পবিত্রকুমার সরকার: শতবর্ষে পা দিলেন বিপ্লবী জননেতা মুকুর সর্বাধিকারী। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিন দশক আগে প্রয়াত এই মানুষটি আজ বিস্মৃতপ্রায়। কিন্তু শহর জুড়ে রয়েছে তঁার বিচিত্র ও বিবিধ কর্মকাণ্ডের নানা চিহ্ন। টানা ১৩ বছর মধ্য কলকাতার ৫০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। ১৯৬৭ থেকেই নকশালপন্থার অনুগামী হন। তার জেরেই ১৯৬৯ সালের ২৬ জানুয়ারি কাউন্সিলর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভোটসর্বস্ব সংসদীয় রাজনীতি থেকে সরে আসেন। তিনি শিল্পকলা, সাহিত্য ও ধ্রুপদী সঙ্গীতের অসাধারণ বোদ্ধা ছিলেন। খোলা গলায় চমৎকার রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। কলকাতার এক অভিজাত পরিবারে তঁার জন্ম। সম্ভবত, ১৯২১–এর জানুয়ারি মাসে (মতান্তরে ১৯২০)।
তঁাদের আদি বাড়ি হুগলির রাধানগর গ্রামে। তঁার বাবা ভারতীয় ফুটবলের জনক নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। পিতামহ ডা. সূর্যকুমার ছিলেন ফ্যাকাল্টি অফ মেডিসিনের প্রথম ভারতীয় ডিন। শোভাবাজার রাজবাড়ি ছিল তঁার মামাবাড়ি। কিন্তু বংশকৌলিন্যের কথা জানাতে চাইতেন না। পৈতৃক সম্পত্তির ওপর অধিকার ছেড়ে দিয়েছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামীর সরকারি ভাতাও নেননি। শিয়ালদা অঞ্চলে ১৩ সি, ফরডাইস লেনে নিজের গড়া জাতীয় সাহিত্য সঙ্ঘের প্রায়ান্ধকার ঘরে একটা তক্তাপোশে শুয়ে, হাত–পাখার বাতাস খেয়ে জীবন কাটিয়ে দেন। অকৃতদার মুকুর ধুতি ও খদ্দরের জামা ও ফাটা রবারের চটি পরে ঘুরে বেড়াতেন। কার গায়ে জামা নেই, বাড়িতে খাবার নেই, পড়ার টাকা নেই, কে চিকিৎসা করতে পারছে না— সবার মুশকিল আসান ছিলেন ‘মুকুরদা’। তিনি বেশির ভাগ দিন দুপুরে মুড়ি–জল, রাতে ছাতু খেয়ে কাটাতেন। এক সময় অতুল্য ঘোষের মতো শীর্ষ কংগ্রেস নেতা মুকুরবাবুকে কলকাতার মেয়র হওয়ার প্রস্তাব দেন। তিনি সবিনয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেন।
স্বাধীনতার আগে ও পরে জেলে যাওয়া তঁার কাছে ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। ১৯৫৫ সালে গোয়ামুক্তি আন্দোলনে পর্তুগিজ পুলিশের গুলিতে জখম হয়ে প্রাণসংশয় দেখা দেয় তঁার। এ কথা আমি তঁার কাছেই শুনেছি। সেই গুলি
লেগে এক মারাঠি নিহত হন। ১৯৫৬ সালে বাংলা–বিহার সংযুক্তি বিরোধী আন্দোলনেও তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। ১৯১৪ সালের ২৬ আগস্ট ‘রডা অস্ত্র অভিযান’–এর অন্যতম নেতা গিরীন্দ্রনাথ ব্যানার্জি ছিলেন তঁার স্কুলজীবনের শিক্ষক। যঁার কাছ থেকে তঁার দেশাত্মবোধ ও পরার্থবোধের শিক্ষা। আর বিপ্লবী বিপিনবিহারী গাঙ্গুলির কাছে রাজনীতির দীক্ষা। সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক। কলেজে তঁার শিক্ষক ছিলেন বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত, হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের এমএ ক্লাসে ভর্তি হয়েও শেষ করতে পারেননি। ঐতিহ্যকে তিনি কোনওদিন অবজ্ঞা করেননি।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। বলতেন, ‘পরম শত্রুরও যদি কোনও গুণ থাকে, তবে তা অস্বীকার করা অসভ্যতার নামান্তর।’ ১৯৫৭ সালে তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের ভোটে ইউসিসি প্রার্থী হিসেবে কংগ্রেস প্রার্থী, ঘনিষ্ঠ বন্ধু বৈদ্যনাথ পালকে হারিয়ে দেন। ফল বেরোনোর পর সবাই বিস্ময়ে দেখলেন বিজয়ী ও বিজিত প্রার্থী পরস্পর গলা জড়াজড়ি করছেন! নির্বাচিত হওয়ার পর কাজকর্মের ধরনে মুকুরবাবু অন্য অনেক পুরপ্রতিনিধিকে ছাপিয়ে যান। সত্যজিৎ রায়ের ‘অপরাজিত’ যখন ‘গোল্ডেন লায়ন’ সম্মানে ভূষিত হয়, তখন মুকুরবাবুর প্রস্তাবমতো কলকাতা পুরসভা ১৯৫৮ সালের ১০ জানুয়ারি চলচ্চিত্রকারকে নাগরিক সংবর্ধনা দেয়। স্বাধীনতার পরেও দীর্ঘদিন কলকাতা পুরসভার ইংরেজ আমলের লোগোটি চালু ছিল। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের পরামর্শে ও মুকুরবাবুর বিশেষ উদ্যোগে ১৯৬০ সালে ‘পুরশ্রী বিবর্ধন’ লোগোটির ব্যবহার শুরু হয়। তিনি পুরসভার মঞ্চকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের হাতিয়ারে পরিণত করতে পেরেছিলেন। যুক্তিনিষ্ঠ জোরালো ভাষণ দিতেন। ষাটের দশকের মাঝামাঝি মুকুরবাবুর প্রস্তাব অনুযায়ী তৎকালীন মেয়র গোবিন্দচন্দ্র দে ক্রিস্টোফার রোডে নজরুল ইসলামকে তঁার জন্মদিনে নাগরিক সংবর্ধনার আয়োজন করেন। ১৯৭৫ পর্যন্ত তা বজায় ছিল। ১৯৬৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পার্ক সার্কাসে খ্রিস্টান সমাধিস্থানের প্রবেশপথে তঁারই উদ্যোগে মাইকেল মধুসূদনের স্মৃতিফলক বসানো হয়। ওই বছরেই ডালহৌসি স্কোয়ারের নাম বদলে ‘বিনয়–বাদল–দীনেশ বাগ’ করা হয় পুরসভার উদ্যোগে। তারও প্রস্তাবক ছিলেন মুকুরবাবু। এর পর টানা আট বছর তঁার রাজনৈতিক জীবন বয়ে যায় অন্য খাতে। সেই সময় তিনি
তরুণ নকশালপন্থী যুবকদের সংযোগ–সেতু ছিলেন। এই যোগাযোগের জন্য তিনি ১৯৭২ সালের ৩০ জুন গ্রেপ্তার হন। খবরাখবর আদায়ের জন্য লালবাজারে চলে তঁার ওপর অকথ্য অত্যাচার। ছ’বছর বিনা বিচারে জেলে কাটিয়ে ১৯৭৭ সালের মাঝামাঝি রাজ্যে বামফ্রন্ট প্রথম ক্ষমতায় আসার পর মুক্তি পান মুকুরবাবু। এর পর সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে পুরোপুরি সামাজিক কাজকর্মে জড়িয়ে পড়েন।
এই পর্যায়ে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ কলকাতাবাসীকে নতুন করে ডিরোজিওকে চেনানো। ১৯৮১ সালে ডিরোজিওর সার্ধশত মৃত্যুবার্ষিকীতে মৌলালির অদূরে ১৫৫, আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডে তঁার জন্ম–মৃত্যুর স্মারক বাড়িটিতে মুকুরবাবু ও তঁার কয়েকজন অনুগামী একটি ফলক বসিয়ে দেন। ফলকটির উদ্বোধন করেন কলকাতাবিদ রাধারমণ মিত্র। পার্ক স্ট্রিটে ডিরোজিওর সমাধির সামনে গড়ে ওঠে স্মৃতিসৌধ। ১৯৮২ সালে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার হলের নামকরণ হয় ‘ডিরোজিও হল’। এ ব্যাপারে তিনি অধ্যাপক সমিতির সাহায্য নেন। পরে তাতে সরকারি শিলমোহর পড়ে। ১৯৮২ সালে ৮ এপ্রিল মহাবিদ্রোহের প্রথম শহিদ মঙ্গল পান্ডে স্মরণে মহাকরণের বিপরীত ফুটপাথে বসে ‘মঙ্গল মিনার’। উদ্যোক্তা ছিলেন মুকুরবাবুই। এর পরে ব্যারাকপুর ফেরিঘাটে শহিদমূর্তি স্থাপিত হয়। সঙ্গীত ছিল মুকুরবাবুর রক্তে। বড়ে গোলাম আলি, জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ প্রমুখের সঙ্গে তঁার ঘনিষ্ঠতা ছিল। মধ্য কলকাতার ২৮, রামকানাই অধিকারী লেনের যে বাড়িতে ১৮৮৩ সালে গায়ক যদুভট্ট শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন, সেই বাড়িটি মুকুরবাবু ও তঁার সঙ্গীরা চিহ্নিত করেন এবং সেখানেও একটি ফলক বসে। ইতিহাস সংরক্ষণের এইসব কাজে তঁার উৎসাহের অন্ত ছিল না। ১৯৮৭ সালের ১৪ আগস্ট কলকাতা তথ্যকেন্দ্রে শিল্পী দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের শেষ প্রদর্শনীটি হয়েছিল তঁার চেষ্টাতেই। দেবব্রত তখন পক্ষাঘাতে বঁা হাত হারিয়েছেন।
ভারতীয় ক্রিকেটের কিংবদন্তি মুস্তাক আলিকে তিনি চৌরঙ্গি ওয়াইএমসিএ হলে সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। মুস্তাক কলকাতায় এলে মুকুরবাবুর সঙ্গে ট্রামে চড়ে ইডেনে যেতেন। তঁার কাজের ক্ষেত্র ছিল বিচিত্র। ১৯৫৩ সাল থেকে চিত্রশিল্পী যামিনী রায়ের জন্মদিন পালন করতেন তঁার বালিগঞ্জের বাড়ি গিয়ে। মুকুর সর্বাধিকারী প্রয়াত হন ১৯৯০ সালের ৩ মার্চ। ৭০ বছর বয়সে। দেহ দান করেছিলেন। তঁার মৃত্যুর পর সুকুমার সেন বলেছিলেন, ‘মুকুরবাবু ছিলেন বিরল মহাপুরুষ। পুরাণে এমন মহাপুরুষের কথা পড়েছি, চর্মচক্ষে এমন একজনকে দেখব ভাবিনি। তিনি আমার পড়াশোনায় যে সাহায্য করেছেন, স্বপ্নেও কেউ তা করবে কল্পনায় ছিল না।’‌
এমন মানুষের কথা কি অজানাই থেকে যাবে?‌

জনপ্রিয়

Back To Top