নামের শেষে দা শব্দটি (‌অর্থাৎ দাদা)‌ ব্যবহৃত হত। যেমন ভূপেন্দ্রনাথকে ভূপেন‌দা, জগদানন্দ রায়কে জগদানন্দদা ইত্যাদি। অবশ্য বিধুশেখর শাস্ত্রীকে শাস্ত্রীমশাই, ক্ষিতিমোহন সেনশাস্ত্রীকে ক্ষিতিদাদু বলা হত। কিন্তু বাবার সময়কার প্রাক্তন আশ্রমিকেরা বাবাকে মাস্টারমশাই বলতেন।
আশ্রমে কাজ করার সময়েই, মনে হয় মায়ের ইচ্ছেয় ও কিছুটা শখে, বাবা এখনকার প্রান্তিক রেল স্টেশনের কাছেই পুব দিকে এবং ওখান থেকে ক’‌পা একটু এগিয়ে গনুটিয়াগামী সড়কের আশপাশে এবং আদিত্যপুর গ্রামের কোপাই নদীর উত্তরে–‌দক্ষিণে কিছু জমি–‌জায়গা কিনেছিলেন, একটু একটু করে প্রায় দু’‌দশক ধরে। পরে উনি একটি দেওয়াল–‌ঘেরা কুটিরও বানিয়েছিলেন ওই গ্রামে। শুধু বাবাই নন, আশ্রমের ছাত্রপ্রিয় অধ্যাপক ও বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান–‌বিষয়ক বই–‌লেখক জগদানন্দ রায় এবং আশ্রমের গ্রন্থাগারিক ও রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ও ওই গ্রামে জমি–‌জায়গা কিনেছিলেন। কিন্তু ওঁরা কেউ গ্রামে বসবাস করেননি। বাবা গ্রামে চলে এসেছিলেন এবং ওখান থেকে হেঁটে আশ্রমে গিয়ে কাজকর্ম করতেন আরও ক’‌বছর।
আমার জন্ম ওই গ্রামে। এবং জ্ঞান হওয়া অবধি দেখেছি, আমাদের গোটা পরিবার আমরা আদিত্যপুরেই রয়েছি। 
১৯৩৯ সালের ৭ পৌষের অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। সেদিন আমরা একটু আগে আগেই পৌঁছেছি। মন্দিরের পাশেই বোলপুর থেকে গোয়ালপাড়া হয়ে সিউড়ি যাওয়ার রাস্তার কোনায় তখন একটা প্রকাণ্ড বটগাছ ছিল। ওর নীচে গাড়িটা রাখা হল। আমরা মন্দিরের কাছে এলাম।
তখনও গুরুদেব এসে পৌঁছোননি। বাবা তো ওঁর বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নমস্কার বিনিময়ে আলাপে ব্যস্ত। মায়ের ইঙ্গিতে মন্দিরের ভিতরে ঢুকতে যাচ্ছি, এমন সময় গুরুদেব এলেন। ওঁকে অনেক লোক ঘিরে ধরল, তার পর ওঁকে মন্দিরের ভিতর আপ্যায়ন করে বসানো হল ওঁর নির্দিষ্ট আসনে। ওঁর ঠিক বঁা দিকে আমরা ভাইবোনেরা বসলাম। মা–‌ও বসলেন আমাদের সঙ্গে। বাবা বসলেন ওঁর বন্ধু সহ–‌আশ্রমিকদের সঙ্গে।
সেদিনকার মন্দিরের অনুষ্ঠানের একটা আবছা ছবি আমার মনের মধ্যে আছে। আমার বয়স তখন প্রায় ৯। মন্দিরের ভিতরে উপাসনায় অংশগ্রহীতারা শান্ত ভাবে বসে। মন্দিরের বাইরেও অনেক লোক। কোনও চিৎকার হইহুল্লোড় নেই। বেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ ভিড়।
আমাদের গ্রামে আদিত্যপুরে অনুষ্ঠিত পুজোপার্বণ তো অনেক দেখেছি। যদিও গৃহস্থ–‌গৃহস্থিনীদের ভক্তিশ্রদ্ধার অভাব ছিল না, কিন্তু প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানেই বিশৃঙ্খলা চাক্ষুষ করে অস্বস্তি ভোগ করেছি। ছেলেবেলায় এই সব অনুষ্ঠানে ঢাক–‌ঢোল–‌কঁাসরের বাজনাটা খুব আকর্ষণীয় ছিল অবশ্য। শান্তিনিকেতনের মন্দিরের উপাসনায় এ ধরনের বাজনার আড়ম্বর ছিল না। তবে এস্রাজ ও খোল–‌সহযোগে গানগুলি হত অত্যন্ত সুচারু ভাবে। মন্দিরের মৃদু–‌মধুর ও স্পষ্ট উচ্চারণে গাওয়া গানগুলি ও গুরুদেবের ভাষণই ৭ পৌষের সকালের উপাসনা অনুষ্ঠানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় ছিল আমার কাছে।
সেদিন গুরুদেব ওঁর ভাষণে কী বলেছিলেন তা আমার মনে নেই। কিন্তু ওঁর মধুর দরদি আবেগঋদ্ধ কণ্ঠটি এখনও আমার কানে লেগে আছে।
গুরুদেবের তিরোভাবের অব্যবহিত পরে অনুষ্ঠিত ওঁর শ্রাদ্ধবাসরের স্মৃতি এখনও আমার মনে জাগরূক।
আশ্রমের চিঠি এল রথীদার কাছ থেকে। শ্রাদ্ধের সময়–‌তারিখ উল্লেখ করে। শ্রাদ্ধের দিন সকালবেলায় আমি আর বাবা গেলাম আশ্রমে হেঁটে। সেদিন আকাশ মেঘলা ছিল সকাল থেকে। যত দূর মনে পড়ে, এই প্রথম বোধ হয় আমি আমাদের গ্রাম থেকে শান্তিনিকেতন হেঁটে গেলাম।
সে–‌সময় আমাদের গ্রাম, আদিত্যপুর থেকে শান্তিনিকেতন যাওয়ার সুচিহ্নিত কোনও হঁাটা পথ ছিল না। সুরুল–‌গনুটিয়া সড়কটিকে আমরা বলতাম সরান। ওই সরান দিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিণ–‌পশ্চিম মুখে গিয়ে সঁাওতালপাড়ার উত্তর পাশে ডাঙার ভিতর দিয়ে এগিয়ে রেলপথের লেভেল ক্রসিংয়ে গিয়ে পড়লাম। এই লেভেল ক্রসিংটাকে আমরা বলতাম ফটক। এই ফটকটা পার হয়ে ফঁাকা ডাঙা এবং খোয়াই পেরিয়ে রতনপল্লী হয়ে শান্তিনিকেতনের কেন্দ্রে এসে পৌঁছোলাম।
শ্রাদ্ধবাসরে আসা মাত্রই টুপটাপ করে একটু বৃষ্টি পড়া শুরু হল। জায়গাটা সুন্দর ভাবে সাজানো ছিল। মাথায় চঁাদোয়া এবং অনেকটা বসার জায়গা। আমরা গিয়ে বসলাম।
অনুষ্ঠানের আচার্য ছিলেন ক্ষিতিদাদু। ব্রাহ্ম রীতি অনুযায়ী বৈদিক মন্ত্র ও গান–‌যোগে অনুষ্ঠান। ‘‌সমুখে শান্তিপারাবার’‌, ‘‌ঐ মহামানব আসে’‌ এবং আরও কয়েকটি গান গাওয়া হল। গায়কদের মধ্যে শান্তিদেবদার মুখ্য ভূমিকা ছিল। ব্রাহ্মণদের শ্রাদ্ধকীর্তির মতো নানা ক্রিয়াচারে পূর্ণ দীর্ঘ অনুষ্ঠান নয়। বেশ সুষ্ঠু ভাবে অনুষ্ঠানটি সমাপ্ত হল। সঙ্গে সঙ্গে আর এক প্রস্থ হালকা বৃষ্টিও হল।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আমরা বেশ কিছুক্ষণ আশ্রমে ছিলাম। বাবা তো অনেকের সঙ্গে কথাবার্তায়, আলাপ–‌বিনিময়ে বেশ কিছুটা সময় ব্যয় করলেন। গ্রামে ফেরার উদ্যোগের মুখে বাবা বললেন, ক্ষণজন্মা মানুষটি চলে গেলেন। হঁাটা রাস্তায় পড়ার পর, আবার বললেন, শুধু স্বজন–‌পরিজন নয়, সমস্ত প্রকৃতি আজ কঁাদছে।
সারা পথটাতেই টিপটিপ করে বৃষ্টি পেয়েছিলাম।‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top