‌‌ডাঃ পল্লব বসুমল্লিক: কার্যকরী?‌ অতি অবশ্যই। ফল লাভে সময়?‌ নিঃসন্দেহে দ্রুততম। পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য?‌ ১০০ শতাংশ না। স্বীকৃতি?‌ অবশ্যই। মার্কিন মুলুকে ইউএসএফডিএ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন থেকে ভারতীয় আইসিএমআর— সবার থেকেই জুটেছে। কলকাতা–‌সহ রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট (‌আরএটি)‌। এটা সবচেয়ে কার্যকরী হবে কন্টেনমেন্ট অঞ্চল বা হটস্পটে কোভিড–‌১৯ চিহ্নিতকরণে। এবার সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে এবং করোনা কার্ভ দমাতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ শুরু হল বাংলায় প্রশাসনের তরফে।
প্রথাগত আরটি–‌পিসিআর–‌এর চেয়ে আরএটি কেন আলাদা?‌ প্রথমটা করোনাভাইরাস নির্ণয়ের গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড। ওপেন সিস্টেম আরটি–‌পিসিআর মেশিন হোক বা ট্রুন্যাট কিংবা সিবিন্যাট পদ্ধতি— সেটা আসলে একধরনের মলিকিউলার বা আণবিক পরীক্ষা। ভাইরাসের জেনেটিক অংশটা অনেক পরিবর্ধিত করে পরীক্ষা হয়। নোভেল করোনা একধরনের আরএনএ ভাইরাস। এই পরীক্ষায় আরএনএ–‌কে প্রথমেই ডিএনএ–‌তে বদলে নেওয়া হয় আরটি বা রিভার্স ট্রান্সক্রিপশন নামক পদ্ধতিতে।‌ তারপর ঘটানো হয় পলিমারেজ চেন রিঅ্যাকশন বা পিসিআর। গোটা প্রক্রিয়া তাই ‘‌আরটি–‌পিসিআর’‌। ভাইরাল লোড যত কমই থাক, সামান্যতম সংক্রমণেও তাই এর ফলাফল নির্ভুল আসে। তাহলে সমস্যা কোথায়?‌ প্রয়োজন অন্তত একটা ভাল ল্যাবরেটরি এবং দামি যন্ত্র। চাই প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান যাঁরা নাক বা মুখগহ্বর (‌ফ্যারিঙ্কস)‌ থেকে নমুনা সংগ্রহে দক্ষ। ব্যাপারটা ব্যয়সাধ্য (‌শুরুতে ৫,০০০ টাকা ছিল। সরকারি নিয়ন্ত্রণে এখন ২,৫০০ টাকা)। স্যাম্পেল সংগ্রহের পর‌ নমুনা ল্যাবে পৌঁছলে, লাগে আরও ঘণ্টা পাঁচেক। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দিনে দিনে ফলাফল মেলে না।
র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট নামকরণেই জানায় যে দ্রুত ফলাফল প্রদানই এর ইউএসপি। সময় নেয় বড়জোর ১৫ থেকে সর্বাধিক ৩০ মিনিট। এখানেও আরটি–‌পিসিআর–‌এর মতো নাক বা মুখগহ্বর থেকেই সোয়াব সংগৃহীত হয়। অ্যান্টিজেন ভাইরাস–‌নির্গত একধরনের ক্ষতিকর টক্সিন যা শরীরে ইমিউন রেসপন্স বা রোগ প্রতিরোধকারী অ্যান্টিবডির জন্ম দেয়। আরএটি পরীক্ষায় একটা কাগজের স্ট্রিপে গেঁথে থাকা নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডির সঙ্গে বিক্রিয়া ঘটানো হয়। স্ট্রিপের গায়ে দাগ দেখেই পজিটিভ সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করা সম্ভব। নাক বা মুখগহ্বর একটা সোয়াবে কতটা অ্যান্টিজেন উঠে এল, তার ওপরই আসলে নির্ভর করে চূড়ান্ত ফলাফল। সংক্রমণের পরিমাণ বেশি হলেই সোয়াবে ভাইরাল লোড বা ভাইরাসের বহর বাড়ে। তখন আর ফলস নেগেটিভ বেরনোর সুযোগ থাকে না।
রাজ্য–‌সহ গোটা দেশে যে ‘‌স্ট্যান্ডার্ড কিউ কোভিড–‌১৯ এজি ডিটেকশন কিট’‌–‌এ আপাতত পরীক্ষা হচ্ছে তা দক্ষিণ কোরিয়ার এসডি বায়োসেন্সর সংস্থায় তৈরি। জরুরি চাহিদা মেটাতে দিল্লি–‌এনসিআর অঞ্চলের মানেসরে তার ভারতীয় শাখা–‌কারখানায় এখন উৎপাদন চলছে। আরও অনেক ভারতীয় সংস্থা আরএটি কিট তৈরির কাজে অবশ্য ঝাঁপিয়েছে। তবে এই কিট কার্যকরী রাখতে সবসময় সংরক্ষণের তাপমান ২ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকা প্রয়োজন। সুতরাং স্বাস্থ্যকর্মীরা পুরুলিয়া–‌বাঁকুড়া বা বীরভূমে কোনও রৌদ্রখর দিনে পরীক্ষায় গেলে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিশ্চয় অবলম্বন করবেন। এমনকী বৃষ্টি না হলে দুপুরে সম্প্রতি কলকাতার গড় তাপমানও ৩৩–‌৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকছে। কোভিড–‌১৯ আক্রান্তের সংস্পর্শে আসার ৫ থেকে ১০ দিনের মধ্যে আরএটি পরীক্ষা করালে আমরা সবচেয়ে ভাল ফলাফল মেলার আশা করতে পারি। 
অনেকেরই মনে সঙ্গত প্রশ্ন— আরএটি ফলাফল পজিটিভ এলে যেমন অবশ্যই করোনা সংক্রমিত, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারি, কিন্তু নেগেটিভ বেরলে কী করণীয়? এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি। করোনা/‌ইনফ্লুয়েঞ্জা লাইক ইলনেস কিংবা উচ্চ কো–‌মর্বিডিটি থাকলে অবশ্যই প্রথাগত আরটি–‌পিসিআর পরীক্ষা করাতে হবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কিন্তু আশাবাদী, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টই আপাতত রাজ্যে সংক্রমণ দ্রুত রুখতে ‘‌গেম চেঞ্জার’‌ হতে পারে। ‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top