অনিন্দ্য জানা- তুই কিন্তু সাবধানে থাকিস।
— হ্যাঁ রে। খুব দুর্দিন।
অ্যাম এক্সট্রিমলি ওরিড ফর ইউ। আফটার অল, ইউ ডিল উইথ পেশেন্টস এভরি’ডে!‌ 
— ইয়েস!‌ হেভি এক্সপোজার!‌ অ্যান্ড নো পিপিই (‌ওই চাঁদে যাওয়ার মতো আগাপাশতলা ঢাকা পার্সোনাল প্রোটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট)‌ ইন দিস কান্ট্রি। আমার টিমকে আপাতত দু’ভাগে ভাগ করে একটা দলকে রিজার্ভে রেখেছি। বাট আই হ্যাভ টু গো। বি’‌কজ অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ডে, দে আর মাই পেশেন্টস। আমাকে যেতেই হবে রে। যারা আসছে, তারা তো আমার পেশেন্ট। 
গত শুক্রবার রাত দেড়টা নাগাদ যার সঙ্গে হোয়াট্‌সঅ্যাপে এই কথোপকথন, সে (‌সমবয়সী। তাই ‘তিনি’ নয়, ‘সে’ই লিখছি)‌ কলকাতা তথা দেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বিখ্যাত এবং দায়িত্বশীল চিকিৎসক। পাশাপাশি, সারা দুনিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে আমন্ত্রিত হয়ে বক্তৃতা করে বেড়ানো চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞও বটে। চিনি ছোট্টবেলা থেকে। নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে অন্যতম প্রিয় বন্ধু তথা সমমনস্ক সহপাঠী। পরবর্তীকালে প্রথমে সেন্ট জেভিয়ার্স এবং পরে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হয়ে সটান বিলেতে। প্রায় ১৫ বছর সাহেবদের স্বাস্থ্যোদ্ধার করে কাটানোর পর ‘দেশের জন্য কিছু করব’ বলে কলকাতা ফিরে এসে থিতু হয়েছে। 
বন্ধু শুভ্র হিমানীশ রায়চৌধুরীর জন্য চিন্তা হচ্ছিল। ভয় করছিল। কিন্তু ডাক্তার শুভ্র হিমানীশ রায়চৌধুরীর জন্য গর্ব হচ্ছিল। 
যেমন ভয় করছে চারপাশের করোনা–দুনিয়ায় কর্মরত ও কর্মরতা হাজার–হাজার, লক্ষ–লক্ষ, কোটি–কোটি চিকিৎসাকর্মীর জন্য। আবার গর্বও হচ্ছে। চীনের ইউহানের মুখগুলোর ছবি ভেসে ভেসে আসছে অবিরত। টানা যুদ্ধ করতে করতে ধ্বস্ত, ক্লান্ত। দীর্ঘ এবং নিরবচ্ছিন্ন মাস্ক ব্যবহারে ইলাস্টিক কেটে কেটে বসেছে মুখের নরম চামড়ায়। সেই ক্ষত থেকে প্রবাহিত রক্তের ধারা ঠেকাতে গালে সাঁটা লিউকোপ্লাস্ট। চোখের তলায় কালি। কিন্তু মুখে হাসি। তৃপ্তির হাসি। যুদ্ধজয়ের হাসি। ভিনদেশি স্বাস্থ্যকর্মীদের ফুলে–ওঠা, বিকৃত মুখ দেখে অনেক দূরের এক শহরে মধ্যবয়সী পেশাদারের ভয় করছিল— তাহলে অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে লড়াই এতখানি মাসুল নিয়ে যায়?‌ ভয় করছিল। 
প্রথম প্রথম অবশ্য বিরক্ত লাগছিল। ভোরে ব্যাডমিন্টন খেলা বন্ধ। লেকের ধারে জগিং বন্ধ। শপিং মল বন্ধ। দোকান বন্ধ। পার্লার বন্ধ। রেস্তোঁরা বন্ধ। হোটেল বন্ধ। পরীক্ষা বন্ধ। বন্ধ একের পর এক প্রতিষ্ঠান। শুধু চালু সোশ্যাল মিডিয়ায় বঙ্গসমাজের একাংশের লঘু চাপল্য (‌এটা গৌরবার্থে লেখা। আসলে ফাতরামো এবং ন্যাকামো)‌। বিরক্ত লাগছিল খুব। কিন্তু এবার ভয় করছে। 
রবিবার সকাল ৭টা থেকে ‘জনতা কার্ফু’। দক্ষিণ কলকাতার যে পাড়ায় বাস, সেখানে সকাল রোজ ৬টা থেকে প্যাঁ–পোঁ আওয়াজ মগজের গোড়া ধরে ঝাঁকুনি মারে। সঙ্গে পথচলতি জনতার কিচিরমিচির। রবিবার মনে হচ্ছিল সোনার কাঠি–রুপোর কাঠি ওলটপালট করে কেউ গোটা পাড়ার ঘুমটাকে আরও অনেকক্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ভোর গড়িয়ে গেল সকালে। সকাল গড়াতে বসল দুপুরে। কিন্তু পরিপার্শ্বের ঘুম আর ভাঙছিল না!‌ চারতলার ব্যালকনি থেকে যতদূর দৃষ্টি যায়, ধূ–ধূ করছে পথঘাট। কোথাও কোনও প্রাণের সাড়া নেই। ভয় করছিল। 
খানিক বেলায় গাড়ি ধোওয়ার জন্য নিচে নামলাম। ফাঁকা। জনমানবহীন অ্যাপার্টমেন্টের পার্কিং লটে নিজের জুতোর শব্দ নিজেরই কানে খটখট করে বাজছিল। মনে পড়ে যাচ্ছিল নয়ের দশকের গোড়ায় প্রথমবার কাশ্মীরে জঙ্গি আন্দোলন কভার করতে যাওয়ার কথা। বন্ধু সাংবাদিক রশিদ আহমেদের শ্রীনগরের বাড়ি থেকে কলকাতার অফিসে ফ্যাক্সে ডেসপ্যাচ পাঠিয়ে বেরোতে বেরোতে রোজই সূর্য পাটে বসে যেত। শুরু হয়ে যেত দৈনন্দিন কার্ফু। সাংবাদিকের পরিচয়পত্রটা আঁকড়ে ধরে অন্ধকারে লালচকের রাস্তা ধরে হেঁটে হেঁটে কিলোমিটার খানিক দূরের হোটেলে ফিরতাম। মোড়ে মোড়ে বালির বস্তার বাঙ্কার। আড়াল থেকে উঁচিয়ে আছে রাইফেলের নল। অন্ধকারেও চকচক করছে। হয়তো তার পিছনে নিস্পন্দ কয়েকজোড়া চোখ। আর কেউ কোথাও নেই। চারদিক থেকে ঝাঁপিয়ে আসত নিকষ অন্ধকার। কংক্রিটের নির্জন ফুটপাথে নিজের পায়ের জুতো ‘টকাস–টকাস’ করে শব্দ তুলত। প্রতিমুহূর্তে সেই শব্দে মনে হত, নির্ঘাত কেউ পিছু নিয়েছে!‌ নিশ্চয়ই অন্ধকারে লুকিয়ে আছে আশেপাশের কোনও বাড়ির আড়ালে। দেওয়ালের পাশে। বারান্দার ছায়ায়। আমি এগোলে সে–ও এগোচ্ছে। আমি থামলে থামছে সে–ও। তারই পায়ের শব্দ ভেসে আসছে অনবরত। 
দৌড়তেও ভরসা পেতাম না। যদি পিছনের লোকটাও ছুটতে শুরু করে!‌ কোনওক্রমে দম ধরে রেখে হোটেলে পৌঁছতাম। ততক্ষণে বন্ধ হয়ে যেত আতঙ্কিত সদর ফটক। যতক্ষণ না ভিতর থেকে কেউ তালা খুলছে, পাগলের মতো ধাক্কা মারতাম। মেরেই যেতাম। কিছুক্ষণ পর ফটক খুলে উঁকি মারত চেনামুখ। 
গেটের বাইরে অপেক্ষা করতে করতে কতবার যে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকাতাম!‌ মনে হত, এবার নিশ্চয়ই মাটি ফুঁড়ে এসে দাঁড়াবে অন্ধকারে ঘাপটি মেরে থাকা চেহারাটা। তারপর কপালে ঠেকাবে কালান্তক অ্যাসল্ট রাইফেল। অথবা নিদেনপক্ষে একটা নাইন এমএম পিস্তল। কেউ আসত না। বুঝতাম, আসলে কেউ পিছু নেয়নি। ভয়টা ঠেলে আসছে নিজেরই ভিতর থেকে। রোজ বুঝতে পারতাম। কিন্তু রোজ ভয় পেতাম। যেমন এখন হচ্ছে। রোজ বুঝতে পারছি। রোজ ভয় পাচ্ছি। আর রোজ ভয় বাড়ছে। 
রবিবার দুপুরে হু–হু করে গাড়ি চালিয়ে এলাম অফিসে। বন্‌ধের চেয়েও ফাঁকা রাস্তা। সমস্ত দোকানের শাটার নামানো। ঝাঁঝালো দুপুরে রাস্তায় কোনও কাকপক্ষী নেই। গাড়ির অভাবে ট্র্যাফিক সিগনালগুলোর সবুজ–হলুদ–লাল আলো নিজেদের মতো জ্বলছে–নিভছে। মা উড়ালপুল থেকে বাইপাসে নামার পর যে জায়গাটায় রোজ জ্যামে আটক থাকে গাড়ি, সেই এলাকাটাও রাজহাঁসের মতো সাঁতরে মসৃণ পেরিয়ে এলাম। আশেপাশে একটাও গাড়ি নেই। একটাও মানুষ নেই। কোথাও প্রাণের চিহ্নটুকু নেই। মৃত্যুপুরীর মতো লাগছিল পথঘাট। যেন কেউ এসে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে চারপাশের সমস্ত জীবন শুষে নিয়েছে!‌ যখন রোজ মধ্যরাত পেরিয়ে বাড়ি ফিরি, তখনও রাস্তা এমন ফাঁকা দেখি না। কিছু ছুটকো মানুষ, কিছু রাতচরা অপ্রকৃতিস্থ অবয়ব, কিছু সজাগ চোখ আনাচেকানাচে থাকে সঙ্গী হয়ে। রাতের গাঢ় অন্ধকারেও কুচো কুচো প্রাণের আবেশ নিয়ে যে রাস্তা নির্ভয় এবং নির্ভীক থাকে, মধ্যদুপুরের খর রোদে সেই রাস্তা মাইলের পর মাইল ধরে পড়েছিল এক অতিকায় কালো ফিতের মতো। নিষ্প্রাণ। 
ভয় করছিল। 
আর গর্ব হচ্ছিল নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কথা ভেবে। গলায় স্টেথো। মুখে মুখোশ। হাতে দস্তানা। মনে গভীর সাহস। গর্ব হচ্ছিল হাজার হাজার ভয়ডরহীন পেশাগত সহকর্মীদের কথা ভেবেও। মুখে মাস্ক। কাঁধে ক্যামেরা। হাতে বুম–নোটবই–কলম। কোভিড–১৯ ভাইরাসের মতো এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ। যারা অনবরত হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে অতিমারী কভার করতে করতে ভাবছে, শত্রু নিঃশব্দে পিছু নেয়নি তো?‌ ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে না তো?‌ ঝাঁপিয়ে পড়েনি তো ইতিমধ্যেই?‌ 
বাল্যসুহৃদ শুভ্র হিমানীশের জন্য চিন্তা হচ্ছিল। ভয় করছিল। আবার পরক্ষণেই মনে পড়ছিল গভীর রাতে হোয়াট্‌সঅ্যাপে ভেসে আসা দৈববাণী— ‘বাট আই হ্যাভ টু গো। বিকজ অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য ডে, দে আর মাই পেশেন্টস। আমাকে যেতেই হবে রে। যারা আসছে, তারা তো আমার পেশেন্ট।’ মনে পড়ছিল পরদিন সকালে বিনা অনুসন্ধানে একটা স্মাইলি সহযোগে আসা আশ্বাসবাণী— ‘চিন্তা করিস না। ভাল লোকেদের কিছু হবে না।’ 
সেই আশ্বাসবাণীর মতোই ভেসে আসছিল ইউহানের নার্সদের মাস্ক–খোলা ক্ষতবিক্ষত অথচ হাস্যোজ্জ্বল মুখগুলো। মনে পড়ছিল লালচকের রাস্তা ধরে হেঁটে যাওয়া নিঝুম, একলা সন্ধেগুলো। মনে হচ্ছিল, ভাইরাস আছে বটে আশেপাশে। কিন্তু এখনও পিছু নেয়নি। আসলে ভয়টা ঠেলে উঠে আসছে নিজেরই ভেতর থেকে। 
মনে হচ্ছিল, অদৃশ্য শত্রুকে জিততে দেওয়া যাবে না। ভাল লোকদের মরিয়া লড়াই জারি থাকুক। ভয়ের পরেই জয় থাকে। আর ভয় থেকে জয়ের শৃঙ্গে আরোহণের রাস্তায় বিছিয়ে থাকে স্বোপার্জিত গর্ব। ‌

জনপ্রিয়

Back To Top