পবিত্র সরকার: আমি কোনওদিন ভাবিনি যে, বই আমার জীবনে একটা ঘটনা হবে। পূর্ববঙ্গের সেই কোন এঁদো গ্রামের বালক, যার বাড়িতে পঞ্জিকা আর লক্ষ্মীর পাঁচালি ছাড়া আর বিশেষ বইপত্তর ছিল না, তার এ রকম ভাবার কথাও নয়। হ্যাঁ, ইশকুলে ঢুকেই কাল হল, ছাপার অক্ষরে লেখার প্রতি একটা অসুস্থ আকর্ষণ তৈরি হল— রাস্তা থেকে হ্যান্ডবিল পর্যন্ত কুড়িয়ে নিয়ে পড়তাম। তো বই পড়তেই হয়, অন্ততপক্ষে নোটবই, কিন্তু তার বাইরে বই পড়ার যে কোনও মানে বা দরকার আছে, সেটা ছেলেবেলায় কেউ তেমন করে বুঝিয়ে দেয়নি। কিন্তু ক্লাসে প্রাইজ পেলে বা শহর থেকে জামাইবাবু একটা বই নিয়ে গেলে তা গোগ্রাসে পড়ার একটা রাক্ষুসে ইচ্ছে তৈরি হয়ে গিয়েছিল।
এটা কোনও ব্যক্তিগত বাহাদুরি বা বিজ্ঞাপনের ব্যাপার নয়। আমার চেয়ে হাজারগুণ বই পড়ে, আর পড়েছে, এমন লোক হাজার হাজার আছে। আবার হয়তো এ কথাও ঠিক যে, আমার মতো এবং আবালবৃদ্ধবনিতা আরও অনেকের মতো বইয়ের ব্যাপারে উৎসাহী নয়, এমন লোকও প্রচুর আছে। সেই বহুগ্রন্থগ্রাসী এবং গ্রন্থবিমুখ যে মানুষের মই,
তার কোনও একটা মধ্যবর্তী ধাপে আমার অবস্থান, এইটুকু দাবি করতে পারি। এই অপ্রিয় দাবি এখানেই নিরস্ত করে বলি, জীবনের বহু সময় বই দেখলে মনটা মিষ্টান্নবুভুক্ষুর মতো লোভী হয়ে উঠত। এখন কী হয় সে কথায় পরে আসব। বই, তা সে যাই হোক, যে রকমই হোক, যে অবস্থাতেই হোক (‏‏‏ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া বইও তুলে নিয়েছি হাতে) যেখানেই হোক, দেখলে মনটা উচাটন হত, ভাবতাম দেখি বস্তুটার মধ্যে কি আছে। আমি জানি, এ ব্যাপারে আমি পৃথিবীতে এক আর অদ্বিতীয় নই, পৃথিবীতে আরও হাজার-হাজার লোক এটা করে থাকে। ইদানীংকার কিছু ছেলেছোকরাও এ ব্যাপারে আমাকে টেক্কা দেয়। কিন্তু ব্যক্তিগত আখ্যানে নিবদ্ধ থেকেই বলি, বিশ্বভুবনে আর কলকাতায় বইমেলা শুরু হওয়ার আগে, আমার বইমেলা আরও অনেকের মতোই ছিল লাইব্রেরি আর বইয়ের দোকান— যেখানে অনেক বই থাকে, অনেক রকমের বই থাকে। সকলের বেলাতেই নিশ্চয়ই তাই। লাইব্রেরিতে জুড়ে গিয়েছিলাম বালককাল থেকেই, নিজেও প্রচুর বই সংগ্রহ করেছি— এখন সেগুলি নিয়ে কী করব তাই নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। বড় হয়ে লায়েক হয়ে কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ চষেছি, গড়িয়াহাটের গোলপার্কের কাছাকাছি ফুটপাথ, ওয়েলিংটন স্কোয়ারের কাছে লেনিন সরণি, কখনও দিল্লির কনট সার্কাসের বইয়ের দোকানের অলিগলি, এমনকী রোববারে লালকেল্লার পিছনের উটকো বাজারের পুরনো বইয়ের ঢল। কিছুদিন দিল্লির বইমেলা হত দিল্লি ইউনিভার্সিটির মধ্যেই, তখন সেখানেও গেছি। তখনকার মাদ্রাজ স্টেশনের পাশে কোনেমেরা বুক স্টল থেকে অনেক পুরোনো বই পেয়েছি। দেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার–টেমিনার উপলক্ষে গেলে, সেখানে বই সাজিয়ে বসত দোকানদার, সেখানেও ঘুরঘুর করতে ছাড়িনি। লন্ডনের ফয়েল নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান, সেটাও দেখেছি, খুচখাচ বই কিনেছি। এর মধ্যে জাপানের কিয়োতোতে পর পর দু-বার যাওয়া হল, সেখানে চারতলা জোড়া একটা বইয়ের দোকানে নিয়ে গেল ছাত্র ও’নিশি আর দুর্গা দত্ত, দেখে তো আমি মুহ্যমান। ইংরেজি বইই দুটো তলা জুড়ে। সেখানেও দু-একটা বই কিনতে হল, না কিনলে অভদ্রতা করা হয়। গরিব দেশের লোক সম্বন্ধে ওদের ধারণা খারাপ হবে। কিন্তু শেলফে সাজানো হাজার হাজার বই নিছক দেখে বেড়ানোরও যে একটা যে একটা প্রবল আনন্দ আছে, বইয়ের ‘উইন্ডো শপিং’এর, সে কথাও তো সকলেই জানেন। তবে নতুন ইংরেজি বই, বিদেশে ছাপা, কিনতে তো গা করকর করে। ডলারে, পাউন্ডে ইউরোতে সব দাম, পকেট থেকে বার করতে গা ঘেমে যায়, ‘পোচ্চোন্ডো’ জলতেষ্টা পেয়ে যায়। তবে এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চ আর ফুর্তি ছিল আমেরিকায়, যেখানে কিছুদিন থাকার সুযোগ হয়েছিল (এই সুযোগে আর-একবার আমার আমেরিকায় থাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে নিলাম)। সেখানে নতুন বই পেট-গুড়গুড়-করা দামে বিক্রি হত ঠিকই। মনে আছে চম্‌স্কির একটা আশি পৃষ্ঠার বই কিনেছিলাম আশি ডলার দিয়ে। কিন্তু পুরোনো বই পাওয়া যেত একেবারে জলের দামে। আর পুরোনো মানে পোকা-ধরা, পাতা খুলে আসছে, মলাট উধাও এমন বই নয়, সবই অটুট, ঝকঝকে আর প্রায় নতুন সব বই। হয়তো একবার পড়েই সে বইয়ের মায়া ত্যাগ করে পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছাত্রটি, মুদ্রা ফ্যালো, বই তোলো। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা পড়ার ‘টার্ম’ যখন শেষ হত, তখন দেখতাম, আগেকার টার্মের পাঠ্য বই এসে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেকার চত্বর বা ‘কোয়াড্র্যাংগ্‌ল’-এর মাঝখানে রাস্তায়, যেন কেউ রোদে শুকোতে দিয়েছে অজস্র বই। আর দামও রোমহর্ষক। মূল দাম চল্লিশ ডলার, কিন্তু বইয়ের মলাট ওলটালেই দেখবে লেখা আছে ফুটকি দিয়ে পঞ্চাশ সেন্ট, এক ডলারের অর্ধেক। সব বিভাগের সব কোর্সের বই, ইংরেজি সাহিত্য, সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান— কী নয়? আমরা, তৃতীয় বিশ্বের (তখনও তা ছিল) হাভাতে লোকেরা তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়তাম, যার দু’‌হাতে আগলে তুলে নিতাম। আমরা টোনাটুনি যে পাড়ায় থাকতাম, সেই ৫৩তম স্ট্রিটে একটা দোকান ছিল স্কলারশিপ শপ নামে। সেখানেও এই রকম জলের দামে বই পেয়েছি, জলের দামে পুরনো শীতের পোশাকও। এই সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার প্রশ্ন কখনও করিনি যে, এ কেমন বিদঘুটে স্বভাব রে তোদের? পড়া শেষ হল তো প্রায় ফোকটে ঝেড়ে দিলি এমন দামি বইগুলো? এ কি আমাদের মতো ভিখিরিদের উব্‌গারের জন্যে, না এর ভেতরে আর কোনও রহস্য আছে? আমি তখন এই সব বই গাদা গাদা কিনেছি, আর স্রেফ ব্যাগে ভরে জলপথে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখনও আমার গ্রন্থসংগ্রহের বেশিরভাগ এই সব বই নিয়ে খাড়া আছে। বইমেলা তো পেলাম তার পরে। বইমেলা তো বইয়ের হোলসেলার, যত মক্কেল যত বই নিকেচে, ছাপিয়েচে— তার প্রায় সব তুমি এখানে পাবে। আজকাল বড়লোকের বিয়েতে যেমন অনেক রকমের ‘চয়েস’ থাকে, ভেগি, নন-ভেগি ভারতীয়, চাইনিজ ইত্যাদি। সেখানে তিন–চার রকমের বেশি তুমি পাবে না, কিন্তু বইমেলায় হাজার চয়েস, এক লিটল ম্যাগাজিনের স্টলই এবার ছ’‌শোর মতো। কিন্তু আমার প্রয়াত বন্ধু ইন্দ্রনীল আমাকে সেয়ানা বুদ্ধি দিয়েছিল, বইমেলায় কলকাতার বই কক্ষনো কিনবি না। কলেজ স্ট্রিটে গেলে কুড়ি, পঁচিশ পার্সেন্ট কমিশন পাবি, আর ওখানে মাত্র দশ। তবে নানা জায়গার বিচিত্র প্রকাশক তো আছেই, বিদেশিরাও তো আসে। কাজেই যা পাও তুলে নাও। আমার সেদিন এখন শেষ হয়েছে। বাড়িতে বই রাখার জায়গা নেই। এখন বই যত কিনি, তার চেয়ে বেশি পাই। যত পাই তত মুষড়ে পড়ি। কখন পড়ব এ সব? নিজের লেখাপড়া নিয়েই কুলোতে পারি না, তার ওপর দৈনিক তিনখানা পত্রিকা, দু’‌খানা কবিতার বই, অন্তত একখানা উপন্যাস আর প্রবন্ধের বই, ছোটদের, বড়দের নানান রকম— এসেই চলেছে হাতে, আমার বয়স আর ইচ্ছেকে উপেক্ষা করে। আমি এই বিপুল বইপত্র-অতিথিদের কাছে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকি। জোড়হাত করে তাদের বলতে ইচ্ছে হয়, ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই!’ আর এসো না। লিফ্‌টে ওজনের বেশি লোক উঠলে যেমন ‘পোঁ’ করে বাজনা বেজে ওঠে, তেমনই একটা যন্ত্র যদি আমার শরীরে থাকত খুব ভাল হত, কেউ সেধে বই দিতে এলেই সেটা বেজে উঠত। ভাবছি, এই বয়সে নিজেকে অব্যাহত বুদ্ধিজীবী প্রমাণ করার এমন সুবর্ণ সুযোগ ছাড়া কি উচিত হল?‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top