দীপ্তেন্দ্র রায়চৌধুরী- বাজেটের দিন সারা দেশ যখন কী পেয়েছি কী পাইনি হিসেব কষছে, রাজস্থানে তখন উৎসব করছিল কর্ণী সেনা। না, বাজেটের থেকে তাঁদের কোনও লাভ হয়নি। ‘‌পদ্মাবত’‌ও বিভিন্ন হলে চলছে হইহই করে। তাঁরা খুশি হয়েছিলেন রাজস্থানের দুই লোকসভা ও এক বিধানসভা আসনে বিজেপি পর্যুদস্ত হওয়ায়। টুইটারে ‘‌রাজপুত ওয়র্ল্ড নিউজ’‌ লিখেছিল, ‘‌বনশালির জন্য রাজস্থানের উপনির্বাচনে চড়া দাম দিতে হল বিজেপিকে।’ সেটাকে রিটুইট করে‌ছিল কর্ণী সেনার সেই অঘোষিত নিজস্ব অ্যাকাউন্ট, যেখানে স্কুলের বাচ্ছাদের বাসে আক্রমণের পর বলা হয়েছিল, গুরগাঁওয়ের ঘটনার সঙ্গে কর্ণী সেনার কোনও সম্পর্ক নেই। শুধু কর্ণী সেনাই নয়, সাধারণ রাজপুতরাও বলছেন, বিজেপিকে সবক শেখাতে পেরে তাঁরা খুশি। কিন্তু তাঁদের এই ধরনের মনোভাবের কারণ কী?‌ বিজেপির নেতারা তো তাঁদের প্রচ্ছন্ন ভাবে সমর্থন করেছিলেন। তা সত্ত্বেও কর্ণী সেনা মনে করছে, রাজপুত গৌরব রক্ষা করতে বিজেপি কিছুই করেনি। কর্ণী সেনার মতোই অন্য অনেক রাজপুত সংগঠনই মনে করে, কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত ছিল অর্ডিন্যান্স করে সিনেমাটি নিষিদ্ধ করা। বোঝাই যাচ্ছে, সংরক্ষণ না–পাওয়ায় ক্ষুব্ধ জাঠদের মতো এবার রাজপুতদের বড় অংশ বিজেপিকে ভোট দেয়নি রাজস্থানে। তার ফলেই মরুঝড়ে উড়ে গেছে বিজেপি। 
কিন্তু এর জন্য নিজেদের ছাড়া কাকে দোষ দেবেন বিজেপি নেতারা?‌ গত শতাব্দীর আশির দশকে দলের উত্থানের জন্য লালকৃষ্ণ আদবানি হাতিয়ার করেছিলেন রামমন্দির আন্দোলন। অর্থাৎ উগ্র হিন্দুত্ব। তখন থেকেই হিন্দু সমাজের বিভিন্ন অংশ, বিশেষ করে সেই সব মানুষ যাঁরা ধর্মীয় ও জাতিগত আবেগে আচ্ছন্ন, বিজেপিকে নিজেদের ত্রাতা বলে মনে করে আসছে। আর বিতর্কিত প্রশ্নটার সঙ্গে যদি প্রচ্ছন্ন মুসলিম বিদ্বেষের কোনও যোগ থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। বিজেপি–র এইসব প্রশ্নে তাঁদের পাশে না–থাকাটা তাঁরা বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর বিজেপির শীর্ষ নেতার পক্ষে দায়িত্বজ্ঞানহীন হওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে, ক্ষোভ বাড়ছে পুরনো সমর্থকদের মধ্যে। রামমন্দির তৈরির পথ করে দিতে কিছু না–করায় নরেন্দ্র মোদির ওপর চটে যাচ্ছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও সাধু–সন্তরা। অটলবিহারী বাজপেয়ীর সময় তবু বলা যেত, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা তো নেই। এখন তা–ও বলা যাচ্ছে না। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে বিজেপি হয়ত লোকসভার ভোটের আগে কৌশলে রামমন্দির তৈরির কর্মসূচি নিয়ে আসবে। এখনও নিশ্চিত ভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মোদি যদি তেমন কৌশল নেন, তা কিন্তু আধুনিক দেশ তৈরির সূচক বলে গণ্য হবে না।
এমন পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদি পড়তেন না, যদি তিনি বিশুদ্ধ পুঁজিবাদী উন্নয়নের পথ আঁকড়ে না–ধরতেন। যদি না তিনি গত সাড়ে তিন বছর গ্রাম ও গরিবের উন্নয়নের কথা ভুলে থাকতেন। ভর্তুকি অর্থনীতির পক্ষে ভাল নয়, সে কথা সবাই জানেন। পুঁজিবাদী উন্নয়নের পথটার কোনও বিকল্প নেই, সে কথাও প্রমাণিত। কারণ, শিল্প–বাণিজ্য বাড়লে তবেই বৃদ্ধির হার বাড়ে, কর্মসংস্থান হয় এবং সরকারের হাতে বাড়তি টাকা আসে জরুরি কাজের জন্য। তার পরেই প্রশ্ন ওঠে, জরুরি কাজগুলো কী?‌ অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ভর্তুকি দিয়ে রোজগারের ব্যবস্থা করা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পরিষেবার ব্যবস্থা করা অবশ্যই অত্যন্ত জরুরি একটা কাজ। মানবিক কারণেই জরুরি। মোদি এই কথাটা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মানতে চাননি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও মানতে চাননি। একশো দিনের কাজকে অর্থের অপচয় বলে মনে করেছেন। এখন শেষবেলায় ৫০ কোটি গরিব মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবার কথা মনে পড়ছে তাঁর। গ্রাম আর গরিবের কথা মনে পড়ছে। গুজরাটের গ্রামাঞ্চলে ধাক্কা না–খেলে হয়ত মনেও পড়তই না। লোকসভা ভোটের ফল বেরলে বুঝতেন কী হল।
গুজরাটে দু দশক পরেও ক্ষমতায় ফেরা, প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়া, নিশ্চয়ই কৃতিত্বের বিষয়। কিন্তু গুজরাটে দেখা গেল কীভাবে শহুরে ভোটার আর গ্রামীণ ভোটার বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। গুজরাট উন্নত রাজ্য, বাণিজ্যমনস্ক রাজ্য এবং গত ২০–২৫ বছরে সেখানে নগরায়ণ হয়েছে দ্রুত। তাই সেখানে গ্রামের অসন্তোষ সত্ত্বেও জেতা যায়। কিন্তু রাজস্থানে, মধ্যপ্রদেশে, উত্তরপ্রদেশে, বিহারে তা সম্ভব নয়। আর গরিব মানুষের ভিড় শহরের থেকে অনেক, অনেক বেশি গ্রামে। কৃষি ক্রমশই অলাভজনক হয়ে যাচ্ছে, কারণ অত্যধিক মানুষের চাপ আছে সেখানে। শেষ যে সব পরিসংখ্যান ও গবেষণাপত্র এসেছে, তা থেকে দেখা যায় যাঁরা কাজ করেন (‌টোটাল ওয়র্কফোর্স)‌ তাঁদের ২২ শতাংশ পুরোপুরি বা আংশিক ভাবে কৃষিক্ষেত্রে কাজ করেন। কিন্তু আরও অনেক মানুষ কৃষি–সম্পর্কিত কাজের মাধ্যমে পুরোপুরি বা আংশিক ভাবে সংসার চালান। সব মিলিয়ে দেশের কমবেশি অর্ধেক মানুষের জন্য কৃষি একমাত্র বা অন্যতম আয়ের উপায়। যত দ্রুত আরও অনেক বেশি মানুষকে কৃষিক্ষেত্রের বাইরে আনা যায়, ততই ভাল। কিন্তু যতক্ষণ না তা করা সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ এই মানুষগুলোকে উপেক্ষা করা যায় কি?‌ নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকার কিন্তু তাই করছিল।
দেশের সবচেয়ে গরিব ১০ কোটি পরিবারকে (‌কমবেশি ৫০ কোটি মানুষ)‌ নিখরচায় ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্য–পরিষেবার আওতায় আনার কথা নরেন্দ্র মোদির মনে পড়ল একেবারে শেষ বাজেটে। যিনি এই প্রকল্পটির কথা ভেবেছিলেন, নীতি আয়োগের সেই সদস্য বিনোদ কে পলের বক্তব্য, এ বাবদ খরচ দাঁড়াবে ১২ হাজার কোটি টাকা। কেউ কেউ বলেছেন, ৫০–৬০ হাজার কোটির কমে হবে না। মাঝামাঝি একটা হিসেব ধরলে দাঁড়ায় ৩০ হাজার কোটি। এই খরচের এক–তৃতীয়াংশও যদি রাজ্যগুলো বহন করে, তাহলে কেন্দ্রকে বইতে হবে ২০ হাজার কোটি টাকার দায়। রাজ্যগুলোর কারও ঘাড়েও খুব বেশি বোঝা চাপবে না। কাজটা যে সহজেই করে দেখানো যায়, তা মমতা ব্যানার্জির সরকার প্রমাণ করেছে। বাম আমলে শোনা যেত, টাকা নেই। তাই গরিবদরদি বাম সরকার রাজ্যের মানুষের বিনা পয়সায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারেনি। অথচ তৃণমূল সরকার করে দেখিয়েছে। ভোটে তার প্রতিফলনও হচ্ছে। সোনিয়া গান্ধীর একার চেষ্টায় ইউপিএ১–এর সময় একশো দিনের কাজ চালু হয়েছিল। ফলে, ২০০৯–এ বিরাট ভাবে জিতেছিল কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট। ভোটে জেতা আর মানুষের কল্যাণ, এই দুটো একসঙ্গে জুড়ে নেওয়াই তো রাজনৈতিক দলের মূল লক্ষ্য। ‘‌মোদিকেয়ার’ নরেন্দ্র মোদির ক্ষেত্রে সেই ব্রহ্মাস্ত্র হতে পারত, যদি আরও আগে শুরু করা হোত। কিন্তু সেই মানসিকতাটাই মোদির ছিল না। 
মোদির সমস্যা হল, তিনি অর্থনীতির হাল ফেরানোর জন্য যা যা করণীয়, তা করতে খুবই আগ্রহী। পরপর নোটবাতিল ও জিএসটি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, অসম্ভব ঝুঁকি নিতে পারেন তিনি। জিএসটি যে অর্থনীতির পক্ষে ভাল, তা নিয়ে বিতর্ক নেই। নোটবাতিল কিন্তু স্বল্পমেয়াদি ভিত্তিতে ব্যর্থ হয়েছে সরকারের প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে। দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে কর আদায় অনেকটা প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা এখনও খোলা আছে। কিন্তু এসবের ফলে রাজস্ব আদায় বাড়লেও, সরকার যদি গরিব মানুষের সমস্যার দিকে মনোযোগী না–হয়, তাহলে দেশের সামগ্রিক কল্যাণ তো হবে না। গ্যাসের, বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছে দেওয়া বা জনধন অ্যাকাউন্ট খোলা ভাল পদক্ষেপ। কিন্তু দরিদ্রতম মানু্যের জন্য তা যথেষ্ট নয়। এখন মোদি যা–ই করুন, গতবারের জেতা ২৮২ আসনের ৫০ থেকে ৬০ আসন সম্ভবত পরের ভোটে হারাতে চলেছে বিজেপি। নতুন ১০–১৫ আসন হয়ত জিততে পারে তারা, কিন্তু বিরাট কোনও পরিবর্তন না–ঘটলে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার আশা নেই। ফলে, সরকার গড়লেও নির্ভরশীল হতে হবে শরিকদের ওপর। এই অবস্থায় মোদি পৌঁছতেন না, যদি গরিব মানুষের বেঁচে থাকার সমস্যা সম্পর্কে উদাসীন না–হতেন।‌‌‌‌‌‌‌

জনপ্রিয়

Back To Top