তুষার কাঞ্জিলাল: সমাজ মানবিক মুখ হারিয়ে ফেলছে, এটা এখন বহুচর্চিত। মাঝেমধ্যে এমন কিছু ঘৃণ্য অমানবিক কাজ মানুষ ঘটিয়ে ফেলছে, তা দেখে ক্রোধ, হতাশা, যন্ত্রণা মনকে নিত্য পীড়িত করে তোলে। নিয়মিত সংবাদপত্রে এবং সংবাদমাধ্যমগুলিতে আমরা নির্মমভাবে হত্যা, নারীধর্ষণ এবং আরও নানা ধরনের অমানবিক কাজকর্মের খবর পাই। হয়তো আগেও এই ধরনের ঘটনা দু–চারটে ঘটত, কিন্তু তা প্রচার পেত না। সীমিত গণ্ডির মধ্যে তার একটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হত। কিন্তু এখন দেশে–বিদেশে যে কোনও কোনায় এ ধরনের ঘটনা ঘটলে তা ব্যাপক প্রচার পায় এবং সমাজের সুস্থ মানুষরা ভীতসন্ত্রস্ত হন। এখন প্রচারমাধ্যমগুলি অনেক বেশি সক্রিয়, তাই আমাদের জানার পরিধি বেড়েছে এবং তার ভয়াবহ ঘটনার ক্রমবৃদ্ধি শঙ্কিত করে তুলছে। সুদূর গ্রামাঞ্চলও এখন আর এর প্রভাবমুক্ত নয়। সেই কারণে এর প্রকৃত রূপ, এই সমস্যার গভীরতা এবং ব্যাপ্তির কারণগুলি অনেক গভীরে গিয়ে বিচার–বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এইগুলি কোনওটিই বিক্ষিপ্ত এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। একজন মানুষকে অমানুষ হতে গেলে নিকট এবং দূর পরিবেশ থেকেই তার উপাদানগুলি সংগ্রহ করতে হয়। মানুষ এখন অস্থির। জীবন এখন তাৎক্ষণিকতার শিকার। সমাজের গভীর অসুখ। আমাদের সমাজ আজ নানা দিক থেকে বিপন্ন। 
কয়েক বছর আগে কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি বক্তা হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। পৌঁছে দেখলাম আমার পূর্ববর্তী বক্তা একজন নোবেলজয়ী অধ্যাপক। জানি, বিদ্বজ্জন যখন কথা বলেন তখন মূর্খের নিশ্চুপ থাকাই শ্রেয়। ওঁর পরেই আমার বলার কথা। ক্ষুদ্র জ্ঞান সম্বল করে পঁয়তাল্লিশ মিনিট কী বলেছিলাম বলার সময়ও বুঝিনি, এখনও মনে পড়লে বুঝি না। তবে বোঝার মতো একটা জিনিসের প্রাপ্তি ঘটেছিল, বেশ কিছু অর্থমূল্য। কিন্তু সমাজকে বোঝার, জানার যে গভীর দৃষ্টিভঙ্গি নোবেলজয়ী অধ্যাপকের বক্তৃতাতে ছিল, তা জ্ঞানের ঝুড়িতে কুড়িয়ে নিতে পেরেছিলাম। আমার পূর্ববর্তী বক্তার আলোচ্য বিষয় ছিল বিজ্ঞাপন কীভাবে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, সমাজজীবন, নীতিবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং আরও অনেক কিছুকে মূল্যহীন করে দিতে পারে। লোভ নামক রিপুটি কীভাবে মানুষের মনকে নিজের বশে এনে ধীরে ধীরে অমানুষ করে তুলতে পারে, বিশ্ব সমাজের সর্বক্ষেত্র থেকে তার উদাহরণ তুলে এনে সমাজের একটা স্পষ্ট রূপ তিনি তুলে ধরেছিলেন। আজীবন এই বক্তৃতাটি মনে থাকবে।
বিষয়টি অত্যন্ত সরল। সংবাদপত্রে বা সংবাদমাধ্যমে মানুষের ভেতরকার মানুষটিকে অমানুষ করে তোলার উপাদান ছড়িয়ে–ছিটিয়ে যাওয়া, হরেক জাতের ভোগ্যসামগ্রীর গুণাগুণ, যা অনেক সময় মিথ্যে, তার প্রচার এবং প্রসার ঘটানো। গোয়েবলস বলেছিলেন, একটা মিথ্যাকে যদি বারবার বলে যাওয়া যায়, তা একটা সময় সত্যের রূপ পায়। গোটা পৃথিবীর সৃষ্টিশীলতা এবং প্রতিভার একাংশ এই ব্যবসায় নিযুক্ত হয়ে আছে। বিজ্ঞাপন অতি সুন্দরী লাস্যময়ী রমণীকে উজ্জ্বলতর করে মনের গভীরে দমিত আগ্রাসন এবং আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলে। জীবনে যা পাওয়ার আশা এবং আর্থিক ক্ষমতা নেই, তার লালসার শিখাও মানুষের মনে জাগিয়ে দাও। সর্বস্বের বিনিময়ে তাকে পাওয়ার চেষ্টাই মানুষকে ভোগপাগল একটি জীবে পরিণত করে। তার জন্য যদি যা–‌কিছু মানুষ এবং সমাজের পক্ষে ভাল তাকে টুঁটি টিপে মারতে হয়, তাও অক্লেশে করার মতো পাগল করে দাও। মানুষকে তঞ্চক, সমাজবিচ্ছিন্ন, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধহীন ভোগবিলাসী রোবট বানিয়ে দাও। পিতা, মাতা, সন্তান, সমাজ— কারও কাছে তোমার কোনও দায় নেই। নিজের ভোগাকাঙ্ক্ষার নিবৃত্তিই চরম কাম্য। সমাজের এই অবস্থা কেন হল, তার গভীর উৎসে পৌঁছোনোর একটা চেষ্টা গোটা পৃথিবী জুড়েই চলেছে। উত্তরটা বোধহয় সহজে এবং সরাসরি দেওয়া সম্ভব নয়। মুষ্টিমেয় মানুষ হয়তো প্রতিবাদী কিন্তু অধিকাংশই লোভের পাপের শিকার। খুব সম্প্রতিকালে আমাদের চারিধারে কিছু অমানবিক ঘটনা ক্রমবর্ধমান হারে ঘটে চলেছে দেখেছি। এটা হঠাৎ শুরু হয়ে যাওয়া ঘটনা নয়, একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ। বিদ্বজ্জনরা বলছেন যে, আমাদের চারপাশে আকাশ, বাতাস, মাটি, ভোগ্যদ্রব এবং অন্য সব ধরনের চাহিদা পূরণের উপাদানগুলিকে বিষময় করে তোলা হচ্ছে। সাধারণ খাদ্যসামগ্রী থেকে মনের খোরাক পর্যন্ত সব কিছু বিকারগ্রস্ত। আমরা বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি। মাটির নিচের খাবার জলকে আর্সেনিক–‌যুক্ত করে দিচ্ছি। কৃষিজ পণ্যে বিষ মিশিয়ে তার খাদ্যগুণকে নষ্ট করে ধীরে আত্মহননের ব্যবস্থা করছি। প্রকৃতিতে দূষণকে মাত্রা ছাড়িয়ে দিতে আমরা ব্যস্ত। প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা পৃথিবীর অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলছে। অসাম্যের নীতি এবং প্রকৃতি–‌বিরোধী কর্মকাণ্ড যুগ যুগ ধরে চলতে পারে না। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ব্যবস্থা অধিকাংশকে সমাজবিরোধী করে তোলার ঊর্বরতায় জমিকে ভরিয়ে তোলে সেই ব্যবস্থাগুলি চিরস্থায়ী হতে পারে না। এবং সংখ্যালঘু মানুষ প্রতিবাদী হলেও, একদিন তা বর্তমানকে ধ্বংস করে ভবিষ্যতের রূপ নেয়। এই সত্যে বিশ্বাস রাখাই আমাদের কাছে বড় শক্তি। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top