পাপড়ি ভট্টাচার্য: যাপনে নতুন পাওয়া নিউ নর্মালের একটি অভূতপূর্ব দিক অনলাইন শিক্ষা। মারীর এই সঙ্কটকালে দেশের প্রগতির অনেক কিছু থেমে থাকলেও শিক্ষা যেন কোনও অবস্থাতেই কোনও ধরনের আপসের শিকার না হয়, এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেও যাতে পড়াশোনা চালু রাখা যায়, এই উদ্দেশ্যেই অনলাইন ক্লাসের ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। উদ্দেশ্য অতি মহৎ এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে দারুণ কার্যকরীও। কিন্তু মোবাইল ফোনের অভাবে হীনমন্যতা এবং হতাশার শিকার শিক্ষার্থী যখন আত্মহত্যা করছে, তখন অনলাইন ক্লাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোকে যে উপেক্ষা করে ক্লাস চালু রাখা হচ্ছে, এই নিয়ে সন্দেহ থাকে না।
এবং এই ঘটনা একটি–দুটি নয়। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ধারাবাহিক ভাবেই আমরা তা দেখতে পেয়েছি। যে দেশে প্রত্যেক নাগরিকের খাদ্যের অধিকার আইনত সূচিত হলেও দু’‌বেলার খাবারের থালায় সেই অধিকার অদেখা থেকে যায়, সেখানে ডেটা–সহ একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর কাছে আছে ভেবে শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রাখা তো ঘুরিয়ে সোনার পাথরবাটির খোঁজ করা। তা ছাড়া মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্তের আর্থিক অবস্থানে এত জটিল এবং সূক্ষ্ম স্তরের পার্থক্য গ্রাম–শহরে রয়েছে, যে বিভিন্ন সরকারি স্কুলের ছাত্রদের অ্যান্ড্রয়েড থাকার পরিসংখ্যান ভিন্ন ভিন্ন। কোনও স্কুলে হয়তো তা ৫০%, আবার কোনওটায় টেনেটুনে ১০%।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি একটি ক্লাসের ছাত্রছাত্রী সংখ্যা হয়তো দুশোর কিছু বেশি। স্কুলের অনলাইন ক্লাসের অ্যাপে পড়ুয়ারা প্রায় পঞ্চাশ জন তাদের ফোন নম্বর দিয়ে রাখল। এবার ক্লাস শুরু হতে দেখা গেল খুব বেশি হলে দশ জন ক্লাসে আছে। বাকিরা পারছে না, তার কারণ বিভিন্ন। অনেকেই হয়তো নিজেদের নম্বর দেয়নি, আত্মীয় কেউ একজনের দিয়েছে। কারও মোবাইল আছে কিন্তু তা অ্যান্ড্রয়েড নয়। কারওর অ্যান্ড্রয়েড থাকলেও এত বেশি নেটপ্যাক কেনা সম্ভব হয়ে উঠছে না। তা ছাড়া, পরিবারে ছাত্র তো আর একজন নয়। অনলাইল ক্লাসের সমস্ত সরঞ্জাম জোগাড় করে দেওয়া প্রত্যেক অভিভাবকের পক্ষে যে সম্ভব নয়, সেই সত্য আমরা অস্বীকার করতে পারব না।
এই দেশে ধনী–গরিবের মাঝের ব্যবধান বড়  প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে করোনাকালীন এই সময়ে। বিজ্ঞাপনের হাজার অপশনের বাজারে আমরা যখন আধখাওয়া আপেলের ছবি দেওয়া মোবাইল সেটে স্টেটাস বেশি, নাকি চীনা দ্রব্য বর্জনে দেশপ্রেম বেশি— এই নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তখন একটি কিশোর প্রাণ শুধুমাত্র এই কারণে নিজেকে শেষ করে দেয়, কারণ তার চূড়ান্ত ইচ্ছে থাকলেও সে পড়া চালিয়ে যেতে পারছে না। একটা সেকেন্ড হ্যান্ড অ্যান্ড্রয়েড ফোন কেনার টাকা জোগাড়ও তার বাবার কাছে প্রায় অসম্ভবের মতো। কী পরিমাণ হতাশা বা অপমানের শিকার হলে একটি কিশোর প্রাণ বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যুকে সহজ ভাবতে পারে তা অনুমান করা হয়তো বা যেতেও পারে। আর যারা এই চূড়ান্ত রাস্তা বেছে নিচ্ছে না, তাদের মনঃপীড়া আর সচেতন অপমানের রোজদিনের খতিয়ান তো মস্ত ভারী বোঝা হয়ে তাদের প্রতিদিনের সঙ্ঘর্ষকে আরও অনেক কঠিন করে তুলছেই। যাদের নেই তাদের তো নেইই। তারা হ্যাভ নটস। তাদের কষ্ট, জ্বালা মোটামুটি একটা ছাঁচে ফেলে আমরা বুঝে নিই, বা অন্তত বুঝে গেছি এমন ভান করি। কিন্ত যারা পরিষ্কার ভাবেই হ্যাভ নটস নয়, যাদের সন্তানরা দামি ভাল স্কুলে পড়াশোনা করছে, আমরা তো আশা করতেই পারি অনলাইন ক্লাস তাদের জ্ঞানচর্চায় প্রচুর সাহায্য করছে।
সর্বভারতীয় একটি ইংরেজি দৈনিকে বেসরকারি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের অনলাইন শিক্ষার অবস্থা নিয়ে ইদানীং একটি রিপোর্ট পড়লাম। সেখানে কিছু শিশুর উল্লেখ পেলাম, যারা ঠিক ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই নানা অজুহাতে বাথরুম বা অন্য কোনও রুমে নিজেদের আটকে রাখে, যাতে যতটুকু সম্ভব ক্লাস করতে না হয়। কিছু বাবা–মা বলেছেন, এই অনলাইন ক্লাসের সময়টায় তাদের বাচ্চারা অদ্ভুত আচরণ করে। কেউ খুব রাগ দেখায়, কেউ কথাই বলতে চায় না, কেউ ঝিমোতে থাকে, কারও পেট ব্যথা, মাথা ব্যথা, টয়লেট যাওয়া অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যায়। আমার চেনা একটি ক্লাস থ্রির শিশুর চোখ লাল হয়ে যায় বেশিক্ষণ একটানা ক্লাস করলে। অথচ তার শিক্ষিতা মা তাকে ক্লাস করা থেকে ছাড় দিতেও তেমন রাজি নন। বাচ্চাদের এমন ব্যবহার কোনও কারণ ছাড়া তো নয় নিশ্চয়ই। ক্লাস রুমের পরিবেশের যে সুবিধে, ছাড় বা আনন্দের বাতাবরণ ছাত্রছাত্রীরা পায়, সেগুলো কিছুই তো নেই অনলাইন পড়ায়। পাশের বন্ধুর সঙ্গে মিস–কে লুকিয়ে অল্প খুনসুটি যে ছোট্ট মনটাকে পড়ার চাপ থেকে সরিয়ে এনে আর একটু পড়তে অম্লজানের কাজ করত, এখন তো সেসবের আর অবকাশই নেই। বাড়িটাই স্কুলের মতো, অথচ সেটা স্কুলও নয় আবার বাড়িও নয়। ব্যক্তির বিকাশে স্কুলের প্রয়োজন রয়েছে। স্কুল আমাদের আত্মবিশ্বাসী করে, বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন জনের সঙ্গে মিশতে শেখায়, টিম ওয়ার্কের গুরুত্ব বোঝায়। স্কুল নিজেই একটা পরিপূর্ণ সমাজের রেপ্লিকা হয়ে পড়ুয়াদের আগামী দিনের জন্য তৈরি করে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্কুলের বিকল্প হিসেবে যে ব্যবস্থা আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে, সেখানে স্কুলের ভাল দিকগুলো নেই। আছে তোতাকাহিনির মতো রাশি রাশি জ্ঞান গেলানো। একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা পাঠদান করা অবস্থায় তঁার মতো করে স্বাধীন। তিনি নিয়ম বা বইয়ে পড়া নানা থিওরির বাইরে গিয়ে নানা অভিনব পন্থায় নিজের ক্লাসের মনোযোগ তৈরি করান এবং বজায় রাখেন। কারণ শিক্ষাবিজ্ঞানে একটি জনপ্রিয় কথাই আছে— '‌A‌ teacher's method is the best method.'‌‌‌‌ কিন্তু অনলাইন ক্লাসে তাঁর সেই স্বাধীনতা বড়ই কম। তিনি যেন একটি মেশিন, পড়াচ্ছেনও আরও কিছু মেশিনকে। যে মোবাইল বা ল্যাপটপের অতিরিক্ত ব্যবহারকে আমরা এতদিন স্বাস্থ্যকর নয় বলে নানা উপায়ে বাড়ির ছোটদের থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করলাম, একটা রোগ ‘‌নিউ নর্মালের’ নামে সেই অস্বাস্থ্যকর জীবনপ্রণালীর দিকেই তাদের ঠেলে দিতে বাধ্য করছে।
এই দেশের প্রচুর শিশু এবং টিনএজ বয়সিরা ইদানীং দিনে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা মোবাইলে স্কুল বা টিউশনের ক্লাস নেয়। সপ্তাহে যদি পাঁচদিনও ক্লাস হয় বলে ধরে নিই, তবে সারা সপ্তাহে মোট ২৫ থেকে ৩০ ঘণ্টা তারা মোবাইলে মুখ করে বসে। ইউনিসেফ কিন্ত এই নিয়ে বিভিন্ন দেশকে সজাগ করার চেষ্টা করছে। বেশিক্ষণ মোবাইল বা ল্যাপটপের আলোয় থাকলে এক ধরনের স্ট্রেস হয়, যার থেকে শরীরে ডোপামিন নামের যে হরমোন বেড়ে যায়, তার কুফল সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তা ছাড়া একটানা বেশিক্ষণ বসার ফলে ওজন বেড়ে যাওয়া, পেশি এবং অস্থিসন্ধিতে ব্যথা বা শরীরের কাঠামোতে পরিবর্তন আসা, ঘুমের সমস্যা, মানসিক চঞ্চলতা বা হতাশা, দীর্ঘক্ষণ গৃহবন্দি থাকার ফলে রোদের আলোর অভাবে শরীরে ভিটামিন ডি, ক্যালসিয়ামের ঘাটতি হওয়া, চোখ, চুল, চামড়ার ক্ষতি ইত্যাদি মোবাইল বা কম্পিউটার জনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তো আমাদের অজানা নয়।
এই ব্যবস্থা হয়তো সাময়িক, কয়েকটা মাসের ব্যাপার। কিন্তু এই কয় মাসে টেকনোলজির ভুল প্রয়োগ আমাদের পরের প্রজন্মকে শারীরিক এবং মানসিক ভাবে কতটা পঙ্গু করছে, সেটাও ভাবতে হবে। আর নিউ নর্মালের অজুহাতে যদি পাকাপোক্ত ভাবে ইটকাঠের স্কুলঘরের উপস্থিতি জীবন থেকে অনেকাংশে কমিয়ে ফেলা হয়, অর্থনৈতিক বা তেমন কিছু সুবিধের জন্য, তবে কতটুকু ড্যামেজ কন্ট্রোল করা যেতে পারে, তা ভাবার সময় হয়েছে। আর্থিক সঙ্কুলান থাকলেই শিশুরা শোষিত হবে না বা হচ্ছে না তা তো নয়। শোষণের তো নানা রূপ, নানা উপকরণ। 
 

জনপ্রিয়

Back To Top