সুদীপ্ত চক্রবর্তী- ভোটের ডামাডোলে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খবর আমাদের সকলেরই প্রায় নজর এড়িয়ে গিয়েছে। প্রথম খবরটি হল, সুইডেনের ষোলো বছরের একটি কিশোরী, গ্রেটা থুনবার্গ, নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে। দ্বিতীয় খবরটি হল, পৃথিবীজুড়ে ৯৮টি দেশের পড়ুয়ারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে শামিল হয়েছে এবং তাদের এই প্রতিবাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের বারো হাজার বৈজ্ঞানিক। তৃতীয়টি আমাদের দেশের। হরিদ্বারের কাছে একটি আশ্রমে কয়েকজন সন্ন্যাসী একের পর এক অনশন করে ধীরে ধীরে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নিচ্ছেন। এই তিনটি ঘটনাকে একসূত্রে যে বিষয়টি বেঁধেছে সেটি বহুচর্চিত ও আলোচিত পরিবেশ দূষণ। সব থেকে বড় কথা, আমাদের দেশের ঘটনার সঙ্গে রাজনীতির কদর্য দিকটি জড়িয়ে গিয়েছে।
হরিদ্বার থেকেই শুরু করা যাক। উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে অবস্থিত মাতৃসদন আশ্রমের সাধুরা গঙ্গাকে দূষণমুক্ত নির্মল ও গঙ্গার প্রবহমানতা বজায় রাখার দাবি নিয়ে অনশনে থাকছেন। ২০১১ সাল থেকে লাগাতার একের পর এক সন্ন্যাসী এই দাবিতে জীবন উৎসর্গ করছেন। কিন্তু কেন এই অনশন?‌
উত্তরাখণ্ডের গোমুখ হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হয়ে গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ২,৫২৫ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। শুধুমাত্র ভারতীয় উপমহাদেশ কেন্দ্রিক সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবেই নয়, গঙ্গার জলের জীবাণুনাশক গুণ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। কানপুর আইআইটি–‌সহ বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় জানা গেছে যে গঙ্গার জলে ১৭টি রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুকে ধ্বংস করতে সক্ষম ব্যাকটিরিওফাজ পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, নদী বাঁধের ফলে এই উপকারী ব্যাকটিরিওফাজের সংখ্যা গঙ্গার জলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় হ্রাস পাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে মল–‌মূত্র থেকে শুরু করে কারখানা ও বিভিন্ন পাথর খাদানের দূষিত বর্জ্য। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গঙ্গায় বসবাসকারী বহু মাছ, প্রাণী, উভচর। ভারতের জাতীয় জলচর প্রাণী ‘‌গাঙ্গেয় শুশুক’‌ আজ লুপ্ত হয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে। উৎপাদনের বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও, জলবিদ্যুতের জন্যই প্রচুর সংখ্যায় ছোট–‌বড় নদী বাঁধ তৈরি করায় গঙ্গার নিম্ন অববাহিকায় জল পৌঁছতেই পারছে না। বিপন্ন হয়ে মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন গুনছে সুন্দরবন–‌সহ গঙ্গার ওপর নির্ভরশীল বহু অঞ্চল ও মানুষ। মনে রাখতে হবে, এই জলবিদ্যুৎ কর্পোরেট সংস্থার (‌পড়ুন আদানি গ্রুপ)‌ দাবি মেনে সস্তায় উৎপাদন করে বেশি দামে বিক্রি করার জন্য বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন উঠবে তা হলে গঙ্গাকে নির্মল ও পরিষ্কার করার জন্য এত কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার কী হল?‌ এ ক্ষেত্রেও অনেকেরই একটা খবর হয়তো নজর এড়িয়ে গেছে। ২০১৪ সালে জয়লাভের অব্যবহিত পরেই হরিদ্বারে গঙ্গারতির মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল ‘‌নমামি গঙ্গে’‌ প্রকল্প। তৈরি হয়েছিল কমিটি। বরাদ্দ হয়েছিল টাকা। খরচও হয়েছে প্রচুর পরিমাণ টাকা। ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের দামামা যখন বেজে গেছে তখন আমরা তথ্য জানার অধিকার আইনের বলে জানতে পারলাম, প্রতি বছর অন্তত একবার মিটিং করার কথা থাকলেও গঙ্গাকে নির্মল রাখার জন্য নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কমিটি একবারের জন্যও মিলিত হতে পারেনি। তা হলে?‌ পুরো ব্যাপারটাই ‘‌আই ওয়াশ’‌?‌‌ লোক দেখানো, ‌প্রচার সর্বস্ব‌?‌
চলে আসি বাকি দুটি খবরের কথায়। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে সুইডেনের সংসদ ভবনের সামনে পোস্টার হাতে দাঁড়ানো এক কিশোরীর ছবি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি অনুযায়ী পরিবেশ বাঁচাতে আন্তর্জাতিক মহলে সুইডেন যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় রাষ্ট্রনেতাদের দায়ী করেছিল সেই কিশোরী, গ্রেটা থুনবার্গ। তারপর থেকে প্রতি শুক্রবার স্কুলে না গিয়ে প্রতিবাদে শামিল হত গ্রেটা। সেখান থেকেই বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ‘‌ফ্রাইডেস ফর ফিউচার’‌ আন্দোলন। অটিজম নামের দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত গ্রেটা বলেছে, ‘‌তোমরা আগামীর জন্য আশাবাদী হোয়ো না। তোমরা ভয় পাও। যে আতঙ্কে আমি রোজ ভুগছি, সেটা একবার উপলব্ধি করো। সেইমতো ব্যবস্থা গ্রহণ করো।’‌
আমাদের দেশের গঙ্গার প্রবহমানতা ও নির্মলতা বজায় রাখার জন্য ইতিমধ্যে স্বামী জ্ঞানস্বরূপ সানন্দ, সন্ত গোপাল দাসজি প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। কোনও আলাদা শুক্রবার নয়, ২০১৮ সালের ২৪ অক্টোবর থেকে টানা অনশন করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছেন এক তরুণ সন্ন্যাসী–‌আত্মবোধানন্দজি। কে তাঁর খবর রাখেন?‌ ঘটনা হচ্ছে, সুইডেনের গ্রেটা পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয়ে সরকার বিরোধী অবস্থান ব্যক্ত করে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয় আর আমাদের দেশে আগে উল্লিখিত সন্ন্যাসীদের রাষ্ট্রব্যবস্থা (‌ক্ষমতা)‌ চিকিৎসার নাম করে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতাল থেকে নিখোঁজ করে দেয়। যে দু’‌জন সন্ন্যাসী মারা গিয়েছেন বলে এখানে বলেছি তাঁদের জোর করে পুলিশ দিয়ে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং সেখান থেকে নিরুদ্দেশ। এখানেই মোদি–‌যোগী সরকারের কৃতিত্ব।
এবার তৃতীয় নজর–‌এড়ানো খবরটির কথায় আসা যাক। পরিবেশ রক্ষার্থে এ যাবৎ সবথেকে বড় আন্দোলনের উদ্যোক্তা আমেরিকার তিন স্কুলপড়ুয়া— হাভেন কোলম্যান, আলেকজান্দ্রিয়া ভিলাসেনর এবং ইসরা হিরসি। কী করেছে ওরা?‌
গত ১ মার্চ একটি মার্কিন মুলুকের সংবাদপত্রে প্রকাশিত চিঠিতে ১৫ মার্চ আন্দোলনের ডাক দিয়ে ওরা তিনজনে বলেছিল, ‘‌আমরা ছোট। ভোট দেওয়ার অধিকার নেই। আমরা মানব সম্প্রদায়ের স্বরহীন আগামী। কিন্তু এবার আমাদের কণ্ঠ শোনা যাবে। ১৫ মার্চ বিশ্বের সব মহাদেশ আমাদের সঙ্গে প্রতিবাদে শামিল হবে।’‌ শুনলে চমকে যেতে হয়, গত ১৫ মার্চ শুধু আমেরিকাতে একশোটিরও বেশি শহরে ছোটরা পথে নেমেছিল। পৃথিবীর ৯৮টি দেশের হাজার হাজার পড়ুয়া এই আন্দোলনে শামিল হয়েছে। অনলাইনে এই পরিবেশ আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়েছে আমেরিকার সীমানা ছাড়িয়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, পোল্যান্ড, থাইল্যান্ড, কলম্বিয়া থেকে শুরু করে সুদূর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আজকের পৃথিবী যেভাবে দূষিত হচ্ছে এবং সেই দূষণের প্রভাবে যেভাবে উষ্ণায়ন হচ্ছে তা আটকাতে আমাদের হাতে আর বড় জোর ১০–‌১২ বছর সময় আছে। তার মধ্যে ব্যবস্থা নিতে না পারলে পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘‌সিক্সথ গ্লোবাল এনভায়রনমেন্টাল আউটলুক’‌ নামে একটি রিপোর্টে বিজ্ঞানীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, পরিস্থিতি না পাল্টালে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দূষণজনিত মড়কে বহু মানুষ অকালমৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকা। নারী–‌পুরুষের প্রজনন ক্ষমতা যেমন কমবে তেমনই শিশুরা আক্রান্ত হবে বিভিন্ন প্রকারের স্নায়ু সংক্রান্ত জটিল রোগে। তাই পৃথিবীর দেশে দেশে পথে নামা পড়ুয়াদের দাবি, কার্বন উৎপাদন বন্ধ করতে হবে, গ্রিন হাউস গ্যাস উৎপাদন কমানোর জন্য সরকার নিজে উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসুক। আর পড়ুয়াদের এই দাবি মেনে নিয়ে, প্রতিবাদকে সমর্থন জানিয়ে প্রায় বারো হাজার বিজ্ঞানী গবেষক পরিবেশরক্ষার স্বার্থে মুখ খুলেছেন।
এতটা উদাসীন বা অসচেতন আমরা, ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষেরা আগে ছিলাম না। কথায় কথায় বেদ, রামায়ণ–‌মহাভারত প্রসঙ্গ এখন রাষ্ট্রনেতারা টেনে আনেন। বৈদিক যুগে, শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গাছপালা, পশুপাখি, পাহাড়–‌নদী ছিল তার একান্ত আপন। তখন সে সবসময় কামনা করত বায়ু মধুময় হোক, নদী মধুময় হোক;‌ দিন–‌রাত্রি, আকাশ, ধুলো, গাছপাতা সবই মধুময় হোক। 
সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সেই সময়েও প্রকৃতির ওপর ঘটেছিল মানুষের আগ্রাসন। কিন্তু মজার কথা, তখনও মানুষের এই বোধটা ছিল যে প্রকৃতির ওপরে অত্যাচার চালালে মানবজাতির পক্ষে তা সুখকর হবে না। বন কেটে ফেলা, যথেচ্ছ পশুপাখি হত্যা করা সেই সময়েও নিষিদ্ধ ছিল। আমাদের ভারতবর্ষের প্রাচীনতম দুই মহাকাব্য— রামায়ণ ও মহাভারতে (‌আনুমানিক ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৫০০ খ্রিস্টাব্দ)‌ পরিবেশ সচেতনতার পরিচয় আমরা পেয়েছি। একটু মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে সুইডেনের গ্রেটা থুনবার্গ, আমেরিকার হাভেন কোলম্যান, আলেকজান্দ্রিয়া ভিলাসেনর ও ইসরা হিরসি এবং ভারতের আত্মবোধানন্দজিরা এক সুরেই কথা বলছেন। যদিও শাসকের চরিত্র দেশ অনুযায়ী ভিন্ন। কিন্তু আমরা আর কতদিন চুপ করে থাকব?‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top