একটা লেখা থেকে তিনটি অংশ তুলে ধরেছি।
প্রথম অংশ
‘‌বারান্দার টবের গাছগুলিতে ফুল ফোটবার কথা আগে বলেছিলাম। জামাই একটা রবারের পাইপ কিনে এনেছিলেন। প্রায় দেড় মিটার লম্বা। অ্যাডাপটার কলের মুখে লাগিয়ে টবে টবে জল দিই। জল পেয়ে গাছের সাড়া যেন বুঝতে পারি। এতদিন এসব অনুভূতি আমার কোথায় লুকিয়েছিল!‌ কিছুক্ষণের মধ্যে পাতাগুলি যেন সতেজ সহজ হয়ে উঠল। এই ভোরবেলায় টবের গাছগুলির সামনে বসে, কী আশ্চর্য বিভূতিভূষণের কথা মনে পড়ল। তিনি তো গাছপালা অন্ত প্রাণ ছিলেন। হতে পারে, এখন বিভূতিসাহিত্যের প্রুফ দেখছি বলে হয়তো বিভূতিভূষণের কথা মনে পড়ল বেশি করে। তাও তো আমি শহরে আছি, গ্রামে নদীর ধারে তো নেই।
জল দেওয়া শেষ হয়েছে। চেয়ার নিয়ে রেলিংয়ের ধারে বসলাম। বারান্দার মাঝে মাঝে মাঝে প্লাস্টিকের খঁাজে খঁাজে জল জমে আছে। হঠাৎ গায়ের পাশে খড়খড় শব্দ। চমকে উঠতেই দুটো বুলবুলি পাখি বেরিয়ে এল টবের গাছের নীচ থেকে। প্লাস্টিকের খঁাজে জমা জল খাচ্ছিল। কী সুন্দর দেখতে পাখি দুটো। জল খেয়ে উড়ে গেল।
একটু পরে তিন চারটে চড়াই এল প্লাস্টিকে জমা জল খেতে। পাছে জল চুঁইয়ে বারান্দার কংক্রিট খারাপ করে সেই জন্যই প্লাস্টিক পাতা হয়েছিল। টবেও জল জমে আছে কিছু কিছু। কী আশ্চর্য দুটি টুনটুনি পাখি সেখানে খঁুটে খঁুটে কী খাচ্ছে!‌ জল না পোকামাকড়। কী অভিনিবিষ্ট তারা। লকডাউনের ফলে সম্ভবত দূষণ কমে গেছে। তাই এত পাখ–‌পাখালি। আমাদের বাড়িতে গাছপালা একটু বেশি। কাক শালিক তো ছিলই। হঠাৎই ভিতরের বাগানে কর্কশ পাখির একটা ডাক। উঠে গেলাম। নারকোল গাছে দুটো কাঠঠোকরা। কী সুন্দর দেখতে!‌ গলার আওয়াজ তত মিষ্টি নয়।
তবু ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। এই বন্দিদশার মধ্যেও আমার এত আনন্দের আয়োজন ছিল।
দ্বিতীয় অংশ
আমি বলেছিলাম, ১লা বৈশাখ গিয়ে অফিসে গিয়ে একটু ফুল মালা দিয়ে আসি। ইন্দ্রাণী (‌লেখকের কন্যা। মিত্র ঘোষ প্রকাশনার অন্যতম কর্ণধার)‌ বলল, তাহলে দপ্তরী, ছাপাখানার কিছু কর্মীদের, মুটে মজুর যারা আসে, কাজ নেই, তাদের কিছু কিছু টাকা দিয়ে এসো।.‌.‌.‌.‌কোথাও কোথাও দৈনিক দুবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। ইন্দ্রাণীর কাছে এদের অবস্থা শুনে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে অনেকে সাহায্যের টাকা পাঠিয়েছেন। আমাদের এক বাইন্ডার তঁাদের পাড়ার অগ্রদূত ক্লাব থেকে প্রতিদিন জলখাবার ও দুইবেলা আহারের ব্যবস্থা করেন প্রায় তিন চারশোজন লোকের। সেখানে ইন্দ্রাণী সেই সাহায্যের টাকা পৌঁছে দিয়ে এল। এরকম আরও কিছু জায়গায় ব্যবস্থা হয়েছে। পটুয়াটোলার রয়্যাল ক্লাব সে আয়োজন করেছেন। সে সব জায়গাতেও সাহায্যের টাকা পৌঁছোনো হয়েছে।’‌
তৃতীয় অংশ
‘‌আজ ১৯ শে মঙ্গলবার। কলকাতার দুদিকে অনলাইনে বই দিতে হবে। বারুইপুরের দিকে তিনটে। দক্ষিণেশ্বর বাগুইহাটির দিকে তিনটে। কী ভাগ্য!‌ ইন্দ্রাণী বলল, তুমি দক্ষিণে যাবে?‌
পাগলে দ্বিরুক্তি করে?‌ আমি তক্ষুণি হ্যাঁ বলে তাড়াতাড়ি তৈরি হলাম। বেরোবার আধঘণ্টা আগে তৈরি থাকা আমার অভ্যাস।.‌.‌.‌‌‌বালিগঞ্জে ডাকঘর ফঁাকা ছিল। সব প্যাকেটই নিয়ে নিল। নিশ্চিন্তে এবার বারুইপুর রওনা হলাম। কামালগাছি, নরেন্দ্ররপুর, বেরিয়ে বারুইপুরে ঢোকার ব্রিজের আগে দঁাড়াতে বললাম।.‌.‌.‌’‌
এই তিনটি অংশটি কার লেখা পাঠক নিশ্চয় এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন।‌ সবিতেন্দ্রনাথ রায়। ভানুদা‌‌। বরিষ্ঠ লেখক এবং মিত্র ঘোষ প্রকাশনার কর্ণধার। বয়স ৮৮ বছর। ‘‌কথাসাহিত্য’‌ পত্রিকার বৈশাখ–‌শ্রাবণ ১৪২৭ সংখ্যায় (কিছুদিন হল প্রকাশিত)‌ তিনি লিখেছেন ‘‌করোনার ডায়েরি’‌।
এই ভয়ঙ্কর সময়কে নিয়ে আমি এখন পর্যন্ত যতগুলো লেখা পড়েছি এটি শ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠ সময়ের দলিল হিসেবে, শ্রেষ্ঠ আত্মকথন হিসেবে, শ্রেষ্ঠ সাহিত্য মূল্যে। দুঃসময়ে যিনি শত বেদনার মধ্যেও আনন্দকেও খুঁজে পান তিনিই আসল জীবনদ্রষ্টা। ভানুদার এই লেখাটি তার ভাল লেখাগুলির অন্যতম। এই ভয়াবহ সময়ে তিনি যেমন বহু মৃত্যুর কথা বলছেন, শোকের কথা বলেছেন, তেমন গাছপালা, পাখি, মানুষের মাঝখানে পেয়েছেন জীবনের স্পন্দন। বেঁচে থাকবার আনন্দ। লিখতে লিখতে তিনি কখনও সময় ধরে পিছিয়ে গিয়েছেন, কখনও এগিয়েছেন। বড় মানুষদের কত অজানা গল্পই না বলেছেন!‌ আবার করোনা, আমফানে নিঃস্ব হওয়া দরিদ্র মানুষের কথাও বলেছেন আর্দ্র হৃদয়ে। শুধু বলা নয়, সাহিত্য রসে সিক্ত করে বলেছেন। কী চমৎকার, সাবলীল কথন ভঙ্গি!‌ কী স্পষ্ট জীবন বোধ। আর বার বার এসেছে প্রকৃতি। কলকাতার ঢাকুরিয়ায় বাস করে এমনভাবে প্রকৃতিকে স্পর্শ করা যায়! নাকি মন থাকলে প্রকৃতি এসে স্পর্শ করে?‌‌
আমি জোর গলায় বলছি, (‌যিনি শোনবার শুনুন, যিনি শোনবার নয় শুনবেন না)‌ যেভাবেই হোক সবিতেন্দ্রনাথ রায়ের এই লেখাটি সংগ্রহ করুন এবং পড়ে ফেলুন। এই সময়কে ছুঁতে পারবেন। চোখে জল আসবে আবার আনন্দে মন ভরেও যাবে। এই সঙ্কটকালে দুইয়েরই প্রয়োজন। লেখাটি না পড়লে বড় আপশোস থেকে যাবে।
এই বিষয়ে আমি একটু সাহায্য করতে পারি। কথাসাহিত্য পত্রিকার কার্যালয়ের ঠিকানা ১০, শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট। ফোন নম্বর ২২৪১৬৪২০। আমার কাছেও পত্রিকাটি (‌আমার কপিটি)‌ রয়েছে। কেউ চাইলে পড়তে দিতে পারি।
এবার একটা দুঃখের কথা, আনন্দেরও বটে।
এই ভানুদা আমাকে তঁার অনেক বই নিজে হাতে লিখে উপহার দিয়েছেন। এ আমার পরম সৌভাগ্য। তবে আমি গর্বিত। যে–‌কোনও কারণেই হোক এই স্নেহ, ভালবাসা আমি অর্জন করেছি। আমার স্বভাব হল, যে বই বা লেখা পড়তে ভাল লাগে সেটা অন্যকে পড়তে বলি। হাতের কাছে থাকলে দিয়ে দিই। তেমনই একটা বই ভানুদার ‘‌কলেজ স্ট্রীট উত্তর পর্ব’‌। আমাকে নিজের হাতে লিখে দিয়েছিলেন— ‘‌‌অনুজ প্রতিম, শ্রীমান প্রচেত গুপ্ত অভিন্নহৃদয়েষু সবিতেন্দ্র। ২১। ১। ২০১১।’‌
সেদিন আমি হোয়াটসঅ্যাপে ছবি ও মেসেজ পেলাম, বইটি নাকি একজন কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথ থেকে কিনেছেন। তিনি ফেসবুকে ছবিও দিয়েছেন।
প্রথম ধাক্কায় দুঃখ পেলাম। এই সুযোগে কেউ নিশ্চয় ভাববে, আমি বইটি বিক্রি করে দিয়েছি। তারা তো বুঝবে না, বইয়ের মধ্যে আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। আমাদের বাড়ির বহু বই বারবার বন্যার জলে নষ্ট হয়ে যেত। তখন বাঙুরে বন্যা হত খুব। আমরা বহু বই মানুষকে পড়তে দিয়েছি, আর ফেরত পাইনি।  এক সময়ে বাড়ির পঁাচ, ছ’‌ হাজার বই থেকে চুরি হয়েছে বহু বই। বহু বই এমনি দিয়ে দিয়েছি। একবার আলমারি বানিয়ে এশিয়াটিক সোসাইটিতে বই দিয়ে এসেছিলাম। একাধিকবার বাড়ি বদলের সময় অনেক বই ফেলে আসতে হয়েছে। আর্থিক অনটনে পড়েছি বেশ কয়েকবার, কিন্তু কখনও কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে বই বিক্রি করিনি। এখন এই করোনা কালে তো কলেজ স্ট্রিটে যাওয়াই হয়নি। তাছাড়া এমন একটা মানুষের উপহার দেওয়া বই কুড়ি, তিরিশ বা পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ হয়তো শুনতে হবে, যাঁর প্রকাশনা (‌মিত্র ও ঘোষ) মাত্র‌ কিছুদিন আগে আমাকে প্রায় ন’‌ লক্ষ টাকার বই বিক্রির হিসেব (‌গত আর্থিক বছরে)‌ দিয়েছে। এবং সেই অনুযায়ী আমার প্রাপ্য পৌঁছে দিয়েছে। দিয়েছে এই ভয়াবহ করোনাকালেই। তার বই বেচে দেব !‌    
তারপরে ভাবলাম, দুঃখ কেন পাব?‌ রাগই বা হবে কেন? কাউকে বোঝাতেই বা যাব কোন দুঃখে?‌ যদি বিক্রিই করতে হয় প্রথম পাতাটা ছিঁড়তে কতক্ষণ লাগত? ‌ যে যা ভাবে ভাবুক। ‌
ফুটপাথেরও তো বই চাই। সেখানেও তো পাঠকরা কত কষ্ট করে হাতড়ে ভাল বইটি খুঁজে নেবেন। দরাদরি করবেন। তার মধ্যে বিক্রি হওয়া বই, চুরি যাওয়া বই, ফেরত না দেওয়া বই, ভুলে যাওয়া বই, নষ্ট হওয়া বই সবই থাকে। বইয়ের সঙ্গে যদি লেখকের হস্তাক্ষর থাকে তাহলে তো কথাই নেই। লেখকের হস্তাক্ষর পাওয়া কি সহজ?‌
যে আমার এই বইটি পড়তে নিয়ে ফেরত দিতে ভুলে গিয়েছিল তাকে আমি চিনে ফেলেছি। সে দুফায় বইটি নিয়েছিল। একবার পড়বার জন্য, একবার কলেজ স্ট্রিট নিয়ে লেখবার জন্য। খুবই পড়ুয়া ছেলে। মাঝে মধ্যে পুরনো বই বিক্রি করে আবার কেনেও। রাতেই তাকে ফোনে ধরি। প্রথমে অস্বীকার করে। আজ সকালে বলেছে, ‘‌মনে হচ্ছে অন্য বইয়ের সঙ্গে চলে গেছে। খুবই দুঃখিত। পড়া বই বিক্রি না করলে, না–‌পড়া বই কিনব কী করে বলো তো? আমার কি অত পয়সা আছে ?‌ কেউ ফ্রি–‌তে বইও দেয় না। সই করে তো দেয়ই না। কিন্তু এটা খুব বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়ে গেল।’
আমি ঠিক করেছি, এরপরেও কেউ চাইলে আমি বই দেব। একশোবার দেব। হাজারবার দেব। তাতে লেখকের সই থাকলে এবং বইটি ফেরত না পেলে খুবই দুঃখ পাব। পরে ফেসবুক ধরনের কিছুতে সেই ছবি আছে শুনলে রাগ হবে। কিন্তু একটা ভাল বই আরও একজন পড়লে, তারপরে আরও আরও একজন পড়লে, তারপরে আরও আরও আরও একজন পড়লে যে আনন্দ হবে সেই আনন্দ ওই দুঃখের কাছে, রাগের কাছে কিস্যু নয়।‌ বাড়ির লাইব্রেরি তো মিউজিয়ম নয় যে লেখা থাকবে ‘‌হাত দিবেন না’‌। কে কী ভাবল বয়েই গেল। তাই না?
করোনাকালের স্বীকারোক্তি:‌ জীবনে আমিও দু একটা বই চুরি করেছি অথবা ফেরত দিইনি।‌

জনপ্রিয়

Back To Top