অনিন্দ্য জানা

পজিটিভ?‌ 
— পজিটিভ।
— যাক বাবা। বাঁচা গেল! ‌থ্যাঙ্ক গড!‌ 
সপ্তাহদুয়েক আগে অগ্রজ বন্ধুর সঙ্গে এই আপাত–স্বস্তিদায়ক কথোপকথন হল। 
কীসের স্বস্তি? ‌কীসের পজিটিভ?‌ কীজন্য উপরওয়ালাকে ধন্যবাদ?‌ 
পজিটিভ হল ‘কোভিড’। বিধাতাকে ধন্যবাদ, কারণ বন্ধুর নিকটাত্মীয়ের কোভিডাক্রান্ত মরদেহটি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে বার করে দাহ করার দায়টা আর ধ্বস্ত পরিবারকে নিতে হবে না। কোভিড পজিটিভ হলে প্রোটোকল মেনে সৎকারের দায় সরকারের। রোগীর মৃত্যু হয়েছে আগের রাতে। শ্বাসকষ্ট ছিল। সঙ্কটাপন্ন ছিলেন।  হাসপাতাল থেকে ফোনে যোগাযোগ করে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গে ওষুধ, অক্সিজেন ইত্যাদি আনুষঙ্গিক। পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল বাড়িতে থাকা পরিজনদের উদ্বেগ। 
সে উদ্বেগ নিকটজনের প্রাণের আশঙ্কাজনিত নয়। উদ্বেগ মৃত্যু হলে দাহকাজ নিয়ে। চিন্তা–শঙ্কা–উদ্বেগ–প্রার্থনা। হে ঈশ্বর, যেন সোয়াব টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ আসে!‌ যেন মৃত মানুষটি কোভিড পজিটিভ হন। যেন তিনি করোনা আক্রান্ত হয়ে থাকেন। 
হলেন। মৃতের করোনা রিপোর্ট পজিটিভ এল। পরিজনরা বাঁচলেন। কোভিড না ধরা পড়লেও সদ্যবিধবা স্ত্রী কোথায় যেতেন সৎকারের জন্য?‌ কোথায় পেতেন শ্মশানবন্ধু?‌ করোনায় স্বামীর মৃত্যু হওয়ায় অন্তত সে দায়টা থেকে তিনি বাঁচলেন। যা শুনে হিতৈষী বন্ধু হাঁফ ছেড়ে অস্ফুটে বললেন, ‌থ্যাঙ্ক গড!‌ 
‘পজিটিভ’ শুনে দ্রুত প্রতিবর্ত ক্রিয়ায় শব্দদুটো উচ্চারণ করে ফেলার পর ঝুম হয়ে বসে ভাবছিলাম, বাঁচলাম?‌ নাকি ভেতরে ভেতরে মরলাম?‌ মানুষ রইলাম?‌ নাকি অমানুষ হয়ে গেলাম?‌ পাষণ্ড হয়ে গেলাম?‌ নষ্ট হয়ে গেলাম?‌ মৃতের করোনা ধরা পড়েছে জেনে আশ্বস্ত হলাম? ‌হতে পারেন অচেনা। কিন্তু এক সদ্যবিধবাকে প্রয়াত স্বামীর অন্ত্যেষ্টির দায়ভার নিতে হবে না জেনে নিরুদ্বেগ হলাম? প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে হবে না জেনে হাঁফ ছাড়লাম? ‌‌ 
করোনাভাইরাসের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের পর চারমাস কেটে গেছে। সংক্রমণের ব্যপ্তির মতো ঝপঝপ করে চারদিকে বাড়ছে অমানবিক প্রবৃত্তি। পাড়ায় পাড়ায় ফিসফাস ক্রমশ গর্জনে পরিণত। দ্রুত অচ্ছুৎ এবং অস্পৃশ্য জীবে পরিণত হচ্ছেন করোনা আক্রান্ত এবং তাঁদের পরিজনরা। তাঁদের পাশে দাঁড়ানো দূরস্থান, সামাজিক বয়কট করা হচ্ছে। এমনকী, কেউ স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে কোভিড পরীক্ষা করিয়েছেন জানতে পারলে সেই পরিবারকে অপরাধীর মতো দেখা হচ্ছে। সেই পরিবারের কোনও আত্মীয় বাড়িতে এলে তাঁদেরও সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে। পাড়ার দোকানের ছোট ব্যবসায়ী বহিরাগত কেউ এলাকায় আসতে চাইলে উপযাচক হয়ে বলছেন, এ পাড়ায় আসবেন না। অমুক বাড়িতে করোনা হয়েছে। বাড়ির সামনে দিয়ে যাতায়াতের সময় আঙুল তুলে দেখানো হচ্ছে দাগী অপরাধীদের আস্তানার মতো। 
করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ভয়কে ছাপিয়ে যাচ্ছে আক্রান্ত হওয়ার পর সমাজে পতিত হওয়ার যন্ত্রণা আর আশঙ্কা। করোনাভাইরাস আমাদের শ্মশানবন্ধু–বিমুখ করেছে। অসামাজিক করেছে। অমানবিক করেছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চারদিক। পচে যাচ্ছে। গলে যাচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছি আমরা। প্রতিদিন। প্রতিমুহূর্তে। 
গত ৩ জুলাই ফেসবুকে সুনন্দা চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘উত্তরপাড়ার মতো এমন একটি শিক্ষিত এলাকায় আমরা যে এভাবে করোনাস্লেজিংয়ের শিকার হব, তা কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। আমরা শুধুমাত্র করোনা টেস্ট করিয়েছিলাম। এই তথ্যটাকে বিকৃত করতে করতে সবার কাছে ছড়িয়ে দেওয়া হল আমরা করোনা পজিটিভ বলে। বাড়ির সামনে দিয়ে বাইক যাচ্ছে, সাইকেল যাচ্ছে, রিকশা যাচ্ছে। জানালার দিকে হাত দেখিয়ে দেখাচ্ছে— এই বাড়িটা, এই বাড়িটা।’ সুনন্দার স্বামী অর্ণব ঘটনাচক্রে আমার পেশাগত সহকর্মী। একটি চ্যানেলের সাংবাদিক। কোভিড–কর্তব্যে ফ্রন্টলাইনার। সে কারণে তাঁরা নিজেদের উদ্যোগে করোনা টেস্ট করিয়েছিলেন। যাতে তাঁরা এবং তাঁদের পড়শিরা সুস্থ থাকেন। হতাশ এবং ক্ষুব্ধ সুনন্দা লিখেছেন, ‘এই সচেতনতারই কি মাশুল দিলাম আমরা এতটা মানসিক চাপের বিনিময়ে!‌’
মাসখানেক আগে বাড়ির সামনে গাড়ি ধোয়ার সময় পড়শি মহিলা বারান্দায় এসে স্নেহশীল এবং চিন্তিত গলায় চুপিচুপি বলেছিলেন, ‘আমাদের দুটো গলি পরেই কিন্তু ধরা পড়েছে। তুমি বাবা সাবধানে থেকো।’ তঁাকে বলেছিলাম, ‘অত চিন্তা করবেন না কাকিমা। সল্টলেকে এমনিতেই বাই ডিফল্ট পরস্পরের সঙ্গে সামাজিক দূরত্ব থাকে। পাশের বাড়ির লোকের সঙ্গেও বেশিরভাগ সময় বাক্যালাপ বা বাড়িতে বাড়িতে যাতায়াত থাকে না। দুটো গলি পর তো অনেক দূর। মাস্ক পরলে, নিয়মমাফিক শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখলে এবং নিয়মিত হাত ধুলে এই রোগ এড়ানো যায়।’ হিতৈষী প্রৌঢ়া কথা না বাড়িয়ে অন্দরমহলে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু কাকিমাদের সেই স্বর এখন আর চাপা নেই। তাঁদের গলা চড়েছে। পরিপার্শ্বের আবহ বলছে, আরও চড়বে। চড়তেই থাকবে। 
রিফ্লেক্স অ্যাকশনে অগ্রজ বন্ধুকে ‘থ্যাঙ্ক গড’ বলে ফেলার পর সুনন্দার ফেসবুক পোস্টের কথা মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, মুদ্রার উল্টোপিঠটাও সমান বিক্ষত। যারা ছদ্ম–কোভিডে আক্রান্ত আর আমরা যারা কোভিড চেয়ে দাহসংস্কারের ঝঞ্ঝাট এড়িয়ে বাঁচতে চাইছি— দু’পক্ষই বোধহয় সমান অপরাধী। 
মনে পড়ছিল পায়েলের ফেসবুক পোস্টের কথা। গত ২১ জুলাই তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের এই লড়াইটা কার সাথে?‌ করোনা নামক অসুখের সাথে, নাকি মানুষ নামক অসুরের সাথে?‌ আমার বাবা গত ৭ জুলাই করোনার সাথে যুদ্ধে হার মেনে চলে গিয়েছেন। মা গত ১৪ দিন মেডিকা হাসপাতালে করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছেন (২৫ তারিখের ‌ফেসবুক পোস্ট বলছে, ২৪ তারিখ তিনি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন)‌। এই অদ্ভুত পরিস্থিতিতে চারদিকের মানুষগুলোকে এক ঝটকায় বদলে যেতে দেখলাম। আমার বাবার বাড়ির নাম হয়ে গেল করোনা বাড়ি। আমাকে দেখলেই যে মানুষগুলো আগে ছুটে আসত কথা বলতে, তারাই কেমন যেন এড়িয়ে যেতে লাগল। কারণটা বুঝলাম না। আমি তো করোনা পজিটিভ নই। আমাকে দেখলে পালাচ্ছে কেন?‌ তার সাথে পাড়ার লোকদের কটূক্তি। 
‘আমার প্রশ্ন হল, এই অসুখটাকে তো আমরা কেউ ইচ্ছে করে বাড়িতে আনিনি। আজ আমার পরিবারে হয়েছে। কাল, ভগবান না করুন, অন্য কারও পরিবারে হতে পারে। করোনা হলেই তার সাথে বা তার পরিবারের সাথে এইরকম অচ্ছুতের মতো ব্যবহার করাটা কি জরুরি?‌ গত ১৪ দিন যা অভিজ্ঞতা হল, তাতে মনে হচ্ছে এই পৃথিবীর ধবংস হয়ে যাওয়াটাই বোধহয় শ্রেয়।’
মনে পড়ছিল, পায়েলের প্রয়াত বাবার নাম অরুণ গুহ ঠাকুরতা। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং অভিনেতা। চিকিৎসকের ঠিকানা গুলিয়ে ফেলায় উবর চালক করোনা–আক্রান্ত ৭৬ বছরের যে বৃদ্ধাকে মাঝরাস্তায় ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছিল। এলাকার কিছু মানুষ তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করান। করোনা তো ছিলই। ততক্ষণে নাচার, সহায়হীন এবং অসুস্থ মানুষটি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছেন। যা থেকে তিনি আর ফিরতেই পারলেন না। আর তাঁর বাড়ির নাম হয়ে গেল ‘করোনা বাড়ি’!‌ 
মনে পড়ছিল বনগাঁ হাসপাতালের চত্বরে অ্যাম্বুল্যান্সের পাদানির সামনে পড়ে–থাকা করোনায় আক্রান্ত অসহায় বৃদ্ধের কথা। তাঁর স্ত্রী–র আকুল আর্জি আর চারদিকে জমাট, পাথুরে এক অমানবিক এবং আপাত–বধির দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে সেই কাতর আবেদনের ফিরে ফিরে আসা।
নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চারদিক। পচে যাচ্ছে। গলে যাচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছি আমরা। প্রতিদিন। প্রতিমুহূর্তে। 
মডেল–অভিনেত্রী র‌্যাচেল হোয়াইট টুইটারে লিখেছেন, ‘শুনলাম কোভিড পজিটিভ হওয়ার পর আমায় ঢুকতে দেওয়ার অপরাধে আমার অ্যাপার্টমেন্টের দারোয়ানের চাকরি যেতে বসেছিল। ফোন করে অ্যাপার্টমেন্টের সেক্রেটারিকে বলেছি, গো টু হেল!‌ দরকার হলে কিন্তু আমি আইনি পদক্ষেপ করব। তা–ও তো আমি এই বাড়ির মালিক। যাঁরা ভাড়াবাড়িতে থাকেন, তাঁদের কী অবস্থা ভাবতেও আতঙ্ক হচ্ছে।’ র‌্যাচেল আবেদন জানিয়েছেন, ‘কোভিড রোগীদের এভাবে অস্পৃশ্য করবেন না। দূরত্ব রাখুন। কিন্তু তঁাদের মানসিকভাবে দূরে ঠেলে দেবেন না। মনে রাখুন, এটা কিন্তু কাল আপনার সঙ্গেও হতে পারে।’
‌‌হতেই পারে। কিন্তু এখন এসব আর কে ভাবছে?‌ শারীরিক দূরত্ব রাখতে গিয়ে সামাজিক দূরত্ব বাড়িয়ে ফেলছি আমরা। অসামাজিক হয়ে যাচ্ছি। ‘রোগকে ঘৃণা করো রোগীকে নয়’ উপদেশাবলি চুলোর দুয়ারে দিয়ে বেলাগাম করোনা সংক্রমণের আবহে রোগীদের একঘরে, অস্পৃশ্য আর অচ্ছুৎ করার হিড়িক পড়েছে। 
চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, একজন করোনা আক্রান্ত থেকে অন্তত আড়াইজন সংক্রমিত হতে পারেন। ফলে আতঙ্ক প্রয়োজন। সত্যিই কি প্রয়োজন?‌ অবুঝ আতঙ্ক?‌ চিকিৎসকদের প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রেখেই বলছি, ‘আতঙ্ক’ দরকার নেই। প্রয়োজন ‘সতর্কতা’। আতঙ্ক ‌আর সতর্কতার মধ্যে একটা সূক্ষ্ণ ভেদরেখা আছে। আমরা বড় দ্রুত সেই সীমারেখা ভুলে যাচ্ছি। সতর্ক থাকতে গিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছি। আতঙ্কের মধ্যে একটা নির্বুদ্ধিতা আছে। সতর্কতার মধ্যে বুদ্ধির ছাপ আছে। নির্বোধ আতঙ্কের দরকার নেই। আতঙ্কিত হয়ে মনুষ্যত্ব বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দৌড়ে গিয়ে অতিরিক্ত অমানবিক হওয়ার অর্থ নেই। বরং বুদ্ধি প্রয়োগ করে সতর্ক থাকতে পারি। পারি না?‌ 
একেক সময় মনে হয়, পারি। তারপর সুনন্দা–পায়েল–র‌্যাচেলদের অভিজ্ঞতা দেখে মনে হয়, বোধহয় পারি না। পারছি না। চোখ বুজলেই ভেসে আসছে অ্যাম্বুল্যান্সের পাদানির সামনে ধীরে ধীরে লাশ হয়ে যাওয়া একটি শরীর। কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে সেই শরীর নিংড়ে বেরিয়ে আসা ক্রমক্ষীয়মান শ্বাসবায়ুর গোঙানি আর তাঁর স্ত্রী–র আকুল দয়াভিক্ষার চাপাস্বরটুকু। 
মনে হচ্ছে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে চারদিক। পচে যাচ্ছে। গলে যাচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছি আমরা। প্রতিদিন। প্রতিমুহূর্তে। 

জনপ্রিয়

Back To Top