বাহারউদ্দিন: সম্প্রতি একটি আর্ন্তজাতিক সংস্থার খবরে নজর পড়ল, ভিড় এড়িয়ে বকরি ইদের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বাড়িতে বসে, অনলাইনে কোরবানির পশু কেনাবেচা চলছে। আফ্রিকা, মধ্য-পশ্চিম-দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় একই চিত্র। ভারতের সতর্কতা অপেক্ষাকৃত বেশি। সাধারণ মানুষ আর সামাজিক নেতৃত্ব বিশেষ ভাবে সচেতন। ফোনে বাংলাদেশে বন্ধুদের সঙ্গে কথা বললাম। অনেকেই জানালেন, ‘‌বকরি ইদে এবার বাড়তি আড়ম্বর হবে না। সচেতনতার পূর্বাভাস লক্ষ করছি।’‌ নিঃসন্দেহে শুভ লক্ষণ। কোভিডের হুমকির বিরুদ্ধে সামাজিক সংযম ও বোধোদয় প্রমাণ করছে যে, করোনা সংক্রমণের মোকাবিলায় আমাদের সার্বিক অভিপ্রায় নেতির সন্ত্রাসকে, আতঙ্ককে আর বেশিদিন টিকতে দেবে না। উৎসবের আনন্দ আর সংযত মানবিক অভ্যাসের ধারণাটি কতটা বাস্তব, সংযমের পূর্ব লক্ষণ আমাদের হৃদয়কে, উৎসবমুখর আবেগকে সত্যি কি যুক্তির পাশাপাশি দাঁড়াতে বাধ্য করছে, এরকম চালচিত্র দেখার আগ্রহ নিয়ে সোমবার সকালে সতর্কতামূলক যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়ে একা, বাড়ির কাউকে না বলে গাড়ির স্টিয়ারিং-এ বসে পড়লাম। শহর ছেড়ে দক্ষিণ থেকে উত্তরের দুই জেলায়, এক গঞ্জ থেকে আরেক গঞ্জে, গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটতে ছুটতে বাড়ি ফিরে দেখি রাত একটা।  
বাংলায় রাস্তা এখন চমৎকার। খানাখন্দহীন। নিঃসঙ্গ লং ড্রাইভের পরম বন্ধু। গ্রামের মানুষ আরও ভাল। সরল, অতিথি পরায়ণ। বানিয়ে সত্য বলেন না। সত্যকে সত্যের মতো অকৃত্রিম ভাষায় জানিয়ে দেন। প্রত্যন্ত গ্রামেও মাস্ক তাঁদের সঙ্গী। ভয় নয়, গুজব নয়, সতর্কতাই তাঁদের সুদৃঢ় সঙ্কল্পের অবলম্বন। যেখানে যাচ্ছি, সেখানেই প্রায় একই উচ্চারণ, ইদে এবার বাড়তি আড়ম্বর নয়। কোরবানি দিতে হয়, দেব। কোরবানির মাংস প্রতিবেশীকে এবার আরও বেশি করে বিলিয়ে দেব। এটাই এবারের ইদে ওপরওয়ালার অদৃশ্য নির্দেশ। সঙ্কটে মানুষের পাশে থেকো, মানুষকে দেখো, অভুক্তকে খাবার দাও, সম্বলহীনকে পরনের পোশাক বিলাও- এরকম আদেশ আর প্রত্যাদেশকে গুরুত্ব দিতে আমরা অভ্যস্ত। এ বছর একটু অতিরিক্ত।
মঙ্গলবার টানা ১৫ ঘণ্টা সফরের এই প্রাপ্তি, এই দায়বদ্ধতার বার্তা আমাকে ঘুমোতে দেয়নি। ঘুম এল ভোরে। তার আগে, ইদ, কোরবানির উৎস, সেমিটিক উৎসব, কৃষিজীবী মানুষের বহুমুখী উৎসবের উৎস, পারিবারিক আর সামাজিক গড়নে পালা পার্বণের বিশ্বায়িত বিস্তার নিয়ে মর্গান, ফ্রেজার, ম্যাকস ওয়েবার, কৌসম্বির ভাবনাচিন্তার সঙ্গে খানিকটা পরিচিতি আবার খতিয়ে দেখার আগ্রহ জাগল এবং ‘‌ইসলামের সামাজিক নৃতত্ত্ব’‌ শীর্ষক ঢাকার জাতীয় সংগ্রহশালায় আমার একটি বক্তৃতা, একটি প্রকাশিত বইকে বাতিল করে দেওয়া দরকার বলে মনে হল। কারণ ফলিত নৃবিদ্যার সঙ্গে বইটির সম্পর্ক বড় খণ্ডিত। নগণ্য। 
ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ আপাতত উহ্য রেখে বকরি ইদ ও কোরবানির পৌরাণিক উৎস ও তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কিছু কথা বলা জরুরি এবং ভেবে দেখা দরকার, সময়ের সঙ্গে উৎসব কীভাবে তাল মেলাচ্ছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সমাজ কীভাবে তার পার্বণের গুণগত যাপনকে বিস্তৃত করে তুলছে।
দক্ষিণ–পূর্ব আর পশ্চিম এশিয়া, আফ্রিকার নানা প্রান্তেও বহু প্রস্তরবেদি আবিষ্কৃত হয়েছে, এ সব বেদিতে কৃষিজীবী মানুষ একসময় তার উৎপাদিত প্রথম ফসল, পরে নরমাথা, তারপর নরবলির উচ্ছেদ ঘটিয়ে পশুকে পারিবারিক অথবা গোষ্ঠীভূত আরাধ্যের উদ্দেশে উৎসর্গ করত। সামাজিক নৃবিজ্ঞানীদের ধারণা, এ সব কালোপাথরে নরবলি দেওয়ার প্রথা আদিম সমাজে (প্রিমিটিভ সোসাইটি) বহুল প্রচলিত ছিল। পশ্চিম এশিয়াও ব্যতিক্রম নয়। পরে মানুষের বদলে পশুবলি চালু হয়। ইসলাম সরাসরি, স্পষ্টভাষায় নরবলির নিন্দা করেছে। নাকচ করেছে বাইবেলও। বাইবেল ও কোরানে, মহাপুরুষ ইব্রাহিমের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ ঈশ্বরের নামে বলি দেওয়ার যে প্রতীকধর্মী গল্প প্রচলিত আছে, তাতেও প্রমাণিত হয়, নরবলির জঘন্য প্রথাকে সেমিটিকদের বিবর্তিত বিশ্বাস বরদাস্ত করেনি। ইসলাম ব্যক্তিগত সম্পদ কিংবা কোরবানির একাংশ বিলিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছে, সামাজিক দায়বদ্ধতা তার ভেতর আর বাইরের আবশ্যিক অঙ্গীকার। এ কারণেই ইদ-উল-আজহার সঙ্গে যে পৌরাণিক গল্প জড়িয়ে আছে, তার মর্মার্থকে প্রাসঙ্গিক করে তুলে গোত্রজাত সাম্যের মহিমাকে ইসলাম গুরুত্ব দিয়েছে। দুই ইদের সঙ্গে সম্পৃক্ত আচার–অনুষ্ঠান, ফিতরা, জাকাত, সঙ্ঘবদ্ধ উপাসনা, আলিঙ্গন বা কোরবানি যে নিছক অনুষ্ঠান নয়, হজরত মহম্মদের (দঃ) মঙ্গলবোধের জোরালো জিজ্ঞাসার প্রায়োগিক উত্তর নতুন করে ভেবে দেখা প্রয়োজন।  
আরবি বর্ষের দ্বাদশ মাসের (জু-উল হিজজা অথবা জি উল হিজাজ) ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে ইদ–উজ–জুহা উদ্‌যাপিত হয়। তিনদিনের যে কোনও দিন পরিবার অথবা প্রতিবেশীর সাত সদস্যের নামে কোরবানি স্বীকৃত, অনুমোদিত। নির্দিষ্ট পশুকে দ্রুত ঈশ্বরের উদ্দেশে বলি দেওয়ার আদেশ রয়েছে। এ ব্যাপারে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত। তা হচ্ছে এই যে, দ্রুতগামী ঘোড়া যে-ভাবে টগবগ করে পুলসিরাত পেরিয়ে যায়, সেভাবে অবিলম্বে পশুকে হত্যা করতে হবে। হইচই করা চলবে না। পুল-এ-সিরাত (জীবনের সেতু বা স্বর্গ–নরকের সেতু) কী? কী তার চেহারা, প্রসঙ্গত, একটু বলা দরকার। চুলের চাইতে সূক্ষ্ম, তরবারির চেয়ে ধারালো এ সেতু শেষ বিচারের দিন প্রতিটি মানুষকে অতিক্রম করতে হবে। যাঁরা পুণ্যবান, তাঁরা দুরন্ত ঘোড়া অথবা বিদ্যুতের গতিতে পেরিয়ে যাবেন। পাপীরা সক্ষম হবে না, পড়ে গিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করবে। বাংলা দোভাষী পুঁথিতে, মধ্যযুগের ফরাসি সাহিত্যে, আরবি কথকথায় এ সেতুর বিশেষ বর্ণনা আমরা দেখি। আরবদের মধ্যে এরকম সেতু চেতনা কীভাবে জন্ম নিল, তার নির্দিষ্ট উত্তর নেই। হাদিশ সঙ্কলন ‘‌মিশকা’‌-তে সেতুটির উল্লেখ আছে। ই বি টেইলার তাঁর ‘‌প্রিমিটিভ কালচার’‌ বইটিতে, এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সামাজিক নৃবিজ্ঞানী  ফ্রেজার বলেছেন, প্রাচীন ইরানের চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে পুলসিরাতের কল্পনা এসে থাকতে পারে। আমাদের অনুমান, শেষ বিচারের ভালমন্দকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সেতুচিন্তা আরব–ইরানের সমন্বয়ে রচিত। পুল শব্দটি অনারব, ফারসি। সিরাত (জীবন) আরবি। সামাজিক নৃবিজ্ঞানের সুতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, প্রাচীন ইরান সেতুটির উদ্ভাবক এবং আরবচিন্তা এ সেতুর সঙ্গে শেষ বিচার দিনটির পুনরুত্থানকে জুড়ে দিয়েছে। প্রসঙ্গত, বলা জরুরি, মৃত্যুর শেষে আরেক জীবনের শুরু, আর তার প্রবহমান পরিণতি নিয়ে নানা ধরনের কল্পনা শত শত বছর জুড়ে, সারা বিশ্বে প্রচলিত। এখানে প্রাচীন মিশর, আরব ভূখণ্ডে, পুরাকালের ভারত ও সমসাময়িক ইরানের মূত্যুচিন্তা একে অন্যের পরিপূরক।
বকরি ইদের প্রধানতম অনুষঙ্গ হজও সম্ভবত প্রাক-ইসলামি অভ্যাস। মক্কা ছিল প্রায় আন্তর্জাতিক ব্যবসা–কেন্দ্র (সেন্ট্রাল প্লেস, মরকজ)। বিশেষ বিশেষ সময়ে নানা প্রান্তের মানুষ মূলত বর্ষাশেষে জুলহজ মাসে এখানে এসে উৎসবে জড়ো হত। রমজান মাস থেকে শুরু হয়ে যেত তার প্রস্তুতি। পরে কাবাগৃহ এবং হজ–এর ইসলামিকরণে বহুপূজার পূর্বজ আচার-অনুচার বন্ধ হয়ে গেল, কিন্তু রয়ে গেল  পূর্বের স্মৃতিচিহ্ন। ইসলামের কৃতিত্ব, হজকে (হজ শব্দের অর্থ ইচ্ছা করা, কোথাও নির্দিষ্ট উদ্দেশে যাত্রা করা- (সূত্র, লিসানুল আরব, আরব শব্দ ভাণ্ডার) দেবদেবীর আরাধনার বাইরে নিয়ে এসে বৃহত্তম উপাসনাময় তীর্থযাত্রায় সাজিয়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, আমরা হজের আনুষ্ঠানিকতাকে সাধারণ মানুষের ভ্রমণ-ইচ্ছার আনুষঙ্গিক উপাদান ভেবে তার মর্মার্থকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি। কী সেটা, বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষ একই ময়দানে, একই উপাসনাগৃহের সামনে এসে সমবেত হয়ে পরস্পরকে দেখছে, পর্যবেক্ষণ করছে একে-অন্যের নিষ্ঠা, লক্ষ করছে পৃথক জনগোষ্ঠীর ভাষা আর তাদের আচার-আচরণ। তৃতীয়ত, কাবাগৃহের দেবদেবীকে প্রদক্ষিণ, মারওয়া ও সাফা পর্বতের মাঝখানে প্রবাহিত ঝর্না জমজম দর্শন, আরাফাত ময়দানে, মিনায় সমবেত হওয়া, অদৃশ্য শয়তানের উদ্দেশে পাথর নিক্ষেপ এবং চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে কালোপাথরে (হজর-এ-আসদ) প্রণিপাত করা এবং সংগঠিত, কিংবা প্রথানির্ভর সফর শেষে মাথামুণ্ডন- এরকম আরও বহু অনুষ্ঠান একসময় ইসলাম-পূর্ব আরবের সফরপর্বে পৌত্তলিকতার অন্তর্গত ছিল। গোত্রজ সাম্যকে, ধর্মীয় সাম্যের মোড়কে যে বৈষম্যহীন ব্যবস্থা (ইগেলিটারিয়ান সিস্টেম) গড়তে চেয়েছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নবি, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ল হজের ভেদাভেদহীন, শ্রেণিহীন মহাসমাবেশে। মক্কায় আর্থিক আমদানিও অব্যাহত থাকল। চতুর্থত, ইসলাম আবশ্যিক হয়ে উঠল একই ধরনের আনুষ্ঠানিকতা, একই কণ্ঠের খুতবার (ভাষণ) বাধ্যতামূলক শ্রবণ। সাধারণ আরবরাও বুঝতে পারল, তাদের চিরায়ত লোকজ বিশ্বাসকে সংস্কার করেও মর্যাদা দিয়েছে ইসলামের অভিমুখ ও অলৌকিকের অন্তহীন অধীতি, যেখানে ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা আর ব্যক্তিস্বরূপকে ছাপিয়ে বিশ্বরূপ বিশ্বাসিত হয়ে ওঠে। যা সব দেশের সব কালের আনুষ্ঠানিক, এমনকী সঙ্ঘবদ্ধ উপাসনা ও পর্বাচারের সচেতন, অবচেতন লক্ষ্য। যাকে, ‘‌মানুষের ধর্ম’‌ এ এক মানবের সাধনা বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। ইসলামের সংগঠিত উৎসবের, দলবদ্ধ নামাজের অভিপ্রায়ে, ইমামের খুত্বাপাঠেও কি উদ্ভাসিত নয় চিরন্তন এ আকাঙ্ক্ষা? আমাদের বিশ্বাস, এটি এক অনন্ত স্রোতধারা- কবি মহম্মদ ইকবাল যে ধারার নাম দিয়েছেন জিন্দারুহ, শাশ্বত প্রবাহ। ধর্ম, দর্শন, সমাজতত্ত্ব, সামাজিক নৃতত্ত্ব-সহ যাবতীয় মানববিদ্যা জেনে, না জেনেও আত্মতার রহস্যের (আসরার-এ-খুদি) উন্মোচনে একই পথে ছুটছে। এ পথের শেষ কোথায়? অনন্ত জিজ্ঞাসার জবাবের খোঁজে? না অনুশাসিত, বদ্ধচিন্তার আনুগত্যে? ব্যক্তিগত পরিসরে, ধর্মের ভেতরে আর বাইরে আমরা অনেকেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি, খুঁজছি ইহ জাগতিকতার বহুমুখী অঙ্গনে। 

জনপ্রিয়

Back To Top