সুচিক্কণ দাস: থাইল্যান্ডের রাচাবুরি প্রদেশের খাও চঙ ফ্রান গুহা। গভীর এই গুহা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত বাদুড় গুহা নামে। এখানে আস্তানা প্রায় ৩০ লক্ষ কোঁচকানো ঠোঁট বাদুড়ের। জায়গাটা রাজধানী ব্যাঙ্কক থেকে প্রায় ৬০ মাইল পশ্চিমে। প্রতি শনিবার ভোরের দিকে একেবারে নিয়ম করে গুহায় ঢুকে পড়েন জনা কুড়ি গ্রামবাসী। এরপর পুরো সপ্তাহ জুড়ে গুহার মেঝেতে পড়ে থাকা বাদুড়ের বিষ্ঠা চেঁচে–‌পুঁছে সংগ্রহ করেন তারা। ঘণ্টা তিনেকের চেষ্টায় মেলে ৩০০ ঝুড়ি বাদুড়ের বিষ্ঠা। এরপর সেগুলো প্যাকেটে ভরে তাঁরা বিক্রি করেন স্থানীয় একটি মন্দিরে। মন্দিরের চাষের জমিতে ওই বিষ্ঠা কাজে লাগে সার হিসেবে। ১ কেজি বাদুড়ের বিষ্ঠার দাম হিসেবে যা পাওয়া যায় তা দৈনিক মজুরির সমান। কীটপতঙ্গভুক এই বাদুড়দের বিষ্ঠায় থাকে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন। যা সার হিসেবে খুবই উপকারী। রাচাবুরির বাদুড় গুহার এই বিষ্ঠা সার হিসেবে বিক্রি হয়ে আসছে বহুকাল ধরে। এমনকি প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস প্রথমে চীনে ও পরে বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়লেও, এবং হাজার দুয়েক মানুষের মৃত্যু হলেও, বাদুড়ের বিষ্ঠা সংগ্রহে কোনও ঘাটতি পড়েনি। যদিও বাদুড়ের দেহে থাকা করোনা ভাইরাসই অন্য কোনও বাহকের মাধ্যমে মানবদেহে ছড়িয়েছে বলে সন্দেহ করছেন বিশেষজ্ঞরা।  
এশিয়ার অনেক দেশেই বাদুড়ের মাংসের বেশ কদর আছে। মাঝেমধ্যে ধরা পড়লে জমিয়ে চলে বাদুড়ের মাংস খাওয়া। তবে এটা নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র পালাও এবং ইন্দোনেশিয়ার কিছু কিছু এলাকায় বাদুড়ের মাংস ভালই চলে। নিপা থেকে এখনকার করোনা ভাইরাস, সবকিছুর সঙ্গে বাদুড়ের সম্পর্ক রয়েছে— এই সন্দেহে বাদুড়ের মাংস খাওয়ার অভ্যাস নিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা–‌নিরীক্ষা শুরু হয়েছে। 
বাদুড় নিয়ে গবেষণার একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৭ সালে। নেচার পত্রিকায় জিডিজ ইকোলজিস্ট পিটার ড্যাসজ্যাক জানিয়েছিলেন, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভাইরাসের বাহক বাদুড়েরা। তাদের থেকে মানুষের সংক্রমণ হতে পারে। বাদুড়ের দেহে থাকা ভাইরাস নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন ডিউক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর মেডিক্যাল স্কুলের প্রধান লিনফা ওয়াং। তাঁর মতে, বাদুড়ের দেহ থেকে সরাসরি মানবদেহে সংক্রামিত হতে পারে এমন ভাইরাসের সংখ্যা কম।  বাদুড় থেকে মানবদেহে ভাইরাস সংক্রমণের বিষয় নিয়ে ওয়াং কাজ করছেন গত কয়েক দশক ধরে। 
তবে বিপদ শুধু বাদুড় থেকেই নয়। ভাম বিড়াল কিংবা উট থেকেও করোনা ভাইরাস মানবদেহে সংক্রামিত হতে পারে। যেসব স্তন্যপায়ী প্রাণী এ ধরনের ভাইরাস বয়ে বেড়ায়, তাদের মাংস ভাল করে রান্না না করলে, তাদের দুধ, লালা, রক্ত, মিউকাস কিংবা প্রস্রাব থেকেও ভাইরাস সংক্রমণ হতে পারে। বিপজ্জনক ভাইরাস কখন রূপ বদল করে মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠবে তা আগাম বলা যায় না। জানিয়েছেন থাইল্যান্ডের সেন্টার ফর ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজ–এর ডেপুটি চিফ সুপাপরন ওয়াছাড়াপ্রুয়েকসাদি। তাঁর মতে, বিপদ আটকানোর সেরা রাস্তা হল ঝুঁকি এড়িয়ে চলা। 
খাও চঙ ফ্রান বাদুড় গুহায় বিষ্ঠা সংগ্রহকারীরা ঢোকেন লম্বা হাতা শার্ট পরে। মাথাটা টি শার্টে ঢাকা থাকে। অথচ  গবেষকেরা ওই গুহায় যান দেহ আপাদমন্তক পোশাকে ঢেকে ও মাস্ক পরে। শুকিয়ে যাওয়া বিষ্ঠা থেকে সংক্রমণের ভয় কম। তবে বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাব থেকে সংক্রমণের ভয় থেকেই যায়। করোনা ভাইরাসে থাইল্যান্ডে একজনের মৃত্যুর পরেও কিন্তু বাদুড় গুহা থেকে বিষ্ঠা সংগ্রহ চলছে। এই 
ব্যবসা যিনি দেখাশোনা করেন সেই সিংহ সিট্টিকুল বলেন, ‘‌অনেক দিন থেকে, বহু প্রজন্ম ধরেই আমরা একাজ করে আসছি। আমরা স্থানীয় ভাবে ব্যবসা করি।  তবে অ্যামাজন বা আলিবাবার মতো কোম্পানিও অনলাইনে বাদুড়ের বিষ্ঠা বিক্রি করে।’‌
রাচাবুরির অর্থনীতিতে বাদুড়ের গুরুত্ব খুবই বেশি। বিষ্ঠা থেকে সার ছাড়াও, নানা ধরনের পোকামাকড় খেয়ে বাদুড়েরা ধানখেতের ফসল বাঁচায়। সেকারণে বাদুড়ের ওই গুহাকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ওখান বাদুড় মারা বা বাদুড়ের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ। আবার ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপে ফলখেকো বাদুড়ের মাংস বাজারে ভালই বিক্রি হয়। সবজি, লঙ্কা বাটা, নারকেলের দুধ ও মশলা দিয়ে সেখানকার লোকজন জমিয়ে রান্না করেন বাদুড়ের মাংস। পালাউতে রেস্তোরাঁয় গোটা বাদুড় প্লেটে সার্ভ করা হয়। রান্না করা হয় আদা, নারকেলের দুধ ও মশলা দিয়ে। কিছুদিন আগেই সোশ্যাল মিডিয়ায় সেই ছবি ভাইরাল হয়েছিল। সেই ছবিকে চীনের ছবি বলে প্রচার করা হলে তীব্র প্রতিবাদ জানায় চীন। 
বন্যপ্রাণী পাচার ও তাদের নিয়ে ব্যবসা, বিশেষত যেসব প্রাণী বাদুড়ের দেহের ভাইরাস বহন করে, খুবই বিপজ্জনক। প্যাঙ্গোলিন, সিংহ, গন্ডার কিংবা হাতির দেহাংশ নিয়মিত এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাচার হয়। সাম্প্রতিক করোনা ভাইরাস সংক্রমণে প্যাঙ্গোলিন বা অশ্বক্ষুরাকৃতি বাদুড়ের ভূমিকা আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এভাবে বন্যপ্রাণী পাচার অবাধে চলতে থাকলে মানবদেহে ভাইরাস সংক্রমণ বিপজ্জনক চেহারা নিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে নানা ধরনের বন্যপ্রাণীর মাংস নিয়ে ব্যবসা ও সেইসব প্রাণীর মাংস খাওয়া বন্ধ হওয়াটা খুবই জরুরি। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, বাদুড়–‌বাহিত রোগ আরও আছে। সেগুলি এখনও জানা যায়নি। সেই সব ভাইরাস আরও বিপজ্জনক হতে পারে। অতএব বাদুড় নিয়ে ব্যবসা ও বাদুড়ের মাংস খাওয়া বন্ধ করতে হবে। এই মর্মে সতর্কতা জারি করেছে থাইল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রক। ‌
(সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট)‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top