রোশেনারা খান: যা তো মা, রামুকাকার দোকান থেকে তেল নিয়ে আসবি। দৌড়ে যাবি আর আসবি।
মায়া সন্ধেবেলা কাজের বাড়ি থেকে ফিরে দশ বছরের মেয়ে জবাকে দোকানে পাঠিয়েছিল। জবা দৌড়ে গেলেও ফিরেছিল রামুকাকার বিকৃত লালসার শিকার হয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে। মায়া থানা–পুলিস করেনি, পেটের ধান্দা করতেই দিন কেটে যাচ্ছে, থানায় চক্কর কাটবে কখন? তাই গালাগাল দিয়েই মনের ঝাল মিটিয়েছিল।
সমাজের নিচুতলায় পিছিয়ে থাকা পরিবারে এই ধরনের ঘটনা দরিদ্রতা ও অসহায়তার কারণে চাপা পড়ে যায়। এদের জন্য পদযাত্রা-পথ–অবরোধ কিছুই হয় না, যতক্ষণ না এরা মরে গিয়ে খবর হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। জবার মতো মেয়েরা শৈশব থেকেই চিল–শকুনের আঁচড়, কামড় খেয়ে বেঁচে থাকে, বেড়ে ওঠে। আবার অনেকে হারিয়ে যায়। বাড়িতে, গাড়িতে, স্কুল-কলেজে, অফিসে, পথে-ঘাটে বিচ্ছিন্নভাবে যে সমস্ত যৌন–হয়রানি ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, মিডিয়ার কল্যাণে সেগুলি জনসমক্ষে আসে। কিন্তু চোখের আড়ালে থেকে যায় তাদের কথা, যারা অপহৃত হয়ে বা ছলনায় ভুলে পাচার হয়ে যায় এবং দেশে কিংবা বিদেশে যৌনদাসী হিসেবে দিনের দিন একাধিক পুরুষের দ্বারা ধর্ষিতা হতে থাকে। আয়েশার কথা মনে পড়ে? উচ্চমাধ্যমিকের ছাত্রী আয়েশাকে ২০১৪-তে অপহরণ করার এক বছর পর ২০১৫-তে এইচআইভিতে আক্রান্ত, দুর্গন্ধময় পঙ্গু অবস্থায় দিল্লির একটি হাসপাতালে তার খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল।
এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আমাদের রাজ্যের দুই চব্বিশ পরগনা, দুই দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, মালদা, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি–সহ কম–বেশি সব জেলা থেকেই প্রত্যেক বছর হাজার হাজার বালিকা থেকে যুবতী পাচার হয়ে থাকে উত্তরপ্রদেশ, হিমাচলপ্রদেশ, হরিয়ানা, রাজস্থান ইত্যাদি রাজ্যে যেখানে মেয়েদের আনুপাতিক হার খুবই কম। চড়া দামে বিক্রি হওয়া মেয়েদের চালান করা হয় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। এছাড়া আরবেও প্রচুর মেয়ে পাচার হয়ে থাকে। গত কয়েক বছর ধরে নারী পাচারে দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নাম শীর্ষস্থানে রয়েছে। বর্তমান সরকারের ‘‌কন্যাশ্রী’‌ প্রকল্প বাল্যবিবাহ কিছুটা রদ করতে পারলেও নারী–পাচার এখনও নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। এই বিষয়ে আরও অনেক বেশি নজরদারি এবং সচেতনতা প্রয়োজন। কারণ, সমীক্ষা থেকে যে সমস্ত তথ্য উঠে এসেছে তাতে জানা যাচ্ছে, দেশে ও বিদেশে নারী পাচারের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রস্থল হল কলকাতা। ভারতের বিভিন্ন শহরে যে সমস্ত নারী কেনা–বেচার ঘাঁটি রয়েছে তার মধ্যে ৫০% বেচা–কেনা হয় কলকাতায়। ৪৫%–এর বেশি নাবালিকা পাচার হয়ও কলকাতার ভিতর দিয়ে। কলকাতা ছাড়াও এ রাজ্যে নাবালিকা পাচারের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি শিলিগুড়ি। নেপাল, বাংলাদেশ থেকে বর্ডার সংলগ্ন এলাকার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন বয়সের মেয়েরা প্রথমে পাচার হয়ে আসে শিলিগুড়ি ও কলকাতায়। এখান থেকে দালালরা তাদের নিয়ে যায় দিল্লি, মুম্বই। সেখানে ঝাড়াই–বাছাইয়ের পর ঘষে মেজে তৈরি করে বিক্রি করে দেওয়া হয়। চেহারা, গুণাবলি ও আদব-কায়দা বিচার করে এদের কারও ঠাঁই হয় যৌনপল্লীতে, কারও হোটেলে, কাউকে ভেট হিসেবে বানানো হয়, কাউকে আইটেম গার্ল। যেসব রাজ্যে মেয়ের আকাল, সে সমস্ত রাজ্যের ধনী পুরুষেরা এদের থেকে মেয়ে কিনে নিয়ে যায় রক্ষিতা করে রাখার জন্য। সেরা মেয়েগুলি পাচার হয়ে যায় বিদেশে।
নারী–পাচার বা নারী ব্যবসার কোনও সীমাবদ্ধতা নেই। সমগ্র বিশ্বজুড়েই চলছে অতিরিক্ত লাভজনক এই নারী কেনা–বেচার আদিম ব্যবসা। পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তিক এলাকার দরিদ্র পরিবারের অল্পবয়সী মেয়েরা পাচারকারীদের সহজ শিকার। এরা অরক্ষিত এবং এদের সুখী জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা যায়। বিয়ের স্বপ্ন, ভাল কাজ পাইয়ে দেওয়ার স্বপ্ন, ইত্যাদি। অরক্ষিত বলে এদের অপহরণ করাও সহজ হয়। শহুরে শিক্ষিত পরিবারের যে সমস্ত মেয়েরা মডেলিং করার, সিনেমায় অভিনয় করার স্বপ্ন দেখে, কিন্তু বাড়ির লোক রাজি থাকেন না, তাদেরও অনেকে দালালদের খপ্পরে পড়ে পাচার হয়ে যায়। দালাল ও তাদের আড়কাঠিরা বিভিন্ন পাড়ায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশে থাকে।
এই পাচার রোখার জন্য প্রশাসন ও সরকারের আরও বেশি উদ্যোগ নেওয়ার ও সজাগ থাকার প্রয়োজন। অনেক সময় অপহরণ বা নিখোঁজের অভিযোগ নিতে থানার অফিসাররা গড়িমসি করেন। ফলে অপহরণকারী নাগালের বাইরে চলে যায়। উপদ্রুত এলাকার থানাগুলিতে এই ধরনের অভিযোগ জানানোর জন্য আলাদা সেল থাকলে ভাল হয়। দক্ষিণবঙ্গের শিয়ালদা ও হাওড়া স্টেশন এই দুটি করিডর দিয়ে নারী–পাচার করা হয়। এখানে পুলিস-প্রশাসনের বেশি মাত্রায় অ্যাকটিভ থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন এদের সচেতন করার পাশাপাশি শিক্ষা ও উপার্জনের বিষয়টি সুনিশ্চিত করা। সরকারি সুযোগ– সুবিধের কথা বাড়ি বাড়ি প্রচার করতে হবে। এ দায়িত্ব অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের দেওয়া যেতে পারে। পাড়ার বা ক্লাবের যুবকেরা থানার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এলাকার সুরক্ষার দায়িত্ব নিতে পারে। এ ছাড়াও প্রান্তিক এলাকায় যেসব স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও ‘‌হোম’‌ রয়েছে, সেগুলির ওপর চোখ বন্ধ করে ভরসা নয়, বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন। কারণ অনেক সময় সর্ষের ভিতরেই ভূত লুকিয়ে থাকে। মূল কথা হল, প্রতিটি মানুষকে নারী ও শিশুপাচার সম্বন্ধে সচেতন করতে হবে। সচেতন থাকতে হবে।

জনপ্রিয়

Back To Top