প্রচেত গুপ্ত: ২০ জুলাই, ২০২০। ব্যাস‌, শিরোনাম এইটুকুই যথেষ্ট। মানবসভ্যতার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে থাকবে এই তারিখটি।
এই পর্যায়ের প্রতিটা লেখা মন ভাল করা কোনও খবর দিয়ে শুরু করতে চেয়েছি। একটা কোনও সুখবর, একটা কোনও সুভাবনা। বলবার চেষ্টা করেছি, এই গভীর দুঃসময়েও সব ‌ভাল‌ চিন্তা, সব ভাল ভাবনা, সব লড়াইয়ের ভাল ইচ্ছে হারিয়ে যায়নি। জানি না সে–কথা বলতে পারছি কিনা। হাল ছাড়িনি। আমি একবারও মনে করি না, আমার এইসব হালকা–পলকা লেখা ইতিহাসে থাকবে। তার জন্য বড় বড় ‘‌পণ্ডিত’‌রা আছেন। তাঁরা এক–একটা ‘‌ঐতিহাসিক লেখা’ লিখছেন।‌ আমি অতি ক্ষুদ্র। পাঠকদের একটু মন ভাল করবার জন্য লিখি। ওইটুকু হলেই খুশি। জানি না, তাও হচ্ছে কিনা।
তবে আজ আমি আর কী সুখবর দেব?‌ এই শতকের সব থেকে বড় সুখবরটি গতকাল, ২০ জুলাই ২০২০ তারিখে ঘটে গিয়েছে। এদিন ঘোষণা হয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় কোভিড ভ্যাকসিন তৈরির কাজে ‘‌বড় পরীক্ষা’‌ সসম্মানে টপকে গিয়েছে। কিছুদিনের মধ্যেই চূড়ান্ত হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন দেশ ভ্যাকসিন তৈরির বরাতও দিয়ে ফেলেছে। আজ, ২১ জুলাই, ২০২০ তারিখ বিশ্বের সব সংবাদপত্রে এই খবর প্রকাশিত হয়েছে। তারা যা লিখেছে এককথায় তার মানে দঁাড়ায়— কোভিড–১৯–এর ভ্যাকসিন পরীক্ষা সফল। সফল কতটা?‌ সিংহভাগ?‌ নাকি মূষিকভাগ?‌ বলতে পারব না। যে মারণ রোগ গোটা বিশ্বে প্রায় ছয় লক্ষ প্রাণ নিয়েছে, তার বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের জয় যদি ধূলিকণাসমও হয়, আমি মনে করি, সেটা এই শতকের সব থেকে বড় সুখবর। সেটাই ‘‌‌পাহাড়প্রমাণ’‌।
ছোটবেলার ফুটবল ম্যাচের কথা মনে পড়ছে। মাঠে নামবার চান্স না পেলে সাইড লাইনের পাশে দঁাড়াতাম আর প্রবল বেগে নিজের টিমের জন্য চিৎকার করতাম।
‘‌আর একটু, আর একটু এগিয়ে যা ভবা.‌.‌.‌ বলটা রিসিভ কর.‌.‌. ড্রিবল কর.‌.‌. ‌এবার অপনেন্টের রাইট ব্যাককে ছিটকে দে.‌.‌. দারুণ.‌.‌. ‌ফাটাফাটি.‌.‌. ‌এগিয়ে যা.‌.‌.‌।’‌‌
আমাদের এত গলা ফাটানোর পরও হয়তো কোনও কোনও সময় লাভ হত না।‌ ভবা গোলপোস্টের মুখে গিয়ে শট নিত এবং গোল মিস করত।
তাতে কী হয়েছে?‌ আমাদের উৎসাহের মূল্য কি একটুও কম ছিল?‌ ছিল না। খামতিও হত না। খেলা শুরু হলে আবার আমরা ফুল এনার্জিতে চেঁচাতে শুরু করতাম। মতি নন্দীর ‘‌কোনি’ গল্পে সুইমিং পুলের পাশ দিয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে খিদ্দার চিৎকার— ‘ফাইট কোনি, ফাইট কোনি’‌, শুধু ‘‌কোনি’‌ গল্পটিকে মহান করেনি, গোটা মানবজাতিকে মহান করেছে। ‘‌পারবে, ঠিক পারবে। এতটা যখন পেরেছে, বাকিটুকুও পারবে’ বলার মধ্যে লজ্জা কিছু নেই, গৌরব রয়েছে। শুধু খেলাধুলোতে কেন, সব ভাল কিছুতেই উৎসাহ দেওয়াটা মানুষের মজ্জাগত। যখন সে উৎসাহ দেয় না, তখন বুঝতে হয় সে বুঝতে পারছে না, নয় সে হতাশ। এতটাই হতাশ যে, কোনও আশার কথাই সে আর বিশ্বাস করতে পারছে না। ভরসা একটাই ব্যক্তি আশা–নিরাশার ওপর বিজ্ঞান চলে না। সে নিজের মতো চলতে থাকে।  
মানবজাতি এবং বিজ্ঞানের লজ্জা কোভিড–‌গবেষণা নিয়েও কেউ কেউ সমালোচনা শুরু করে দিয়েছেন। গবেষণা এবং তার ফলাফল নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন তুলছেন। মুখে মাস্ক পরে এবং না পরে আলোচনায় বসে পড়ছেন।
‘‌হুঁহু দঁাড়াও, এত লাফালাফির কী হয়েছে?‌ আগে দেখতে হবে। হুঁহু, কতটা সত্যি বুঝতে হবে। হুঁহু, কবে আমাদের জোড়াসঁাকো, জোড়াবাগানে আসে দেখি। হুঁহু, ভারতের যা হাল। হুঁহু, বুর্জোয়া ওষুধ কোম্পানি মিথ্যে রটায়। হুঁহু, অক্সফোর্ড হল ইয়েদের দালাল‌। হুঁহু, আগে দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের মুখে অন্ন। হুঁহু, আমি যখন রক্ত নিয়ে ল্যাবরেটরিতে.‌.‌.‌। হুঁহু, আসলে কী জানেন প্রোটিনের সঙ্গে আইসো ব্রুফেন, ফসফরাস ট্রুফেন আর ঘস্‌ঘরাস্‌ ঘ্রুফেন মেশালে.‌.‌.‌।’
হায়রে!‌ এঁরা হলেন ছিদ্রান্বেষী। ছিদ্র খুঁজতে খুঁজতে এমন স্বভাব হয়ে গিয়েছে যে, কোভিড ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীদেরও ভাবছেন ‘‌পাড়ার কেল্টোদা’‌। বিজেপি, তৃণমূল, সিপিএম খুঁজছে।
যাক, যা খুশি ভাবুক।
এই মুহূর্তে আমার খুব মনে পড়ছে ডাঃ সুকুমার মুখার্জির নাম। এই প্রসঙ্গে আবার একটা বিধিসম্মত সর্তকীকরণ দিয়ে রাখি। ডাঃ মুখার্জি আমাকে চেনেন না। চেনবার কারণও নেই। আমি ওঁর কাছে কখনও চিকিৎসার জন্য যাইওনি। ফলে এখন যা বলব, তা সত্য, নিরপেক্ষ এবং প্রমাণ–সহ। আজ থেকে তিন মাস আগের কথা। সময়টা একটু এদিক ওদিক হতে পারে, খবর কাগজ খুঁজলে সঠিক তারিখ অবশ্যই জানা যাবে। আজকাল পত্রিকায়, সম্ভবত ২ নম্বর পাতায় একটি অতি ছোট খবর প্রকাশিত হয়। সেখানে ডাঃ মুখার্জি বলেছিলেন, করোনার ভ্যাকসিন বেরোতে খুব বেশি দেরি নেই। ইউকে–তে আমার পরিচিতজনেরা, বন্ধুরা গবেষণার কাজ করছে। তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি চমকে উঠেছিলাম। আর কোনও সংবাদমাধ্যমে আমি এ ধরনের কথা তখন পড়িনি। খুব আশান্বিত হই। ডাঃ মুখার্জির মতো এতবড় একজন চিকিৎসক এ কথা বলেছেন!‌ আমি ওই ছোট খবরটির কথা অনেককে বলতে শুরু করি। আমার এক বন্ধু খুব হেসেছিল। আজ কি তাকে ফোন করব?‌ না, থাক। ওরও ভাল হোক।
ডাঃ মুখার্জির মতো বড় এবং ব্যস্ত মানুষকে ফোন করলে তিনি কি ধরবেন?‌ না, থাক, বিরক্ত করবার দরকার নেই। আশার খবর, সবার আগে আজকাল–এর পাঠকদের জানানোর জন্য আপনাকে অভিনন্দন, প্রণাম ডাঃ মুখার্জি। সেই ভয়ঙ্কর সময়, যখন বঁাচা নয় মৃত্যুই একমাত্র কথা, তখন আপনি যে বিজ্ঞানের কথা বলেছিলেন তা কে মনে রেখেছে আমি জানি না। আমি রেখেছি।
আর সেদিন সেই খবর প্রকাশ করবার জন্য নিজের কাগজ আজকাল–কে তো ধন্যবাদ জানাতে পারি না। গর্ব অনুভব করছি।
ধন্যবাদ জানাচ্ছি সুমন্ত্রদাকে। সুমন্ত্র ভট্টাচার্য। ধানবাদের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (‌ইন্ডিয়ান স্কুল অফ মাইনস্‌)‌–র সিনিয়র প্রফেসর। অতি বিদ্বান মানুষ। বিদ্বান মানুষের সঙ্গে পরিচত হবার কিছু সৌভাগ্য (‌তঁাদের জন্য দুর্ভাগ্য)‌ আমার হয়, কিন্তু সুমন্ত্রদার মতো ভালমানুষের সঙ্গে পরিচিত হবার সৌভাগ্য আমার খুব বেশি হয়নি। এমন মুক্তমনের মানুষও খুব কম দেখেছি। আমি ওঁর খানিকটা ‘‌ফ্যান’‌ই বলা চলে। সেই সুমন্ত্রদা আমাকে ক’‌দিন আগে ধানবাদ থেকেই ফোন করে বললেন, একেবারে ঘোড়ার মুখের খবর, ভ্যাকসিন কিন্তু অনেকটা এগিয়ে এসেছে। সুমন্ত্রদা বিশ্বের ইউনিভার্সিউটিতে পড়িয়ে, সেমিনার করে বেড়ান। ফলে অক্সফোর্ডে তাঁর ‘‌বন্ধু’‌ থাকা খুব স্বাভাবিক। শুধু বলেই ক্ষান্ত নন, সুমন্ত্রদা আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে কিছু লিঙ্কও পাঠিয়ে দিল।
এরপর আমার ভাইঝির কথা। মোহনা। মোহনা গুপ্ত। আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ ম্যাসাচুসেস্টে পিএইচডি করছে। মেডিক্যাল স্কুলে। এটা উস্‌টার শহরে। তার বিষয় মাইক্রোবায়োলজি। খুব স্বাভাবিকভাবেই ওরা কোভিড ভ্যাকসিন গবেষণার অনেক খবরাখবর সরাসরি জানাতে পারে। মোহনা আমাকে বেশ কয়েক দিন ধরেই বলছিল, ভ্যাকসিনের কাজ কিন্তু জোরকদমে এগিয়ে চলেছে।
ভ্যাকসিন গবেষণা নিয়ে যে তিনজনের কথায় আমি আশান্বিত হয়েছিলাম, তাঁরা কতটা বিশ্বাসযোগ্য পাঠকরাই বলতে পারবেন। তবে দুঃখিত, এঁরা কেউ কিন্তু আমাকে বলেননি, শনিবার বা সোমবার পাড়ার মোড়ের ওষুধের দোকানে গেলে চারটে হজমের ট্যাবলেটের সঙ্গে‌ একটা কোভিড ভ্যাকসিন কিনে আনা যাবে।
আমার বিশ্বাস আজ না হয় কাল যাবে। সেদিন কবে জানি না, তবে বিজ্ঞান বলছে, সেদিন খুব দূরে নয়। আর যদি ফেল করে তবে না হয় আবার বলব, ‘‌ফাইট কোনি ফাইট।’‌ ক্ষতি কী?‌ শুধু তো আমি নই, এটা গোটা বিশ্বকে বঁাচিয়ে তোলবার লড়াই। কিছু না পারি, চেঁচাতে তো পারব।
আমাদের খুব লজ্জা, ‘‌২০ জুলাই, ২০২০’‌ এতবড় একটা সুখবর জানবার পরও আমরা কোনও উৎসব করি না। বারান্দায় দঁাড়িয়ে হাততালি দিই না। থালা–বাসন বাজাই না। আলো জ্বালাই না। বাজি ফাটাই না। অথচ মোমবাতি জ্বালিয়ে পথে হঁাটতে আমাদের মতো কে পারে? আমরা হলাম ‘‌মোমবাতিম্যান।’‌
বিজ্ঞানের এতে লবডঙ্কা। বারবার সে–‌ই জেতে। এবারও জিতবে।‌

জনপ্রিয়

Back To Top