প্রচেত গুপ্ত: আজ শিবু বাঁশফোরের কথা।
আমরা শিবু বাঁশফোরকে চিনি না। এটা আমাদের দোষ নয়। যাদের কথা ছিল পরিচয় করিয়ে দেওয়ার, তারা কথা রাখেনি।
শিবু বঁাশফোরের বয়স আঠাশ বয়স। কলকাতা থেকে এক রাত, এক বেলা লেগে যাবে তাঁর কাছে পৌঁছতে। নদীর পাশে ছোট্ট শহরে শিবুর বাস। এই দরিদ্র যুবকটির নিজের কোনও পাকা ঠিকানা নেই, তারপরেও নিজের ভিতরে দায়িত্ব কর্তব্যবোধের একটা পাকা ঠিকানা বানিয়ে ফেলেছেন তিনি।‌ ভয়ঙ্কর অতিমারীর সময় আমরা বেশিরভাগ ‘‌ভদ্রলোক’‌ যখন নিজের আর আপনজনের শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তিত, তাকে আগলে রাখতে ব্যস্ত, শিবু তখন ভোর হতে না হতে ঘর ছাড়ছেন। ঘর ছাড়ছেন অপরকে ভাল রাখতে। সুরক্ষিত রাখতে। ভয় নেই। কামাই নেই। অজুহাত নেই।
শিবু একজন সাফাই কর্মী। ছোট শহরে পুরসভার ঠিকাকর্মী। কাজ থাকলে রোজগার, না থাকলে নেই। এখন তাঁর ডিউটি হল, চাল আলু বিলির আগে স্কুলবাড়ি ‘‌স্যানিটাইজ’‌‌ করা। কোভিডের কারণে স্কুল বন্ধ। ছেলেমেয়েদের বাবা–‌মায়েদের হাতে চাল ডাল আলু দেওয়া হয়। নিয়ম, এই বিলি বণ্টনের আগে বাধ্যতামূলকভাবে স্কুলবাড়ি ‘‌ভাইরাস মুক্ত’‌ করতে হবে। শহর থেকে শুরু করে দূরদূরান্তের গ্রামে কোথাও এই নিয়মের ছাড় নেই।
মাসের প্রথম কটা দিন কাজ চলে। সাইকেলে চেপে বেরিয়ে পড়েন শিবু। পিঠে স্প্রে করবার মেশিন, সঙ্গে বোতলে স্যানিটাইজ করবার ‘‌ওষুধ’‌। মাইলের পর মাইল চলে যান। নির্দিষ্ট তারিখের আগেই অনেককটা স্কুলে কাজ সারতে হবে যে। সন্ধের আগে কাজ শেষ হয় না। কোনও কোনও দিন খাওয়াও হয় না। সারাদিন খাটাখাটনির তুলনায় মজুরি কম।
অনামা গ্রামের এক প্রাথমিক স্কুলের দিদিমণি ফোনে ধরিয়ে দিলেন। শিবু বললেন, ‘‌কেউ কতে পারবে না শিবু কাজে ফঁাকি দেয়। দিবই বা কেন?‌ টাকাপয়সা যা–‌ই পাই মানস্যের জীবন নিয়ে তে খেলা যায় না। যায় কি ?‌ আপনে বলেন না স্যর্‌।’‌
আমার বলতে ইচ্ছে করে, যায় শিবু, মানুষের জীবন নিয়ে খেলা যায় বৈকি। যায় বলেই কেউ এই ভয়ঙ্কর সময়ে নিত্য প্র‌য়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়ে দেয়, চিকিৎসার খরচ বাড়িয়ে দেয়, অ্যাম্বুল্যান্স থেকে কোভিড রোগী ফেলে দেয়, শত প্র‌য়োজনে ফোন বেজে গেলেও ধরে না। আবার উল্টোটাও রয়েছে। শিবু বাঁশফোরের মতো কোভিড যোদ্ধা সেই উন্টো মানুষদের প্রতিনিধি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখের জল, আহা উঁহু, মোমবাতি মিছিল, গণ আন্দোলন, জন বিস্ফোরণ কিস্যু চান না শিবু বাঁশফোর। শুধু একটু ভালবাসা চান। আসুন, তাঁর পিঠে হাত রেখে বলি ‘‌শাবাশ‌!‌’‌
হিংসুটেপনা এড়াতে শিবু বাঁশফোরের পরিচয়ে একটু অদলবদল করেছি। তাতে কিছু এসে যায় না। শিবু বাঁশফোরের মতো মানুষ সর্বত্র থাকেন। আমরা চিনতে চাই না এই যা।
এবার একটু অন্য কথা।
এখন আমাদের মাঝেমধ্যে সপ্তাহে দু’‌দিন লকডাউনের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেকের মতো আমার মনেও প্রশ্ন, দু’‌দিন কেন? সত্যি কি এই বিষয়ে অঙ্কের কোনও মডেল রয়েছে?‌
কেউ বলছে, দু’‌দিনের বদলে দশ দিন লকডাউন হলে ঠিক হতো। কেউ বলছে, দু’‌দিন ঘরে আটকে রেখে লাভ কী,‌ তৃতীয় দিন তো বাজারে যে কে সেই ভিড়। বরং বেশি ভিড়। কেউ আবার রাজনৈতিকভাবে সমর্থন করছে অথবা রাজনৈতিকভাবে বিরোধিতা করছে। এসবে আমি নেই। শুধু জানতে চাই, মডেলটা কী?‌
শুনেছি, এই ধরনের অতিমারী বিষয়ক মডেলে নানা ধরনের পার্টিয়াল ডিফারেনসিয়াল ইক্যুয়েশন ব্যবহার হয়। বাপ্‌রে!‌‌ আমি কী বুঝব?‌ দুই পরিচিতের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। প্রথম জন পদার্থবিদ্যার শিক্ষিকা নন্দিনী নাগ। অ্যাস্ট্রোফিজিক্সে ডক্টরেট। নিউট্রন স্টারের কিছু সূত্র নিয়ে কাজ করেছেন। দ্বিতীয়জন অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রযুক্তি গবেষক, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।
শ্রীমতী নাগ আমাকে বোঝবার মুখটা ধরিয়ে দিলেন।
ধরা যাক, একজন করোনা আক্রান্ত তিনজনকে আক্রান্ত করার ক্ষমতা রাখে।  সুতরাং একজন আক্রান্ত পথে বেরোলে তিনজনকে আক্রান্ত করছে। সেই তিনজন আরও তিনজনকে আক্রান্ত করছে। মোট ৯ জন আক্রান্ত হল। এই ৯ জন ৩ জন করে আরও ২৭ জনকে আক্রান্ত করছে। মোট ৩৮ জন হয়ে গেল। এটা গুণিতক হারে বাড়তেই থাকে। একে বলে সংক্রমণ শৃঙ্খল। সুতরাং একদিন ঘরে আটকে দিলে  শৃঙ্খলটি ভাঙা যায়। দু’‌দিন লকডাউন হলে আরও কিছুটা ভাঙা যায়, তিনদিন হলে আরও, চারদিন হলে আরও, আরও.‌.‌.‌।
অমর্ত্য বিস্তারিত গেলেন। তিনি ‘‌মডেল’‌টি পড়লেন। আলোচনা, সমালোচনা পড়লেন। তারপর আমার নিরেট মাথায় ডান্ডা মেরে বোঝানোর চেষ্টা করলেন।
আমি যা বুঝেছি, বলার চেষ্টা করছি। ভুল হবে এবং মার্জনা করবেন। আবার বলে রাখি, আমি কিন্তু দু’‌দিন লকডাউনের সমর্থন বা বিরোধিতা কিছুই করছি না। শুধু মডেলটা বোঝরা চেষ্টা করছি।
১)‌ এরকম একটি লকডাউন মডেল সত্যি আছে। একদিন এবং দু’‌দিন ধরে মডেল।‌‌ ভারতবর্ষের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা মডেলটি তৈরির কাজে ছিলেন। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স (আইআইএসসি), মুম্বইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (টিআইএফআর) এবং চেন্নাইয়ের চেন্নাই ম্যাথেমেটিক্যাল ইনস্টিটিউট (সিএমআই)–‌এর গবেষকরা জড়িত। আইআইএসসি–‌র পক্ষ থেকে দু’দফায় দুটি রিপোর্ট পেশ করা হয়। এ বছরের ১৯ এপ্রিল এবং ৪ জুন।
২)‌ এটি করোনা অসুখ সারানোর মডেল নয়। তা স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের বিষয়। এটি কতটা সংক্রমণ ঠেকিয়ে মানুষের রুটিরুজির ব্যবস্থা রাখা যায় তার মডেল। একটু চাপমুক্ত হয়ে পরিকাঠামো তৈরি করা যায়, চিকিৎসা ব্যবস্থা গুছিয়ে নেওয়া যায় তার মডেল। মনে রাখতে হবে, এটি কাজ বন্ধ করার মডেল নয়, কতটা সাবধানে কাজ চালু রাখা যায় তার মডেল।
৩)‌ যাদের সঞ্চয় অগাধ, এই ভয়ঙ্কর অবস্থাতেও নিয়মিত বেতন, উপার্জন রয়েছে, ঘরে বসে কাজ, তারা বেশিরভাগ চান মাস ছয়েক সব বন্ধ থাকুক। এক বছর হলেও সমস্যা নেই। দু’‌বছরেই বা ক্ষতি কী?‌ ব্যাঙ্কের সুদ, হোম ডেলিভারি এবং নেটফ্লিক্স খোলা থাকলেই হবে। দুঃখিত, এই মডেল তাদের খুশি করতে পারবে না। এই মডেল সেই অর্থনীতির, যেখানে ৮৫ শতাংশ মানুষেরই (‌বেশিও হতে পারে)‌ দিন আনি দিন খাই ব্যবস্থা। অনেককেই সকালে কঁাধে কোদাল নিয়ে বেরোতে হয়। এই মডেলের অঙ্ক অর্থনীতির গলা টিপে ধরেনি, হাত ধরেছে। না হলে তো বছর খানেক টানা লকডাউনেই করোনা মুক্তি ঘটত। সব শৃঙ্খল টুটে যেত। এই মডেল তাই একদিন এবং দু’‌দিন লকডাউন নিয়ে হিসেব করেছে। তার বেশি যায়নি। এমনকী তিনদিনও নয়। সেই ‌হিসেবটি অনেকের মতো আমার কাছেও রয়েছে।
৪)‌  গবেষকরা দেখেছেন এখনও পর্যন্ত  মূলত শহরকে কেন্দ্র করেই করোনা সংক্রমণ ঘটছে। অফিস থেকে বাজারে মানুষ যাচ্ছে ঘুরিয়ে–‌ফিরিয়ে (‌একেবারে বিরাট বোকা ছাড়া এখন বাজারে রোজ কে যায়?)‌‌। তাই ঘুরিয়ে–‌ফিরিয়ে আটকাতে পারলে এক্সপোজড হওয়ার সম্ভাবনা কমবে। ঘুরিয়ে–‌ফি‌রিয়ে লকডাউন করলে অনেক বেশি সংখ্যক মানুষকে নিয়ম মানতে বাধ্য করা যাবে। এক বা দু’‌দিনের লকডাউনের সময় স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং যাঁরা নীতি নির্ধারক তাঁরাও খানিকটা হলেও কাজ গুছিয়ে নিতে পারবেন। টানা লকডাউনে মানুষের মনে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা দেখা যায়। ঘুরিয়ে–‌ ফিরিয়ে লকডাউনে মানুষের সেই দিনগুলিতে নিয়ম মেনে চলার বাড়তি প্রবণতা থাকে। এসব কথা আমার নয়। ‌সূত্র:‌ কোভিড–‌১৯ আইআইএসসি মডেল, কমপিউটেশনাল ম্যাথমেটিক্স গ্রুপ, ডিপার্টমেন্ট অব কমপিউটেশনাল।
৫) মনে রাখতে হবে,‌ মডেল কোথাও বলেনি, প্রয়োজনে সাতদিন, দশদিন, একমাস লকডাউন করা যাবে না। সেটা এই মডেলের প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। মডেল কোথাও বলেনি, এক বা দু’‌দিনে লকডাউনের পর বাজারে ভিড় উপচে পড়বে না। সেটা এই মডেলের প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। যে কোনও অঙ্কেই কিছু নির্দিষ্ট প্যারামিটার থাকে। এখানেও রয়েছে। মাস্ক, হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার, দূরত্ব, পরীক্ষা, সংক্রমিতকে আলাদা করা, চিকিৎসা, প্রতিটি দিনই কড়া প্রশাসন—এসব যে থাকবে, এটা ধরে নিয়েই মডেল। ২ আর ২ যোগ করলে ৪ হয়। কেউ মাঝখানে গায়ের জোরে, উদাসীনতায় ১ ঢোকাতে পারে, তাতে ২ আর ২–‌এর যোগের ‘‌মডেল’ বদলাবে না। অঙ্কটি ভুল হবে।

জনপ্রিয়

Back To Top