পাপড়ি ভট্টাচার্য: আমাদের জন্ম‌–‌‌উপত্যকায় ইংরেজি মে মাসে কৃষ্ণচূড়ার মাথায় আগুন জ্বলে। ‘‌বুঢ়ালুই’‌ ব্রহ্মপুত্র যেমন অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার কৃষ্টি–‌সংস্কৃতির বহমান বাহক, তেমনি ‘‌বরবক্র’‌ বা বরাক (বড় বড় বঁাক যার) নামে আরও একটি মহাভারত–বর্ণিত নদী রয়েছে এই অসমেই। বরাক নামে পরিচিত এই নদীর দুকূল জুড়ে বহু প্রাচীন জনপদ আজও বহন করে চলেছে এই অঞ্চলের সভ্যতা ও কৃষ্টির বহুরূপতা। নানা জাতি, জনজাতির এই মিলনভূমি সিপাহি বিদ্রোহ, স্বাধীনতার অহিংস এবং সহিংস আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। ভারতের আর–‌পাঁচটা শহরের সঙ্গে তুলনা করলে এই মিল তেমন আশ্চর্যের কিছু নয়। কিন্তু এই প্রান্তিক পিছিয়ে পড়া জনপদ তার স্বতন্ত্র গাথা রচনা করেছিল প্রায় ছয় দশক আগে, কোনও এক মে মাসের ১৯ তারিখে। মায়ের ভাষা বাংলায় বলার, লেখার, ভাবার অধিকার আদায় করতে ১৯৬১ সালের ১৯ মে দুপুর ২.৩৫ মিনিটে ১১টি তাজা প্রাণ রাষ্ট্রযন্ত্রের বুলেট বুকে নিয়ে ধরাশায়ী হয়েছিল শিলচর রেল স্টেশনে।
উগ্র অসমিয়া জাতীয়তাবাদের ভাষিক আগ্রাসন বুকের রক্ত দিয়ে রোধ করলেন সেই শহিদেরা। ভারতের প্রথম মহিলা শহিদ, ভাষা–সেনানী কিশোরী কমলা ভট্টাচার্য সেই একাদশের অন্যতমা। ১৯ মে ভারতের প্রথম মাতৃভাষা শহিদ দিবস। অসম–‌সহ সকল বাংলাভাষীর, সকল ভাষিক সংখ্যালঘুর প্রতিবাদ, অহিংসতা আর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের প্রতীক। তালিকা অবশ্য একাদশেই শেষ হয়নি। আঘাত এসেছে আরও তিনবার। ১৯৭২, ১৯৮৬, ১৯৯৬। দশকের ব্যবধানে বার বার। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার অধিকার আদায়ে ভাষা–সেনানীরা নিপীড়নের সাক্ষী থেকেছেন। যে বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজের শিল্পী রাজকুমার সেনারিক সিংহকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ছাত্র–ছাত্রীদের নাচ শেখানোর জন্য, যে সমাজের গুরু বিপিন সিংহ ‘‌সঙ্গীত নাটক আকাদেমি’‌ সম্মান লাভ করেন, সেই সমাজের সুদেষ্ণা সিংহকে পুলিশের গুলির সামনে দাঁড়াতে হয় নিজের ভাষা সংস্কৃতির অধিকার আদায় করতে। সব মিলিয়ে পঞ্চদশ শহিদের ভূমি ভারতবর্ষের বরাক উপত্যকা। তার পর থেকে বরাকের দুটো মুঠোই ভরা। একহাতে একুশে অন্যহাতে উনিশে। শহিদ বেদি কৃষ্ণচূড়ায় সাজত, আজও সাজে। গান হত, আজও হয়— ডাকে আজ একাদশ শহিদেরা, ভাই, আর দেরি নয় দেরি নয় দেরি নয়।
সত্যিই খুব একটা দেরি হত না। স্কুল ফুরোবার বেশ আগেই কিছু প্রশ্ন, কিছু সত্য আর কিছু অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখা উঠে আসত প্রতিদিনের যাপনে। ২১ ফেব্রুয়ারির কুলীনতার সামনে বড়ই ম্লান আমাদের ১৯ মে। ‘‌অস্তিত্বের সঙ্কট’‌–এর মতো কঠিন গালভরা শব্দের অভিঘাত রোজকার জীবনের কিছু টুকরো টুকরো শব্দ যেমন দেশভাগ, আসু আন্দোলন, বংগাল খেদা, অসম চুক্তি, ভিত্তিবর্ষ, ইত্যাদি নিয়ে বেশ খানিকটা হীনমন্যতা তৈরি করত ভিতরে বাইরে। আজও করে। কেউ জোর করে না। সরাসরি বলে না, স্পষ্ট হয়ে যায়। সেই পরিচয়হীনতার অস্বস্তি ঠেকাতে সঙ্গতি থাকা অনেকেই পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরবঙ্গ বা ভারতের আরও আরও শহরে ফ্ল্যাট বা জমিখণ্ড কিনে বৃহত্তর ভিড়ে মিশে যেতে চাইছেন। যঁারা আছেন, তঁাদেরও বৃহদংশ নিজেদের সন্তানদের পূর্ববঙ্গীয় উচ্চারণের বাংলা সরিয়ে রেখে প্রাণপণে মান্যভাষা (পশ্চিমবঙ্গে বলা বাংলা) শেখাচ্ছেন। উচ্চমাধ্যমিকের পর অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ও অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তানরা ড্রেন্‌ড আউট হয়ে যায় মেনল্যান্ড ভারতে। কিন্তু যারা প্রান্তিক, কাজের খোঁজে যাদের উত্তর–‌পূর্বের বাকি রাজ্যগুলোতে যেতেই হয়, তারা যে বাংলাদেশি বহিরাগত বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নন, সেই প্রমাণ কাগজেপত্রে দেখাতে হয় থানায়, বাসে, ট্রেনে.‌.‌.‌। তাই অসমবাসী ভারতীয় বাঙালি ভাষিক সংখ্যালঘুরা উনিশের লিগ্যাসি থাকা সত্ত্বেও খুঁজে চলছেন কে তঁারা? তঁারা বাংলাদেশি, শরণার্থী, বিদেশি, প্রকৃত ভারতীয়, নাকি উইপোকা, ঘুসপেটিয়া?
উত্তর–‌পূর্বের রাজ্যগুলিতে জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিরা যে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংখ্যালঘু, মূল ভারতের একাডেমিক, বা বৌদ্ধিক চর্চায় এই সত্যের তেমন গুরুত্ব নেই। অসম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, অরুণাচলপ্রদেশ, মেঘালয়ে ভাষিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালিরা নিয়ত আক্রান্ত। জমি আইন, ইনারলাইন পারমিট, আসাম চুক্তি, নাগরিকত্বের আইন সংশোধন ইত্যাদি বিভিন্ন আইন–স্বীকৃত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে উত্তর–পূর্বাঞ্চলে ভাষিক সংখ্যালঘুদের ওপর যে নিয়ত হেনস্থা চলে, তা কিন্তু মেনল্যান্ড ইন্ডিয়ার কাছে প্রায় অলীক, অচেনা বা মুখ ফিরিয়ে রাখা এক সত্য, যা আমরা বিশদভাবে পাই অস্ট্রেলিয়ায় গবেষণারত অসমবাসী গবেষক অর্জুন রাজখোয়ার লেখায়। (সূত্র: রেসিজম অ্যান্ড দ্য নর্থ ইষ্ট— এক্সক্লুশন অ্যান্ড প্রেজুডিস)
অসমে ২০১৫ সালে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি আপডেশন প্রক্রিয়ার জন্য নথি পেশের চাপ যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে ‘‌ডি’‌ সন্ত্রাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু এবং আত্মহত্যার ঘটনা। তখন থেকেই একাংশ সচেতন মানুষ ঘটনার উৎসে যেতে থাকেন এবং অসম উত্তর–পূর্বের বাঙালি জবাবও খুঁজে পেতে শুরু করেন। ষাট বছরের ওপর শুধু এটুকু বুঝতেই লেগে গেল অসম তথা উত্তর–পূর্বের বাঙালির, যে দেশভাগ অসম এবং উত্তর–‌পূর্বের বাঙালির জন্য আরও ভয়াবহ কিছু স্বতন্ত্র ধারার কুফল রচনা করে রেখেছে। ওই বাঙালিরা বুঝতে পারলেন, বিভিন্ন সময় নানা ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভাজনের শিকার হয়েছেন তঁারা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থা ও প্রশাসন যে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করেছে, এ কথাটা সর্বজনবিদিত সত্য হলেও অসম–উত্তর পূর্বাঞ্চলের ক্ষেত্রে আলোচনাটা বারবার অবহেলিত হয়েছে। ১৮২৬ সালে ইয়ান্ডাবু সন্ধির মাধ্যমে ইংরেজরা অসম দখল করে। ১৮৭৪ সালে সিলেট জেলাকে পূর্ববঙ্গ থেকে ছেঁটে অসমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গে আবার গোটা পূর্ববঙ্গকে কেটে অসমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। এই তিন ভূ–রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর্যায় জুড়ে স্বাভাবিক নিয়মে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানুষের স্বভাবজাত কারণে আনাগোনা, প্রব্রাজন, বাণিজ্য ও লোক বিনিময় ঘটতে থাকে। ব্রিটিশরা এই সামাজিক প্রভাবকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থে নিখুঁত ভাবে কাজে লাগাতে থাকে। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের মূল্য দিতে হল দেশভাগ স্বীকার করে। সর্বশেষ আঘাত ছিল ১৯৪৭ জুলাইতে সিলেট ভাগ বা শ্রীহট্ট গণভোট। দেশভাগের পর শুধুমাত্র অসমের সিলেট জেলার ক্ষেত্রে এই গণভোট বা রেফারেন্ডাম আয়োজন করা হল এক বিশাল সংখ্যক ভোটারকে বাদ দিয়ে। সিলেট জেলার গণভোট আয়োজনের সরকারি যুক্তিটি ছিল: অসম একটি অ–মুসলিম সংখ্যাগুরু প্রদেশ, এবং সিলেটে মুসলিমরা সংখ্যাগুরু। এই ঘটনার উল্লেখ এ জন্যই করা হল, যে অসম আন্দোলন, নাগরিকত্ব সঙ্কট এবং আজকের এনআরসি পরিস্থিতির উল্লেখিত প্রতিটা সিদ্ধান্ত ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে প্রায় সরাসরি যুক্ত।
বর্তমান এনআরসি প্রক্রিয়া এই বুঝতে পারাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। অখণ্ড ভারতের আদিবাসী বাঙালি বিভাজিত ভারতে বিদেশি তকমার সমাজ–রাজনৈতিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য খঁুজে পাচ্ছেন। দেশভাগ, সিলেট গণভোট যে পূর্ববঙ্গের এক বিশাল অংশের বাঙালিকে ভিন্নভাবে বিপন্ন করে তুলেছে, তা স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। একই সঙ্গে মানুষ বুঝে উঠতে শুরু করেছেন, ঠিক যেভাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা মানুষদের পূর্ববঙ্গ থেকে আসা বাঙালি উদ্বাস্তুদের তুলনায় বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন রাষ্ট্রনেতারা, ঠিক সেভাবেই দেশভাগ ও শ্রীহট্ট ভাগের শিকার উত্তর–‌পূর্বের বাঙালিদের নিঃশব্দ–নিকেশ–প্রকল্প বৃহৎ বঙ্গ সমাজেও তেমন গুরুত্ব পায়নি। ভারতের প্রথম মাতৃভাষা শহিদ দিবস ১৯ মে তাই এই প্রতিস্পর্ধী রাজনৈতিক অধিকারের স্পষ্ট মর্যাদা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তার বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ তমসাচ্ছন্ন, সকল উৎস মুখরতা নিয়ে উনিশ পালনের পরও। 
কেমন আছেন মহান উনিশের ভূমির ভাষিক সংখ্যালঘুরা? তারা ভাল নেই। বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জ শহরে একদিনে দুই হাজারের ওপর সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়েছে। প্রতিটি জেলাতেই এমন হচ্ছে। এদের ঠাঁই ডিটেনশন ক্যাম্প নামক আমরণের জেলে। যদিও তিন বছরের বেশি জেলে রাখার নিয়ম নেই, কিন্তু যে–‌সব নিয়ম বেইল পাবার জন্য আইনত সিদ্ধ, তা প্রান্তিক মানুষের পক্ষে জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। ডি সন্ত্রাসে মৃত্যু আর আত্মহত্যার সংখ্যা রোজ বাড়ছে। ক–বাবু যে–‌কোনও সময় খ–এর বিরুদ্ধে সন্দেহভাজনের তকমা লাগাতে পারে অযথাই। শুনানির দিন ‘‌খ’‌ অনুপস্থিত থাকলে এবং তার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলেও, তার জন্য কোনও শাস্তির বিধান নেই। এই ভাবে শুধুমাত্র পাঁচজন ব্যক্তি নগাঁও জেলার আঠারো হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহভাজন তকমা লাগিয়েছেন। এতে করে এনআরসি সেবাকেন্দ্রের কর্মীদের নিরপেক্ষতাও প্রশ্নচিহ্নের মুখে। এই অমানবিক নিষ্পেষণ সত্ত্বেও দেশনাড়ানো জাতীয় নির্বাচনে অসমের কোনও দল ইস্তাহারে নাগরিকত্ব সঙ্কট বা এনআরসি–কে ইস্যু করার উপযুক্ত ভাবেনি। প্রকৃত এনআরসি, প্রকৃত নাগরিক, প্রকৃত ভারতীয় ইত্যাদি পলাতক পলিটিক্যাল কারেক্টনেসে অসমের বাঙালিরা সর্বার্থে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে ডি–নাগরিক হয়ে চলেছেন।
উপত্যকার বিশিষ্ট কবি শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর কবিতার একটি পঙ্‌ক্তির গুঞ্জন শোনা যায় উনিশের আবহাওয়ায়— যে কেড়েছে বাস্তুভিটে, সেই কেড়েছে ভয়, আকাশ জুড়ে লেখা আমার আত্মপরিচয় আকাশ জুড়ে যাদের আত্মার পরিচয় লেখা, মমতাহীন কালস্রোতে বারবার যাদের ভূমিকে, শিকড়কে খণ্ড খণ্ড করে উপড়ে ফেলা হয়েছে, উনিশের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের লিগ্যাসি বহন করা অসম–উত্তরপূর্বের বাঙালির ভারততীর্থের কাছে প্রশ্ন— কবে, আর কত পরীক্ষা দিলে তারা নিজভূমে সন্দেহভাজন বিদেশি হয়ে থাকার অভিশাপ মুক্ত হবেন?‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top