রাজীব ঘোষ: ইতিহাস, ভূগোলের বিন্দুমাত্র জ্ঞানগম্যি যে এই মোদি সরকারের নেই— এটা আমাদের বোঝা হয়ে গিয়েছে। নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করতে স্রেফ কলম কাজে লাগিয়েছেন ওঁরা, মস্তিষ্কের প্রয়োগ করেছেন বলে তো মনে হয়নি। সত্যি বলতে কী, আজ পর্যন্ত কোনও বিরোধী নেতাকে বলতে শুনিনি যে, শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়া যাবে না! ভারতে এসে আশ্রয় নিয়েছেন লক্ষ তিব্বতি, হাজারে হাজারে বর্মি। বাংলাদেশ থেকে এসেছেন প্রায় এক কোটি মানুষ। তখন কেউ আপত্তি করেছেন‌‌‌‌‌? না।‌ তাহলে প্রশ্ন একটাই, শিখ–‌বৌদ্ধ–‌খ্রিস্টানদের কথা বলা হলেও, মুসলিমদের বাদ রাখা হল কেন? দেশভাগের সময় কোন প্রস্তাবে লেখা হয়েছিল অমুক ভারতে আসতে পারবে, তমুক পাকিস্তানে যেতে পারবে? বরং উল্টোটাই। ভারত থেকে পাকিস্তানে যাওয়া, কিংবা পাকিস্তান থেকে ভারতে আসায় কোনও ধর্মীয় শর্তের বেড়ি পরানো হয়নি। মোদ্দা কথা এই যে, অত্যন্ত বিভেদকামী একটি আইন এনে মোদি সরকার নেহরু–‌গান্ধী–‌প্যাটেলকে শিখণ্ডী খাড়া করেছে। না, তঁারা মুসলিমদের বাদ দিয়ে নাগরিকত্ব দেওয়ার কোনও ফিকির খোঁজেননি।
এবার আসুন ইতিহাসের কথায়। হঠাৎ আফগানিস্তানকে জুড়তে গেলেন কেন মোদিরা? আফগানরা কস্মিনকালেও ইংরেজদের গোলাম ছিল না। মাত্র চার বছর ওই দেশে ইংরেজরা থাকতে পেরেছিল। ১৮৩৮ সালে ১৫,৯৯৯ ইংরেজ ফৌজিকে কচুকাটা করেছিল পাঠানবাহিনী। শুধু ডাঃ ব্র‌্যাডেন নামে একজন পালিয়ে এসেছিলেন, তঁার ৪০ কেজি ওজন কমে গিয়েছিল। হিন্দু–‌মুসলিম–‌তাজিক–‌উজবেক–হাজারা সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ ভারতে এসে আশ্রয় নিলেও তঁারা আফগানিস্তানে ফিরে গিয়েছেন। আফগানিস্তানে বড় বড় ব্যবসা চালিয়েছেন শিখ ও হিন্দুরা। তঁাদের ওপর কেউ অত্যাচার করেনি। সুলতান আলি কিস্তমান এক সময় আফগানিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তঁার বাবা মজুর খাটতেন শিখদের ক্ষেতে। শ্রীলঙ্কা থেকে ভারতে এসেছেন খ্রিস্টান, হিন্দু, তামিল মুসলিমরাও। কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। 
ভারত সম্পর্কে এঁদের, মানে মোদি–‌শাহদের কোনও ধারণাই নেই। মহর্ষি দয়ানন্দের রচনা নির্ঘাত পড়েননি। তঁার রচনায় যে আর্যাবর্তের বিবরণ আছে, তা একদিকে ত্রিবিষ্টুপ থেকে মলদ্বীপ, অন্যদিকে আরাকান থেকে খোরাসান পর্যন্ত বিস্তৃত। আরাকান হল বর্মা, খোরাসান মানে ইরান–‌পারস্য। প্রায় একই রকমের সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস। তামিলদের চেট্টিনাড় চিকেন, তালাকাপাট্টি বিরিয়ানির নাম নির্ঘাত মোদিরা শোনেননি। শুনলে দু’‌বেলা বিরিয়ানির নামে গাল পাড়তে গিয়ে দু’‌বার ভাবতেন। ইরানের চেলো কাবাব কলকাতার জনপ্রিয়তম পদের একটি। আর্যাবর্তে মাংস আর সোমরসের আসক্তির প্রমাণ গ্রন্থে গ্রন্থে রয়েছে। সে সব কথা ওঁদের বুঝিয়ে লাভ নেই। ওঁরা একবগ্গা মনুবাদী। ব্রাহ্মণ্যবাদের বাইরে কিছু ভাবতেই পারেন না। এক দলিত সমর্থকের বাড়িতে গিয়ে খাচ্ছেন অমিত শাহ, সঙ্গে সঙ্গে ছবি দিয়েছেন টুইটারে— যেন কী মহান কাজটি করেছেন!‌ মুসলিমরা ওঁদের কাছে যতটা অচ্ছুত, দলিতরাও ততটাই। ভোটের সময় অবশ্য মোদি দলিত–‌দলিত বলে চিৎকার জুড়বেন, ব্যস ওইটুকুই। হিন্দি বলয়ের বাইরের ভারতকে ওঁরা চেনেন না, চিনতেও চান না।
আসলে দেশের স্বার্থে ভেবেচিন্তে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া মোদির ধাতেই নেই। নোটবাতিল তার উদাহরণ। নতুন নোট ছাপতে ৩০ হাজার কোটি গলে গেল, ওই পরিমাণ কালো টাকা উদ্ধার হল না। উল্টে দিব্যি জাল হতে শুরু করেছে নতুন দু’‌হাজারি নোট। নাগরিকত্ব আইন আনার আগে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনাই করা হয়নি। পড়শি দেশগুলি আজ ভারত সম্পর্কে বেজায় খাপ্পা। পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শত্রু বাংলাদেশ, সেই সূত্রে ভারতের সবচেয়ে বড় বন্ধুও বটে। আজ সেই হাসিনাই বাধ্য হচ্ছেন ক্যা–‌র বিরুদ্ধে মুখ খুলতে। যিনি দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে কাজ করতেন। চেনা শহর, চেনা মানুষ। বাড়ির মেয়ের মতো। তাঁকে ইওর এক্সেলেন্সি বলতে হয় না, হাসিনা আমাদের কাছে প্রিয় আপা, দিদি। ক্ষুব্ধ মালয়েশিয়ার মহাথির মহম্মদ। ক্ষিপ্ত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। তাদের সংসদে বিরূপ প্রস্তাব আটকাতে তদ্বির করতে হচ্ছে স্পিকারকে, বিদেশ মন্ত্রককে। যঁাদের কাশ্মীর দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন মোদি, তঁারাই ফিরে গিয়ে গালমন্দ করছেন। অর্থনীতির বারোটা বাজিয়েছিলেন আগেই, এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের সম্মানটুকুও ধুলোয় লুটিয়ে দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কা, মলদ্বীপ ঢলেছে চীনের দিকে। পাকিস্তান, নেপালও চীনের দিকে। বাংলাদেশ দূরে সরে যাচ্ছে। তিলে তিলে গড়া জোট–নিরপেক্ষ আন্দোলন কিংবা সার্ক— সব ধুয়ে–‌মুছে গেছে।‌
নাগরিকত্ব চাল–‌ডাল–‌আটার মতো সামগ্রী নাকি?‌ পাল্লায় বসিয়ে ওজন করলাম আর দিয়ে দিলাম!‌ আজ যদি কোনও দেশ শিখ বা খ্রিস্টান সাজিয়ে কোনও চর ঢুকিয়ে দেয়, আটকাতে পারবে মোদি সরকার?‌ পেরেছে ২০০০ টাকার জাল নোট রুখতে?‌ না, পারেনি। পারেনি কাশ্মীর সামলাতে। পারেনি জিএসটি রূপায়ন করতে। তা–‌ও ওইসব হঠকারী সিদ্ধান্তগুলোয় মানুষ এতটা খেপে ওঠেনি, কিন্তু এবার সহ্যের সীমা পেরিয়ে গেছে। ‘‌এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত’‌–‌এর বুকনি মারতে মারতে মোদিরা দেশটাকে ভেঙে টুকরো করে ফেলেছেন। আন্তর্জাতিক মহলে ভারত উপহাসের পাত্র এখন। মার্কিন মানবাধিকার সংগঠন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল চটে গেছে। আজ পর্যন্ত দুনিয়ার কোনও দেশ ক্যা–‌এনআরসিকে তারিফ করেনি। 
মোদিরা এখন প্রমাণ করতে চাইছেন প্রতিবাদী মানেই মুসলিম। ভুল। মুসলিমদের তুলনায় অনেক বেশি সংখ্যায় হিন্দু যুবক–‌যুবতীরা আজ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে শাহিনবাগ। মোদিরা একটা উপকার করেছেন। বিরোধী আন্দোলনের ব্যাটনটা সফলভাবে অরাজনৈতিক যুবশক্তির হাতে তুলে দিয়েছেন। ঠিক যেমনটি হয়েছিল জরুরি অবস্থার সময় অশ্রুতপূর্ব জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে। ইরানের শাহ জমানা তখনও স্মৃতিতে অমলিন, ট্যাঙ্ক চালিয়ে পিষে মেরেও যুবশক্তিকে দামাতে পারেননি শাহ। তাহরির স্ক্যোয়ারও আমরা ভুলিনি। মোদিদের দলবল যত গুলি চালাবে, তত সংহত হবে আন্দোলন। দেশ জুড়ে এনআরসি নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি— এমন ঘোষণাটি সম্ভবত পিছু হটারই ইঙ্গিত। হয়তো বা আদালতকেও ইঙ্গিত দেওয়া। সুপ্রিম কোর্ট ওই আইন খারিজ করে দিলেই মোদি হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন এখন। শাখের করাত, সামনেও কাটে, পিছনেও কাটে। 
আপ্তবাক্যটি মনে পড়েছে। ‘‌ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।’‌ এটা মোদির জানা নেই, ধাতে নেই। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top