মেহেদি হাসান মোল্লা: কোভিড ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রতিযোগিতা চলছে বিশ্ব জুড়ে। বিভিন্ন দেশ এখন তাদের ভ্যাকসিন বাজারে আসার দিন আগাম ঘোষণা করছে এই দৌড়ে এক পা এগিয়ে থাকতে। তার মধ্যে রাশিয়া এক লাফ দিয়ে তাদের ভ্যাকসিন ‘‌স্পুটনিক ৫’‌–এর নাম নথিভুক্ত করে বসে আছে। রুশ ভ্যাকসিন কতটা কার্যকরী এবং নিরাপদ হবে, সেই সন্দেহ দূর করতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, তঁার কন্যার ওপরেও ভ্যাকসিনটি প্রয়োগ করা হয়েছে। অর্থাৎ ভ্যাকসিনটির ব্যাপারে তিনি এতটাই নিশ্চিত এবং নিশ্চিন্ত।
কিন্তু সমস্যা হল ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘতম যে পর্যায়, সেটি অতিক্রম করার আগেই এই ভ্যাকসিনকে ছাড়পত্র দিয়েছে রুশ স্বাস্থ্য মন্ত্রক! যার দৌলতে রাশিয়া এখন ক্লাসের ফার্স্ট বয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, হিউম্যান ট্রায়ালের গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় পর্যায় সফল ভাবে উত্তীর্ণ না হয়ে ফার্স্ট বয়ের সার্টিফিকেট পাওয়া, আর ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়া এক নয় কি? কিন্তু এই ঝুঁকি নিয়ে কেন স্বাস্থ্য মন্ত্রক ভ্যাকসিনের ছাড়পত্র দিলেন? মাত্র দু’‌মাসের ট্রায়ালে মোট ৭৬ জন স্বেচ্ছাসেবীর ওপর ট্রায়াল চলেছে রাশিয়ায়। তাদের ওপর ভ্যাকসিনের শর্ট রানে তেমন সমস্যা হয়নি ঠিকই এবং তাদের শরীরে অ্যান্টিবডির উপস্থিতিও পরিলক্ষিত হয়েছে। কিন্তু তাতেই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা সঠিকভাবে প্রমাণিত হয় না। কোনও ভ্যাকসিনকে সফল ভাবে উত্তীর্ণ হতে গেলে কমপক্ষে ১০০০ থেকে ৩০০০ জন, বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে তা প্রয়োগ করতে হয়। তারপর লং রানে অন্তত ৬ মাস ধরে পর্যবেক্ষণ করতে হয়, কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে কি না। ভ্যাকসিন নেওয়ার পর কেউ নতুন ভাবে আক্রান্ত হচ্ছে কি না। ভ্যাকসিন আদৌ রোগ প্রতিরোধ করতে পারছে কি না অথবা প্রতিরোধ করলেও কত দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। ভ্যাকসিনের রিস্ক–বেনিফিট নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় ‘‌প্ল্যাসিবো কন্ট্রোলড, র‌্যান্ডমাইজড ট্রায়াল’‌। অতি আবশ্যিক ও গুরুত্বপূর্ণ এই ধাপ টপকে নিজের সাফল্য জাহিরে কোনও কৃতিত্ব নেই, বরং আছে শুধু মূর্খামি। ফলত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা–সহ অনেকেই সন্দিহান।
স্বাস্থ্যকে পণ্য হিসাবে বাণিজ্যিক রূপে রূপান্তর অনেক আগেই শুরু হয়েছে। সারা বিশ্বজুড়ে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের রেষারেষিতে রাশিয়ার এই পদক্ষেপ স্বাস্থ্যের বাণিজ্যিকরণের অভিযোগকে যেন আরও দৃঢ় করল। রাশিয়া বরাবরই নিজের আমিত্ব, অহংবোধ জাহির করা ও প্রতিশোধ নেওয়ার মনোভাবে বিশ্বাসী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ঠান্ডা যুদ্ধের আবহাওয়ায় বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে মহাকাশযান পাঠিয়ে সবাইকে চমক দিয়েছিল। মনে করা হচ্ছে সেই ধারা অব্যাহত রাখতে এই তীব্র সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে আবার একটা চমক দিল পুতিনের দেশ। কিন্তু সাধারণ মানুষকে কি বিপদের দিকে ঠেলে দেওয়া হল না? ইতিহাস সাক্ষী আছে অসম্পূর্ণ গবেষণা, অসাবধানতার ফলে বহু ভ্যাকসিনে মানুষের হিতে বিপরীত হয়েছে।
১৯২৯ সালে জার্মানির লুবেক শহরে বিসিজি টিকা শিবির হয়েছিল। এই শিবিরের চার মাস পরে দেখা যায় যে শিশুদের ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল তার মধ্যে ২৫১ জনের যক্ষা রোগ দেখা গেছে। তাদের মধ্যে মারা যায় ৭০ জন। ঘটনার তদন্ত করে জানা যায়, নতুন আবিষ্কৃত এই ভ্যাকসিনে ভিরুলেন্ট টাইপ টিউবারকুলোসিস মিশে ছিল যেটি থেকে সংক্রমণ ছড়ায়। এই ঘটনা ‘‌লুবেক ডিজাস্টার’‌ নামে চিহ্নিত হয়ে আছে আজও। ১৯৫৫ সালে আমেরিকার পাঁচটি রাজ্যে প্রায় দু লক্ষ শিশুকে পোলিও ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। কিছুদিনের মধ্যে বহু শিশু প্যারালিসিসের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরীক্ষা করে জানা যায়, প্রায় ৪০ হাজার শিশু পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তদন্তে উঠে আসে কাটার ল্যাবরেটরিতে নতুন আবিষ্কৃত ভ্যাকসিনে ভিরুলেন্ট পোলিও ভাইরাস ইনঅ্যাক্টিভ করা ছিল না। এই ঘটনা শুধু ইতিহাসের পাতায় অন্ধকার ‘‌কাটার ইনসিডেন্ট’‌ নামে পরিচিত হয়নি, এরপর থেকে বলা হয় মার্কিনিদের মধ্যে অ্যাটম বোমার পর পোলিও ভ্যাকসিনের প্রতি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হল রাশিয়ার তৈরি স্পুটনিক ভ্যাকসিনে রিকম্বিনান্ট হিসাবে যে অ্যাডিনো ভাইরাস ব্যবহার করা হয়েছে, সেই অ্যাডিনো ভাইরাস এর আগেও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল। ২০০৭ সালে আমেরিকায় এইচআইভি ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের সময় দেখা যায় সংক্রমণ আরও বেড়ে যাচ্ছে। ওই ভ্যাকসিনে ব্যবহার হয়েছিল অ্যাডিনো ভাইরাস, যেটি সংক্রমণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ওই ভ্যাকসিনের ট্রায়াল।
সুতরাং ভ্যাকসিনের ক্ষতিকর প্রভাব কী হতে পারে, তা সহজে অনুমেয়। যদিও এই ভ্যাকসিনগুলোর অধিকাংশই ট্রায়ালের তৃতীয় ধাপ সম্পূর্ণ করার পরেই ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, তবুও তাদের সুদূরপ্রসারী প্রভাব আটকানো যায়নি। যে–‌কোনও নতুন ভ্যাকসিন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, তার পর্যবেক্ষণের জন্যও কয়েক বছর সময় দিতে হয়। অথচ রাশিয়া উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ ছাড়াই ভ্যাকসিনের সুদূরপ্রসারী কার্যকারিতা নিয়ে নিশ্চিত থাকছে? শুধুই কি বাণিজ্যিক মনোভাব আর বিশ্ব রাজনীতিতে মর্যাদা বাড়ানোর ভাবনা? এর উত্তর হয়তো সময় দেবে। 

জনপ্রিয়

Back To Top